১।

একজন কবিতা লেখক ঠিক কবে কবিতায় পথ হাঁটতে শুরু করেন তিনি নিজেও জানেননা।

আমিও কি ভেবেছিলাম শৈশবের কিছু ধ্বনি আমাকে ধীরে ধীরে কবিতার রাস্তায় ঠেলে দিচ্ছিল।কলকাতার কাছেই এক উদ্বাস্তু পল্লীতে সন্ধ্যার অন্ধকারে যখন শুনতাম “ চাউল নাই চাউল দাও ,নইলে গদি ছেড়ে দাও”। মিছিল থেকে আসা আওয়াজ আমাকে কি শব্দের ধ্বনিময়তা প্রথম শিখিয়েছিল? বয়ে যাওয়া আদিগঙ্গার ওপরে বাঁশের সাঁকো পার হওয়ায় যে আবিস্কারের উত্তেজনা ছিল তাই কি আমাকে বহন করেছিল কবিতার দিকে?

জীবনকে দেখার টুকরো মুহূর্তগুলি শুরু থেকেই মনের দেরাজে যা জমা করতে থাকে, তা ই ভবিষ্যতে তাকে অনুভুতি প্রকাশের অন্তহীন ইচ্ছার দিকে এগিয়ে দ্যায়। কবির তার থেকে মুক্তি নেই।ছেলেবেলায় একটি উদ্বাস্তু পল্লীর মানুষ প্রকৃতি অসহায় দৃশ্যাবলী অনেক পরে চলচ্চিত্রের মত ভেসে আসে।


উদ্বাস্তু কবিতা

বাড়িটা উড়ছিল
অন্য কোনও জল ও সবুজের কাছে যাবে
যাবে না-ই বা কেন
আদিজেলা বরিশাল গ্রাম সম্বলকাঠি
মা ও বাবার কাঁধে ডানা
যার দাগ চামড়ায় আজও রয়ে গেছে দেখি

চল্লিশ বছর বাদেও আমাদের বাড়িঘর ভাসমান হাওয়ায়
উড়ন্ত চাকী ভেবে তুমি শুধু ভয় পাও কলকাতার মেয়ে

(তোমাকে জানাচ্ছি মহাদিগন্ত প্রকাশন ১৯৮৮)


কম্পাস

মা ও বাবা যে দেশে জন্মালেন তার নাম ভারতবর্ষ
আমার জন্ম ভারতবর্ষে
অথচ তাদের দেশ আমার নয়

পূবের কোনও পশ্চিম নেই
পশ্চিমের কোনও পূব নেই
দিক নির্ণয়ে ভেঙ্গে আছি    
(বর্গ পরিচয় এখন বাংলা কবিতার কাগজ ২০১৮)                                                                                          

আমরা বলি ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা । অতি সতর্ক এই কথনে আমরা প্রকাশ করি সেই মানসিকতা যা এই ভাগকে মেনে নিতে পারেনি। জানিনা এই দেশভাগে কোন উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছিল। দুই বাংলায় আমরা যারা কবিতায় আছি, তারা জানি, আমাদের ভাষা একটাই।সেই ভাষা বাংলাভাষা। সেইখানে কাঁটাতার কোনও বাধা হতে পারেনা।                                                   

বাংলাভাষাকেও কোথাও কোথাও কখনও কখনও একা হয়ে যেতে হয়। এর ঐতিহাসিক কারন কি দেশ বিভাজন?জানিনা। তবে এক প্রাদেশিক ভাবনা চেপে বসেছে সারা দেশে। সেখানে আক্রান্ত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি। মনে হয় আরও বড় অসহিষ্ণুতায় এক বিপর্যয় নেমে আসতে চলেছে এই পূর্বভূখন্ডে।

কবির কোনও দায় নেই। কবিতায় সুন্দরকে দেখানোই তাঁর কাজ। তবুওতো লেখা হয় সেই কবিতা যা অসহায় অবস্থান থেকে উঠে আসে। যা সেই সময়কে লিখে রাখতে চায়।


আসাম ১৯৮০

পেরেক আর ঝোলান মানচিত্র সহ আমাদের দেয়াল
তেত্রিশ বছর ধরে
বাদামী টিকটিকি পুষেছিল

গতকাল তার ভারী জিভ ছুটে বেড়িয়েছে মানচিত্রে
কাঁচা রঙ লেগে আছে মুখে ও শরীরে

সাদা মানচিত্র জুড়ে এখন শুধু রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম
সারিসারি বিবর্ণ মুখ

সহায়হীন পেরেক আর উদাসীন দেয়াল
(খনিজ কবিতা পিলসুজ প্রকাশনী ১৯৮১)
                                                                                                                               
২ ।

আসাম পাহাড়ে সাপ

বন্ধুগণ-

টেলিযোগাযোগ কিংবা রিমোট কন্ট্রোলের চেয়েও
এক তড়িৎ পদ্ধতিতে আপনাদের কাছে এলাম

জিভগুলো লম্বা চেরাই হয়ে গেছে
ঠান্ডা খোসাযুক্ত আপনাদের গা

আমাকে বিদেশী বলার মত শরীর
আপনাদের অনেকদিনই নেই
(বরফ মহাদিগন্ত প্রকাশনী ১৯৮৪)       
       

আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে অনেকেই গর্বিত উচ্চারণ করে, যে সে ভূমিপুত্র। কিন্তু একজন কবি,তার ভূমি  কোথায় রেখেছে, সেই প্রশ্নে  আগ্রহী হয়না। তার পরিচয় সে বিশ্বমানবের অংশ।তার ছুঁয়ে থাকা মাটিই তার বাসভূমি। সেখানকারই ভূমিপুত্র সে। তবুও মানচিত্র আছে। অধিকারের সীমারেখা আছে। অনায়াসে কিছু মানুষ অন্যদের অনধিকার প্রবেশের কথা তোলে। তাদের স্বার্থ এবং ষড়যন্ত্র উৎখাত করতে চায় কাউকে তার জায়গা থেকে কবিতার পথে হাঁটা একজন মানুষ এই ক্রিয়াকর্মে বিচলিত হন।
  

                                                                                                                          
ভারতীয় শিল্প  

পূব বাংলার শোক যাদের পাথর করেছিল
সেইসব পাথরে বিদেশীর মূর্তি খুব ভাল হবে বলে
শিল্পীরা বর্শা হাতে নেমে পড়েছে

এবছর বিহুনাচ রক্তের উঠোনে
(বরফ মহাদিগন্ত প্রকাশনী ১৯৮৪)


আবহাওয়া কি ভারী হয়ে উঠছে ক্রমশঃ,  চিহ্নিতকরণের সংকেত পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে?
বাংলা ভাষার কবি কবিতা ও কবিতা পাঠক তাড়িত হচ্ছে সেই ভাবনায়- মাটির ওপরে কাঁটাতার কোন ভূমিকা পালন করবে এই সময়ে।