কবি মণীন্দ্র গুপ্ত বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল প্রবীণ কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক। কবিদের  মনোজগত নিয়ে আমার একটি ছবিতে অংশ নিয়েছেন তিনিও। ছবির নাম ‘উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ’। সেই সুত্রে ওঁর সাথে বেশ কিছুদিন কেটেছে আমার আড্ডায়, আলোচনায়। জন্ম বাংলাদেশের বরিশালে। নব্বই বছরের এই প্রাজ্ঞ মানুষটি আমাকে মুগ্ধ করেছিলেন তাঁর তারুণ্যে ; ওই বয়সেও তাঁর আন্তরিকতা, সারল্য, কৌতূহল, স্বীকারোক্তি, অন্বেষণ, ভাবনা ! বলেছিলেন, সব কিছু নতুন করে ভাবতে হবে আবার, ভুলে যেতে হবে আমরা মানুষ ; আমরা আসলে অন্য যেকোনও প্রাণীর মতোই।
মনে পড়ছে, কৌরবে আমরা যে পঞ্চাশের দশকের কালেকশান করেছিলাম, তার মধ্যে ওঁর চারটে কবিতা ছিল। ঐ চারটে কবিতার মধ্যে একটার নাম ছিল ‘শিলচরের গল্প’। ঐ কবিতার একদম শেষে আছে :
‘দু আনায় সিনেমা, দু আনায় ফাউল কাটলেট--
তবু বান্ধবীহীন, সহপাঠীহীন আমাদের সেই
কিশোরকাল খেলার মাঠে হঠাৎ হঠাৎ
উগ্র হয়ে উঠত।    সন্ধ্যায় বরাকের তীরে
একলা বসে ভাবতাম, সাধু হয়ে যাব। আবার
জীবনকে আমি এবং আমাকে জীবন নানা রকম কুপ্রস্তাব দিয়ে
তছনছ করে দিত।’  

আমার সৌভাগ্য যে সোয়া দুঘন্টার সেই ‘উত্তরমালা’ ছবিটা শেষ করার পরে কবিদম্পতি আমার বাড়িতে এসে ছবিটা দেখতে পেরেছিলেন। দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, কবিদের মনোজগত নিয়ে এমন ছবি এর আগে কেউ কখনো করেনি। তুমিই প্রথম একটা পথ দেখালে। বলেছিলেন, এর সমগ্র টেক্সট এবং অনুলিখনও প্রকাশিত হওয়া দরকার। জানিনা, হয়তো কোনও সুযোগ্য প্রকাশক এগিয়ে এলে সেটা একদিন সম্ভব হতেও পারে। এই ছবিতে অংশ নিয়েছিলেন নয়জন কবি ; তাঁদের মধ্যে তিনজন অতি প্রবীণ-- মণীন্দ্র গুপ্ত, সমীর রায়চৌধুরী ও আলোক সরকার। আজ তিনজনই প্রয়াত।  
তো, সেই ছবির সুত্রে কবি মণীন্দ্র গুপ্তের সাথে আমার প্রশ্নোত্তরের কিছু অংশ এখানে রইলো। সেটা ছিল ২০১৬ সাল।
 
শংকরঃ   শুরু করছি। ছোটবেলার কোনও স্মৃতি আছে যা বারবার সারাজীবনে অনেক বার ঘুরে ঘুরে আসে ? কোনও একটা বিশেষ স্মৃতি, এমন কিছু আছে ?
মণীন্দ্রঃ   আমি তো গ্রামে জন্মেছিলাম, জন্মের পর থেকে গ্রাম দেখেছি। গাছপালার শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, এসব মনে আছে। আর হাট, মানে বনের কাছাকাছি জায়গা, গ্রামের বাড়ির পাশে লাগোয়া, বনের মধ্যেই প্রায়। সেখানে ঘুরে বেড়াতাম, সেইসব ছবি মনে আছে।    
শঃ   মানে, দৃশ্য জিনিষের চেয়ে কি শব্দিত স্মৃতি বেশী ?
মণীন্দ্রঃ  না, দুটোই। - মানে রাত্রিবেলা যেমন, যখন অন্ধকার হয়ে যেত, তখন যদি বৃষ্টি নামতো তাহলে টিনের চালের ওপরে বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পেতাম না। কিন্তু দুপুরবেলা যদি বনের মধ্য দিয়ে হাঁটতাম তখন বন ছাড়া কিছু দেখতে পেতাম না। মাঝে মাঝে হাওয়ার শব্দ পাওয়া যেত। সুতরাং দুটোই। আসলে হয়তো দৃশ্যটা ছিলোনা বলে রাত্রিবেলা ওরকম হোত। নাহলে দৃশ্যতেই আমার বেশী টান।   

