এলো-চুলে একইরকম সন্ধ্যা নেমে এলো আর সব দিনের মতো। জ্যামিতির ছকে পাখিরা ফিরে এলো । বাড়ির পেছনের জঙ্গলে প্রথমে অন্ধকার ঢুকল, তারপর জোনাকি, আর তারপর জঙ্গলের পেছনের বাড়িগুলোর একে একে জানলা-কাঁচ আলো। এরকম সময়টা উদাস শূন্যতা ঘিরে ধরে। চোখ বুজলে ফুটে ওঠে গোলঞ্চা গাছ, তুলসী মঞ্চ, সন্ধ্যা প্রদীপ, শাঁখের ডাক, দুলতে থাকে মায়ের আঁচল আর গা ছম ছম করা ছেড়ে যাওয়া সাপের খোলস। পড়তে বসার ভয়ে যে সন্ধ্যাগুলোকে ছিড়ে খুড়ে একটানে বড়ো হতে চেয়েছিলাম এখন যেনো সেইসব মৃত সন্ধ্যারা এসে ভিড় করে বাড়ির পেছনে। আমি উচু ডেক থেকে ওয়াচটাওয়ারের মতো দাড়িয়ে দেখি। এদেশের সন্ধ্যাগুলো দৈর্ঘে লম্বা, কলকাতার সন্ধ্যার মতো ঘরে ফেরার পথে হঠাৎ হারিয়ে যায়না। তাই বিষাদের সুরটাও টানা। যদি সম্রাট নিরোর মতো আগুনে পোড়ানো যেত স্মৃতি, রং ঘষে লাল আকাশে মিশিয়ে দিতে পারতাম ফেলে আসা সন্ধ্যাগুলোকে, অথবা নেশার চাদরে ঢেকে দিতাম। নেশা গাঢ় হলে হতাশারা ম্লান হয়, ভালোলাগা জেগে থাকে। রক্তে দাপিয়ে বেড়ানো চিলিয়ান মালবেক কথা বলে, নেরুদার মতো, আর আমি কান পাতি বুকে।

তর্কের টেবিলে আমি ভালোবাসি ওয়াইনের প্রগাঢ় আলো।

বেগুনি কাঁচের সোনালী ফোঁটায় তেষ্টা মেটাও, - ভাবো।

গোটা হেমন্তের সংগ্রাম ওয়াইন বানাবে বলে

যাতে মানুষ পথহারানো পুরোনো সভ্যতায় ফিরে যেতে পারে।

(Excerpts from ‘Ode to Wine’ by Pablo Neruda)

অথচ আজ দিনটা ব্যতিক্রমী হওয়ার কথা ছিল। নতুন সকাল ছিল অন্যরকম সময়ের আশ্বাসে। ঘড়ি দেখার অভ্যাস আমার নেই। ছিলনা কোনোদিনই। সময়ের জীনে বাধা মানুষ নিজের জীবন হারিয়ে ফেলে নিয়মের বলগায়। বিছানার পাশে রাখা জানালার কাঁচে রাতের আকাশ দেখে ভোর হল কিনা যাচাই করে নিতে হয়। জানালায় কুয়াশা লেগে ছিল; টাঙানো ছিল ধূসর আকাশ। নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় মঙ্গলবার। বছরের এই সময় বরফ না পরলেও শীত জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে । গাঢ় বাদামী ভোর গুলোয় আলসেমি ভর করে গাছের গায়ে লেগে থাকা কুয়াশাকেও। যেতে না চেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে উদ্দেশহীন। সত্তরের দশকে আমাদের কসবা অঞ্চলে যখনও রক্তবীজ ফ্ল্যাটবাড়ি আসেনি তখন গভীর শীতে গোড়ালি উচ্চতার কুয়াশার চাদর শুয়ে থাকতো মাঠ ভর্তি খড়ের ওপর মাইল এর পর মাইল। এখানকার কুয়াশা তুলনায় বেশি অন্তরঙ্গ, শরীর আঁকড়ে ধরে, অনেকটা ছোটবেলার ঘুম স্টেশনে অপেক্ষা করা মেঘের মতো।

