শাহ আবদুল করিম ‘নয় বিঘা জমি বিক্রি করে ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে’ ‘কালনীর ঢেউ’ গীতিকাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেন বলে জানিয়েছেন। বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে এবং সিলেটের সন্ধানী নাট্যচক্রের সভাপতি নাট্যজন আরজু আলীর সহযোগিতায় বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে। একটি বইয়ের সতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয় সকল কপি বিক্রি হওয়ার পরে। আর সকল কপি বিক্রি হলে লেখক, প্রকাশক এবং বিক্রেতা সকলেরই লাভের অংক পাওয়ার কথা। এক্ষেত্রে লেখক যখন নিজেই প্রকাশক সেক্ষেত্রে লাভের টাকায় ‘নয় বিঘা জমি’র চেয়ে বেশি জমির টাকা উপার্জন হওয়া সম্ভবপর। কিন্তু আরজু আলী জানালেন যে হয় নি।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের একটি প্রশিক্ষণ-কর্মশালায় অংশ নিতে সিলেট গিয়ে আরজু আলীর বাসায় এক সন্ধ্যায় আতিথ্য গ্রহণ করি। আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশিষ্ট তথ্যচিত্রনির্মাতা তারেক আহমেদ বুলবুল। আমার সঙ্গে ছিলেন স্নেহভাজন সাংবাদিক ও করিম-অনুরাগী সুমনকুমার দাস। নাট্যজন আরজু আলীর সঙ্গে শিল্পী শাহ আবদুল করিমের গানের গ্রন্থনা এবং তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্রনির্মাণ বিষয়ে ঘরোয়া আলাপ বেশ জমে উঠেছিল। সঙ্গী সুমনকুমার দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিতব্য ‘শাহ আবদুল করিম সংবর্ধনাগ্রন্থে’ আমার একটি রচনা প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর কাছেই জানতে পারি যে, কবি শুভেন্দু ইমামের সম্পাদনায় আরো একটি সংবর্ধনগ্রন্থ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। পরের দিন সুমনকুমার দৌত্যে কবি শুভেন্দু ইমাম, কবি তুষার কর এবং গবেষক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহর সঙ্গে পরিচয় হয়। এঁদের সংকলনেও একটি প্রবন্ধ রচনার অনুরোধপ্রাপ্তি আমার জন্য একটি বড় গৌরবের ব্যাপার মনে হলো। শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে লেখার সুযোগ ও সৌভাগ্য হারাতে চাই নি। আমার হাতে রয়েছে ‘কালনীর ঢেউ’র তৃতীয় সংস্করণ। গানের সংখ্যার হেরফের না হলেও ‘যথাসাধ্য সংশোধন ও পরিমার্জনের চেষ্টা’ থাকায় এই সংস্করণটিই আলোচনার জন্য গ্রাহ্য বিবেচনা করা যায়।
শাহ আবদুল করিম নিজের লেখা গান পরিবেশন করেন। অর্থাৎ তিনি ‘গীতিকার’, ‘সুরকার’ এবং ‘কণ্ঠশিল্পী’। নিজের পরিবেশনা নিজেই পরিচালনা করেন বলে তিনি ‘সংগীত-পরিচালক’ও বটে। তাঁর গান গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে বলে তিনি ‘গ্রন্থকার’ হিসেবে মর্যাদা পাবেন। আর গানের লিখিত যে বাণীরূপ পাই, তাতে সুর যোজনা নেই, আছে ছন্দোময় পদাবলি অর্থাৎ কবিতা। সকল কবিতা গান নয়। আবার সকল গানকেও কবিতা বলার সুযোগ নেই। কিন্তু গানের লেখ্যরূপকে ‘গীতিকবিতা’ বলতে অসুবিধে নেই আদৌ। আমরা শাহ আবদুল করিমকে প্রথমত একজন ‘গীতিকবি’ এবং শেষত ‘কবি’ বললে অত্যূক্তি হওয়ার কথা নয়। আমি এই প্রবন্ধে শাহ আবদুল করিমের রচনাকে কবিতাকে বিবেচনা করে, তার ছন্দোবিচার করার চেষ্টা করছি। গানের ভেতরে ছন্দ থাকে কিন্তু কাব্যের ছন্দের মতো আঁটসাঁট বাঁধুনি তাতে আবশ্যকীয় শর্ত নয়। কারণ সুরের ও মীড়ের কারণে ছন্দের মাত্রাচ্যুতি কিংবা মাত্রাস্ফীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। বাণী-রচয়িতার পরেও সুর-রচয়িতার সৃষ্টিরনৈপুণ্যের সুযোগ সেখানে থেকে যায়। শাহ আবদুল করিমের বাণীর ছন্দোবিচার করতে গিয়ে আমরা এই বিষয়টি যেমন মনে রাকতে চাই।
