বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ্‌ মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়-এর (১৯০৯ - ১৯৬৯) দাদু (মাতামহ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অল্প বয়স থেকেই গল্প লেখা শুরু, অবন ঠাকুরের উৎসাহে। ‘বোর্ডিং স্কুল’, ‘বাবুইয়ের অ্যাডভেঞ্চার’, ‘লাফা যাত্রা’ বাঙলার কিশোর সাহিত্যে তাঁর অনন্য সৃষ্টি।
দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের পাঁচ নম্বর আর ছ’ নম্বর, এই দুই বাড়ি মিলিয়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। পাঁচ নম্বর বারান্দার তিন মহারথী গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ। দক্ষিণের টানা-বারান্দায় ছিল তাঁদের স্টুডিও এবং বৈঠকখানা। মোহনলালের শৈশব, কৈশোর এবং প্রথম যৌবন কেটেছে এই পাঁচ নম্বর বাড়িতে। দাদামশায় অবনীন্দ্রনাথের সবসময়ের সঙ্গী ছিলেন কিশোর মোহনলাল। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখা এই বিখ্যাত বই ‘দক্ষিণের বারান্দা’। অবন ঠাকুরের চরিত্রের কত বিচিত্র দিকই না উঠে এসেছে মোহনলালের এই বইয়ের লেখায়। আর আছে শিশুর বিস্ময়। একটি বাচ্চার বেড়ে ওঠার সময়ে তার যে অপার প্রশ্ন আর কৌতূহল থাকে তার চারপাশ নিয়ে, যত্নবান অভিভাবক কিভাবে লালন করেন সেই শিশুর মনটিকে, কিভাবে তাকে আলো দেন, জল দেন, তার হাতে তুলে দেন এক স্বপ্নের মোড়ক, শিক্ষণীয়।


দক্ষিণের বারান্দা
মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়

৬.

