রাবণ
রিমি দে
পাঠক

ক্ষাত্র সধবার প্রেমে আচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ। সে শৈব তাঁর রাজনৈতিক- সামাজিক অবস্থান ভুলে কুপথে অগ্রসর হলেন আর লোককথায় তাঁর চরিত্র বিস্তৃত হতে থাকল, মহাকাব্যিক উপাদানে সমৃদ্ধ হতে থাকল। শতাব্দীর পর শতাব্দী আসমুদ্র হিমাচলে তিনি চর্চিত, উপমায় ব্যবহৃত। জনচেতনার প্রথম শৈশবে তিনি উদাহরণ অন্যায়, মন্দ, অন্ধকার ও সমস্ত খারাপের।

চোখ মুখের বিদ্যুৎ সরিয়ে
দশরকম ভাবে চুল সাজাচ্ছেন
ঘন কুয়াশার ভিতর গাঢ়তম
রাবণ হয়ে উঠছেন
                                    (আমি ও রাবণ -১)

এই গাঢ়তম রাবণ হয়ে ওঠা তাঁর নিয়তি নির্দিষ্ট কি? নিয়তি, তিনিও তো নারী। পুরুষনিয়ন্ত্রিত সমাজে পরনারী আসক্ত পুরুষের পরাজয় নির্দিষ্ট করা তাই তাঁর কর্তব্য। কেননা সমাজ নারীর একগমন চায়। অবগুণ্ঠন চায়। পুরুষের বহুগামীতা স্বাগত। যদিনা বীরভোগ্যা, একগামী নারীকে সে পুরুষ কামনা করে। পরনারী আকৃষ্ট হওয়ার আগে থেকেই ত্রিকালজ্ঞ শৈব তাই নারী নিয়ন্ত্রিত, দৈব বা বিধানের ছদ্মবেশে, সমাজের অঙ্গুলিহেলনে।

মোমবাতির আলোছায়ারূপ
যতটা প্রয়োজন ছিল
ঠিক ততটা নয় গভীর জঙ্গল
এলিয়ে পড়ছিল পুড়ে যাওয়া
                          রাবণের গায়ে
                                    (দশেরা -১ থেকে)

এইখানে খানিক সুত্র খুঁজে পাওয়া যাওয়া যায় সেই নিয়তি নির্দিষ্ট আচরণের। খানিক চলচ্চিত্রের ভাষায় তাঁর নির্ধারণ সম্পন্ন হয়। একটি ক্ষীণ দীপ্যায়মান মোমবাতি, স্থির ব্রাহ্মণ বসেছেন কুশাসনে, রাত্রির অন্ধকার জঙ্গল অনভাসিত- বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তাঁর, ক্রমে সে গ্রাস করছে ব্রাহ্মণকে। সে অন্ধকার, সে জঙ্গল- নিয়তি। ক্ষীণ মোমবাতি নিয়ে তার সাথে অসম সংগ্রামে পরাভূত হচ্ছেন ব্রাহ্মণ।

রাবণ চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ আমার উদ্দেশ্য নয়। রাবণ শাশ্বত। সনাতন ধর্মাবিলম্বি সিন্ধু নদ তীরবর্তী ভূখণ্ডের জনসমাজে তিনি ঘৃণিত, তিনি পূজিত। তাঁর পুত্তলিকা প্রজ্জ্বলন ছাড়া মহান দশেরা উৎসব অসম্পূর্ণ, অর্থহীন। এসব পুরনো ও বহুচর্চিত তথ্য। পুনর্বার স্মরণে আনার কারন এই যে কবি রিমি দে তাঁর ষষ্ট কাব্যগ্রন্থের নামকরণ করেছেন রাবণ, আর সুচারু প্রচ্ছদ পেরোনোর পর নানা পৃষ্ঠায় তিনি রাবণ চিহ্ন এঁকেছেন। সেই চিহ্ন শাশ্বত রাবণকে নির্মাণে- বিনির্মাণে নিয়ে যায় লোকায়ত থেকে কবির অন্তরলোকে, যা বোঝাতে তাঁর তিন লাইনের বিভব কবিতাটিই যথেষ্ট;

