হেঁটে যাওয়ার সাথে আলোর অনুপাত নিয়ে আমরা ভাবি না। যখন হাঁটা শুরু হল তখন সেটাই যেন সব। যেন কেউ কোনদিন জিজ্ঞেস করবে না – ভাই তোমার পদচিহ্নের নাম কি। বঙ্গদেশে পদচিহ্নের অভাব নেই। আমি যে গ্রামে থাকি সেখানেও একটি আছে – স্বামীজীর পদচিহ্ন। প্রথম জানতে পেরে বেশ মজা লেগেছিল ছোটবেলায়। বারান্দায় ভিজে পায়ে হেঁটে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতাম – বেশ একটা হুঁ .. হুঁ .. ভাব। আমারও একটা পদচিহ্ন হল। সে আলো তো চোখ থেকে যায় না কোনদিন। হঠাৎ একদিন বালিয়াড়ির আলো-আর্দ্রতায় ফিরে আসে। যে হাঁটার গায়ে রঙ লাগে সে পদচিহ্ন ছেড়ে বালি আর সমুদ্রের কথোপকথনে মন দেয় – ‘হার্ট আর হৃদয়ের তফাৎটুকু আমি ধাক্কা লাগার পরে জানলাম’।

সে রাতে আমি আর অর্জুন (বন্দ্যোপাধ্যায়) “গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র” প্রায় বার তিনেক পড়ে ফেলেছিলাম। কখনও আমি পড়ে শোনাচ্ছি অর্জুনকে। কথা হচ্ছে অবজার্ভেশন নিয়ে। কখনও অর্জুন পড়ছে। এক চূড়ান্ত মেধাবী নির্মাণ .. আর তার মুখোমুখি আমরা। পদচিহ্ন নিয়ে আমরা চিন্তিত ছিলাম না। আমরা দেখছিলাম হাঁটার রঙ .. রঙবাজ বারীন ঘোষাল ... “হৃম আমাকে লিখছে। শব্দই যথেষ্ট। আমার আর আয়নার বা লেন্সের প্রয়োজন নেই।”

- তাহলে কি বারীনদার মতে শব্দ ফিল্মের থেকে সুদূরপ্রসারী ?
- এ তো ফিল্মকে হ্যাঁটা করে দেওয়া ...
- হ্যাঁটা যদি নাও বলি .. স্পষ্টই বলা রয়েছে - শব্দই যথেষ্ট। আমার আর আয়নার বা লেন্সের
প্রয়োজন নেই।
- সেটা কীভাবে হয় ? তুলনায় ফিল্ম তো শব্দের থেকে এগিয়ে থাকবেই ...
- সে তো বটেই .. কিন্তু বারীনদা কি সেকথা বলতে চেয়েছেন ? বিশেষত: এই লাইন যখন
রয়েছে – “ছবি শব্দে ধরা যায় না। ধরলে তা নাটুকে হয়ে যায়।”
- এ তো কন্ট্রাডিকটরি ..

আমার আর অর্জুনের মধ্যে সেদিন অনেক কথাই হয়েছিল। তবে এই কথাগুলোই হয়েছিল কি না আজ আর তা ঠিক মনে পড়ছে না। শেষপর্যন্ত বারীনদার বাড়িতে গিয়েছিলাম আমি, অর্জুন আর অস্তনির্জন। ‘গিনিপিগ’-এর আড্ডা -

আমিঃ বারীনদা .. তুমি যখন গিনিপিগ লিখছ .. নামকরণ করছ ‘গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র’, তখন তুমি কি কোথাও চলচ্চিত্র এবং কবিতার পারস্পরিক সম্পর্ক, মাধ্যম হিসেবে তাদের সাযুজ্য-পার্থক্য - এই রেসপেক্টে কাজটা করতে চেয়েছ ? কেন তুমি ‘গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র’ – নামকরণে কাজটা করলে ?

