জীবনানন্দ পরবর্তী সময়ের কবিতার ছায়া কি জীবনানন্দই?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ নিরর্থক। বাংলা কবিতা আজ এতগুলো দশক পেরিয়ে এসেছে। নয়ের দশকের বিশ্বায়িত পাল্টে যাওয়ার পূর্বসূত্র থেকে শুরু করে শূন্য দশকের ঢিমেতাল গতিময় গ্লোবাল জীবন গিলতে থাকা, সবকিছুই তার ভেতরে আত্তীকরণ হয়েছে, অথবা হয়নি। ব্যক্তির সংকট কি আজ 'আট বছর আগের একদিন'-এর মতো কোনও অলৌকিক সংবেদে থমকে আছে? না কি সেই সংবেদ আজ, এই চরম নাগরিক উথালপাথালে ভেসে থাকা কবিতার কাছে আর অলৌকিক নয়? 'জানিবার গাঢ় বেদনার/ অবিরাম-অবিরাম ভার' বহন করা কি আজ এই নিউ মিডিয়াচালিত ইনফরমেশন এজ-এ সেই ব্যক্তিটির সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে? জীবনানন্দের অনুপম ত্রিবেদী, যে 'প্লেটোর থেকে রবি-ফ্রয়েড নিজ নিজ চিন্তার বিষয় পরিশেষ করে দিয়ে...অপরূপ শীতে এখন ঘুমায়ে আছে', বা আলফ্রেড প্রুফরকের মতো ইথারে ডুবে আছে, সে আজ যে অপরূপ শীত খুঁজবে তা এক হতে পারে কি জীবনানন্দর সঙ্গে?

আসলে আজ 'আধুনিকতা' নামক অজর ভূতটিও ক্ষয়প্রাপ্ত। এই শব্দটিই আজ মৃতবৎ শুয়ে আছে। তবে আজ নামক কোনও কল্পিত ভূমি থেকে সরে গিয়ে পাঠ করব আমরা জীবনানন্দর কবিতা? তাহলে তার উত্তরাধিকার খুঁজতে হলে আমাদের কোন সময়খণ্ডে ভেসে থাকতে হবে?

এখানে একটি মূলগত প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন, 'উত্তরাধিকার' কি আদৌ সঠিক শব্দ? ধরে নেওয়া যাক, না। কোনও বিশেষ পরম্পরা বা ধারাবাহিকতার গৌরব বহন করা সেসব কবিতার উদ্দেশ্য বা বিধেয় ছিল না। গতপর্ব শেষ হয়েছিল রণজিৎ দাশ-এর একটি উক্তি দিয়ে, "রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতায়; জীবনানন্দই আমাদের মহত্তম উত্তরাধিকার।" তাহলে কি ধরে নিতে হবে, পরবর্তীর বাংলা কবিতা জীবনানন্দকে স্বাভাবিকভাবেই পূর্বসূরি বলে ধরে নিয়েছে?


যুগান্তর চক্রবর্তীর কবিতা 'দর্পণ'-এর কয়েকটি পংক্তি ছিল, "রুক্ষ মুখ চায় লক্ষ কোটি সূর্য চন্দ্র নক্ষত্রের জটিলতা, হাড়ের কাঠামো চায় প্রতিমার রক্ত মাংস...কবে তুমি বিশাল নগ্নতা নিয়ে হবে শুদ্ধ, মুছবে প্রত্যহের আয়ুর অসুখ।"

'কবে তুমি বিশাল নগ্নতা নিয়ে হবে শুদ্ধ'- এ প্রশ্নের ভেতরে যে পবিত্র বর্বরতা রয়েছে তার ব্যাপ্তি বা সংকীর্ণতা কোনওটিই জীবনানন্দের দান নয়। কিন্তু 'লক্ষ কোটি সূর্য চন্দ্র নক্ষত্রের জটিলতা'-র সংকট যে আধুনিক মননের, তা তো জীবনানন্দকেও আক্রান্ত করেছিল। তবে এই কবিতার ভাষা, আঙ্গিক, কোথাও জীবনানন্দ নিজে উপস্থিত নেই।

যুগান্তর চক্রবর্তী ছিলেন একজন মানিক-গবেষক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সূত্রটি বাদ দিয়েও এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। সম্প্রতি 'পুতুলনাচের ইতিকথা'-র একটি এডিশন পেলাম, ১৯৭১ সালের। এই এডিশনটি ১৯৭৩ সালে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে উপহার দিচ্ছেন যুগান্তর। তবে তার চেয়েও জরুরি হল, এর ভেতরে বিভিন্ন অংশে যুগান্তরের নিজস্ব নোট নেওয়া। এমনই একটি নোটে চোখ আটকে গেল আচমকা।

উপন্যাসের প্রথমে হারুর মৃত্যু বাজ পড়ে। তার নিথর মৃতদেহ যখন পেরিয়ে যাচ্ছে শেয়াল, একটি মরা শালিকের বাচ্চাকে মুখে করে, তখন সে বারবার ফিরে তাকাচ্ছে হারুর দিকে। মানিক বলছেন, "ওরা টের পায়। কেমন করিয়া টের পায় কে জানে!"

এই লাইনের পাশে যুগান্তর মুক্তাক্ষরে লিখে রেখেছেন, "মৃত্যুর নীলাভ ঘ্রাণ?"

