একরকম একটা আধখেঁচড়া ভোরের স্বপ্নে আটকে ভালো লাগে? প্রায় ঘন্টাখানেক আমি একটা মোরগ হয়ে খাঁচার ওপর এক পা তুলে দাঁড়িয়ে আছি। মেঘ থেকে প্রবজ্যা নেমে আসবে,হাতে মখমলের মত কিছু একটা নিয়ে এসে আমাকে ছুঁয়ে দিলে আমি একটা আস্ত সুরের ওপর ঘন্টাখানেক ছুটে বেড়াব। কাদাজল, মাঠ পেরিয়ে আসা যুবকের মুখের দেশি মদের গন্ধ, খাঁচার নিচে জমে থাকা থকথকে রক্ত -মেদ আমাকে কিছুই ছোঁবে না। বিষয়টা ঠিক অবজেক্ট রিলেটেড নয়, ঘুমের ওপর একটার পর একটা পালিশ চাপিয়ে প্রবজ্যা চলে গেছে তারপর আমার এই স্বপ্নের মধ্যেকার আবর্তন ক্রমশ বিভ্রান্ত করেছে আমি এবং আমার প্রথাগত চারপাশকে। অথচ এখন আমার ভাঙা আয়নায় মুখ দেখতে লজ্জা করে না,লিপস্টিক শেডের নিচে লুকিয়ে চার ঘরের ঘুঁটি খেলার অভ্যেসও চলে গেছে।দাঁতের ওপর শ্যাওলা আর খান পাঁচেক পাপোষের দড়ি আটকে বসে আছি,প্রবজ্যা এলে স্বপ্নদোষ কেটে যাবে। আমি ভোরের পরবর্তী সমস্ত সম্ভাবনাময় দৃশ্যের কথা পরপর সাজিয়ে রেখে একপায়ে মোরগ হয়ে আছি।

পুজোর প্যান্ডেল বাঁধা শুরু হয় যেখান থেকে তার ঠিক একটু আগে মজুমদারদের বাড়ি,একটা ফুটো বন্ধ করে দেওয়া ঘুঘু পাক খাচ্ছে বাড়ির মাথায়, রোয়াক আর তুলসীগাছের আশেপাশে। কানে শুনতে পায় বাস্তু ঘুঘু। বাস্তু বা বস্তু কিছুতেই স্বাদ না পেয়ে এপাশ ওপাশ করে,মুখে খড়কুটো নিয়ে দৌড়ে বেড়ায় এপাশ ওপাশ। রান্নাঘর থেকে পিন্ডাকৃতি মাংসের গন্ধ ভেসে এলে আরও চাঞ্চল্য বাড়ে,সমস্ত রতি শব্দকে ঝড়ের পূর্বাভাস সংক্রান্ত ভাবনার সাথে গুলিয়ে ফেলে আঁচড়ে দিতে চায় প্যাংলা বেড়ালের পিঠ অথবা জ্যান্ত মানুষজন। কোনওদিন শব্দহীন যৌথ দৃশ্যে জানলায় পটচিত্রের মত সেঁটে গিয়ে বোঝে আদতে সে মজুমদারদের বাড়ির তুলসীমঞ্চের পাশে ঘুরতে থাকা ফুটো বন্ধ করে দেওয়া এক বাস্তুঘুঘু।

থ্যাঁতলানো মাথার একটা সাপ লেজ নাড়িয়ে চলেছে, আহ্বানে তেজ নেই তবু একটা ঘুমের আবেশ মত তার কাছে টেনে নিয়ে যায়।  ছায়ার ওপর ন্যাতানো শরীর,পাশে মরা কুকুরছানার সাথে নিজেকে সংযুক্ত করে একটি আধমরা ভীতু সাপ শুয়ে আছে। জিভের ওপর থেকে আরও খানিকটা আড়াআড়ি চিরে গেছে,একটা চোখের ওপর আর একটা চোখের বিদ্রূপ। আমি খনিজ লবন ছিটিয়ে ফেরত আসছি,সরারাত ধরে একটু একটু করে লেজের আহ্বান অস্বীকার করে ফিরে আসা। ফিরে আসার দৃশ্যের শেষে একটা ছোট দোলনা আর আমি একটা দু হাতের নপুংসক হয়ে তাতে দোল খাচ্ছি। চারিদিকে সাপের লেজের মত নিদারুণ কৌতুক...

