কবি ও প্রাবন্ধিক সমীর রায়চৌধুরীর সাথে আলাপচারিতা 

 

নভেম্বর ২০১৫-র শেষ সপ্তাহে একদিন সকালে সমীরদার বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে আগে থেকে ফোনে ব্যবস্থা করা ছিল প্রায় তিরিশ বছর পরে মুখোমুখি হেমন্তের মেঘলাদিনে আমার মনে তখন চাইবাসায় ওঁদের বাড়িতে যাওয়ার শেষ স্মৃতি তখন ছিল আশির দশক পরে একবার জামশেদপুরে আমার সুবর্ণরেখা ফ্ল্যাটেও এসেছিলেন উনি এতদিন পরে আবার দেখা হওয়ায় স্বামীস্ত্রী দুজনেই সেই অতীতের হাসিমুখে লোহার গ্রীলের তালা খুলে ভেতরে নিয়ে গেলেন খুল যা সিমসিম ! ওঁর কাছে আসার উদ্দেশ্য হোল আমার পরবর্তী ছবির শ্যুটিং, যে ছবিতে আমি একঝাঁক তরুণ কবি ও কয়েকজন প্রবীণ কবিকে নিয়ে কাজ করছি উনি সেই তিনজন নির্বাচিত প্রবীণদের একজন আমার ছবির বিষয়, কবিদের মনোজগতের আলো-আঁধার ও রহস্যময়তা নিয়ে সমীরদা বললেন, এদেশে এরকম বিষয় নিয়ে কাজ তোমার আগে আর কেউ করেনি   

-এরপর অনেকবার বসা হোল ওঁর বাড়িতে ক্যামেরার সামনে সমীরদা, আর ক্যামেরার পেছনে আমি শ্যুটিঙের ফাঁকে ফাঁকে বেলাদির হাতের চা মিষ্টি ডিমভাজা, আর অনেক আড্ডা কবি স্বদেশ সেনের ওপর আমার বানানো ছবিটা ওঁরা তখনও দেখেননি  একদিন সেই ছবিও দেখানো হোল ছবি দেখে সমীরদা মুগ্ধ বললেন, এই যে বারান্দায় শীতের রোদ এসে পড়েছে, এখানে একসময়ে কত হৈ হুল্লোড় হোত শক্তি সুনীল দীপক আর তিন গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল বরেন পৃথ্বীশ সেটা ১৯৯০-৯২ সাল বললেন, সেসব দিনে যদি তোমায় পেতাম, দারুণ একটা ছবি বানাতে তুমি আমাদের নিয়ে, সারা কোলকাতা সেই ছবিতে মাতিয়ে দিতাম আমরা -এই বাড়িতে এসেছেন অ্যালেন গীন্সবার্গও আর সেই নিয়ে অতি সম্প্রতি বিবিসি থেকে ইন্টারভিউ নিতে এসেছিলেন কয়েকজন তো, আমাদের আলাপচারিতা শুরু হয়েছিল সেই সুত্র ধরে               

আমি >  হ্যাঁ সমীরদা, বলুন। অ্যামেরিকানদের ...  
সমীর > হ্যাঁ, আমি, ... গীন্সবার্গ সম্বন্ধে আমার এ রয়েছে যে গীন্সবার্গের আমাদের দেওয়ার মতো কিছু ছিল না ; বরং আমাদের কাছ থেকে নেবার। কোনও অ্যামেরিকানদের ভারতকে দেবার কিছু নেই।  

আমি >  মানে, লিটারেচারে ?