বারীনদাঃ আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে কিছুদিন ধরে ভেবেছিলাম। অনেকদিন আগের কথা .. ২০ ইয়ারস প্লাস .. এগুলো ভাবতাম। একবার খুব ইমোশন এলো যে এবার আমি লেখা শুরু করি। আমার ভাবনাগুলো খানিকটা ডায়রির মতন ছিল .. টুক টাক টুক টাক করে লিখে রাখা .. কিন্তু পুরো শেপ দেওয়া ছিল না। ভাবলাম এবার লিখতে হবে। তখন কমল আমাকে চাপ দিল .. বারীন তুই কৌরবে একটা ৪০-৪৮ পাতার একটা কিছু লিখে দে ... বই হবে। আমরা কিছু একটা করব। তখন আমার বাড়ি .. আমি একাই থাকতাম বাড়িতে। চাকরি করতাম।বাড়িতে একা থাকতাম। আমার খুড়তুতো ভাই দোলন .. সে আসত আমার কাছে। তার কাছে আমার একটা চাবি ছিল। তাকে বলা থাকত তুই এখানে এসে পড়াশুনো করিস, থাকিস, দেখাশোনা করিস, চলে যাস। আর আমি প্যারালালি আসব যাব। দোলনকে বললাম আমি কারখানা যাব না আগামী কুড়ি দিন। ছুটি নিয়ে নিয়েছি। আমি বাড়িতে বসে থাকব। বসে শুধু লিখব। তুই ঘরে আসবি, বেরবি - আমার সাথে কথা বলবি না। আমি দোলনদের বাড়িতে লাঞ্চ করতাম। দোলনকে বললাম তুই আমাকে লাঞ্চ-ডিনার পৌঁছে দিয়ে যাবি। আমি বাড়ির বাইরে বেরব না। কারোর সাথে কথা বলব না। আমি খাতা কলম নিয়ে বসলাম। কিচ্ছু মনে নেই .. কোন কিচ্ছু মনে নেই .. নিজের মনের মধ্যে যা কিছু ছিল সব উগরে দিলাম। আমি দৃশ্য রচনা করতে শুরু করলাম একে একে। এগুলো কল্পদৃশ্য নয় ... ঘরে বসে বসে কল্পদৃশ্য হয় ... বনের কথা ভাবলাম, পুকুরের কথা ভাবলাম। আমি দৃশ্যকল্প তৈরি করতে শুরু করলাম। ‘গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র’ নামটা পুরো ব্যাপারটা শেষ হওয়ার পরে, পুরোটা পড়ার পরে দিয়েছি। নাম আমার আগে থেকে ভাবা ছিল না। স্টেজ বাই স্টেজ চ্যাপ্টার করা আছে। আমি এক একটা চ্যাপ্টার এক এক বেলায় লিখেছি। লিখে রেস্ট করলাম। আবার পরের বেলায় উঠে আবার আর একটা লিখে রেস্ট করলাম। এইভাবে দেখবি যতগুলো চ্যাপ্টার আছে তার অর্ধেক .. অতদিন কন্টিনিউয়াসলি এই কাজ করেছি। থ্যাংকস টু দোলন .. যে আমাকে খাবার-দাবার, সিগারেট, মদ সব সাপ্লাই করে গেছে। কেউ আমাকে ডিস্টার্ব করেনি সেইসময়।

আমিঃ প্রথম লেখাটাই .. সাম হাউ পড়ে মনে হয় যে তুমি কোথাও ডিফারেন্স তৈরি করছ - ফিল্মে কীভাবে কাজটা হয় .. ফিল্ম কীভাবে কাজ করে .. সে কীভাবে তার দৃশ্য রচনা করে, কীভাবে তার অন্তর্নিহিত কাজ এগোয় এবং লেখার সাথে তার কোথায় পার্থক্য থাকে। এরকম মনে হয় যেন তুমি প্রথম থেকেই বা তোমার লেখার শুরুতেই সেই জায়গা রয়েছে যেখানে তুমি ডিফারেন্স তৈরি করছ যে আমি এই কাজটা করব... এখানে ফিল্ম কাজ করে ... আমি লেখাকে এই জায়গায় নিয়ে যাব বা লেখাকে এই জায়গা থেকে ভাবছি। আমি সেই অর্থে জানতে চাইছিলাম যে এটা কি কোন নির্দিষ্ট প্রজেক্ট ছিল ?

বারীনদাঃ আমার মনের মধ্যে যে চাপটা ছিল সেটা হল .. আমি যে নতুন কবিতা, অতিচেতনায় প্রসারিত নতুন কবিতার কথা ভাবছিলাম সেটা শব্দে কীভাবে আনব। কবিতা তো লিখে দিলাম কবিতা হয়ে গ্যালো ... কবিতাতে কীভাবে ট্রান্সপায়ার করছে সেই ব্যাপারটা তার ভিতরে পরিবিষয়টা .. সেই পরিবিষয় নিয়ে আমার ভিতরে একটা চাপ ছিল। সেটাকে রিলিজ করার একটা ব্যাপার ছিল। আমি পুরো ব্যাপারটা সম্পূর্ণ হওয়ার পর পড়ে দেখলাম নতুন কবিতা সম্বন্ধে আমি যা বলতে চেয়েছি - নতুন কবিতা কীভাবে গড়ে .. কীভাবে বিল্ট আপ করে সেই জিনিসটাই আমি বলেছি। সেটাই আমি বলতে চেয়েছি গদ্যে অনেকসময়.. এটাতে গদ্য পদ্য মিশ্রিত ভাবে .. এমন ভাবে যে দৃশ্য রচনার মধ্য দিয়ে এটা সিনেমাটিক হয়েছে। আমি অনেক জায়গায় বলেছি, এই তো কোন স্ক্রিপ্ট নেই, একটা ক্যামেরা লাগবে, ক্যামেরা নেই, কলম লাগবে .. এ’রকম ভাবে উলটে পালটে .. মন্তাজ .. হ্যান-ত্যান .. এসমস্ত নানা কথা, এলোমেলো পরের পর যা এসেছে ... কিচ্ছু সাজানো না। পর পর যা এসেছে সে’রকম ভাবে লিখেছি। আমার ধারণা এই ভাবেই নতুন কবিতা গড়ে। আমার ধারণা এ’ভাবেই সিনেমা তৈরি হয়।