এক.
সমস্ত পাতা ঝরে যাওয়ার পর অনুভব করতে শুরু করলাম সঞ্চারিত হচ্ছি পাথুরে মাটিতে। শিকড়ের গহ্বর বড়ো অন্ধকার। কেবলই শূন্যতা। আমি বুকে হাঁটছি। শরীর থেকে জন্ম নিচ্ছে আরও শিকড়। কামড়ে ধরছি মাটি আর গোপন চলার আনন্দ থেকে নিংড়ে নিচ্ছি জল।
জল জল ! হে ঊর্ধ্বগামী জল
আমায় পান করো।
তোমার শরীরের গাঢ় আশ্লেষে
আমার পুনর্জন্ম হোক।


দুই.
গত আর অনাগতে একমাত্র বর্তমান আমি। এই যে ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় থেকে-থেকে হল্‌কার চোরা স্রোত পিঠ পেতে নিচ্ছি; বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দরাজ গলায় গান শোনাচ্ছেন বাবা; ঘরের পোষ্য হাওয়ায় বাইরের উত্তাপ বুনে দিচ্ছে তার সুর। সবমিলিয়ে কেমনঘোরের মতো লাগছে। গরমের ছুটির এই কয়েকটাদিন নিজের সঙ্গে থাকবার সুযোগ। শরীরের খাঁজে-ভাঁজে দিনলিপি ফিরে পড়বার দিন।
মুহূর্ত নিজের নিয়মেই বয়ে চলে। আমাদেরও ভেসে যেতে হয়। সময়ের স্রোতে জাল পাতে যে কাণ্ডারী, প্রাণের খেলা তো তার সঙ্গেই।

 

তিন.
চোখে চশমা ছিল না। তাই জানলার বাইরে চাঁদ আকৃতি বদলাচ্ছিল বারবার। মনে পড়ল চাঁদের শরীর নাকি কুঁকড়ে যাচ্ছে! চশমা পরতেই সমব্যথী তারাকেও দেখতে পেলাম চাঁদের পাশে চুপটি করে বসে আছে। আমিও বসে আছি চাঁদের কপালে চাঁদের টিপ পরাবার জন্য ব্যাকুল মেয়েটির মনের দরজায় কান পেতে। বছরষোল আগে ওকে দেখেছিলাম প্রথম।কোলে একটি বাচ্চা। কী ব্যস্তসে তার পরিচর্যায়। তারপর কবে যেন জানলাম বাচ্চাটি প্রতিবেশীর। একটু বড়ো হতেই বাবা- মা দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। একটা বাচ্চার জন্য পাগলের মতো করতো মেয়েটি। তরীকে নিতে চাইলে মনের কোণে কালো মেঘও উঁকি দিয়েছে মাঝেসাঝে, কী জানি কী করে। বাতাসে খবর ও সুস্থ নয়। মেয়েটি সুস্থ। আসলে পুরোপুরি সুস্থ।শুধু ‘মা’ ডাকের জন্য তার এত আকুলতা।ও চঞ্চল হয়ে উঠছিল ক্রমশ।আমরা বছরপাঁচেকের তরীকে নিয়ে চলে এলাম এক সময় পাড়া ছেড়ে।কে আর এখন কার খোঁজ রাখবার অবকাশ পায়। আমারও দিন চলছিলনিজস্ব নিয়মে। হঠাৎই খবর পেলাম মেয়েটি ‘মা’ হয়েছে। অ্যাডপ্ট করেছে একটি বাচ্চাকে। মন বলল বেশ বেশ।এতদিনে ইচ্ছে পূরণ।মাতৃত্ব শাখা প্রশাখায় পল্লবিত হোক। দিন পেরিয়ে মাস গেল, মাস পেরিয়ে বছর গেল। বছর পেরিয়ে আরও বছর।এতদিনে নতুন মায়ের কোল আলো করা দুরন্ত ছেলের বয়স তিন চার হবে। হঠাৎইদেখা ওদের পরিবারের সঙ্গে।উৎসাহে খোঁজ খবর নিতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম। বাচ্চাটি জড়বুদ্ধি। তাকাতে পারে না ঠিকমতো, দাঁড়াতে কিংবা বসতেও পারে না।