সমীর >  লিটারেচারে। ...টেকনোলজিতে প্রচুর জিনিষ আছে, দিতে পারে, আমরা সেখানে দৈন্যের জায়গায় আছি। যা দেবে তাই নিয়ে নেবো। সেখানে আমরা পিওরলি হাংরি। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, এখানেতে কবিতার জায়গায়, ...তুমি আজকের বাংলা কবিতাকে দেখো। আজকের বাংলা কবিতা যথেষ্ট ঋদ্ধ। এবং সে জায়গায় অ্যামেরিকান কবিতা কোথাও দাঁড়ায় না। অ্যামেরিকান কবিতার মধ্যে অনেক পালিশ আছে, এ সমস্ত আছে। বাংলা কবিতার মধ্যে সে পালিশটা হয়তো নেই, কিন্তু তার মধ্যে গভীরতা আছে। এবং আমি বললাম (বিবিসি-কে) যে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি গীন্সবার্গকে, কাছ থেকে দেখে এটা বুঝেছি যে, ...ও আমার কাছে এসেছিল যখন, তখন ওর কাছে একটা খাতা আমি দেখেছিলাম,  -চাইবাসায় যখন এসেছিলতো খাতার মধ্যে দেখলাম অনেক ড্রয়িং। বললাম, তুমি এসব ড্রয়িং নিজে করেছো ? বললো হ্যাঁ, বলে মাথা নেড়ে দিল। আমি ভাবলাম হতে পারে না তো। এই যে ছবিটা দেখাচ্ছে একটা সার্কেল আর তিনটে মাছ, তাদের মাথাটা এক আর শরীর তিনটে, -এতো ‘দীন-এ-এলাহি’র সিম্বল।
দীন-এ-ইলাহির এটা হচ্ছে সিম্বল। এখন তুমি যদি আকবরের সমাধিতে যাও, সমাধির গায়ে এটা আছে। আর পুরো যে চত্তর তার মধ্যে ঐটা আছে। আর দীন-এ-ইলাহি একমাত্র ধর্ম যেখানে ভারতীয় ধর্মগুলোর একটা সারাৎসার নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সেখানে হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, এবং কি বলে...

আমি >  জৈন কি ?

সমীর >  বৌদ্ধ ধর্ম। এই তিনটে নিয়ে উনি বানিয়েছিলেন। তখন খ্রীষ্ট ধর্ম সেভাবে প্রসারিত হয়নি। তো উনি দেখিয়েছিলেন যে তিনটের ব্যাপারটা একই। গন্তব্যটা...  মানে পথটা, মার্গটা আলাদাকিন্তু গন্তব্যটা এক ; মঞ্জিল এক হ্যায়... পর যানে কা তরিকা অলগ হ্যায়।                        

আমি >  তো ঐটাই উনি স্কেচ করে এঁকেছেন ?

সমীর >  স্কেচ করে নয়। তারপরে আমি দেখতে পেলাম যত গীন্সবার্গের বই বেরোলো সব বইয়ে ওটাকে লোগো হিসেবে ব্যবহার করেছে।

আমি >  কিন্তু কোথাও লিখছে না ?

সমীর >  কোথাও নেই, কোথাও স্বীকার করেনি, -এই হচ্ছে অ্যামেরিকান চরিত্র। আর এই হচ্ছে...  ভারতীয়রা হীনমন্যতায় ভোগে বলে কিছু কিছু ভারতীয় মনে করে গীন্সবার্গ এই করেছে ওই করেছেআরে রাস্কেল তুই যা না, গিয়ে দেখ নিজেসে যদি নিজে যায়, ওই যারা যারা বলে আরকি, অনেকে বলে ওরকম। কি নাম যেন, শংকর...    

আমি >  শংকরলাল ?   

সমীর >  হ্যাঁ শংকরলাল ওনাকে বলবো যে উনি যান, অনুগ্রহ করে এতে যান, উনি অনেক গভীর  লেখকওনার রবিশংকর সম্বন্ধে বই পড়েছি, সত্যি একটা ঋদ্ধ গ্রন্থ। কিন্তু ওই সেই এক কথা খাটে না। রবিশংকর তো আমাদের দেশের মানুষ। কিন্তু গীন্সবার্গ তো আমাদের দেশের মানুষ নয়। ও তো এসেছে মতলবে। ও তো এসেছিল আমেরিকান একটা সেলসম্যানের মতো বেশে ওকে পুপুল জয়কার, -ইন্দিরা গান্ধীর যিনি উপদেষ্টা, -তিনিই বলেছিলেন, বাবা এই হালে তুমি এদেশের সাধুসন্তদের সাথে মিশতে পারবে না। এবং আমাদের এখানকার কবিরাও প্রায় সাধুসন্তদের জায়গায়।   

আমি >  হ্যাঁ, তাই তো।

সমীর >  তো, তুমি যদি এ করো ... তুমি কী বলবে কমল চক্রবর্তীকে ? কমল চক্রবর্তী তো একটা বৃক্ষুকে, একটা গাছকে ভালোবাসে। গাছপাগল মানুষ। সে তো একটা সন্ত্‌। আমি তো বলবো, সন্ত্‌ কমল। তাই না ? এখন ব্যাপার হচ্ছে এই যে...