এসব খুঁটিনাটি স্বপ্নের মধ্যে একরকম বেঁচে ছিলাম,সেটুকু খানিকটা ভাবমূলক এবং শতাংশ খানেক আশাপূর্ণ। এরপর একটা হলদে স্নানঘর আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতে শুরু করল,ইশারা মত নাচতে বাধ্য করল এবং ডিমের খোলার মত আমার  ওপর লেগে থাকা ঠুনকো সমস্ত আবরণ ছিঁড়ে ফেল মৃদু সন্ত্রাসী করে তুলল। আসলে স্নানঘর নয়,স্নানঘরের একটি জীব যাকে প্রথমবার চশমা ছাড়া দেখে আমার মনে হয়েছিল একটা কচুরিপানা হাঁটতে শিখেছে। পরেরদিন চশমা সমেত গিয়ে তাকে দেখে অনেকখন তাকিয়ে ছিলাম,মাকড়শায় আমার মারাত্মক ভয় তবু যেন একটা আকর্ষণ আমাকে টেনে রেখেছে। সরতে না পারার এই অভিজ্ঞতা আমাকে ভেতরে ভেতরে আরও টলমলে করে তুলছিল,মনে হল পড়ে যাব জলের বালতির ওপর মাথা গুজে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল,পারিনি। খানিকখন পর প্রবজ্যাই প্রথম কথা বলল, ভাঙা আয়নায় মুখ দেখতে লজ্জা করে নাকি? আমার থতমত মুখ দেখে হেসেও ফেলল। লজ্জা করত,নিজের মুখ দেখতে লজ্জ না করলেও ইয়ার দোস্তরা এসে যখন ওই ঠাকুরদার আমলের ভাঙা আয়না নিয়ে গুছিয়ে আওয়াজ দিত তখন তো লজ্জা লাগতই,একে চুন সুরকির এই ভাঙাচোরা বিপন্নতা তার ওপর এই একটা বিষয় নিয়ে কাঁহাতক আর বরদাস্ত হয়! ও আমি বদলে ফেলেছি, হ্যাঁ বদলে ফেলেছি, বেশ করেছি। আমার বাড়ি আমার আয়না আমি বুঝব। এবার মনে হল চটিটা তুলে সপাটে মারি ওটার মুখে,মুখ বলতে তো কিছু নেই পুরো বদন বিগড়ে মেরে চটকে বাথরুমের পাশের নালায় ফেলে দিই। এবার প্রবজ্যা আবার হেসে বলল ওসব ভেবে লাভ নেই,তোমার দ্বারা ওসব কিস্যু হবে না। হলে এদ্দিনে অনেককিছু হত। মোদ্দা কথা আমি একটা একজন অমেরুদণ্ডী জীব এটা প্রমান করে সে একটা চূড়ান্ত আরাম পাচ্ছিল। বেরিয়ে এলাম, ধুর এর জ্বালায় দিনটা মাটি।

ঘরের মেঝের ওপর থেপসে বসে মাস্টারবেট করছি, ভাবনার বিষয়বস্তু আগে থেকে ঠিক করা -- একজন বেল বাজিয়ে ঢুকবে, আমি দরজা খুলব, তারপর প্রথাগত স্ট্রেঞ্জার সেক্স। অর্গাজমের জলকাটা সবে শুরু হয়েছে তখন একটা খিচখিচে হাসিতে সবটা বিগড়ে গেল।তিনি বসে আছেন, কাঠের চেয়ারের হাতল থেকে সরানোর জন্য বারদুয়েক একটা ছোট স্কেল ঠুকলাম পিছিয়ে বসারও কোনও চেষ্টা না করে বেশ একটা টিপ্পনী কাটার ভঙ্গিতে বলে উঠল স্কেলটা ওখানে ঢুকিয়ে ট্রাই করো তাড়াতাড়ি হবে মনে হয়,বলেই একটা পিত্তি জ্বলানো খ্যাঁকখ্যাঁকে হাসি। উঠে পড়লাম,কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না। গায়ে মাথায় জল ঢেলে বেরিয়ে পড়লাম। একটা দোকানে গিয়ে ডিমভাজা আর পাঁওরুটি খেয়ে সারাদিন অকারণে রাস্তায় হেঁটে বেড়ালাম, মনে হল এই অনির্দিষ্ট ঘুরে বেড়ানো আমার বাধ্যতা। বিকেলের পর একটা ডিভাইডারের ওপর বসে বোতলে পাঞ্চ করা ভদকা খেতে খেতে খালি মনে হচ্ছিল ওটাকে একটা কাক তুলে নিয়ে যাক, কিম্বা কিছু একটা হোক ওর সাথে। বাড়ি ফিরলে একটা হালকা সবজে রঙের মাকড়শার ঠাট্টা শুনতে হবে এটা ভাবলেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। অনেকখন বসে থাকার পর কোনও ঠিকঠাক গন্তব্য না পেয়ে পরিচিত রাস্তায় হাঁটা লাগালাম, যার শেষটা আমার বাড়ির উঠোন এবং আরও বিস্তারিত আমি। বাড়ি ফিরে দেখা হয়নি,নিদারুণ সন্তুষ্টি নিয়ে ঘুমোতে গেলাম...বালিশে চাদরে পোড়া সাপের গন্ধ হয়ে গতরাত মিশে আছে। পরবর্তী দুদিন আর আমাদের দেখা হয়নি,আমি একটা স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ফিরে পেয়েছি নিয়মিত দাঁত মাজছি,স্নান করছি, বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়ছি।