মেয়েটির কোল জুড়েছে খোকা, কিন্তু‘মা’বলেনি; বলবেও না কোনোদিন।ও যে কথা বলতেই পারে না। ছোট্ট দস্যির পেছনে দৌড়তে চাওয়া মেয়ে,‘মা’ বলে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়া সন্তানের মুখ দেখতে চাওয়া মেয়ে অমাবস্যার দিন গোনে এখন।
চাঁদের শরীর ক্রমশ কুঁকড়ে যাচ্ছে

 

চার.
একটি বিষণ্ণ ডানা পড়েছিল। পাখির হদিশ জানিনা। গাঢ় মেঘে তার শেষটুকু ঢাকা। যেখানে কালো বলয়ে সাদা পালকগুলো ক্রমশ লুটিয়ে পড়ছিল, সূর্য – গোলা রং স্থিরবিদ্যুতের জন্ম দিচ্ছিল সেখানে। আর আমি ক্রমশ অনুভব করছিলাম তীক্ষ্ণ মোচড় - কিছু কি হারিয়ে ফেলছি !

 

পাঁচ.
আজ নীরার বিয়ে। এ এমন নীরা যার জন্য কোনো দিনও কোনো কবিতা লেখা হয়নি। বরং নীরাই লিখে ফেলেছিল খাম বন্ধ মস্ত চিঠি। আমি তার কিছু মাত্র জানি। তাকে জেনেছিলাম ওর সদ্য সতেরোয়।  ছিপছিপে সাদামাটা একান্তই নিরুপদ্রপ , গুরুবাক্যের বাইরে চোখ পাততেই শেখেনি। বৈষ্ণব কবিতার ক্লাশে ওকেই দেখতাম চঞ্চল হতে। আমার মুখের দিকে যখন তাকিয়ে থাকত এক ভাবে ; চোখে খেলে যেত আবিষ্কারের বিস্ময়। যেন ওর না বোঝা অনুভূতি এতদিনে ভাষা পেয়ে কথা হয়ে উঠছে। যৌবনের উদ্‌যাপনকে যেন কিছুতেই আটকাতে পারছে না। বয়স কাঁচা , রংও কাঁচাই মনে করেছিলাম। ভুল ভাঙল বেশ কয়েক বছর পর। পাড়াতুতো সমবয়সীকে ভালবেসেছিল ও। ছেলেটিও নিতান্তই সহজ-সাদা। বয়সের ধর্মে প্রেম খুঁজেছিল পাড়ারই কোনো ‘অধরা’র মধ্যে। নীরা অপেক্ষা করেছে ডাক শোনবার , ডাক পাঠাবার। না-লেখা ডায়েরির পাতায় একটু একটু করে জমা হয়েছে কান্না-ভেজা দশ বসন্ত। কিছুতেই সুযোগ আসেনি নিজেকে প্রকাশের।
পরের গল্প আমি জানি না। শুধু জানি ছেলেটি শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বের সহজ সুরে অতলের সাক্ষাৎ পেয়েছিল। চেষ্টা করেছিল কাছে আসবার। কিন্তু যে একবার যায় সে-ই কি আর ফিরতে পারে ? নীরা তাই মানেনি ওকে। হয়তো আবার হারাবার ভয়ে এই বুঝতে পারাটুকুকেই রসদ করে নিয়েছে জীবনের। এখন নীরা সযত্নে ক্ষত ঢাকতে পারে। গোপন সঞ্চয়টুকু আঁচলে বেঁধে আজ পিঁড়েয় বসেছে। সামনে নতুন বাঁক।
নীরারা ভালো থাক।