হঠাৎ উঁকি দিলেন জীবনানন্দ। এই নোটটুকুর মধ্যে। দীপেশ চক্রবর্তীর 'প্রভিনসিয়ালাইজিং ইউরোপ' বইটিতে দেখানো ছিল কীভাবে ইউরোপ খণ্ডীকৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তার উপনিবেশের মধ্যে। সেভাবেই দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গঞ্জে। যেমনভাবে শশীর সঙ্গে কলকাতা বাহিত হয়েছিল বাজিতপুরে।

সেই শহুরে শশী এসে প্রথম হারুর মৃতদেহের মধ্যে দিয়ে দেখবে গ্রামকে। অর্থাৎ গ্রামের শরীরের প্রতিরূপ হয়ে দেখা দেবে ওই বাজপড়া প্রায় পচে যাওয়া হারুর মৃতদেহ।

জীবনানন্দের 'অবসরের গান' কবিতাটির কথা ভাবা যাক!

"চোখের সকল ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে, এখানে, হতেছে স্নিগ্ধ কান,
পাড়াগাঁর গায় আজ লেগে আছে রুপশালি-ধানভানা রুপসীর
শরীরের ঘ্রাণ,"

যুগান্তর চক্রবর্তীর এই নোটে মৃত্যুর পরে 'ঘ্রাণ' শব্দটির ব্যবহার, এবং তার মাঝে 'নীলাভ' বিশেষণটির প্রয়োগ, 'ঘ্রাণ'-এর আগে...এর মধ্যে জীবনানন্দের কাব্যকৃতি অভিশাপের মতন ঘাপটি মেরে যেন। সেইসব রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ থেকে হারুর নীলাভ মৃত্যুর ঘ্রাণ।

"আমাদের পাড়াগাঁর সেই সব ভাঁড়-
যুবরাজ রাজাদের হাড়ে আজ তাহাদের হাড়
মিশে গেছে অন্ধকারে অনেক মাটির নিচে পৃথিবীর তলে;"

পাড়াগাঁর সেইসব ভাঁড়দের প্রেত তবু ঘুরে বেড়ায়। যেভাবে জীবনানন্দের প্রেত ঘোরে। এই নোটেও সেই প্রেত আচমকা উপস্থিত।


শিশিরকুমার দাশ জীবনানন্দকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আশঙ্কা করেছিলেন ক্রমশ এইসব আধুনিক কবিরা (জীবনানন্দ ছাড়াও সমর সেন, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কথাও বলছেন শিশিরকুমার, তাই বহুবচন) ক্রমে অনাধুনিক হয়ে পড়বেন। কথাটি ধ্রুব। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে যে যুক্তিটি অনুক্ত রাখলেন শিশিরকুমার, তা হল আধুনিকতাই ক্রমে তার জমি হারাবে। 'আধুনিক' বলে কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠির আলোয় নিক্তিতে মাপা যাবে না পরবর্তীর বা‌ংলা কবিতাকে। কারণ সাহিত্যে দর্শনে আধুনিকতা মাত্রা পাল্টেছে বা উত্তরাধুনিকতা নামক কোনও নবতর আত্মার সামনে দাঁড়িয়েছে‌।

এখন কাব্যদর্শন যদি আধুনিক-অনাধুনিক-উত্তরাধুনিকের নির্দিষ্ট কোনও মোকাম ধরে এগিয়ে না থেকে থাকে, তাহলে কাব্য-রাজনীতির সেখানে কী ভূমিকা?

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের 'উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলার কাব্য রাজনীতি' প্রবন্ধটিতে লেখক দেখিয়েছেন 'কৃত্তিবাস' যুগ থেকে যে 'বোহেমিয়ান' আধুনিকতার ট্যাবলেট গেলানো শুরু হল, সেই আধুনিকতা আদতে এক পৌরুষে ভরা আত্মকথন। আর স্বাধীনতা পরবর্তী দশকের কাব্যভাবনায় বিভিন্নভাবে যে মার্কসীয় বীক্ষণ বা রাষ্ট্রিক একাধিপত্যের বিরুদ্ধে দ্রোহচেতনা টগবগ করেছে-- কখনও সমর সেন, সবথেকে স্পষ্টভাবে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতায় যা জ্বলজ্বলে--তার প্রভাবও বাংলা কবিতা বহন করেছে অনেকদিন। এই বোহেমিয়ান পৌরুষের কবিতা এবং মার্কসীয় কাব্যকৃতি--এই দুই নিয়েই বাংলার কাব্য রাজনীতির একটি ছাঁচ গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে।

কিন্তু এর আড়ালে তো বিনয় মজুমদারও রয়েছেন। বিনয় বলেছিলেন কবিতার বিষয়বস্তু কাব্যিক হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই, এবং 'ফিরে এসো চাকা'-র ৫১ নম্বর কবিতায় তিনি লিখছেন,

"কোনো স্থির কেন্দ্র নেই, ক্ষণিক চিত্রের মোহে দুলি।
ভিন্ন-ভিন্ন সুশীতল স্বাস্থ্যনিবাসের স্বপ্নরূপ
ইতস্তত আকর্ষণে ভ'রে রাখে শূন্য মন, সাধ।"

ভুলে যাওয়া যাক, জীবনানন্দ বলে কোনও কবি ছিলেন বাংলায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের "প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ধ্ব‌ংসের মুখোমুখি আমরা"-র স্থিরনির্দেশ বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বোহেমিয়ান যৌবনের উচ্ছ্বাস থেকে সরে এসে একক ব্যক্তির হাসপাতাল, এই আধুনিকতাকে তাহলে নতুন আলোয় দেখতে হবে?

এখানেই কাব্যরাজনীতির সঙ্গে কাব্যদর্শনের সংঘাত। এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু থেকেই আমাদের ঢুকতে হবে জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতায়।