শহুরে জিন্স শোকান রোদ। ঝাঁঝালো রোদ থেতলে শব্দ হচ্ছে, পাতাহীন বৃক্ষে, চাকার ঘূর্ণনে অথবা মোমজ্বলা বুকে। বহু বছর পূর্বে এখানে প্রথম বট-পাকুরের বিয়ে হয়েছিল। এই বট-পাকুরের ছায়ায় ঠান্ডা কূপজল পান করে কত পথগামী হেঁটে গেছে নিঃশব্দে। আজ সেই বট-পাকুরহীন কূপডুবা পিচ রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটছি আমরা একতালে। সামনে একজন লিড দিচ্ছে --- জয় বাংলা, জয় বাংলা, জয় বাংলা। মাইদী-সুজাহীদ ভাই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই। অথবা পিছনে ঝোলানো প্রায় প্রত্যেকের পিঠে রঙ-বেরঙের নানান বাণীর প্ল্যাকার্ড ---

কোন আঁতাতে এমন রায়
জনগণ জবাব চায়?

অথবা ---
এমন রায়ে কাঁদছে চোখ
না হয় আমার ফাঁসি হোক!

অথবা অস্থায়ী মঞ্চের এক কোণে হারমোনিয়াম নিয়ে দলবদ্ধ গান ---

বিচারপতি বিচারপতি
তোমার বিচার করবে কারা
আজ জেগেছে এই জনতা...

অথবা এক আঙুল জনতার দিকে তুলে মাথা ডানে-বামে দুলিয়ে, চোখ বন্ধ করে ঝাঁঝাল আবৃত্তি ---
ই --- মাটি মোদের
ই --- মাটি দিবেক লাই...

তখন আমাদের চোখে থোকা থোকা মাটির শরীর ভেসে উঠে। আমরা মাটির গুরুত্ব বুঝি। মাটি দিয়ে মানুষ তৈরি। আমরা ঈশ্বরের গুরুত্ব বুঝি। নিজেদের প্রতিরূপ হিসেবে ঈশ্বরকে সাজাই। বিবর্তনের কথা ভাবি। মহিষ, হাতি যদি চিত্রশিল্পী হত তবে তাদের ঈশ্বরও প্রতিরূপ পেত তাদের। ঝাঁজালো শব্দ আমাদের ভাবনাকে মাটি করে দেয়। আমাদের চিন্তা ফিরে আসে মাটির শরীরে। আমরা সোনার মাটিতে সোনার ফসল ফলাতে চাই। তুখোর মস্তিষ্কে শালি, ভোগ, কাটারী, আউশ ধানের বিবর্তন ঘটাই। নামহীন নামের সহজতা খুঁজে নেই ২৮, ৩২, ৩৪ ইত্যাদি। পাখিদের কাছেও তাদের নামের গুরুত্ব নেই। নিজেদের ভাষায় নিজেদের নামেই তারা খুশি। আমরা পাখিদের ভাষা বুঝি না অথবা বুঝতে পারি না --- মাটি আর পানি কী করে একটা জীবন্ত ব্যাঙ তৈরি করে? আমরা কেবল রোদে পুড়তে জানি, পারি রোদের বিবর্তন ঘটাতে। আর যখন আমাদের রোদে পুড়তে হয় তখন বুঝি, যে ভাত খাই সে ধানে কতটুকু পুড়ে ছকিনা আর কান্দুরীদের পিঠ। ভাবনার অন্তরালে ছকিনা-কান্দুরীদের আমরা স্থান দেই না। আমাদের চোখ থেকে ঢিবি-ঢিবি শালি-ভোগ-কাটারী-আউশ ধানের ছবি ক্রমে দূরে সরে যেতে থাকে। দেশে মঙ্গা দেখা দেয়, সে মঙ্গা প্রচুর ধান, চাল থাকার মঙ্গা। সে মঙ্গা ন্যায্য মূল্যের মঙ্গা। তখন বুঝি কোল্ডস্টোরের সামনে আলু ফেলে কৃষক কেন চটের বস্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, আগামী প্রত্যাশায় কেন স্বজতেœ রেখে দেয় বস্তাগুলো। তবুও আমরা কৃষকের সন্তানরা বিজ্ঞানের সুবাতাসকে মেনে নেই, মেনে নিতে বাধ্য হই। অথবা কৃষি উপাক্ষাণের বদলে আমাদের সামনে তখন ফাঁসির দাবি মূখ্য হয়ে উঠে। আমরা সংঘবদ্ধ হতে চাই, বাড়াতে চাই জ্ঞানের পরিসীমা। বই পড়ি, সংগ্রামের বই, যুগে যুগে লিখে যাওয়া জীবন যুদ্ধের বই। যে বইয়ের সংগ্রামের রেশ সুপ্ত থাকে আমাদের স্মৃতিকোষে ধ্বংসের স্মৃতি, হত্যার স্মৃতি, নগ্নতার স্মৃতি।