প্রথম মৃত্যুর পর
রাবণ ছাপা হয়
মাঝরাতে রক্ত ঝরে পড়ে

৩৮ পৃষ্ঠার ৩৮টি কবিতার এই বইয়ে কবিতার গঠন প্রকরণ গ্রীষ্মের নদীর মতো- শীর্ণা, মেদহীন, অপ্রয়োজনীয় পলিমুক্ত। অল্প শব্দের এই চলন প্রমাণ করে কবি স্বেচ্ছায় আবেগকে দূরে সরিয়ে কবিতাকে মেদহীন করেছেন এবং তিনি চেয়েছেন স্বল্প শব্দের প্রতিটি স্ব উপস্থাপনে সমুজ্জ্বল হয়ে পাঠকে আলোকিত করে তুলুক। খেয়াল করার জন্য নীচের কবিতাটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করছিঃ

হাঁটে তাকায় এদিক সেদিক
ভয় এবং নির্ভয়ে
সূর্য ও অসূর্য মিলেমিশে একাকার
রাবণ
ফুটে থাকে নিজস্ব দোপাটির ভিতর
                                    (বিচিত্ররূপ-১)

একটিও অতিরিক্ত অনাবশ্যক শব্দ নেই। ভয় নির্ভয় পাশাপাশি আর তার মধ্যে এবং এর ব্যবহার অনিশ্চয়তার দোলাচল কি সহজে বুঝিয়ে দেয়। একইভাবে সূর্য ও অসূর্যকে মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়ে সহজ অর্থে আলো অন্ধকার এবং গূঢ়ার্থে তেজ নিস্তেজকে একাকারে কবি এক অভিঘাত প্রস্তুত করেন পরবর্তী অনিবার্য শব্দ রাবণের জন্য। যে রাবণ দোপাটির অন্তঃস্থলে ফুটে আছেন তার দ্বি পাপড়ির নিজস্ব আড়ালে। এই নিজস্ব শব্দটির ব্যবহার এক পরম নিশ্চিত আশ্রয়ের কাজ করছে সবকটি পঙক্তির।

বস্তুতঃ এত সহজ পাঠও রিমির প্রাপ্য নয়। কেননা এই বই তিনি নির্মাণ করেছেন মেধার প্রাকার দিয়ে ঘিরে। প্রতিটি শব্দই তাই মূল্যবান এই বইতে। শব্দের অর্থবোধ ফুরিয়েছে এরকম একটি অসঙ্গত ধারণার বিরুদ্ধে মূল্যবান দলিল হয়ে উঠেছে এই বইটি। বিচিত্ররূপ-৫ কবিতাটি দেখি-

রাবণে নেমেছি                           কাজলে

অনন্ত ফাটলে

রাবণে শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্যনীয়। রাবণ যে অনাচারী, দুষ্ট এবং সমাজ বহির্ভূত আচরণের প্রতীক সে এখানে সেই সামাজিক অবস্থানই হয়ে উঠেছে। তাই কবি রাবণে নেমেছেন। যেন অন্তহীন পাঁকে তিনি পা বাড়িয়েছেন আর তাঁর যাত্রাসঙ্গী, তাঁর মূলধন, তাঁর একমাত্র পাথেয়- কাজল। যাত্রা পথ ও যাত্রা সমাপ্তি- অনন্ত ফাটল, যা চরম শরীরী উদ্ভাস থেকে চূড়ান্ত পতন সমস্তই নির্দেশ করে। কাজল শব্দটিতে একটি এ কারের ব্যবহার কাজল, তার কালিমা, তার গাঢ় বিন্যাস একাকার করে দেয়। মাত্র পাঁচ শব্দের এই কবিতা কোনখানে বিন্দুমাত্র চিহ্ন না রেখে, না উল্লেখ করে কাজল পরিহিতা এক রমণীর অভ্যস্ত সমাজ দর্শন ভেঙে অপর যাত্রার ছবি মনে এনে দেয়।

