কাশ্মীর নাম শুনলেই চোখে ভেসে উঠে প্রকৃতির উজাড় করে দেয়া সৌন্দর্যের ছবির পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান এবং চীনের দখলে থাকা এক যুদ্ধ-উপত্যকার ছবি। যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি, সামরিক আগ্রাসন, ধর্মীয় মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি কারণে কয়দিন পরপরই এই উপত্যকা খবরের শিরোনাম হয়। ইতিহাস বলে, দেশভাগের পর থেকে ভারত-পাকিস্তানের কাশ্মীরের দখলদারিত্ব নিয়ে যুদ্ধ, নিয়মিত গোলযোগের পরেও ৮০র দশকের আগে পর্যন্ত ধর্মীয় সম্প্রীতির পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম-শিখ-বৌদ্ধ জনগণ নির্বিশেষে সবাই কাশ্মীরি জাতীয়তাবাদে“কাশ্মিরিয়াত”বিশ্বাসী ছিল।৮০র দশকে ভারত অধ্যুষিত কাশ্মীরে মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের হাতে হিন্দু পন্ডিতদের এবং শিখদের হত্যা, বিতাড়ন ঘটে। যার ফলে কাশ্মীরে সাধারণ জনগণের ভিতর ধর্মীয় বিরোধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস কাশ্মীরি-জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে একাত্ম থাকার প্রশ্নেও প্রভাব ফেলে। ৯০ দশক থেকে কাশ্মীরে ভারতীয় সামরিক আগ্রাসন, রাষ্ট্র কর্তৃক হত্যা, গুম, জেল, ধর্ষণ, জনহেনস্থা ইত্যাদি কাশ্মীরি মুক্তিকামী জনগণের ভিতরে স্বাধীন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেয় এবং পাশাপাশি ভারত সরকারের প্রতিও বিদ্বেষ বেড়ে চলে। কিছুদিন আগেও ৩৭০ ধারা ও ৩৫ (এ) আর্টিকেল বাতিলের পরে, টানা ১০দিন বাইরের বিশ্বে সাথে কাশ্মীরের সব ধরণের যোগযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া হয়। এই অবরোধ তুলে নেয়ার পরেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
কাশ্মীরি সাহিত্যের হাজার বছরের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের হাত ধরেই প্রথমে সংস্কৃত ভাষায় কাশ্মীরি সাহিত্যের সূচনা হয়। কাশ্মীরি ভাষায় ব্যপকভাবে সাহিত্য রচনার সূচনা হয় সাড়ে সাতশো বছর আগে। মধ্যযুগ থেকে কাশ্মীরিরা উর্দু ভাষায়ও সাহিত্য রচনা শুরু করে। বর্তমানে কাশ্মীরি সাহিত্য মূলত উর্দু এবং ইংরেজিতেই রচিত হয়। কাশ্মীরি ভাষার ব্যবহারও সাহিত্যে তুলনামূলক কম। কাশ্মীরের প্রথমদিককার কবিদের মধ্যে লালেশ্বরী অন্যতম। বিশ্বসাহিত্যেও কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত সাহিত্যিকদের মধ্যে সালমান রুশদী, আগা শাহিদ আলী, নিতাশা কৌল বেশ পরিচিত মুখ। বর্তমানে কাশ্মীরে বসবসকারী কবিদের বেশিরভাগ উর্দুর পাশাপাশি ইংরেজিতে লিখেন। এখনকার তরুণ কবিদের মধ্যে চারজন কবির চারটি কবিতা অনুবাদ করা হয়েছে। যেহেতু অনেকেই লিখেন তাই যে চারটি কবিতা নির্বাচন করা হয়েছে সেগুলো মূলত সাম্প্রতিক গত কয়েক বছরে বিভিন্ন অবরোধ চলাকালীন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ইংরেজি কবিতাগুলো থেকে বেছে নেয়া হয়েছে। হুজাইফা পণ্ডিতের কবিতাটি তার প্রকাশিত ইংরেজি কবিতার বই “গ্রীন ইজ দ্য কালার অফ মেমোরি” থেকে নেয়া হয়েছে। হুজাইফা ইংরেজির পাশাপাশি উর্দুতেও লিখেন। বর্তমানে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার উপর পিএইচডি করছেন। ওমাইর ভাটনিজের সম্পর্কে বলেন “স্মৃতিতে বাস করি”। তিনি মূলত ইংরেজিতেই লিখেন।উজমা ফালাক কবিতা লেখার পাশাপাশি কাশ্মীরের উপর নির্মিত তার পরিচালিত ডকুমেন্টারি সিনেমা “টিল দেন দ্য রোডস ক্যারি হার” এর জন্য বিখ্যাত। বর্তমানে তিনি দিল্লী থাকেন। ইনশা মালিক ইরানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। কাশ্মীরে জন্ম এবং বেড়ে উঠলেও বৈবাহিক সূত্রে তেহরান থাকেন বর্তমানে, তার বাবা-মা, পরিবারের সবাই কাশ্মীরেই থাকেন।তিনি মূলত কাশ্মীরে ঘটে চলা সামরিক বাহিনীর হাতে ঘটা হত্যাকান্ডের উপর লেখা সিরিজ কবিতার জন্য বিখ্যাত। এই চারজন কবিই কাশ্মীরের প্রতিবাদী কবি হিসেবে পরিচিত। চারজনের কবিতার মূল বিষয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, একাকীত্ব, আগ্রাসন।

 

Letter to Azadi
Huzaifa Pandit

Either everyone talks of you to me
Or else no one converse with me

Anonymous
 
They barricade us, dear
in halls of censored silence.
 