রোববার দুপুরের দিকে একটা বারে গিয়ে বসলাম। খিদে অল্প আর তারসাথে মদের বিল মেটাতে হবে ভেবে অল্প একটু খাবারের সাথে একটা বিয়ার অর্ডার করে বসে আছি। এটা তেমন যুতসই কিছু নয়, এর চাইতে বহু ভদ্রস্থ বার আছে আমার কয়েকমাস আগে অবধি এরকম একটা জায়গায় আসার প্রয়োজন পড়েনি। ইয়ার দোস্তদের প্যাঁক খেতে খেতে হুট করে মাথায় একদিন ভূত চাপল,সবকটা আয়না বদলে বেলজিয়াম গ্লাস লাগালাম।  বেশ লাগছিল নিজেকে চকচকে আয়নায় দেখতে,তারপর সঞ্চয় শেষের দিকে এসে ঠেকল, কাজ থেকেও ছাঁটাই হয়েছি মাসকয়েক। সামনের মাসের আগে কিছু জুটবে বলেও আাশা নেই,কাজেই আপাতত এই কালো কাঁচ দেওয়া খেঁচো বারই আমার ভরসা। বিয়ারের পর কয়েক রাউন্ড হুইস্কি চালান করে যখন উঠলাম তখন বেশ তুলতুলে একটা নেশা জমেছে। একরকম সময় আমার নিজেকে সন্দেশ মনে হয় আর হাঁটা চলার রাস্তাগুলেকে গোলাপি হলুদ ক্যান্ডিফ্লক। বাড়ির গেট খুলে সোজা শোবার ঘরে এসে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললাম,হঠাৎই নিজেকে নরপিশাচ মনে হতে লাগল,নিজের গালে চড় মেরে মাথার চুল দুহাতে চেপে ধরে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লাম। উফ্! আমার এই নিঃসঙ্গ জীবন, এই গিলে খাওয়ার মত একাকীত্ব আর নেশার ঘোরে ডুবে থাকার প্রবণতা। সমস্ত কিছুর জন্য নিজেকেই দায়ী মনে হতে লাগল, ভয়ঙ্কর ভাবে নিজেকে আঁচড়াতে আঁচড়াতে মনে হল ওর কথা। একটা সবুজ মাকড়শা, আমি তারও মৃত্যু চেয়েছি। হঠাৎ সবকিছুর মধ্যে একটা গুমট হাহাকার ছড়িয়ে আমি কেঁদে উঠলাম। কান্নার দমক এক ঝটকায় থমকে গেল, সেই খ্যাঁকখ্যাঁকে হাসি...  উফ্! যেন নিরাপত্তা ফিরে এল।

 এরপর প্রবজ্যা আমার ওপর দখল জমিয়ে বসল। আমি একমাত্র ওর সামনে নির্দ্বিধায় ন্যাংটো হতাম,নাচতে নাচতে স্নান করতাম। ও বেলজিয়াম কাঁচের আয়নার ওপরে বসে সেসব দেখে যেত মন দিয়ে। সত্যি বলতে কি এরপর আমি বাইরে বেরোনো প্রায় বন্ধ করে দিলাম,কাউকে বাড়ি অবধি আসতেও দিতাম না। দরজা থেকে সমস্ত কিছুকে বিদায় করে আমি আর প্রবজ্যা দুজনে মেতে থাকতাম। আমার পিঠের ওপর দিয়ে ওর দৌড়ে যাওয়া গলার কাছে চেপে বসে থাকা আমাকে পাগল করে রাখত। ওর অশ্লীল গালিগালাজ শুনতে শুনতে আমার মাস্টারবেটের তীব্রতা ভয়ঙ্কর বেড়ে যেত। এতদিনের একটা অর্থহীন জীবন পালটি খাচ্ছিল হাওয়ার সাথে। ক্রমশ টের পাচ্ছিলাম প্রবজ্যা ছড়িয়ে পড়ছে আমার সমস্ত শরীরে, আমার স্বপ্নের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসতে লাগল। ক্ষতগুলি একসাথে জুড়ে জুড়ে যে অবিচ্ছিন্ন আমাকে তৈরি করছিল তার গড়িয়ে যাওয়া একটি অবিকল বিষণ্ণতার মত। ছড়িয়ে পড়ার শেষদিনে প্রবজ্যা আমার ওপর ঘুমের প্রলেপ মেরে দিয়ে বলল আসছি। আমি ঘড়ঘড়ে গলায় বাধা দেওয়ার কথা বলছিলাম হয়ত,ও ঠোঁটে লম্বা দাঁড়া দাঁড়া পা চেপে ধরে বলল আসি। চুপচাপ বারান্দায় পড়ে থেকে দেখলাম দরজা টপকে একটি সাদামাটা সবুজ মাকড়শা চলে গেল।