সকালটা আসলেই অন্যরকম ছিল; কফির গন্ধে ছুটন্ত ঘোড়া রেশ, স্টারবাক্সের মহিলার হাসিতে নিয়মের চেয়ে বেশি চিনি, এমনকি ডাল থেকে ডালে লাফ দেওয়া টুকটুকে লাল কার্ডিনাল পাখিগুলোর রুটিনে অন্যদিনের চেয়ে বেশি চাঞ্চল্য। অফিসে যাওয়ার মন করেনি, কাজ ছিল অথচ সাড়ার ইচ্ছে জাগেনি। আমার দশ বছরের মেয়ের উত্তেজনা ছিল দেখার মতো। অন্যদিন হলে হলুদ স্কুল বাস করে সে অতক্ষণে কুয়াশার ভিতর মিলিয়ে গেছে; না আজ বাস আসেনি। আজ ভোটের ছুটি। স্কুলে এখানে ইলেকশনের আগে গণতন্ত্রের বীজ বোনার উদ্দেশ্যে বাচ্চাদের ভোট ভোট খেলানো হয়। সেই মিছিমিছি ভোটে আমার মেয়ের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন জিতেছিল কাল। স্কুল ছুটির আনন্দ ছাপিয়েও ওর মজা ওর সাথে ওর বাবাও একই দেশের নাগরিক, ভোট দিতে যাচ্ছে ওরই পছন্দের পাত্রীকে। ঠিক যে কারণে দেশে আমার মা অল্প হলেও দুঃখিত ঠিক সে কারণে আমার মেয়ে খুশি। আমেরিকান হিসাবে এই আমার প্রথম ভোট তার ওপর প্রথমবার আমেরিকায় কোনও মহিলা প্রেসিডেন্ট হতে চলেছে। ইন্দিরা গান্ধীকে দেখে বড় হয়েছি আমি বা আমরা ঠিক এর গভীরতা মাপবনা। কিন্তু যারা আমেরিকান সোসাইটির ও রাজনীতির শরীর ছুঁয়ে থেকেছেন তাদের কাছে দিনটা সত্যি অন্যরকমের। আজ না হয় পথ বদলাল নদী। আজ না হয় আড়াইশো বছরের গণতন্ত্রে ধাত্রী পান্না পেয়ে গেলো রাজা হওয়ার অধিকার।

আমার মেয়ের কেন হিলারিকে ভালো লাগে? মহিলা বলে? আসলে না। অদ্ভুত রকম ভাবে আমেরিকার সত্তর শতাংশ আগামী দিনের ভোটাররা সাম্যবাদের দিকে ঝুঁকে। সমীক্ষা তাই বলে। হিলারির প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য খুবই দুর্বল; চারিত্রিক এবং নীতির দিক থেকে তো বটেই, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বা পলিটিশিয়ানদের যেরকম শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখা যায় তুলনায় ট্রাম্প দুধ ভাত। তাছাড়া প্রিপোল সার্ভেগুলোর রায় সবই জাতীয়তাবাদী বর্ণবাদী ট্রাম্পের বিপক্ষে।

দিনটা আমার জন্যেও অন্যরকম গল্প লিখেছিল। একটা গণতন্ত্র থেকে আরেকটা গণতন্ত্রে, মায়ের দালান ছেড়ে মেয়ের খেলার মাঠে ঢুকে পড়েছি অনায়াসে। এ যেন মাঝ বয়েসের রোদ্দুর ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বারান্দার গ্রিলে গিয়ে বসেছে। আমার আটপৌরে মা তার হলুদ মোছা আঁচলে হাত গুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুর্গা দুর্গা বললেন। বেরোবার মুখে আমি যেন ঠিক শুনলাম।

