. আত্মপক্ষ সমর্থন

আমি তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক অথবা দুই ক্লাসের শেষ বেঞ্চে; নীরিহ মানবশাবক। খাপছাড়া লম্বাটে এক মেয়ে আমাকে বিরক্ত করে। স্কুল ছুটির পর পিছু নিতে ভুলে না মেয়ে। হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ঘুরপথে; যে পথে ছড়িয়ে থাকে দমকা বাতাসে উড়ে আসা পাখির বাসা, ভেঙে যাওয়া ডিম; চোখ না ফোটা পাখিশাবক। শিমুলদীঘির পথে জাদু ছড়ানো মরা রোদ; শীত ঋতু; মরাদীঘির বুকে ভীনদেশি পাখি; পাখির চোখের মতো মায়াবি জলের স্বচ্ছতায় ভেসে আছে কলাপাতারঙ কচুরিপানার ফাঁকে নীলরঙা তাজা কচুরিফুল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠি বালিকা আমাকে টেনে নামায় সেই নীলকষ্টের কাছে; একেবারে নীলের কাছাকাছি; তখন ভাষার সীমানায় ‘নীল’ শব্দটি হয়ে ওঠে কষ্ট প্রকাশের পরিপুরকধ্বনি; কষ্টপ্রকাশ, সূচকধ্বনি।

বিদ্যালয়ফেরা সেই সন্ধ্যায় ডাহুক ডেকে ওঠে। আমি চেতনা ফিরে পেলে আমাকে পেয়ে বসে ডাহুকনেশা। আর তখন ময়েন কাকা শিমুলদীঘির কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এক-দশ-শ অথবা হাজার গাছের রস, তালপাতার শরীর জুড়ে মৌদেহ তালরস অথবা খেজুরপাতার চিকন ধারালো পাতার তীক্ষ্ণতা ভেদ করে জেগে ওঠা মিইয়ে পড়া জীবন্ত বিকেল অতিক্রান্ত হয়। সহসা চোখ খুলে গেলে, সন্ধ্যার কাছাকাছি সেই বিদ্যালয়ফেরৎ ঘরে ফেরা বিকেল হাটুভেঙে বসে থাকে শিমুলদীঘির জলের ওপর; যেন বা রূপকথা ভেসে আছে সন্ধ্যার জলে। আর তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই শ্যামারঙের মেয়েটি আমার চোখ বরাবর তার চিকন সবুজ আঙুল তুলে দেখায়, ঐ যে, ঐ দূরে সীমাহীন দূরে, দিনের আলো ডুবে যায়। ঠিক সেই সময়, দিগন্তের ওপর মৃতপ্রায় আলোর ওপাড় থেকে ঝাঁক ঝাঁক ভূতের নিঃশ্বাস ঝাঁক বেঁধে এসে আমাদের শরীরে ভর করলে আমরা ভুলে যাই বিদ্যালয়ের ২য় ক্লাসে ইসহাক স্যারের যোগ-বিয়োগ রহস্য। সেই ‘রহস্য’ সন্ধ্যা-সময়ের ভাষাদেহ অতিক্রম করে ভেসে থাকে মায়াকাতর আকাশের দেহে।

ঠিক তখন, মেঘবিহীন আকাশ অথবা শুকিয়ে ওঠা দীঘিজলকাদার একপাশে শুয়ে থাকা একটি ধবধবে শাদা বক; আর আমরা বকশাবকের কাছে ছুটে গেলে আমি অবাক হই; কী হতবাক বিস্ময়ে ঘুমিয়ে আছে বকশাবক। আমি হাত বাড়িয়ে দেই বকশিশুটির দিকে; নীরব নিথর ওর শরীর। আমি বুঝি না কেনই বা এই ভর সন্ধ্যায় অসময়ে এভাবে ঘুমিয়ে আছে বকশাবক কচুরিঝোপের পাশে একা! ঠিক তখন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠি বালিকা আমাকে পৃথবীর প্রথম পাঠ শেখায়, যে পাঠের শিরোনাম, ‘মৃত্যু’; বকশাবক মৃত। আমি বুঝে উঠতে পারি না এই সত্য। আমি মেনে নিতে পারি না এই সত্য। আমি বহুদিন বিদ্যালয়ের ব্যাকবেঞ্চে বসে অথবা বহু বহু দিন বিদ্যালয় থেকে ফিরে গিয়ে মা-র কাছে, বাবার কাছে অথবা দাদি অথবা চাচার কাছে ফুপুর কাছে জানতে চেয়েছি; অথচ আমার জানা ছিল না, কী আমার জিজ্ঞাসা, মৃত্যু বিষয়ে কী-ই বা আমার জানার আছে! শুধু ক্ষত বিধে থাকে, মেনে নিতে পারি না, কেন একক সন্ধ্যায়, একাকি ধবধবে দেহ নিয়ে, একাকি শুয়ে থাকে মৃত ধবধবে বকশাবক? ক্ষত বিধে থাকে, প্রশ্ন জেগে ওঠে; অথচ সেই প্রশ্নকে ভাষার শরীরে গেঁথে নেওয়ার মতো কোনো শব্দ আমার বোধে নেই।