‘কালনীর ঢেউগীতিকাব্যে ১৬৩টি গান রয়েছে। সঙ্গত কারণেই এতে ছন্দ ও অন্ত্যমিল রয়েছে। অন্ত্যমিলের শুদ্ধতা নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকলেও সুরের বিষয়টি মাথায় রাখলে শুদ্ধ্যাশুদ্ধি নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার পড়ে না। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শাহ আবদুল করিম সুরের কাছে সমর্পিত, ছন্দের কাছে নয়। কিন্তু আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি যে, তাঁর বাণীতে ছন্দের নিখুঁত প্রয়োগ দুর্লভ নয়। বিশেষত স্বরবৃত্ত ছন্দকে অবলম্বন করে তিনি প্রায় সকল গানের বাণী রচনা করেছেন। যেমন:
১. খাজা তোমার/ প্রেমবাজারে ৪+৪
আমি কাঙ্গাল/ যেতে চাই। ৪+৩
প্রেমলীলা/ প্রেমের খেলা ৪+৪
দেখে পোড়া/ প্রাণ জুড়াই। ৪+৩
[গানসংখ্যা ১২, পৃ. ১৮]
এখানে ‘প্রেমলীল’ শব্দটির উচ্চারণ ‘প্রেমোলীলা’ ধরতে হবে। ‘প্রেম্লীলা’ পড়লে একমাত্রার ঘাটতি পড়বে।
২. আশেক যারা/ পাইল তারা ৪+৪
আপন ঘরে/ আপন চিনে। ৪+৪
হল না মোর/ আপন চিনা ৪+৪
রাং কি সোনা/ ৪
ভাবছে করিম/ দীনহীনে। ৪+৪
[গানসংখ্যা ২৭, পৃ. ২৮]
৩. আমি বাংলা/ মায়ের ছেলে ৪+৪
জীবন আমার/ ধন্য যে হায় ৪+৪
জন্ম বাংলা/ মায়ের কোলে। ৪+৪
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার তেমন নেই। আমার জানি যে, গানের বাণীতে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ তেমন মানায় না। কিন্তু মাত্রাবৃত্ত ছন্দে সাবলীল বাণী রচনা করা যায়। রবীন্দ্র-নজরুলে তেমন নজির রয়েছে ভুরিভুরি। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে যে, শাহ আবদুল করিম যে বাণী রচনা করেছেন তা আসরে দাঁড়িয়ে সরাসরি পরিবেশনের প্রয়োজনে। তিনি মানুষকে উদ্দীপনা দিয়ে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। তাঁর বাণী প্রাণময় বক্তব্যধর্মী। সমসাময়িক বিষয়-আশয়কে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাই মানুষের মুখের কথার গতিকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। সে কারণে তাঁর বাণীতে স্থান করে নিয়েছে ‘লোকছন্দ’। লোকছন্দের আদলে তৈরি হয়েছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী ছড়া। আর ছড়ার ছন্দ মানেই স্বরবৃত্ত। এরকম সমীকরণ থেকে আমরা শাহ আবদুল করিমের গানের বাণীর স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রকরণ-ধারণের কারণ বুঝে নিতে পারি।
আমরা এ-ও লক্ষ করি যে, স্বরবৃত্ত ছন্দের সাধারণ চাল ৪+৪ মাত্রাই তিনি গ্রহণ করেছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রভৃতি বিবেচনায় আমরা ধরে নিতে পারি যে, শাহ আবদুল করিম ছন্দ সম্পর্কে প্রণালীবদ্ধ কোনো পাঠ করেননি। কিন্তু সুরের বোধই তাঁকে ছন্দ নির্ধারণ করে দিয়েছে। সহজাত এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভা তাঁর আছে বলেই এমনটি সম্ভবপর হয়েছে।