আমি >  আমাদের জল মাটিতেই তো ওই ব্যাপারটা রয়েছে।    

সমীর >  রয়েছে।  তুমি যেমন... তোমার র‍্যাপ-কবিতা। তোমার র‍্যাপ কবিতা কি... যে এর মধ্যে সারা পৃথিবীতে যে র‍্যাপ চলছে তার সাথে তুলনা করা চলে ?... মোটেই তুলনা চলে না। সে র‍্যাপটাকে দেখতে হবে ভারতের প্রেক্ষিতে। বা তুমি যা কিছু কাজ করছো। আমি কখনোই যাবো না ওদের প্রেক্ষিতে। আমি তোমার কাজকে দেখবো, অ্যাপ্রিসিয়েট করবো, আমি জানি যে হ্যাঁ আমি কানেক্ট করতে পারবো।   

আমি >  কোন র‍্যাপ কবিতার কথা বলছেন ?

সমীর >  ওই যে তুমি একবার একটা বই...

আমি >  মুখার্জী কুসুম ? কবিতা আবাস জলে জলময়, -আপনার মনে আছে কবিতাটা !

সমীর >  আমি পড়েছি। আমি বললাম যে শংকর লাহিড়ীর সাথে নেগোশিয়েট করার জন্যে আমার কোনও মানে-বই চাইনা, আর অ্যালেন গীন্সবার্গ মার্কা কোনও ইয়েও চাই না। আই ক্যান স্ট্রেট ওয়াক ইনটু ইট।
আমি >  হোহোহো... ঠিক। ঠিক।

সমীর >  ফলে সেই জায়গা থেকে দেখতে হবে আমাদের।

আমি >  হ্যাঁ। এইটা আমেরিকানরা জানে। যেহেতু ওরা একটা টোটালি ক্যাপিটালিস্টিক কান্ট্রি...

সমীর > হ্যাঁ, ওরা জানে যে এখানে ভোঁদা লোক অনেক আছে। হীনমন্য লোক প্রচুর এখানে। হীনমন্যতায় ভোগে। কলোনিয়ালিজ্‌মকে আপ্রিসিয়েট করে, রাদার। ওরা জানে না যে ওরা উল্টোদিক থেকে কথা বলছে,  নিজের অবস্থাকে নিজেই কলঙ্কিত করছে। এই বোধ ওর নেই।  

আমি >  হ্যাঁ হ্যাঁ। এতে আরও কি হবে, এই যে আপনাদের জেনারেশান, আপনারা এটা ধরতে পারছেন।

সমীর > হ্যাঁ, হ্যাঁ।

আমি >  আপনাদের নেক্সট জেনারেশানদের মধ্যে কিন্তু ওই আন্দাজটাই নেই, ওই জানকারিটাও নেই।

সমীর >  সে তো অলরেডি একটা গ্লোবাল ইয়ে...   

আমি >  তাই না ? ওই গ্লোবাল... তার তো ওই আন্দাজ, বা জানকারি কোনোটাই নেইফলে সে ধরতেই পারবে না।     

সমীর >  না। সে হয়তো তোমার কবিতাকেও অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারবে না। সে হয়তো কমলের... মানে ব্যাপার হচ্ছে এই যে... তোমরা আসতে তো ওখানে (চাইবাসায়), আমি দেখেছি তো কৌরবের অবস্থান যে জায়গায় ছিল। মানে কৌরব তো তার... কমল তো তার প্রথম উপন্যাস আমার এখান থেকে বের করেছে। এবং শুধু তাই না। ও উপন্যাসটা আমার কাছে এনেছিলো।