বাড়ির থেকে মিনিট দশেক চালালে ভোটিং বুথ। আমেরিকার পাড়ার পার্কগুলো আঁকা ছবির মতো। বিশেষত আমার যেটায় ভোট দেওয়ার কথা সেটার ভেতর মিউজিয়াম এর মতো নেচার সেন্টার আছে। ছোট বড়ো কাঁচের বাক্সে হরেকরকমের সাপ নেউল বনবিড়াল আর খট্টাশ।যে সব প্রাণীরা এখানকার পাড়াগাঁর জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় তাদের সাথে শিশু মনের পরিচয়টাই মুখ্য উদ্দেশ্য। খর কুটো জড়ো করে আগুনের ওম নেওয়া দিল্লির প্রবল শীতের মতো ঠাণ্ডা। হেমন্ত যেতে যেতে দু একটা কমলা লাল পাতামোড়া গাছ ফেলে রেখে গেছে স্মৃতি চিহ্নের মতো। শুকনো হাওয়ায় শব্দ নেই নিশ্বাসের , কেবল খসখসে পাতায় কাঠবিড়ালির শরীরের রোমের আচমকা ঘসা আর মৃত বাড়ির বারান্দায় ঝোলানো উইন্ড চার্মের প্রগলভতা। যূথবদ্ধ হরিণেরা এ সময় ঘুরে বেড়ায় যত্র তত্র। ওপরের বরফ ঠাণ্ডা এড়াতে নিচের দিকে নামতে থাকে সদলবলে। তাই রাস্তায় গাড়ি চলে সাবধানে বিশেষ করে পাহাড়ি বাঁকের মুখে। হরিণ ধাক্কা দিলে গাড়ির দফা রফা আর শিকারির প্রাপ্য হিসাবে মৃত হরিণের মালিকানা।

সিনসিনাটি শহরটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হতেই পারে আলাদীনের সেই আশ্চর্য প্রদীপের জিন তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছে কোনও এক রাতে সাতখানা টিলার ওপর। কলকাতার যখন একশোর কাছাকাছি বয়স, বুকের ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গেড়ে বসছে ঠিক সেই সময় সিনসিনাটির জন্ম। পৃথিবীর মানচিত্রে জার্মানির জন্ম হতে তখনও ঢের বাকি। আমেরিকা তখন ব্রিটেন এর থেকে সবে স্বাধীন। ইংলিশ এবং স্কটিশ রা এই শহরের গোড়াপত্তন করলেও জার্মানরা ক্রমে দখলদারি নেয়। ক্যাথলিক বা প্রটেস্টান্ট এর সাথে লড়াই চলে বিস্তর। অধিকাংশ পুরনো বাজার বিল্ডিং তাই বিভিন্ন সময়ের জার্মান আর্কিটেকচারের আদলে। কালো আর সাদায় বিস্তর তফাৎ। পরিবার-মুখী মানুষজন ধর্মভীরু ও গোঁড়া কিন্তু পছন্দ হলে আপন করে নিতে জানে। অবশ্য কদিন আগেই অন্য এক পাড়ায় আমার বন্ধু এক ভারতীয় প্রফেসরের গাড়িতে কেউ বা কারা শুয়োরের মাংস ফেলে রেখে গেছে। যেন খুব জব্দ করলাম। অথচ মূর্খরা জানেইনা হিন্দু মুসলমান ভারতীয় খয়েরি চামড়া এগুলো সব আলাদা আলাদা বাস্তব। আমার প্রতিবেশীরা ধনাঢ্য রিপাবলিকান কিন্তু ট্রাম্প সাপোর্টর বলে মনে হয়না। আসলে ট্রাম্পের চরিত্র বা কার্যকলাপ কনজারভেটিভ রিপাবলিকান থেকে অনেকটাই আলাদা।

জলের ও প্রয়োজন হয় চাদর মুড়ি দেওয়ার; যে সব সরু নদীরা ঘুরে বেড়ায় শহরের আনাচে কানাচে নভেম্বরের ঠাণ্ডায় ওদের ওপর একটা হালকা সর পরে থাকে। আমার বাড়ি থেকে ভোটিং বুথ যাওয়ার আগে এরকম একটা সরু নদী যার পোশাকি নাম লিটল মায়ামি হাঁটতে থাকে আমার সাথে। সেই নদীর ওপর ছোট্ট কাঠের ব্রিজ পেরিয়ে ভোট কেন্দ্র। এখানে দুটো পার্টি আর দুই পার্টির কর্মীরা হাতে ব্যালট পেপারের কপি নিয়ে দাড়িয়ে থাকে। উদ্দেশ্য নিজেদের প্রার্থীর লিস্ট ভোটার কে চেনানো। তারা কথা বলেনা শুধু হাসে। ছোট ছোট বক্স, সেখানে গিয়ে ব্যালট পেপারে নিজের পছন্দের গায়ে পেন্সিলের দাগ দিয়ে ডিজিটাল মেশিনে ফেলা। হয়ে গেলো ভোট। আঙুলের ডগায় কালো ছাপ নেই , ছাপ্পা ভোট নেই, বুথ দখল নেই। জীবনে একবার বামফ্রন্ট কে ছাপ দিয়ে দ্বিতীয় বার ছাপ দিলাম আমেরিকার ভাবী মহিলা প্রেসিডেন্টের নামের পাশে। আদতে যার বর ক্ষমতায় থাকা কালীন আমেরিকায় বাম ঘেঁষা লেবর ইউনিয়নের মৃত্যু ডেকে আনে। আমি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে কিন্তু ট্রাম্প নৈব নৈবচ। গণতন্ত্রের আরেক নাম আপোষ। আজ দিনটা আদতেই আপোষের ছিল।