সুতরাং আমার কষ্টকে চিহ্নিত করতে না পারার যন্ত্রণা থেকে এক ধরনের অবদমন অবযাতনা অথবা অবকষ্ট আমাকে ক্রমাগত ভাষাবোধের দিকে ঠেলে দিতে থাকলে একদিন আথবা বহু বহু দিন পর আমি বুঝতে শিখেছিলাম আমার সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বালিকা বন্ধুটি আমাকে কতটা ভালোবাসতো। অথচ সেই ভাললাগা বুঝে নেয়ার মতো কোনো ‘ভাষাবোধ-আশ্রিত-শব্দ’ আমার মেমোরিতে তখনো জমে ওঠেনি; সুতরাং আমি ভাষাবোধহীন বোবাশিশু। অথচ কী এক অমোঘ প্রাত্যহিক সহজাত তাড়না আমাকে সেই বালিকা বন্ধুর পিছে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়।

অতঃপর একদা আমার বোধে ভাষাবোধ জেগে উঠলে, অথবা বোধের শরীরে সারার্থের সবুজ-আভা জেগে উঠলে আমি অপেক্ষায় থাকি, যেভাবে বকশাবকের মৃত্যুর পর বকপিতা অথবা বকমাতা সন্ধ্যার শেষ সীমানায় বসে অপেক্ষায় থাকে, কখন-কীভাবে বকশাবকের ধবধবে দেহ শিমুলদীঘির জলে ভেসে উঠবে; অথবা জেগে উঠবে ডাহুকশিশুর কণ্ঠধ্বনি; রাতদুপুরের চিরায়ত সঙ্গীত। চিরায়ত সেই সঙ্গীত বকপিতাকে অথবা বকমাতাকে ভাষাশিক্ষা দেয়। আর যখন সেই ভাষাশিক্ষার অবারিত পাঠ ছুঁয়ে দেই আমি, তখন সেই ভাষার শরীরে ভর দিয়ে বুঝে যাই, সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবুজ-সীমানায় জেগে থাকা বালিকা-বন্ধুটির নাম ছিল ‘কবিতা’।


. প্রতিপক্ষ সমর্থন

শেষাবধি দার্শনিক হয়ে উঠেছিলেন নরওয়ের ইয়স্তেন গার্ডার। তার ‘মায়া’ উপন্যাসে নিজের কৈশোর নিয়ে, ‘ঘটনাটা আমার অষ্টম জন্মদিনের আগের, তখন আমাদের পরিবার চার বছরের জন্য মাদ্রিদে পাড়ি জমায়। পকেট ভর্তি হ্যাযেলনাট নিয়ে একটা বুনো পথে দৌড়াচ্ছিলাম আমি; হ্যাযেলনাটগুলো কুড়িয়ে পেয়েছিলাম আমি। দৌড়াচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম মা-কে দেখাবো নাটগুলো। হঠাৎ বনের মধ্যে স্যাঁতসেতে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলাম ছোট একটা হরিণের বাচ্চা। শরতের ঝরা পাতার ওপর শুয়েছিল হরিণশাবক। পাতাগুলোর ছবি আমার মনে গেঁথে আছে; ছোট্ট হরিণ-বাচ্চাটির গায়ে লুটিয়েছিল সেই ঝরে পড়া পাতা। আমি ভেবেছিলাম হরিণশিশুটি ঘুমিয়ে আছে। নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়েছি আমি, গায়ে হাত বুলিয়ে সরিয়ে দিলাম ঝরে পড়া পাতা; কী চমৎকার মায়া। অথচ শিশুটি ঘুমাচ্ছিল না; মারা গিয়েছিল হরিণশাবক।’

এরপর ইয়স্তেনের বোধগত জগতে বিবর্তন ঘটে। ইয়স্তেন কোনোদিন এই অপ্রত্যাশিত যন্ত্রণার কথা মা-কে অথবা প্রিয়জনকে বলতে পারেন নি। বরং তিনি, নিজেকে এবং নিজের ক্ষুদ্র জীবনকে আরও ব্যাপক প্রেক্ষিতে স্থাপন করে সান্ত্বনার আশ্রয় খোঁজার প্রয়াস পেয়েছিলেন। ‘নিজেকে এই বলে তুষ্ট করার অভ্যাস করেছিলাম যে, জীবনের মহা অভিযাত্রায় আমি একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র; এমন কোনও কিছুর ক্ষণস্থায়ী অংশ বিশেষ যা আমার চেয়ে ঢের বিশাল এবং শক্তিশালী।’