আমি >  কোনটা, ‘আমার পাপ’ ? সেটা তো কৌরব থেকে বেরিয়েছে।

সমীর > না না, ব্রহ্মভার্গব পুরাণ। ওটা এনে বলেছিল, সমীরদা, যোগেন চৌধুরী একটা ছবি এঁকে দিয়েছে, আর এটা কেউ বের কোরছে না, তো এটা আপনি করে দিন। তো আমি বললাম, আমাকে ভাই এটা পড়তে দিয়ে যাও, আমি পড়বো। তো বল্লো আমি আছি দুচার দিনতো আমি যখন দেখলুম ও আছে, তখন আমি দুদিনেই পড়ে নিলুম ওটাকে। হয়তো দুঘন্টায় পড়া যায়, কিন্তু আমি হারিড একটা রিডিং দিচ্ছিলুম না। আমি বুঝে বুঝে দেখছিলাম কোথায় কি করা যায়। আমার মতে ব্রহ্মভার্গব ওর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোর একটা।     

আমি >  কেন বলছেন আপনি এটা ? আপনি ওর ‘স্যার যদুনাথের আদি ভারতবর্ষের ইতিহাস’ পড়েছেন?  

সমীর > দারুণ।  দারুণ বই।

আমি >  আমার কাছে ব্রহ্মভার্গবের চেয়ে আদি ভারতবর্ষ- স্যার যদুনাথ, আরও ইম্পর্ট্যান্ট লেখা।     

সমীর > হ্যাঁ, হ্যাঁ।

আমি >  এবং ওই প্রথম লেখা যেখানে ও সত্যিকার ভাঙচুর করে দেখালো যে এভাবে একটা লেখা তৈরী করা যায়।

সমীর >  এটা ঠিক। এটা ঠিক। আসলে আমার এখান থেকে হয়েছে বলে বলছিলাম। তখন আমার এখানে একটা শীলা বলে মেয়ে, ওই বারুইপুরে থাকে,... কি বলা হয় যেন ? ওই যাদের নিয়ে ও লিখেছে ? 
আমি >  এই যারা... নপুংশকদের নিয়ে। হিজড়েদের নিয়ে।  

সমীর >  হ্যাঁ, হিজড়েদের নিয়ে। তো, তাদের ও (মেয়েটি) সেক্রেটারী। উনি। উনি আমাকে বলেছিলেন যে একটা লেখা লিখতে চাই, তো ঠিক ওই সময়ে ও (কমল) এসেছিলো। তো আমি (কমলকে) বললুম যে তুমি এটা, তোমার এটা তো এ হয়েছে, কিন্তু তুমি এটাকে একটা আঁতেল লেভেলে নিয়ে গেছ, এটাকে গ্রাউন্ড লেভেলে নিয়ে যাওয়ার জন্যে বলছি। অনেকগুলো সাজেস্ট করেছিলাম, ও দু’এক দিন থাকলো, কথা মন দিয়ে শুনলো । এই আর কি। শোনে কিন্তু খুব।  

আমি >  পড়াশোনা করা, শিক্ষিতা ? 

সমীর >  না, উনি তো বটেই। তা কমল ওটা করলো। তারপর বইটা ছাপা হোল। তো আমি ওটা বেশী ছেপেছিলুম, যে একটা বই বার করব ‘হাওয়া’ থেকে। তারপর দেখি একদিন ও নিয়ে চলে গেছে।
এইসব দুষ্টুমি তো ওর করার অভ্যেস আছে।

আমি >  এই হাওয়া নামটা কে রেখেছিলো ? ‘হাওয়া ৪৯’ নামটা কমলদা দিয়েছে ?      

