১৯৯৯ এর ১৭ জানুয়ারি। কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স এর বিমান ছেড়েছিল নিজের সময় পার করে। নিজের শহর নিজের মানুষ ছোট হতে হতে অসীম শূন্যে মিলিয়ে গেল। তারপর বাষ্প, মেঘ, আর নিরেট অন্ধকার।
************************************************
দুপুরের আয়না-রোদ ঠিকরে পড়ছিল তুষার মোড়া ছাদের গা ছুঁয়ে লোহার রেলিঙে, রেলিং থেকে রঙবেরঙের গাড়ির বনেটে, সেখান থেকে আরও নিচে জলে ভেজা কালো এস্ফলটে। ছাদ না বলে চাল বলা ভালো। এসব ছাদে মাদুরের ওপর কমলা লেবুর খোসা ছড়িয়ে থাকেনা, এসব ছাদে সূর্যের দিকে ভেজা পিঠে সুনীল বাবুর নারীরা দীর্ঘ ইকারের চুল শুকায় না। টালির চালের মত ঢালু। অনেক পরে জেনেছি কাঠের ওপর কুচি পাথর মেশানো পিচের চাদর দিয়ে ঢাকা এইসব স্বার্থপর ছাদগুলো। পাখিদের বসার পাঁচিল নেই, বৃষ্টির জল দাঁড়ানোর জায়গা নেই, ছেলেবেলার লুকিয়ে বড় হবার অবকাশ নেই।
বাস ছেড়েছিল দুপুর দুটোয়। নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল স্টেশনে  নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল তুলি দি। এদেশে প্রথম আসা বাঙালী ছাত্রর কাছে তুলি-দিরা ডাঙ্গার মত। কুমীর ভাসা জলে অবগাহনের আগে কিছুক্ষণ দম নেওয়া যায় নিশ্চিন্তে। এক সপ্তাহের  চাল ডাল থালা বাটি খিচুড়ি রান্নার রেসিপি মুঠয় ভরে দিয়ে সহজাত বাংলাদেশি আন্তরিকতায় বলল রাজা ভাল থাকিস আর ঠাণ্ডায় সাহস দেখাস না। বাস ছাড়ার পরও পেছনে ফেলে আসা নারতে থাকা ক্রমশ ছোট হওয়া তুলি-দির হাত কাটা ঘুড়ির মত জানালার পাশে ভেসে থাকল অনেকক্ষণ। ঠাণ্ডা যে সাহস করার নয় তা বুঝতে সময় লাগে বড় জোর চার মিনিট। ৩২ ঘণ্টা ধরে পৃথিবীর গতিকে টপকে প্রথম আকাশে চড়ার বিস্ময় ও বিবমিষায় বোতাম আটকে পায়ে হেঁটে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে যুদ্ধ জয়ের সিগারেট ধরিয়েছি ঠিক তখনই ঝাঁকে ঝাঁকে আলপিন ফুটল আঙ্গুলে আর পায়ে ঢেলে দিল সিমেন্ট। তুলি-দির ব্যস্ত ডেন্টিস্ট বর আর একটু দেরি করলে আমি এখন আর পাঁচটা বাড়ির সামনের শিশু ভাস্কর্যের বরফ-মানুষ। বাইরে তখন -১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