ভালো দার্শনিক হওয়ার জন্যে প্রয়োজন বিস্মিত হবার ক্ষমতা। এই বিস্মিত হবার ক্ষমতা থেকে ভাষা-স্তরের অবচেতনে ঘটে যায় বিবর্তন; যে ঘটনাটি ঘটেছিল ইয়স্তেনের ক্ষেত্রে; যে ঘটনাটি ঘটেছিল আমার ক্ষেত্রে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানায়। প্রকৃত প্রস্তাবে, এই বিস্মিত হবার ক্ষমতা থেকেই জন্ম হয় কবিতার। ২০০৭ এ প্রকাশিত ‘কবিতাশিল্পের জটিলতা’ প্রবন্ধপুস্তকের ভূমিকায় বলেছিলাম, মানব-জগতের চেয়ে কবিতার জগৎ বিশাল এবং জটিল। এই জটিলতাকে যতটা-না বিচার বিশ্লেষণ দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব, তার চেয়েও অধিক উপলব্ধি সম্ভব সরাসরি কবিতার রস আহরণে। সুতরাং কবিতা-শৃঙ্গারের কোন বিকল্প নেই। অথচ এই শৃঙ্গাররস উপলব্ধির ক্ষমতা সবার সমান নয়; অতএব কবিতা সবার কাছে সমান অর্থ নিয়ে উপস্থিত হয় না। কবিতা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নিজেই সৃষ্টিশীল; সুতরাং কবিতার অর্থমাত্রা নির্দিষ্ট অর্থে স্থির অথবা সীমাবদ্ধ নয়। এ অর্থে একটি সফল কবিতা সৃষ্টি হয়ে ওঠার পর সেখানে কবির আর কোনো অংশগ্রহণ থাকে না; বরং কবিতা তখন নিজেই হয়ে ওঠে স্বয়ম্ভূ এবং তা সময়ের পরির্তনে নোতুন ব্যাখ্যা দাবি করে। যদিও শেষাবধি কবিতার কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে রহস্যময়তার জগৎই কি কবিতার জগৎ? নাকি শিল্পীর নির্মাণ-দক্ষতার ওপরই কবিতার সাফল্য? নাকি উভয় বিষয় পরস্পর পরিপূরক? এক্ষেত্রে প্রকৃত কবিতার জগতে প্রবেশের ক্ষমতা বিষয়ে মালার্মে মনে করতেন, আবেগকে ঘনীভূত ও পরিশুদ্ধ করে সমস্ত আলঙ্কারিকতা ত্যাগ করতে হবে। কবিতার রহস্যময়তা আর তার জাদুকরি প্রভাব বিষয়ে মালার্মে পাঠককে মনে করিয়ে দেন, আমরা যা-ই লিখি না কেন তার শুরু আর শেষটা ছেঁটে ফেলতে হবে; কেননা যা কিছু বিশুদ্ধ অথবা বিশুদ্ধ থাকতে চায় তা সত্যিকার অর্থেই অর্থবোধক সীমাহীন রহস্যের অবগুণ্ঠণে আবৃত থাকে।

সুতরাং বিশুদ্ধ কবিতার সন্ধানে আমাকে দৈনিকতার নগ্নতায় জড়িয়ে পড়লে তা আর কবিতা থাকে না; হয়ে ওঠে প্রত্যহিক বাজারি কথা; যা আমরা হরহামেশা ছড়া অথবা অন্তমিল সমৃদ্ধ শব্দবুননের ভেতর দিয়ে সৃজন করে চলেছি। এবং তা মঞ্চায়নযোগ্য কথাশিল্পে উন্নীত করে হাততালির প্রত্যাশা করি। অথচ কবিতা কোনো উপস্থাপনযোগ্য শিল্প নয়; কবিতা আত্মবোধের ব্যক্তিক আহরণ। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, আত্মবোধের আহরণ হয়ে উঠলে সেই কবিতা কীভাবে যাপিত সময়ের সাথে মহার্ঘ্যতা অর্জন করে? হ্যাঁ মহার্ঘ্যতা অর্জন করে এবং সেই মহার্ঘ্যতার করণকৌশল আবিষ্কার করা সম্ভব, যখন আমরা কিছুটা আত্মমগ্ন অথবা কিছুটা সচেষ্ট হই; তখন আমরা আমাদের প্রজ্ঞাপ্রাপ্তি চোখে দেখে ফেলি কবিতার সেই মহার্ঘ্য সত্তা, কবিতার ভেতরমহল।