সমীর >  না না না। ‘হাওয়া ৪৯’ নামটা কি হয়, উম... আমার অনেকগুলো বন্ধু সাজেস্ট করেছিলো অনেকগুলো নাম, তার মধ্যে সমীর আর মলয় –আমরা দুজনে মিলেই তো বার করছিলাম, তার সঙ্গে নামের একটা ইয়ে। আমি বললাম হাওয়ার অনেক সমার্থক শব্দ জানা আছে, আমি পড়েছি, পুরাণে। তো আমি দেখলাম হাওয়াটাই তো বেটার নাম। তখন অনেকের সাথে আলোচনা করে,... তখন,  তার মধ্যে কমলও একজন, সবাই অ্যাপ্রিসিয়েট করলো। তার মধ্যে কৃষ্ণগোপালও একজন। মলয়ও একজন।     

আমি >  তখনও ৪৯ লাগেনি ওতে ?    

সমীর >  ৪৯ লেগেছিলো। ওটা আমি জানতাম ছোটবেলা থেকে।

আমি >  মানে ‘হাওয়া ৪৯’ কয়েনেজটা একসাথেই তৈরী ছিলো ?  

সমীর >  হ্যাঁ, কেননা বাতাসকে যদি তুমি ভাঙো তবে তার ৭টা রূপ হবে, তাদের আবার ৭টা করে।

আমি >  ঊনপঞ্চাশ বায়ু বলে। আয়ুর্বেদেও বোধহয় আছে।
সমীর >  হ্যাঁ আয়ুর্বেদেও আছে। আমি আয়ুর্বেদ নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছি, গল্পও লিখেছি। মানে, দ্রব্যগুণ নিয়ে। যেমন কৎবেল নিয়ে আছে। ইংরেজরা সব কিছুই অ্যাপল দিয়ে সিগনিফাই করতো। বেল হচ্ছে উড অ্যাপল । আতা হচ্ছে কাস্টার্ড অ্যাপল। সবই আপেল দিয়ে।

আমি >  হয় আপেল, নয় বেরি। প্রচুর বেরি আছে। র‍্যাস্পবেরি, গুজবেরি, ক্যানবেরি। 

সমীর >  হ্যাঁ, মানে, ওদেশের ইয়ে দিয়ে চিনতে চাইতো। ভেবে দেখ না, চিনছে কিভাবে। এখান থেকেই বুঝতে হবে তোমাকে। এই যে অবলোকন পদ্ধতি, এখান থেকে সরে যায়নি কখনোই। কোনক্রমেই না, যতদিন রাজত্ব থেকেছে, ওইটা ও রেখেছে।        

আমি >  তো হাওয়া নামটা হোল এইভাবে। ... কমলদা রিসেন্টলি একটা সভায় বললো যে, হাওয়া ৪৯ নামটা আমি দিয়েছিলাম, মানে কমলদা দিয়েছিলএটা আমি জানতাম না।      

সমীর >  বললো ভালো, আমি খুশি হবো। বললো তো, হাওয়া নিয়ে একটা চর্চা তো হোল। এসব খবর আমার কাছে আসে না, আমি খুব বেড়োই টেড়োই না তো। ও একটা আমাদের কাজ করেছিলো, যেটা  কোনোদিন আমি ভুলবো না। সেটা হচ্ছে এই যে, ও আমাকে নিয়ে যাবে কৃষ্ণগোপালের কাছে। 

আমি >  কমলদা নিয়ে যাবে ?

সমীর >  হ্যাঁ। এই জন্যে যে এটা বলবার একটা অধিকার ওর আছে। যেটা বলছে। ... তো বলছে, এই লোকটার (কৃষ্ণগোপালের) কাছে আপনাকে এনে দিলুম। আমি কিছুক্ষণ,... লোকটা তো অদ্ভুত, লোকটাকে দেখে আনস্মার্ট মনে হবে...

আমি >  ও, সেই প্রথম দেখছেন কৃষ্ণগোপালকে ?    