নিউ ইয়র্ক থেকে কানেক্টিকাট এর হার্টফর্ড শহর ঘড়িতে পাঁচ ঘণ্টা আর ছবিতে আর্ট মিউজিয়াম এর দেওয়াল। মিউজিয়াম এর বাইরে একলা দুপুরের বিষণ্ণতা। আর ভেতরে একটা ক্যানভাস থেকে আরেকটায় লেগে থাকা বিস্ময়, যেন ব্যস্ততম শহর থেকে নীরব গ্রাম হওয়ার এক বিদেশি রূপকথা। লম্বা লম্বা গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি; ফুরিয়ে গেলে দোল খাওয়া উঠোন, ছড়ান বাগান; ফুরিয়ে গেলে নিবিড় গাছের সাড়ি। পাতা নেই অথচ ডাল পালা অসংখ্য কাটাকুটি খেলতে খেলতে উঠে গেছে কোন এক অসীম শূন্যতা ছুঁতে। তাদের গায়ে জড়ানো রুপালি বরফের রাংতা। তুষার আর বরফ আসলেই আলাদা, পৃথিবীর রূপ পাল্টে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এ যেন আয়না কাঁচের সামনে আর পিছন। ট্রান্সপারেন্ট বরফে আটকানো বুড় ওক দেখলে মনে হয় জেল খানায় আটক গাছ আর শাদা তুষারে ঢাকা ঝাউ বা স্প্রুস দেখলে মনে হয় পাপ স্পর্শ করেনি কোনদিন। পবিত্র শব ঢাকা শাদা কাপরে মাইলের পর মাইল। কখনও আবার গাছ সরিয়ে টারজানের মত বুক বাজিয়ে সামনে দাঁড়ায় এবড়োখেবড়ো নিরেট দেওয়াল। খয়েরি পাথরের টিলার গা বেয়ে নেমে আসা জল থমকে দাঁড়িয়ে থাকে জমাট বরফ হয়ে, যেন ফাটল দিয়ে অশ্রু নেমেছে রোদের উত্তাপ নেবে বলে। অন্ধকার শীতের রাতে লেপের নিচে প্রথম বরফ দেখেছিলাম চকচকে মলাটের আলিওনশুকার গল্পে। ঘুমকাতুরে আলিওনশুকার জানালার শার্সিতে শাদা বরফ বসে থাকে ভালমানুষ বুড়ির মতোই নিঃসঙ্গ মুমূর্ষু। তারপর বরফ দেখেছিলাম দেবী দিদির বিয়েতে। মোটা কাঁচের পাটা, কাঠের গুড় লাগান। তারপর বাবার হাত ধরে রবিবারের বাজারে, গুড় কাঁচের মত, সিঁদুরের রঙ লাগা, ওপরে মরা কাতলার দেহ। চোখ বুজলে এখনও সেই গোল চোখের অসীম শূন্যটা ঘিরে ধরে। তারপর অনেক দুরে কাঞ্চনজঙ্ঘা, সেদিন টাইগার হিলের মেঘ সরে নি। কেন জানিনা মনে হয়েছিল মেঘ সরলেই স্বর্গ। টাইগার হিল এ আর ফিরে যাওয়া হয়নি। স্বর্গও তাই মেঘে ঢাকা।  
 
সন্ধ্যার পাশাপাশি বাস মোট শুদ্ধ আমাকে নামিয়ে দিয়েছিল গন্তব্যে। ফাঁকা বাসস্টপে চারিদিকের উঁচু শহুরে পাঁচিলগুলো তখন হিজিবিজি ভয় আঁকছে। দুহাতে তিনটে বোঝা কি করে সামলাই ভাবতে ভাবতে দেখি হিজিবিজি অন্ধকার থেকে এক বিশাল দেহ কৃষ্ণ সার লোক বেরিয়ে এসে আমায় কিছু বলল। ভাষা বোঝা দায় কিন্তু আস্তিন থেকে বাড়ান বিশাল হাতে অন্ধকারের নকসা। গরীব ছাত্র, এক ডলার মানে পঞ্চাশ টাকা জ্ঞানে না শোনার ভান করে দাঁড়াল। তীব্র গাঁজার গন্ধ লাগা ১২ অক্ষরের টানা ঝোলের বলিষ্ঠ ইংরেজি গড়ল আছড়ে পরল কানে। জেনে গেলাম এদেশেও ভিখারি আছে এবং তারা অনিকেত বুদ্ধ নন। পরে জেনেছি এদেরকে বাস্তবিকই ঘুরিয়ে হোম লেস