. গন্তব্য দেখা যায় অথবা আত্মলেহন-রহস্য

অবলীলায় কবিতা উচ্চারণের ধ্বনিমৌনতা অথবা অর্থ-বিস্ময়-স্তরে মনোযোগী হলে কবিতার অন্তর্গত রহস্যের সামান্য হলেও বোধের সাথে মিলিয়ে নেয়া সম্ভব। কবিতা বোধের পাথা দিয়ে ছুঁয়ে দেওয়ার বিষয়; কবিতা দৃষ্টিগ্রাহ্য অথবা ব্যাখ্যাযোগ্য শিল্প নয়। প্রকৃত কবিতার ব্যাখ্যাবিস্তার দুঃসাধ্য অথবা সেই ব্যাখ্যা ঠিক কবিতার কাছাকাছি পৌঁছে কিনা, সেখানেও সংশয়। সে কারণেই বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই, কবিতা-বিশ্লেষক পণ্ডিতদের ‘অর্থহীন-বাচাল’ হিসেবে কটাক্ষ করা হয়; জীবনানন্দ দাশ শুধু নয় অনেকেই একাডেমিক পণ্ডিতদের মূর্খজ্ঞানে উপহাস করতে ছাড়েন নি। আসলে পণ্ডিত অথবা একাডেমিশিয়ানদের দোষ নয়; বরং আমাদেরকে স্বীকার করতেই হচ্ছে শিল্প-বিশ্লেষকদের কিছুটা হলেও শিল্পসত্তা থাকা জরুরি। একজন শিল্পীর হাতে শিল্পের ব্যাখ্যা যেভাবে উঠে আসে, সেভাবে একাডেমিশিয়ানদের কলমে সম্ভব হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে একাডেমিক স্তরে, অন্তত ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃ� ��ি’ বিষয়ে আর্টিস্টদের অংশগ্রহণ অধিক ফলদায়ক হতে বাধ্য। এ কারণেই শ্রেণিকক্ষে কবিতা যেভাবেই আলোচিত হোক না কেনো, আমরা যখন কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদ� ��র নিয়ে সেমিনার-আলোচনা-আড্ডার আয়োজন করি তখন তা অধিক অর্থবোধক মাত্রা লাভ করে। এই মাত্রাকে শুধুমাত্র বোধের পাখা দিয়েই স্পর্শ করা সম্ভব। যার পাখা নেই তার পক্ষে কবিতাকে ছুঁয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এই ছুঁয়ে দিতে না পারা, এটি আসলে পাঠকের ব্যর্থতা। কেননা সমসাময়িকগণ যদি পড়তে না শেখেন সে দায়ভার শিল্পীর বা কবির নয়। এ ক্ষেত্রে মালার্মে সব শ্রেণির জনগণকে তুষ্ঠ করতে পারে এমন কবিতাকে এক কথায় নাকচ করে দিয়েছেন।

কবিতা আদৌ অলস সময় যাপনের জন্য মনোরঞ্জক উপাদেয় কোনো শিল্পমাধ্যম নয়। নাটক, নৃত্য, সঙ্গীত অথবা ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি ইত্যাদি বহুবিধ শিল্পমাধ্যমে যেভাবে আনন্দ-রিল্যাক্স অথবা জৈবিক চাহিদার পরিপুরক পরিবেশ পাওয়া সম্ভব ঠিক সেভাবে কবিতার মাধ্যমে সে চাহিদা কনোক্রমেই মেটানো সম্ভব নয়; এমনকি কবিতা কখনো কোনো সামাজিক নীতিশিক্ষাও পরিবেশন করে না; কবিতা কখনো দর্শনসূত্র পরিবেশন করে না; অথচ তারপরও মানব প্রজন্ম যাতে সামাজিক চোখ অথবা দার্শনিক চোখ তৈরি করার সুযোগ লাভ করতে পারে সে বিষয়ে কবিতা আমাদের অজ্ঞাতে আমাদেরকে প্ররোচিত করে। হতে পারে ধর্মপুস্তকের কাজ ন্যায়শিক্ষা দেওয়া, সমাজশিক্ষা দেওয়া অথবা দর্শনশিক্ষা দেওয়া; তারপরও অবশ্যই ধর্মপুস্তক এবং কবিতা এক বিষয় নয়; বিষয়-আঙ্গিক অথবা রস আহরণে, যে ক্ষেত্রেই বলিনা কেনো কবিতা আর ধর্মগ্রন্থ সম্পূর্ণ পৃথক অভিধা। সামাজিক বাস্তবতা আর সভ্যতার বিবর্তনের সত্যতা অনুসারে আমরা দেখতে পাচ্ছি মানুষ ধর্মপুস্তক থেকে ক্রমশ বিযুক্ত হতে চলেছে; অপরপক্ষে ক্রমশ বিজ্ঞানচেতনাসহ নন্দনচেতনার সাথে সংশ্লিষ্ট হতে শুরু করেছে। সে হিসেবে সত্যিকার অর্থেই কবিতার চর্চা যে তুলনায় বেড়েছে সে তুলনায় ধর্মপুস্তকের চর্চা বাড়েনি। জ্ঞানের রাজ্যে এটাই স্বাভাবিক যেভাবে বিজ্ঞান-দর্শনসহ জ্ঞানরাজ্যের নানাবিধ বিষয়াদির চর্চা মানবসভ্যতা টিকে থাকার স্বার্থে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে অনুপাতে ততটাই ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মচর্চা পিছিয়ে পড়তে শুরু করেছে। কবিতাসৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনে এ বিষয়গুলোও ভেবে দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে বলা সম্ভব, ভাষাবোধে জীবন-প্রকাশের সময়-উপযুক্ত অনুভূতি কি শেষাবধি কবিতাকে আশ্রয় করে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে? ধর্মরস সেক্ষেত্রে কি যথেষ্ট নয়? অথবা যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে? অবশ্যই ব্যর্থ হচ্ছে। যদি ধর্মপুস্তক প্রশান্তি প্রদায়ক যথেষ্ট ভাষা-অভিধা হতো তা হলে সভ্যতায় শিল্প-সাহিত্য চর্চার কোনো প্রয়োজন হতো না। মানব সভ্যতা টোটেম-ট্যাবু, ফোকবিলিভ অথবা ঐশিগ্রন্থ ও বিশ্বাসের ভেতর আটকে থাকে নি; বরং ক্রমশ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা প্রিজার্ভ করাই মানব সভ্যতার বৈশিষ্ট্য; এই বৈশিষ্ট্যের সাথে কবিতার বাঁক বদলের বিষয়টিও জড়িত।