আমরা ভুলে যেতে পারি না ‘কিসি’ নামের সেই সংগ্রামী মেয়েটিকে, যে ছিল জন্মসূত্রে ক্রিতদাসী। যার অপ্রাপ্ত যোনির উপরে যখন প্রভুর পৌরুষ প্রোথিত হয় তখন সে গোপনাঙ্গ দিয়ে মল ত্যাগ করে। আমাদের বেদনা বোধ হয়। আমাদের বেদনা বোধ হয় মক্তবের মেয়ে মরিয়মের জন্য। পাঁচ বছর বয়সে যাকে সহ্য করতে হয় আরবি শিক্ষকের পাশবিক ধর্ষণ। অতঃপর আমরা দেখি কিভাবে মক্তব শিক্ষক আহমদ রুহানীর ওজু গোসল নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় একটি শিশু জীবন যেভাবে হাতুড়ি ডাক্টারের সুঁচ ফোরানোর আগে তিন ফোটা ওষুধ সুঁচের মাঝপথে গড়িয়ে এসে তুলার মাঝে নিঃশব্দে নিঃশেষ হয়ে যায়। অথবা নিঃশেষ হয়ে যায় শত কিশোরীর স্বপ্ন যখন ধর্ষনের সেঞ্চুরির লিস্টে নিজেদের নামের অপ্রত্যাশিত অন্তর্ভুক্তি হয় বিশ্ব বিদ্যাপীঠে পড়তে এসে। তখন আমরা পান্না মাস্টারদের এক চোখওয়ালা মোবাইল গণিতের জটিল সমীকরণ বুঝি না বা বুঝতে পারি না যখন সেঞ্চুরির রেকর্ট রেকট সংখ্যক পণ্যের তালিকায় পড়ে। অথবা অচল নষ্ট সমাজের সচল ঘুণ পোকা আক্রান্ত একজন ভারসাম্যহীন হিতৈশীর হাতে রক্তছেড়া নাড়িছেড়া দুজন ব্যাস্ত নাগরিকের মৃত্যু হলে জীবন সমীকরণ আরো দুর্ভোধ্য হয়ে উঠে আমাদের কাছে। সেই দুর্বোধ্যতা ক্রমান্বয়ে টেলিভিশনের নতুন নতুন ‘ব্রেকিং নিউসে’র স্তরে স্তরে (ছেলের হাতে বাবা খুন, নারায়নগঞ্জে সাত খুন, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, গার্মেন্টস শিল্পে আগুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৪৮ঘন্টার আল্টিমেটাম, গলা টিপে গণতন্ত্রকে হত্যা ইত্যাদি ইত্যাদি) ঢাকা পড়ে যায় মস্তিষ্কের অদৃশ্য পর্দায়। সে পর্দায় সময়ের দাবিতে সচল হয়ে উঠে মঞ্চ। চ্যানেলে চ্যানেলে টকশো হতে থাকে। আমরা একি আব্দুর রহমানকে বিভিন্ন টকশোতে দেখতে থাকি (পহেলা বৈশাখের পান্থা ভাত থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর বেডরুম পর্যন্ত যার বিশ্লেষণী ক্ষমতা, রাজনীতির ক্ষেত্রে তো কথাই নেই)। আমরা মঞ্চের দিকে ফিরে যাই। আমাদের চোখে, মুখে, চুলে, কণ্ঠে ঝাঁঝালো ঝঙ্কার বের হতে থাকে। অস্থায়ী মঞ্চকে স্থায়ী করার তুমুল দাবিতে জোড়দার আন্দোলনে রাস্তায় নামি। সামনের দিকে আগাই, কণ্ঠ উচিয়ে একবার চারপাশটাকে দেখে নিতে চাই।

আমাদের চোখে পড়ে কঠিন মাটির বুক চিড়ে বেড়ে উঠা বহুতল ভবনের উপর রেডিয়েশন মাতা মূর্তমান টাওয়ার। টাওয়ারে বসে থাকা অপেক্ষারত একটি চিল অথবা টাওয়ার চুঁয়ে পড়া সূর্যগলা বৈকালিক রক্ত। রক্ত! আরো গভীর, আরো ঘন, নিকাশ কালো হয়ে ছাঁয়া ফেলে পৃথিবীর বুকে। রক্তের লালাভ অঙ্গে নিয়ে আকাশের গায়ে ঝুলে থাকে মেঘ। অথবা ঝুলে থাকে একটি ঘুড়ি টাওয়ারের মাংসহীন শরীরে ১২/২১ হাত লম্বা লাইলনের সুতো নিয়ে। ঝুলে থাকে আমাদের ভবিষ্যত, দেশের ভাগ্য, মানবতা অপরাধির বিচার অথবা ঝুলে থাকে চার দেয়ালের মাঝে বেড়ে উঠা এক টুকরো মাঠের স্বপ্ন চোখে বুকে লেপ্টে নিয়ে বখাটে রিংকুদের পাড়ার অন্তু। এক টুকরো স্বপ্ন ক্রমে বিশাল বুক জুড়ে আধিপত্য করতে থাকলে একদিন সে অসংখ্য শব্দের মাঝে নিঃশব্দে হারিয়ে যায়। পুলিশি জটিলতায় ক্রমে ১/৩/৫/১০ লাখ টাকা দিয়েও কোনো সুরাহা হয় না। কপালে ঘাম নিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয় অন্তুর বাবা-মাকে। অবশেষে তার বস্তা বন্দী মৃত্যু আমাদের মেনে নিতে হয়। আমরা মানবিক মানসিক জটিলতায় ভোগি, আমাদের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