এলো-চুলে সন্ধ্যা নেমে এলো ঢালু রাস্তায়, শুকনো মাঠে, মাঠ পেরিয়ে বাড়ির মেহগনি দরজায়, জানালার কাঁচে। টিভির নীলচে স্ক্রিনে সন্ধ্যা নেমে এলো আর সন্ধ্যার লালিমা। আমেরিকার ম্যাপেও সন্ধ্যা রং লাগতে শুরু করেছে। সাধারণত দুপাশটা নীল থাকে বাকিটা লাল। লাল নীল ব্যাপারটা আসলে একেকটা দল। রিপাবলিকান পার্টির চিহ্ন গাধা, রং লাল। ডেমোক্র্যাটদের হাতি আর নীল। আমার এক সাদা রিপাবলিকান বন্ধু ব্যঙ্গ করে বলে হাতি দেখলেই ইন্ডিয়ানদের গণেশ মনে পরে আর ডেমোক্রাটদের ভোট দেয়। কিন্তু আজ গণপতি যেন বেসামাল। অবিশ্বাস্য গতিতে আমেরিকার ম্যাপ লাল হতে শুরু করেছে । লাল, খেটে খাওয়া মানুষের রং, আজ যেন আমেরিকার ও তাই। উপচে পড়া মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ভোট দিয়েছে ট্রাম্পকে। বন্ধ কলকারখানা, বুজে যাওয়া খনির মৃত ভোটার কবর থেকে উঠে এসে ভোট দিয়েছে ট্রাম্পকে। হেরে যাওয়া মানুষ, ভগবানে বিশ্বাস করা মানুষ কাতারে কাতারে ভোট দিয়েছে ট্রাম্প কে। যে সব মানুষের কলেজে যাওয়া হয়নি তারাও। মূলত এরা সাদা। এরমটা কি হওয়ার কথা ছিল ? হয়তো ছিল কিন্তু বিজ্ঞরা বোঝেনি। মানুষ আদতে প্রতিহিংসা পরায়ণ। অন্যের প্রতি দ্বেষ হিংসার যে আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিল, ট্রাম্প তাতে যোগান দিয়ে এসেছে। অগ্রগতির সাথে নিজেকে না মেলাতে পেরে যে রাগ এতদিন ঘরমুখো ছিল তা আজ আছড়ে পড়েছে বাইরে। যেন আমেরিকার বার বাড়ন্ত একপেশে অগ্রগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমেরিকার গণতন্ত্রের টানেলে নতুন সিঁড়ি দেখা গেলো। হয়তো নিচে নামার। আপাতত আমার রাতজাগা চোখে হতাশা। যে কূপমণ্ডূক রাজনীতিকে এড়াতে নিজের গণতন্ত্র ছেড়ে অন্য গণতন্ত্রে এলাম সে রাজনীতি পিছু ছাড়ল কই। সক্রেটিস সেই কবে বুঝেছিলেন গণতন্ত্রের সমস্যা। আমার দুঃখ অন্য জায়গায়। বাবা হিসাবে সকালে মেয়েকে ঘুম ভাঙিয়ে বলা হলোনা একজন মহিলা তোমার দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আজ ও আগামীকালের মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। আমেরিকায় মহিলারা বিপ্লবের সেবাদাসী থেকে গেলো।

Parabashe

ক্রমশঃ