সমীর > হ্যাঁ। গামছা প’রে ঘুরে আসবে...আমি বললুম, আমি তো পত্রিকা বার করবো। বললে, আপনি বার করলে আমি খুব ভালো ক’রে করে দেবো, একটা ভুল হলে আপনি পয়সা কাটবেন। বললাম, আমি কী কী কাজ করবো ? বললে, আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না। আপনি প্রেস থেকে চেক করে নিন কি রেটে হয় এখানে, তার চেয়ে বরং একটু কম করে দেবো। তো কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যে ও দেখালো যে স্টেটসম্যানে চাকরি করে 

আজ সূর্য সেন স্ট্রীটের সেই বাড়িটার পাশ দিয়ে গেলে, ওপরে জানালার দিকে তাকালে, বা ভেতরে ঢুকে ‘কৃষ্ণদা-’ বলে ডাক দিলেও তাঁকে আর পাওয়া যাবে না। আজ বাঁশদ্রোনীর ব্রহ্মপুরের সেই ভারী গেটওয়ালা বাগানবাড়িটায় গেলেও পাওয়া যাবে না আর সমীরদাকে। শুধু ক্যাসেটে রয়ে গেছে কতদিনের কত অন্তরঙ্গ কথাবার্তা, কত অজানা কথা, কত উন্মোচন।  

সমীরদার তিরাশি বছর জীবনের শেষ ছ-সাত মাস আমি ওঁর অন্তরঙ্গ সঙ্গ পেয়েছি। সমসাময়িক কবি ও কবিতা নিয়েও  অনেক ক্ষোভের কথা বলেছেন আমায়যেদিন ছবি সুরু করি একটু নার্ভাসই মনে হয়েছিল ওঁকে।  রেকর্ডিং চালু ছিল। বলেছিলেন, ‘প্রশ্ন দিয়ে নিশ্চয় তুমি শাসন করতে চাইবে না আমায়আমরা তাহলে বেশ বন্ধুর  মতোই দুজনে পাশে বসে কথা বলে যাবো, যেভাবে বান্ধবীর সাথে, প্রেমিকার সাথে মানুষ কথা বলে।’ আমি তাই বেশ কিছুটা দীর্ঘ করেছিলাম আলোচনার প্রস্তুতি পর্ব প্রথম দিকে আমার ভাবনাচিন্তার সাথে অপরিচয়ে কখনো একটু উষ্মিত, কখনো ডিফেন্সিভ, একবার গলা তুলে বলেছিলেন ‘আই উইল ডিমোলিশ ইউ’। তারপর কথায় কথায় বহুদূর গিয়ে কি যেন হয়ে গেছিল ওঁর মধ্যে। তিনি বিজ্ঞানের ছাত্র, প্রাজ্ঞ কবি ও প্রাবন্ধিক। ক্রমে ক্রমে উনি সহমত হতে হতে একসময় বলেছিলেন, তুমি আমার মনের পরিসরকে বাড়িয়েছ, এক নতুনের, অনন্তের সন্ধান দিয়েছ, ভাবিয়েছ ; আমি আর কারো লেখায় এভাবে পাইনি। -তখন এসব মাথায় রাখিনি। কিন্তু তাঁর অকপট আন্তরিকতা ও সারল্য আমায় স্পর্শ করেছিল। এখনও কানে বাজছে তাঁর কথা, ছবির একটি অংশে যেখানে তিনি আমায় মৃত্যুর কথা বলছেন, কেমন হয় মানুষের শেষ মুহূর্তটা যখন রিগর মর্টিস শুরু হয় শরীরে। বলছেন, মৃত্যুর আগে একটা ঘন্টার ধ্বনি, ... ‘মৃত্যু, জাগো!’ -এই উচ্চারণ করে সে মারা যায় -সেই তার শেষ অস্ফুট অনুরণন       

এখন উনি পরলোকে, বন্ধুদের সাথে। শক্তি-সুনীল-দীপক-সন্দীপন-শ্যামল-সমীর-উৎপল, সব্বাই একসাথে। খেলা করছেন, আড্ডা মারছেন, শুয়ে আছেন নিজস্ব ঝর্ণার পাশে। সেই ওংকার-জগতে নতুন করে হয়তো বার করবেন ওঁ কৃত্তিবাস। আমায় সেদিন বলেছিলেন, শক্তির লেখা ‘পৃথিবীর শেষ দিন’ কবিতাটা পড়ে শোনাই তোমাকে। আমি শুনেছিলাম সেই পাঠ, এখনও যা আমার কানে বেজে চলেছে।

 

Samir Roychowdhury

Samir Roychowdhury