পাঠক যদি কবিতার টোন এবং মেজাজকে টাচ করতে না পারেন, তা হলে কবিতাকে উপলব্ধিতে নিয়ে আনা সম্ভব নয়। আর অবশ্যই প্রত্যেক প্রতিভাবান কবির কবিতামেজাজ পৃথক। মেজাজের সেই ভিন্নতা থেকেই উঠে আসে কবিতার অর্থবিস্তারি পরিভ্রমণ-প্রক্রিয়া; এই পরিভ্রমণগুণ একজন কবিকে সমকাল থেকে পৃথক করে চিহ্নিত করে। হতে পারে কবিতা মৃদু অথবা তীব্র; হতে পারে তা এতটাই জীবনঘনিষ্ট যে সেখানে কবিতার কুহক নেই বরং আছে কবিতার মায়া; যে মায়া আমাদের সম্মোহিত করে; ক্রমশ ডুবিয়ে রাখে জীবনের সীমাহীন অমীমাংসিত প্রশ্নে। তারপরও আমি বলবো কবিতার কুহক আসলে বিভ্রান্তির বেড়াজাল নয়; বরং তা মায়াবিস্তারি অর্থব্যকুলতার হাতছানি। তারপরও আমি মনে করি, মালার্মে যেভাবে ভেবেছেন, কবিতা এখন মালার্মের সেই ভাবনা থেকে অনেকটা সরে এসেছে। কবিতা এখন শুধু ছন্দ অথবা শব্দঝঙ্কারের অথবা শুধুই রহস্যবুননের খেলা নয়; শুধুমাত্র কণ্ঠধ্বনি নির্ভর ছন্দময় ঝঙ্কার আর অর্থহীন রহস্যকে আমি কবিতা বলে মেনে নিতে কুণ্ঠা বোধ করি; যদি না সেখানে সীমাহীন ভাবনার স্তরসমূহ উন্মোচিত হবার অবকাশ পায়; যদি না সেখানে দৈনিকতা অতিরিক্ত ভ্রমণ-প্রক্রিয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়; যদি না সেখানে পাঠকের বোধে সৃজনশীলবোধ সক্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ লাভ করে; যদি না সেখানে নিত্য ব্যবহৃত শব্দরাশি নতুন অভিব্যক্তি প্রকাশজ্ঞাপক শক্তিতে নোতুন হয়ে ওঠে; যদি না সেখানে চিত্রকল্পের সৌহার্দে প্রতিদিনের শব্দসমূহ অথবা দৃশ্যকল্পসমূহ অভিধানে আটকে থাকা অর্থের অতিরিক্ত কোনো অর্থময়তায় পাঠককে গ্রাস করে, তবে তা কখনোই নতুন কবিতা নয়; বরং তা বহু লিখিত বহু পঠিত ও ব্যবহৃত রুগ্ন ভাষা-প্রকাশ মাত্র; এগুলো লেখা হয়ে গিয়েছে, বলা হয়ে গিয়েছে, পঠিত হয়েছে; আপনাকে আর আবেগ-আপ্লুত হয়ে দ্বিতীয়বার তা লেখার দরকার নেই; অথবা আমাকে পাঠ করাবার তাড়নায় ফেইসবুকের টাইমলাইনে তা দয়া করে ট্যাগ করবেন না; সত্যিকার অর্থেই এতে আমরা বিরক্ত বোধ করি।