পৃষ্ঠা সরণী বেয়ে পাঠ যত এগোতে থাকে ততই রাবণ হয়ে উঠতে থাকেন কবির অপর যাত্রার যাত্রাসঙ্গী, যাত্রাপথ। এ যাত্রা বহিরঙ্গ ভ্রমণ নয়। অন্তর্নিহিত আপনার কাছে পৌঁছনোই তাঁর উদ্যোগ। এ সেই অপর যাত্রা যেখানে কবি স্বেচ্ছায় বিশ্লেষণে এনেছেন আপন মানস।


রাবণ পেঁচিয়ে যাচ্ছে সাপ ও আগুনে
পেঁচিয়ে যাচ্ছে আমার ছায়ায়
                          ছলনায়
হাস্যকর গুঞ্জনে
                                    (আয়না-২)

ছায়া, ছলনা ও গুঞ্জন এই তিন শব্দ পরপর এসে সামগ্রিকে নারীকে সমাজ কি ভাবে বিচার করে তার একটি রেখাচিত্র এঁকে দেয় যেন। নারী ছায়া- পুরুষের, সামাজিক নিয়ম ও নীতির, সে ছলনাময়ী- সে বারবার পুরুষকে প্রলুব্ধ করে মায়ায়, লাস্যে আর তারপর পুরুষ শাসিত সমাজে তাকে ঘিরে আবর্তিত হয় গুঞ্জন। কবি আমার শব্দটিকে ছায়ায়-র আগে ব্যবহার করে সমাজের এই নারী বিষয়ক ধারনাকে নিজের ওপর টেনে এনেছেন। আর এই সামাজিক ধারনা নিয়ে কবির নিজস্ব কথা একটি শব্দে পরিস্ফুট- হাস্যকর। মিতশব্দের একটি শীর্ষপ্রয়োগ এই হাস্যকর। ছায়া, ছলনার ধারনায় আমার কোন হাত নেই, সে সমাজ আপন স্বার্থে, সুবিধার্থে আমাকে বিশেষিত করেছে; গুঞ্জন? সেও সেই সমাজের অবদান। আমার হাস্যকর ছাড়া আর কিই বা বলার আছে?

পুরুষ নারীকে যখন সম্মানিত করে, রহস্যে মুড়িয়ে তাকে অলৌকিক অভিধা দেয়, সে আসলে আপন শ্লাঘাকেই মহিমান্বিত করে, আপন ধারনাকে সত্যে রূপান্তরিত করতে সে প্রয়োজনে প্রয়োগ করে রহস্যের। এই প্রয়োগের লক্ষ্য যে সেই নারীরও নিজস্ব কিছু বলবার ছিল, আছে, থাকবেও। সামাজিক অসাম্যের স্বাভাবিক বিরোধিতা করতেই এই বলা। রাবণ মাধ্যমে রিমি সেই বলার কাজটিই করেছেন। রাবণ এই পৌরাণিক চরিত্র বেছে নেওয়া থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায়। রাবণ- অনাচারী কিন্তু সে এক পরম সত্যকে সার্থক ভাবে আমাদের মানসে প্রতিষ্ঠা করে যায় যুগ যুগ ধরে। ধরিত্রীকন্যা জানকী ঘোর অনিচ্ছা এবং তীব্র প্রতিবাদ সহযোগেও যদি রাবণ কর্তৃক কেবল অপহৃতা হন তাও রাম (ঘৃণায়- লজ্জায়, আনন্দে- বিষাদে, সুখে- দুঃখে, ঐহিক- পারলৌকিকে, জন্ম- মরণে যার নাম ভারতবর্ষে নিয়ত উচ্চারিত) তাঁকে আপন পৌরুষ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কেবল উদ্ধার করতে পারেন কিন্তু সৎকুলের প্রতি আস্থাশীল থাকার জন্য তাঁকে গ্রহণ করতে পারেন না, পারেন না ততক্ষণ যতক্ষণ স্বয়ং অগ্নি সীতাকে আগুন থেকে তুলে নিয়ে এসে তাঁর কাছে প্রত্যার্পন করেন এই আশ্বাস সহযোগে যে সীতা কখনও রাবণকে আপন চিন্তাতেও স্থান দেন নি। নারীর চিন্তা সেও পরাধীন থাকবে রামায়ণ এই সত্যশিক্ষাও দিয়েছে আমাদের।