শঃ   কোনও কিছু যে সুন্দর লাগে, কেন সুন্দর লাগে কিছু বলতে পারেন ?  কেন কোনও কিছু আপনার সুন্দর লাগে ?  কী গুণের জন্যে ?
মণীন্দ্রঃ    মনে করো বিকেল বেলার আকাশ । বাংলাদেশে কখনো কখনো অসাধারণ সুন্দর হয়ে ওঠে। যখন সূর্যটা ডোবে, আগুন জ্বলে যায় যেন। কিন্তু মধ্যপ্রদেশে এই আকাশ আরও অনেক বেশী সুন্দর। মানে যেন অনেকখানি জায়গা জুড়ে আগুনটা আরও বেশী দাউ দাউ করে জ্বলছে।
শঃ  ওই যে হারীন চট্টোপাধ্যায়ের গান 'সূর্য অস্ত হো গয়া, গগন মস্ত্ হো গয়া' -ওইরকম একটা ?   
মণীন্দ্রঃ  হ্যাঁ, গগন মস্ত্ হো গয়া, ওইরকম। -গগন মস্ত্ হয়ে যাওয়াটা মধ্যপ্রদেশে দেখতে পেতাম। আর বাংলা দেশে কখনো কখনো। রোজ না। শান্ত হয়ে সূর্য ডুবে যায় বাংলাদেশে। আর ওখানে দাউ দাউ করে জ্বলে।
শঃ   তো, এইটাকে সুন্দর মনে হচ্ছে ; ওই শান্ত সৌন্দর্যও মনে হচ্ছে, এই মস্ত্ হয়ে যাওয়ার একটা সৌন্দর্যও...  

মণীন্দ্রঃ   দুটোই মনে হয় সুন্দর। ... সুন্দর বোধহয়, প্রথম অচেনা বলেও সুন্দর লাগে। বারবার একই জিনিষ  ঘটতে থাকলে সেটা সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে। যেমন যদি একটা ছবি, খুব ভালো ছবি দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখো, দেখতে দেখতে দেখতে দেখতে সেটা আর তেমন টানে না। কিন্তু হটাৎ একটা নতুন ছবি, হয়তো তার থেকে একটু ইনফিরিয়র, রাখো তুমি, হটাৎএর জন্যে সুন্দর লাগবে।
শঃ   তার মানে যা অচেনা, যা অপরিচিত এবং যা হটাৎ।    
মণীন্দ্রঃ  খানিকটা, খানিকটা। বেশী পরিচয় ভালো নয়। ... সৌন্দর্য শাস্ত্রের ব্যাপার ।  
শঃ  মানুষে মানুষে তফাৎ হয়। একজন কবির কাছে সৌন্দর্যের উপলব্ধি, আর একজন সাধারণ মানুষের কাছে, একজন শ্রমিকের কাছে, একজন মহাজনের কাছে, একজন জমিদারের কাছে সৌন্দর্যের উপলব্ধি আলাদা।   
মণীন্দ্রঃ  প্রফেশানটা কি কোনও কথা ? আমার তো মনে হয় একটা হাবাবোকা লোকের কাছেও সুন্দর এসে ধরা দিতে পারে যদি সে চুপচাপ এক সময় তাকিয়ে থাকে। প্রফেশানটা বড় ব্যাপার নয়।
শঃ   কলসি ভরা মোহর, সোনার মোহর, কারুর কাছে ভীষণ সৌন্দর্যজনক, কারুর কাছে সৌন্দর্য আনেনা তা। তার কাছে অন্য স্মৃতি নিয়ে আসে।
মণীন্দ্রঃ  সে সৌন্দর্যের, মানে, ক্লায়েন্ট নয়। যার কাছে সোনার মোহর সুন্দর লাগাবে, মানে সে কিন্তু সৌন্দর্যের ব্যাপারী নয়।  
শঃ   কিন্তু তার দৃষ্টিকোণ থেকে তার জগতে সেগুলোই সৌন্দর্য।  
মণীন্দ্রঃ  হতে পারে। হতে পারে।
শঃ  কেউ ফর্সা রঙের মেয়েকে দেখে বলে কি সুন্দর !
মণীন্দ্রঃ  সেইটা একটা ব্যাপার বটে। আমরা যেহেতু কালো, মানে সারা পৃথিবীর কালো লোকদের কাছেই বোধহয়।
শঃ  এগুলো মনের খুব জটিল স্তরে গিয়ে আমি সেখান থেকে ধরার চেষ্টা করছি।
মণীন্দ্রঃ  কিন্তু মা কালীকে মনে করো, ওরকম সুন্দরী কে আছে ?