আমি মনে করি, একজন কবি মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের স্তরসমূহের সাথে পরিচিত হতে বাধ্য; পরিচিত হতে বাধ্য বিজ্ঞানের ক্রমবিবর্তনের প্রভাবে মানব পরিবারের মননগত চেতনস্তরের সাথে। কেননা কবি জানেন তিনি কী বলতে চান; অযথা উদ্দশ্যহীন কথাস্তম্ভ নির্মাণ করতে ইচ্ছুক নন তিনি; সেক্ষেত্রে তিনি মানব-প্রকৃতি বোঝেন, সেই সাথে বোঝেন সভ্যতার গতিবিধি। এ বিষয়ে যারা একমত নন; অবশ্য একমত হবার ক্ষেত্রে বোধগত মানবীয় চোখ থাকা জরুরি; যাই হোক তারা অপ্রস্তুত পাঠকের অজ্ঞানতার সুযোগ গ্রহণ করেন মাত্র; এবং তিনি নিজেও যেহেতু অন্ধ সেহেতু তরল বাক্যবিন্যাসকে তিনি কবিতা জ্ঞান করে জীবনভর লিখতে থাকেন; এবং বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকেন। অসংখ্য প্রতিষ্ঠান অজস্র মিডিয়া প্রস্তুত আছে সেই মূর্খতাকে স্বীকৃতি দেবার জন্য; আর যখন পুরস্কার অথবা মিডিয়াবাজি চেগিয়ে উঠতে থাকে তখন আর জনগণের দোষ দেব কেনো, এর মধ্যেই তো এভাবে মিডিয়াবাজির ধাক্কায় অপকবিতাকে কবিতা হিসেবে চিনতে শিখে গেছে সোসাইটি। আর লিখিয়েদের যে অংশটি মিডিয়ার নজরে চুক্তিবদ্ধ হতে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা সংগঠন, ফোরাম, গ্রুপ, ইচ্ছেমত পত্রিকা প্রকাশ অথবা গোষ্ঠীবদ্ধ হতে যত্নবান অথবা নিদেনপক্ষে ফেইসবুকের আলোকদেয়ালে কবিতা লেপটে দিচ্ছেন; এমন কি অসভ্যের মতো বিনা অনুমতিতে আমার অথবা আপনার টাইমলাইনে ট্যাগ করে দিচ্ছেন প্রতিদিন কবিতার নামে শত শত শব্দের অপ-আচরণ।

যাই হোক। আমি অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিভাধর কবিদের বেলায় দেখে আসছি, প্রতিভাগুণে কখনো বা কোনো বহু ব্যবহৃত রুগ্ন শব্দও হয়ে উঠেছে নোতুন; আবার কখনো বা তীক্ষ্ণ শব্দ হয়ে উঠেছে মৃদু। সত্যিকার কবিতার শরীরে দেখা যেতে পারে শব্দসংখ্যার স্বল্পতা অথচ সেই চূড়ান্ত ও সীমিত শব্দপ্রয়োগ কী প্রচণ্ডরকম অর্থ-আগ্রাসী পরিবেশ নির্মাণ করতে পারে; যার উদাহরণ একমাত্র একটি উৎকৃষ্ট কবিতাই হতে পারে। অথবা অব্যবহৃত শব্দের সহসা ব্যবহার কবিতার পরিবেশকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, পাঠককে নির্দেশনা অথবা ইশারা দিচ্ছে, পাঠক কী ভাববেন অথবা কোন পথে পরিভ্রমণে অগ্রসর হবেন এ সব কিছুই নির্ভর করছে শব্দের বিনির্মাণ অথবা প্রতিনির্মাণের ওপর। কবিতা বুঝতে হলে শব্দ ব্যবহার অথবা বাক্যবিন্যাসের এমনতর কৃৎকৌশল নিয়েও ভাববার অবকাশ রয়েছে।

আমার অভিজ্ঞতায় আমি প্রতিভাধর কবির কবিতায় এমনটিও দেখেছি, বর্ণনা ধীর ও হ্রস্ব; ফলে লাইন ছোট ও কমপ্যাক্ট হয়ে উঠেছে এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকলেও তা কখনো নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে থাকছে না; হতে পারে বিরামচিহ্নহীন অথবা প্রায় বিরামচিহ্নবিহীন প্রবহমান ছন্দের ধীরস্রোতে স্বচ্ছ অথচ রহস্যমুখর অথবা প্রচলিত ছন্দের সীমানা সেই কবিতার জন্য যথেষ্ট নয়, ফলে কবিতার ভাষা ছন্দের সীমানা অতিক্রম করছে; তারপরও সব মিলিয়ে কিন্তু নির্মাণ নয় বরং কৃত্রিমতা ও আঁতলামো বর্জিত কবিতা; সেই কবিতার পদবিন্যাসে রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রয়োজনীয় পদবন্ধন; অথবা হতে পারে সেই কবিতা ধারাবাহিক ও লক্ষ্যাভিমুখি, গন্তব্য বিদ্যমান; ফলে পাঠ-উত্তর পাঠকের প্রাপ্তিযোগ ঘটে।