কিন্তু এ সময় চোখ ঝাপসা হলে চলে না, সময়ের দাবিতে আমাদের চোখ আবার পরিষ্কার করে নিতে হয় । পারিপার্শ্বিক শব্দ আমাদের মস্তিষ্কে বিশেষ বার্তা পাঠায়। চোখের সামনে ভিজুয়াল হয়ে উঠে মঞ্চ। মঞ্চ ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি থাকে না। মঞ্চ রক্ষায় আমরা টাকা তুলি, কেরোসিন কিনি, মোম কিনি, বাঁশ কিনি। সেই বাঁশ মঞ্চের সামনে নাদের মোল্লার খরের ভূতিওয়ালা বিশাল পাছার ফাঁকে ঢুকিয়ে উপর নিচে জোড়ে-জোড়ে ঠেলা দেই। সেই ধর্ষণ সইতে না পেরে নাদের মোল্লা যখন নেতিয়ে পড়ে অথবা তার টুপি খুলে পড়ে তখন তার পাছার ফাঁসে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেই। আমরা ভিষণ মজা পাই, হাততালি দেই, আমাদের সাথে অসংখ্য উৎসুখ জনতাও মজা পায়, তারাও হাততালি দেয়, জমায়েত বাড়ে। যখন জমায়েত বাড়ে তখন নাদের মোল্লার পিছনে দেয়া আগুনের ধোয়া ছড়াতে না পেরে সাপের মত কু-লি পাকায় অথবা তখন সেই কু-লি আমাদের ঘিরে ধরলে আমাদের চোখ আবার ঝাপসা হয়ে আসে। আমরা কিছুই দেখি না। যখন কিছুই দেখি না (আর আমাদের এ না দেখার মাঝে মিশে যায় নাদের মোল্লাদের জারজ সন্তানরা। ওরা মন্দির ভাঙে, মসজিদ ভাঙে, পতাকা পোড়ায়) তখন নাদের মোল্লা তার তর্জনী আর মধ্যমা আমাদের বিশেষ অঙ্গে প্রোথিত করে তার ভিক্টোরির মর্ম বোঝায়। সেই মর্ম তার চলে যাবার পরেও জাম আঁতা বীজের মত অসংখ্যহারে অঙ্কুরিত হয়ে উঠে।

অঙ্কুরিত চারা বড় হয়, অগণন ফল ধরে। সেই ফলের লোভে দেখা দেয় রাজনৈতিক জটিলতা। যে জটিলতা আমাদের মস্তিষ্কে আরো জটলা পাকায়। আমরা রাজনীতির লেজ খসে যেতে দেখি, নীতির নৈতিকতা খুঁজে পাই না। তার বদলে আমাদের চোখে গঠিত হতে থাকে নতুন নতুন সব শব্দ: রাজভোগ (রসগোল্লা), রাজশাসন (অক্ষয়), রাজশোষণ (বর্তমান), রাজ আকার (বিকশিত), রাজাকার (হীরা-চুনি-পান্না)।
একদিকে নতুন নতুন শব্দ যেমন আমাদের মস্তিষ্কে খেলা করে অন্যদিকে বয়ে যায় সময়ের স্রোত। সময় যেমন সময়ের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় শব্দের উত্থিত করে তেমনি খুলে দেয় নিঃশব্দের বাতাবরণ, আমরা ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। আমাদের কণ্ঠ থেমে আসে। আমরা মঞ্চের কথা ভুলে যাই।

শীত যায় শীত আসে। গত শীতের স্মৃতি ভুলে আগামী শীতের সম্ভাবনায় আমরা গহীণ রাতের পথ চলি ভোরের উদ্দেশে। পথ চলতে চলতে হঠাৎ থমকে যাই ব্যাস্ত শহরের প্রাণকেন্দ্রে আমাদের তৈরি অজস্র শব্দে গাঁথা বাঁশের মঞ্চ দেখে। আমরা বিষ্মিত হই, দুঃখ পাই, আমাদের ফুসফুস-কলজের নরম মাংসে বিষ কাঁটা ছেঁচড়ে ছেড়ে ছেড়ে গর্তের সারি করে যায়। আমরা বিষণ্ণতায় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমাদের চোখে নিঃশব্দে শীতঘুম নেমে আসে। ঘুম নেমে আসে মঞ্চের উপর এলোমেলোভাবে শুয়ে থাকা ছেড়া, ময়লা, আঠালো জমাট বাধা চুল, পিচুটি ভরা চোখ নিয়ে একজন পাগল/ নেশাখোর/ উদ্বাস্তু/ ভবঘুরে অথবা একজন ভিখারীর চোখে।