লেখকদের সঙ্গে আর তাঁদের লেখার সঙ্গে পরিচয় আমাদের খুব ছেলেবেলা থেকেই। কত্তাবাবা (রবীন্দ্রনাথ), দাদামশায় (অবনীন্দ্রনাথ), বাবার (মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়) কথা ছেড়েই দিলুম, এ ছাড়া লেখক-সমাগম জোড়াসাঁকো-বাড়িতে কম হত না। আমাদেরও তাই শখ যেত লেখার। খুব ছেলেবেলা থেকেই। কিন্তু পারব কোত্থেকে? একে ছেলেমানুষ, তার উপর বিদ্যা-বুদ্ধির একান্তই অভাব। দাদামশায়কে দুঃখের কথা জানালুম। গল্প লিখতে গেলে একটা প্লট দরকার। প্লট পাই কোথা থেকে?
দাদামশায় বললেন, এর জন্যে ভাবছিস? কেন, স্বপ্ন দেখিস না? স্বপ্নগুলো লিখে ফেল, দেখবি গল্প আপনি এসে যাবে।
এ এক নতুন কথা শোনালেন আমাদের দাদামশায়। আমরা ভাবলুম, সত্যিই তো, স্বপ্নগুলো অনেক সময় গল্পের মতোই আসে। গল্পের চেয়েও ভাল কোনও কোনও সময়। শুধু লিখে ফেললেই হল।
দাদামশায় বললেন, কাল সকালে যে যে স্বপ্ন দেখবে, চলে আসবে আমার বারান্দায়। স্বপ্ন লিখে তারপর শুরু করবে লেখাপড়া।
পরদিন সকালে মাস্টারমশায় এসে দাদামশায়ের ব্যবস্থা দেখে তো থ। দু’তক্তা শ্রীরামপুরী কাগজ লম্বালম্বি চার টুকরোয় কেটে গঁদের আঠা দিয়ে জুড়ে রাখা হয়েছে। এতেই স্বপ্নের পর স্বপ্ন লেখা হবে। আর যেমন যেমন লেখা হবে তেমনি কোষ্ঠীর মতো গুটিয়ে রাখা হবে। জিনিসটার নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্বপ্নের মোড়ক’।
আমরা সেদিন যে যা স্বপ্ন দেখেছি কেউ ভুলিনি। ঘুম-চোখেই চলে এসেছি এবং প্রাণপণে মনে রাখবার চেষ্টা করছি। স্বপ্নের তো প্রধান দোষই যে, ঘুম ভাঙলেই স্বপ্নটা পালিয়ে যায় আর মন থেকেও যায় মুছে। লেখাপড়ার আগেই স্বপ্ন লিখতে হবে দাদামশায়ের হুকুম। লেখাপড়ার চেয়ে জিনিসটা অনেক ভাল, অনেক মজার। স্বপ্নের এখানটা-ওখানটা ভুলে গেলে বানিয়ে দিলেও চলবে, কেউ ধরতে পারবে না।
মাস্টারমশাই বই গুটিয়ে বসে রইলেন। আমাদের একজনের পর একজনের স্বপ্ন লেখা চলতে লাগল। প্রথম উৎসাহে সকলেই কিছু বাড়িয়ে বাড়িয়ে লিখেছিলুম নিশ্চয়, কারণ, স্বপ্নের স্রোত সেদিন যেন আর শেষ হতে চায় না। অপটু লেখক সকলেই, বাংলা বানানই দুরস্ত হয়নি অনেকের। কাটাকুটি আর ঘন ঘন দোয়াতে কলম ডোবানো, পড়াশুনার বদলে এ-ই চলল সেদিন সকালে। শেষে দাদামশাই বললেন, মাস্টারমশায়কে দিয়ে একটা স্বপ্ন লিখিয়ে নে।
আমরা ছাড়লুম না। স্বপ্নের মোড়কের প্রথম তারিখে মাস্টারমশায়কে দিয়ে লিখিয়ে নিলুম। পড়ার ঘন্টা শেষ হয়ে গেল। বই খোলা আর হল না। স্বপ্নে স্বপ্নে ভরে গেল আমাদের শ্রীরামপুরী কাগজ, আমাদের দক্ষিণের বারান্দা আর আমাদের পড়ার ঘন্টা। এই ভাবে শুরু হয় আমাদের স্বপ্নের মোড়ক। অনেকদিন চলেছিল সেই স্বপ্নের মোড়ক। দাদামশায়ও লিখেছিলেন তাতে। বড়রা অনেকে লিখেছিলেন। মাঝেমাঝে খুলে পড়া হত স্বপ্ন। দাদামশায়ের একটা স্বপ্ন ছিল ভারী সুন্দর। দাদামশায় কোথা থেকে যেন একটা নতুন রকমের বীণা পেয়েছেন। সেই বীণাটা নিয়ে ছাদের এক কোণে বসে বাজাবার চেষ্টা করছেন। আকাশে কালো মেঘ। এলোমেলো হাওয়া। নৌকোর পালের মতো ফুলে ফুলে উঠছে মেঘ আর মাঝেমাঝে যাচ্ছে ছিঁড়ে। সেই ছেঁড়া মেঘের মধ্যে দিয়ে সোনার সুতোর মতো থেকে থেকে রোদ এসে পড়ছে দাদামশায়ের কোলে। আর ঠিক তখনই বীণা উঠছে বেজে। বীণার তার থেকে সুর উঠছে, কী আলোর রশ্মি থেকে ঝংকার উঠছে বোঝা যাচ্ছে না। দাদামশায়ের কোলে বীণা। হাত উঠছে পড়ছে। কখনও বেজে উঠছে বীণা, কখনও নীরব। মেঘে ঢাকা পড়েছে সূর্যের আলো। আবার বেরিয়ে পড়ছে ফুটো দিয়ে সোনার তরীর মতো। এই স্বপ্ন! এ রকম স্বপ্ন আমরা কখনও দেখতুম না। এ যেন একেবারে কবিতা। আমরা অনেকবার চেষ্টা করেছি দাদামশায়ের মতো স্বপ্ন দেখবার। কিন্তু পারিনি। পারব কোত্থেকে? স্বপ্ন কি আর চেষ্টা করে দেখা যায়!

(আংশিক)

মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়-এর ‘দক্ষিণের বারান্দা’ বইয়ের ৬নং পরিচ্ছেদ থেকে নেওয়া। পৃঃ ৩৮-৪০। বানান অপরিবর্তিত।