আবার এ কথাও ঠিক, কবিতা প্রয়োজনের দাবিতে দীর্ঘ হয়ে উঠতে পারে; অথচ তারপরও সেই কবিতা বাহুল্যবর্জিত; হয়তো আপনি সেই কবিতার দীর্ঘ বয়ানে বিরক্ত হবার পরিবর্তে ক্রমশ পাঠবিস্তারে, ক্রমশ মুগ্ধতায় উন্মুখ হয়ে উঠবেন।

প্রতিভাধর কবিদের ক্ষেত্রে এও দেখেছি, ভাষার কাঠামো-নির্ভরতা অপেক্ষা কবিতায় শিল্পের জীবনীশক্তির সমাবেশ ঘটে পদবন্ধনের অর্থময়তার কারণে; ফলে দৈনন্দিন বস্তুজগৎ আশ্রিত ঘটনাবলীর চিত্রায়ন ও জীবন-জগতের গূঢ়ার্থ বিষয়ে দর্শনচেতনায় বিবিধ অনুষঙ্গের ইশারা বোধযোগ্য হয়ে উঠতে পারে কবিতায়। এক্ষেত্রে কবিতার বহু ব্যবহৃত কাঠামো-খোলসকে অস্বীকার করে কবি কবিতার পৃথক পোশাকে উপস্থিত হতে বাধ্য। তা না হলে পুরোনো কবিতা নোতুন করে ভিন্ন কলমে বা ভিন্ন কণ্ঠে শোনার কোনো যৌক্তিকতা নেই; আমি শুনতে বাধ্য নই। এই যে নোতুন করে কবিতাকে সামনে নিয়ে আসা; এই নোতুন করে নিয়ে আসার মধ্যে থাকে না কোনো চটুল নৃত্য; বরং সেখানে রয়েছে গভীরতার যাত্রাপথ উন্মোচন-প্রক্রিয়া।

এ অবস্থায় এসে আমি বিনয়ের সাথে বলতে চাই, এমনতর কবিতার মুখোমুখি আমি হয়েছি তার অর্থ এই নয় যে এগুলোই হতে হবে কবিতার আদর্শ; কেননা আমি মনে করি সৃজনশীলতা কোনো সুনিয়ন্ত্রিত ছকে বা আদর্শে আটকে থাকে না বা সীমাবদ্ধ থাকে না; আটকে থাকলে সেখানে সৃজনশীলতা থাকে না; সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এক্ষেত্রে আমি আমার কবিতার কৃৎকৌশল বিষয়ে ইদানিং ভাবছি, আমি আমার কবিতায় প্রাত্যহিক নন্দনপ্রিয়তাকে ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রত্যাখ্যান করতে ইচ্ছুক; এতে কবিতায় জন্ম নিতে পারে এক ধরনের বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া; যেখানে লুকিয়ে থাকে প্রতিবেশ অথবা দৈনিকতার ওপর অনাস্থা অথবা ক্ষোভ। অবশ্য এ অবস্থায় প্রচল কবিতারীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। আর এভাবে বিপজ্জনক পথে কবিতার পদবিন্যাসকে মুক্ত করে দিতে গিয়ে আমি ঝুলে থাকতে পারি তীক্ষ্ণ অথচ ধারালো সুতোর ওপর। হ্যাঁ এভাবে কবিতা নিয়ে ভাবনার সীমানা খুলে দেয়া যেতেই পারে। আবার এভাবেও ভাবা যেতে পারে কবিতা তো আসলে সৃজিত হয় না; কবিতা ছড়িয়ে আছে বাস্তব অথবা জান্তব অভিজ্ঞানের ভেতর। সেই ছড়িয়ে থাকা কবিতাকে নিজ নিজ ভাষায় অনুবাদ করে নিতে গিয়ে যে কষ্ট আর প্রশান্তির পলি জমে ওঠে সেটাকে ছেঁকে তুলে নেওয়াই কবির কাজ। তারপরও আমি বলবো, কবিতা মানবসভ্যতার জন্য কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ভাষানির্ভর মানস-প্রক্রিয়া; কবিতা বিজ্ঞাননির্ভর কোনো সৃজনজগত নয়; যদি মনে করি কবিতা রচনা করে সভ্যতা উদ্ধার করবো, তা হলে তা দৃষ্টিগ্রাহ্য ও বৃহত্তর অর্থে হাস্যকর; তবে ব্যক্তিমানস ও এমনকি গোষ্ঠীমানসকল্পে তা অবশ্যই ভূমিকাবিস্তারি ভাষাপ্রকাশ।

চূড়ান্ত অর্থে, আত্মলেহনের তাড়নায় মানবভাষাকে প্রতিনিয়ত ‘রেপ’ করার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় কবিতা; সেই ‘রেপ’ হয়ে উঠতে পারে পরকীয়া।