শঃ   অনেকে তাকে ভয়ঙ্করী মনে করে।
মণীন্দ্রঃ  এটা তো মনের বানানো। কিন্তু মূর্তি যেটা। মন যদি কাজ না করে, তুমি যদি মূর্তিটা শুধু দেখো, তবে কিরকম যুবতী, কিরকম সুন্দরী। অসাধারণ সুন্দরী।

শঃ  আপনার কাছে বেশী সুন্দর কী ? সমান্তরাল রেখা না, যা ছেদ করেছে ?
মণীন্দ্রঃ  সমান্তরাল রেখা, মানে, কি বলবো, ছবির দিক থেকে ভালো না। ... কিন্তু যেই তুমি এরকম, হ্যাশ লাইন কাটাকুটি করলে, সঙ্গে সঙ্গে একটা কম্পোজিশান দাঁড়ালো। ফর্মের যে ব্যাপারটা, কাটাকুটি না হলে হয় না।    
শঃ  মানে, সেখানে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে
মণীন্দ্রঃ  সম্ভাবনা রয়েছে
শঃ   যেটা সমান্তরালের মধ্যে নেই
মণীন্দ্রঃ   সমান্তরাল সমান্তরালই।

শ :  একটা সাউন্ডস্কেপ, নানা ধরণের আওয়াজ দিয়ে, প্রাকৃতিক শব্দ দিয়ে, বাজনা দিয়ে এমন কিছু যা আপনার মনের ভেতরটাকে, এখনকার যে অবস্থা তাকে সূচিত করে ?  এমন কোনও বাজনা বাজছে ভেতরে যেটা আপনি বলে বোঝাতে পারেন ?
মণীন্দ্র :     এখন কি জানো, সত্যি কথা বলতে কি, খুব সুখের কিছু সেরকমভাবে চট করে এসে ধরা দেয় না। আজকাল, সেই মনে করলে সেই পুরনো জিনিষই মনে পড়ে। নতুন কিছু মনে পড়ে না। নতুন কোনও একটা আশা ভরসার জিনিষ দেখতে পাই না।   
শঃ  আপনার তো শব্দ নিয়ে কাজ। যে বিশাল বিরাট শব্দভান্ডার আছে, এর মধ্যে কথিত শব্দের যে ভান্ডার, প্রাকৃতিক নয়, কথ্য শব্দ যা ডিকশনারীতে পাওয়া যায় এরকম অজস্র শব্দ থেকে চার-পাঁচটা খুব প্রিয় শব্দ ?  
মণীন্দ্রঃ  আমার, এভাবে বলা খুব মুশকিল। তার কারণ হচ্ছে ব্যবহারের ওপরে, অবস্থার ওপরে, শব্দ নির্ভর করে। এক একটা শব্দ এত বেশী মানানসই, এত বেশী অকস্মাৎ, এত বেশী, কি বোলবো, মানে সমস্তটাকে বর্ণনা করতে পারে, সেই শব্দের অবস্থান ... ব্যাপারটা মনে রাখা দরকার।    
এটা খানিকটা, ...রবীন্দ্রনাথের একটা আবস্ট্রাক্ট মূর্তি তৈরী করেছিলেন রামকিঙ্কর বেজ। তিনি মূর্তিটা করার পরে নীচে একটা প্লেট বসবার, মানে বসাবার প্লেটটার ওপরে পাঁচটা শব্দ, মানে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত পাঁচটা শব্দ, খুদে দিয়েছিলেন। সেটা খুব মজার। অনন্ত টনন্ত এরকম। কী, এখন মনে পড়ছে না। লেখা ছিল, বিরহ। হেন তেন, এরকম।  মানে কবিজনোচিত, এবং রবীন্দ্রনাথের উচিৎ এরকম পাঁচটা শব্দ উনি খুদে দিয়েছিলেন। সেটাও নাকি ওই অ্যাবস্ট্রাক্ট মূর্তিটার একটা অঙ্গ। ... সেরকম  আমি পারবো না।    

শঃ  সম্ভাবনা নিয়ে কথা হচ্ছিল । কোনটা বেশি সম্ভাবনাময়, -একটা ব্রেকফাস্ট টেবিল না প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম কোনও অঞ্চল ?
মণীন্দ্রঃ  প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম অঞ্চলে তো যাইনি। কল্পনা করতে পারি। -অন্ধকার অন্ধকার, সেখানে ফ্লুরেসেন্ট মাছেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।  কিন্তু আমার ব্রেকফাস্ট টেবিল, পৃথিবীর আলোর মধ্যে, সকালবেলা প্রথম আলোতে, ব্রেকফাস্ট টেবিলই ভালো লাগে। - শুনতে হয়তো খারাপ শোনাবে, মানে একেবারেই কবিজনোচিত হোল না। কিন্তু সত্যি কথা ব্রেকফাস্ট টেবিলে যে আলো এবং যে আনন্দ
শঃ   এবং সম্ভাবনা
মণীন্দ্রঃ  হ্যাঁ, তার যে সম্ভাবনা তা কিন্তু, আমার কাছে অন্তত সকালবেলা অতুলনীয়।  


swadesh sen