কবির অন্তরকে সেই শিক্ষা প্রবলে নাড়া দিয়েছে। কবির লিঙ্গবৈষম্য হয় না, তিনি কেবল একজন সচেতন মানুষ। আর সচেতন বলেই নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই সত্য শিক্ষা তাঁকে এই সত্যের বিরুদ্ধাচারণে নিজেকে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। মিত শব্দে, কৃশ গঠনে কবিতার পর কবিতায় রিমি নির্মাণ করেছেন তাঁর বিরুদ্ধাচারণ। এইই তাঁর অভীষ্ট। নিয়তি পরাভূত রাবণকে তাঁর মহিমান্বিত পরাজিত মহাকাব্যিক দুষ্টের থেকে আটপৌরে জীবনে নামিয়ে এনে তিনি বারম্বার বিদ্ধ করে গেছেন। যে রাবণকে জনশিক্ষার্থে পরনারী আসক্ত হতে হয় এবং যুগপুরুষের অঙ্কশায়িনীর প্রতি তাঁর সেই আসক্তির জন্য মৃত হয়ে সামাজিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সেই রাবণকে রিমি তাঁর এই ৩৮টি কবিতা যাত্রায় ধীরে ও সূক্ষ্মে সমাজে রূপান্তরিত করে আপন বক্তব্য প্রতিষ্ঠায় বহুমাত্রিকে ব্যবহার করেছেন। সীতার নারীসত্ত্বাকে আপন সত্ত্বায় লীন করে তিনি স্বিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন,

ক্যানভাসে মেঘময় রাম ও রাবণ
দুধরঙে রাবণ চন্দনচর্চিত
রাবণ রাবণে বিলীন
যুদ্ধাবসান...!



সীতার দশদিক খুলে যায়
রাবণরঙে রাবণ আঁকা থাকে চিরকাল
                                    (রাবণবধ)

রাম ও রাবণ সমাজের দুই পুরুষ সত্ত্বার দ্বন্দে দ্বিধাগ্রস্ত ও অসহায়া সীতা তাঁর নিজস্ব বিকল্প যেন খুঁজে পান এইখানে। দশাননের কুনজর ও রামের সুনজর উভয়ের পরুষ উপলব্ধি করা সীতা, অগ্নিপরীক্ষা ও বনবাস উত্তীর্ণা সীতার দশদিক উন্মুক্ত হয়ে গেছে। তিনি স্বেচ্ছাধীনা। তবুও রাবণ নামক পৌরাণিক চরিত্রের রঙে সামাজিক একটি অবস্থান কেবলই রঞ্জিত আজও। সে সামাজিক অবস্থানই রিমির রাবণ।

কবি সংজ্ঞায়িত করেন না। কবি অনর্থকে সদুপদেশ বিতরণ করেন না। কেবল আপন যাপনের স্তরবিন্যাস থেকে তিনি তুলে আনেন শব্দচিত্র। নির্মাণ করেন রাবণ। এই বই পাঠ একটি অভিজ্ঞতা। এক কবি কবিতার প্রতি সততায় সামাজিক নীতি ও অনুশাসনকে অনর্গল ব্যবচ্ছেদ করছেন, ব্যবচ্ছেদের অস্ত্র স্বয়ং কবি নিজে- এই বিরল পাঠের অভিজ্ঞতা রিমি দের রাবণ থেকে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।