. প্রাসঙ্গিক ক্ষমা প্রার্থনা

‘রেপ’ শব্দটি দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট জেন্ডার বোঝানো হয়নি; অথবা এমন বাক্যবিন্যাস দিয়ে পুরুষবাচক ভাষাবোধ বা দৃষ্টি উপস্থাপন করা হয়নি। জেন্ডার অথবা পুরুষকেন্দ্রিক চেতনা এক্ষেত্রে কবিতার সীমানাকে টেনে নামায় নিচে; সমকালে কবিতার বিষয়, সত্তা ও আঙ্গিক বুঝতে হলে ভাষাকেও বচন ও লিঙ্গনিরপেক্ষ হিসেবে রিসিভ করা প্রাসঙ্গিক।


. শিমুল মাহমুদের কবিতা

বংশগতিবিদ্যা ও অন্যান্য কবিতা

ক.
ট্রেনের ভেতর তুমি, শান্ত এবং নীরব; গতির ওপর চেপে এতটা বিকারহীন! দেহের মৃত্যুর পর তখনো স্মৃতিকোষে ভেসে ছিল ট্রেনভ্রমণের ছবি। এই সংবাদ বহন করে ফিরে যাচ্ছ তুমি, হলুদ প্রজাপতি।

আমার মৃত্যুর পর, স্মৃতিকোষ থেকে রেলভ্রমণের ছবি মুছে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করো তোমরা।

খ.
জাদুর দরজা খুলে রেখেছো তুমি; সেই উন্মুক্ত দরজার ওপাশে তাকিয়ে রয়েছে ক্লোনচোখ।

তোমার দৃষ্টিশক্তি প্রখর হতে লেগে গেছে কত কোটি বছর। হাইপার ইন্টেগ্রেটেড প্রোটিনস আর অ্যামিনো এসিডে স্থির করেছো দৃষ্টি। এখন তুমি বলছো, চিনতে পারছো না মানুষ?

গ.
হাইপার ইনডিভিজুয়াল মাস্টার ম্যামালদের আমি একজন। মনে করো আমার জমজ ক্লোন, থেকে গেছে কোনো এক অচেনা গ্রহে। অথবা এখনো প্রতীক্ষায় আছে কেউ, নামহীন কোনো এক সৌরপ্রজাতির ভেতর।

কোষবিভাজনের লটারি খেলায়, লক্ষকোটি প্রজাতির মতো আমিও অপেক্ষায় আছি; কখন কতটুকু কোষবিভাজনে হয়ে উঠবো, কতটুকু মানুষ!

ঘ.
ফুলের ভেতর থমকে আছে, পুরুষ। যতটুকু জানো তুমি, তার চেয়ে অনেক রহস্যময় ফুল। আমি ফুল থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে, মানুষ সেজেছি।

তোমাকে ভালোবাসতে গিয়ে, ফুলের কাছেই ফিরে আসতে হয়েছে আমাকে।
ঙ.
মাঠ থেকে ফিরে আসা সাঁওতাল মেয়েটির ঘরের দেয়ালে কোনো জানালা ছিল না। সবুজ মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে, সবুজ জানালা।

চৈত্রসংক্রান্তির নিচে দাঁড়িয়ে গা ধুয়ে নিচ্ছে মেয়েটি। কালো স্তনের চূড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে দুপুর।

হয়তো বা এখনি মেঘ করবে আকাশে।

চ.
গর্ভবতি মহিষের সাথে সাদ্রি ভাষায় কথা বলছে বউয়া লক্ষী। গাজোলডোবার আকাশ; ওদলাবাড়ি থেকে উড়ে আসছে অগ্রীম শীতঋতু। আমরা বৈরালিমাছ খাচ্ছি আর ভাবছি শস্যদানার কোষবিভাজনসূত্র।

প্রসব-তীব্রতা নিয়ে চা-বাগানে ঢুকে গেছে চিতা; ডেঙ্গুয়াঝাড় বাগান। ভুটানপাহাড় থেকে নেমে আসছে নীলহাতির পাল। প্রবীণ হয়ে ওঠা কোন এক প্রাচীন হাতি, ভাটির দেশের জন্য বহন করে এনেছে চিতাবাঘের চিৎকার; অথবা তিস্তাজল-সংবাদ।

ছ.
পৃথিবীতে পা আটকে মহাশূন্যে ঝুলে আছি। কেন আছি এইভাবে মিছেমিছি ঝুলে? পাখির প্রাকপ্রাচীন ভাই, ডাইনোসর তার নাম। তাহলে বিলুপ্ত নয়, বিবর্তনরেখা ভূমি থেকে শূন্যে ওড়ায়।

পাঁচ কোটি বছরের পেছনে ভেসে থাকা কোন এক নক্ষত্রের বুক থেকে ভেসে আসছে দীর্ঘপথ আলোকরেখা। তিন হাজার বছরের চিন্তাসূত্র মগজে নিয়ে জেগে দেখি মানুষের প্রাণসূত্র জেগে আছে মহাকাশ-ছায়াপথ ঝাঁপটে ধরে। মনে করো সেইখানে সেই ছায়াপথে আমি আছি অথবা তুমি, প্রাণের বিবর্তনরেখা স্বপ্নে গেঁথে।