বলে। সিলেটী দের নাকি খুঁজলেই আত্মীয় জন্মায়। তুলি-দির মতোই পঙ্কজ মামা অদৃশ্য জাদুকরের টুপির থেকে দেবদূতের মত লাফিয়ে বেরিয়ে এলেন অতর্কিতে। গাড়ির দরজা খুলে বললেন উঠে এস। আমাকে নিয়ে যাবেন এখান থেকে আমার ইউনিভার্সিটি টাউন স্টরসে। স্টরস কানেক্টিকাটের প্রায় মাঝামাঝি একটা গ্রাম, ১০ হাজার লোকের বাস, আমার আগামী চার বছরের জীবন। নিজের গাড়ি না থাকলে সেখানে যেতে পথ হারায়।
পঙ্কজ মামার বুইক গাড়ি চলছে আর চলছে। ফুলে ওঠা সমুদ্রের শাদা তুষার এর ঢেউ, সরু অথচ সরু না রাস্তা ময়ালের মত শুয়ে মাইলের পর মাইল। পাহাড়ি ওঠা নামা পেরিয়ে পরের ট্যারা বাঁকে কি দেখবো কে জানে। বরফের ভারে নুয়ে পরা হরেক রকমের পাইন মাঝে মাঝে মাথা তুলে জেগে থাকা উঁচু ওক, ম্যাপেল আর একর্ণ এর সংসার। নাম না জানা আরও কত গাছ। ঠাণ্ডায় ছাল বেরোনো রোঁয়া ওঠা। তাদের ফাটা শরীরের ভেতর গার অন্ধকার। গাড়ির গতির সাথে পাল্লা দিয়ে সেই অন্ধকার বেরিয়ে এসে গিলছে সব কিছু। শাদা বরফ রুপালী হল চাঁদের আহ্লাদে। অনেক দূরে একটা দুটো পুরনো গির্জার মতো বাড়ি অন্ধকারকে আরও জমাট করে বসে আছে। তাদের শার্সিরা যেন আধ ঘুমন্ত চোখ। ভেতরের হলদেটে সবুজ আলো যেন ভুলে যাওয়া ছেলেবেলার শাদা সেন্টেড রাবারের ওপরের অংশটা। ঠেস দেওয়া চুল্লির ভিতরের ধোঁয়া কখনও পুনপুনে পোকা কখনও বা ঝাঁকরা ভালুক। এই শার্সিদের পেছনে আলিওনশুকারা শুয়ে, তাদের এক চোখ ঘুমায়, অন্যটা জেগে থাকে। জায়গার নাম ম্যান্সফিলড, ডেনবাড়ি, গ্লাস্টনবাড়ি আসলে এরা রূপকথারই। আলিওনশুকার রুশ দেশ পথ হারান ছেলেবেলা থেকে নেমে এলো। ভাসিলি নামের ইতর খরগোশ মুখ ভ্যাংচাল গাড়ির হেডলাইটকে। রাস্তা আর রাস্তা নেই, রুপালি শস্যের ভেতর দিয়ে সোনালি চাঁদে পৌছনোর সাঁকো। জানলা কাঁচের বাইরে তখন বড় মেজো সেজো ছোট কচি পাঁচখানা হরিণের সংসার, হেঁটে গেলো দূরে সাঁকো পেরিয়ে সোনার ডিমের মতো ফাল্গুনের চাঁদ লক্ষ করে। চোখে হিম ঘুম নেমে এলো পাহাড় পেরিয়ে অতলান্তিক পেরিয়ে না দেখা টাইগার হিল পেরিয়ে না দেখা কাশ্মীরে। একশোয় চল্লিশ পাওয়া ইতিহাসের বইয়ে হাতে গোলাপ নিয়ে জাহাঙ্গীর বলে উঠলেন স্বর্গ যদি কোথাও থাকে – হামিন আস্ত্ হামিন আস্ত্।
***********************************************
ঘুমের অন্ধকার কাটল পঙ্কজ মামার ডাকে, “এবার নামো আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে।”     


ei prithibir baranday