রাস্তাটি সোনালি আভায় উপদ্রুত, যেদিকে স্বপ্নের স্বাভাবিক গতিপথ তার রঙ কালো নয়,ধূসর নয়,অথবা সাদাকালোয় মেশামেশি কিছু একটার মতও নয়। আমি তার বিবরণ জানিনা, শুধু তাকে লক্ষ্য করে হেঁটে যাওয় ছাড়া আমার কিছুই যেন করার ছিল না। আভাহীন গন্তব্যের নিচে প্রেমিকের আঁচড়ের মত স্পষ্ট লালদাগ। একটা ছোট ঘরের মধ্যে বান্ধাই খুলে দেখিয়েছিল কত লোভনীয় সব আঁচড়, জিভের সাথে দাঁত মিশে গেলে সুসজ্জিত ট্যাটুর মত লাগে। তাকে ঘোরের মত চোখে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে রাস্তা ফুরিয়ে এলে এই চড়ায় তাকে অতিসংবেনশীল মেঘের নীচে আবিষ্কার করি। বান্ধাই-এর কালো শরীরে ফুটে উঠছে ছেদ-যতি চিহ্ন,কৃষ্ণতা তাকে আরও লোভনীয় করে তুলছে। আমি কতবার তার খোঁপার নীচে আটকে থাকতে চেয়েও পরিত্যক্ত লিপস্টিক হয়ে ড্রয়ারের নীচে জমে গেছি। রাস্তা শেষ হবে না,আমি আরও কালোর গভীরে ডুবে গিয়ে একটি ঘুমন্ত কপালের ওপর স্মৃতিচিহ্ন হয়ে বসে পড়ব। ওই লাল, লালের ডুবন্ত তুষ আমি ঘুমিয়ে পড়ছি...

স্বপ্ন শেষ হয়ে এলে মেঘাচ্ছন্ন রাস্তাটি মজা নালায় গিয়ে শুয়ে পড়ে,শরীরের সমস্ত লাল নর্দমার জলের ওপর গিয়ে আস্তরণ ফেলে,বালতির জমে থাকা জলের ওপর আরও ঘন হয়ে জমে থাকে। সুজন ফিটকিরি দেয়,থিতানো রক্তের নাম হয় গুঁড়ো লোহা। বান্ধাই দরজার ওপাশ থেকে হাঁ করে সব দেখে,তার পাতলা চুলের শেষে কোনও গাঢ় খোঁপা নেই। একবার স্নানকালে শরীরে আদরচিহ্ন খুঁজি,যেসব বালিকা বেলার মত নিয়ন্ত্রণহীন। মাথা নিচু, চুপচাপ ড্রেনের সাহচর্যে ফিরে দেখি বারান্দায় পিঁপড়ে ধরে আছে। কিছু লোক শরীরকে মৃত ভেবে ঘরসমেত কেরোসিনে ডুবিয়ে দিতে চায়। আমি কত মুগ্ধ চেখে নিজেকে দেখছি,সমস্ত শরীর জুড়ে ছোটবড় ক্ষত, বিষে বিষে পচে যাওয়া পিঠ,পাছা। প্রবজ্যা আমার তুমি খেয়ে যাও,আরও গভীর পচনশীল ক্ষতে আমাকে ডুবিয়ে রাখো। তোমার দৃষ্টির কাছে ফিরে যেতে চেয়ে প্রতিদিন এই গলে যাওয়া,এই নিবিষ্ট ঘুমের অছিলা। আমার আর মোরগ সেজে থাকার দৃশ্য ভালো লাগে না। আমার নিজস্ব মুগ্ধতা বাংলা মদের মত শরীর গলিয়ে দেয়,পিঁপড়েরা অবসন্ন হয়, অন্য কোনও ঘন তরলের মত গড়িয়ে যেতে যেতে মনে হল একটি সাধারন সবুজ মাকড়শা বাড়ি ফিরে এল...