A half dead rumour
Whispers you will visit soon.

 

Black roses shed mourning, buds
Bulge in the blind garden
Beside frantic beds in the fort-prison.

 

We were directed to forget
The taste of tulips left on battered
Tongues and further directed to report
The rumors of your exile to stinking Dal.

 
We wrote back
An ember simmers in our ancestral mouths
when cold minutes prey on a mutilated memory.
We wrote that this fire also feeds on our caned bones.

 We Remain wedded to our delusion:
One day, the final destination of mirages
will testify in courts of reality. Their apprehensions
too will be dismissed, we too will wheel in the hollow horse of victory.

 

We are still prisoners of the sorcerers.
They lure us with outlawed remedies and handcuffed
potions. They gouge out our warm heartbeats and auction them
at the loud borders over feasts of rented revelry. We are yet foolish dear
to smuggle letters to you in our beats. Do they reach you? Did you read them? You never reply.

 

আজাদীর প্রতি চিঠি
হুজাইফা পন্ডিত    

আমার কাছে হয় সকলে তোমার কথাই জিজ্ঞেস করে
নয়তো মুখে কুলুপ এঁটে থাকে
বেনামে
ওরা আমাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে, প্রিয়
নিষেধাজ্ঞার নিরব কামরায়।
 
এক আধমরাগুজব
ভাসছে তুমি আসবে খুব শীঘ্রই।

শোক ছুঁয়ে আছে কালোগোলাপে, কুঁড়ি
ঝরে পড়ছে অন্ধবাগানে
কারাদুর্গের ভিতর উন্মত্ত শয্যার পাশে।
আমাদের আদেশ দেয়া হয়েছিল ভুলে যেতে
জিহবায় ফেলে আসা আহত টিউলিপের স্বাদ
আর নির্দেশিত হয়েছিলাম ছড়িয়ে দিতে
পচাগলা দালে তোমার নির্বাসনের গুজব।
 
আমরা ফিরে লিখেছি
পুর্বপুরুষের মুখে পোড়া জ্বলজ্বলে কয়লা
যখন শীতকাতর মুহুর্তগুলো ছেঁড়া-ফাটা স্মৃতির উপর হানা দেয়
আমরা লিখেছি,এই আগুন আমাদের চেপে থাকা হাড়গুলোয় খাবার জোগায়
আমরা বেঁচে থাকি আমাদের ভ্রমে:
একদিন মরিচিকার শেষ গন্তব্য
বাস্তবতার আদালতে সাক্ষ্য দেবে। তাদের আশঙ্কাও
খুব ভুল প্রমাণিত হলে, আমরাও বিজয়ের পঙ্খীরাজ ঘোড়া ছোটাবো।
 
আমরা এখনও বন্দী কালো জাদুকরের হাতে।
হাতকড়া পরিয়ে ওরা আমাদের দমিয়ে রাখতে চায়, অবৈধত্রাসে,
বিষঢেলে। আমাদের উষ্ণ হৃদস্পন্দন টেনে বের করে নিলামে তোলে, ওরা
উৎসব জুড়ে দেয় উচ্চকিত সীমান্তে। হেপ্রিয়, আমরা এখনো বোকার মতো
প্রতিটি হৃদকম্পন তোমার কাছে চিঠিতে ভ’রে পাচার করি।
তোমার কাছে পৌঁছেছিল সেগুলো? তুমি কি পড়েছ? উত্তর দাও নি কখনো।

 

Siege
Omair Bhutt

“In the streets, filled
With impenetrable smoke,
Kashmir is burning again,
So are tyres, rubber,
And logs. The houses
Are burning. Fire
runs in waves. The air,
heavy with soot, murmurs
death overhead.
The lost children of
the sad country sprint
in alleyways with
black balloons. The lost
children of the sad country
count shadows
on the sun. In the afternoons
they sleep to the
rain’s lalluby. The food is scant.
There is no milk. The
grain of life shapes itself
into a stone we bring home
for a familial ceremony. Each evening
on the dinner tables
we prepare for our little wars
we will fight in the morning.”

 

অবরোধ
ওমাইর ভাট

 
দুর্ভেদ্য ধোঁয়ায়,
ভরে গেছে রাস্তাঘাট,
আবার জ্বলছে কাশ্মীর,
টায়ার, রাবার,
এবং কাঠেরগুড়ি। ঘরবাড়ি
জ্বলছে। আগুন
দাউ দাউ ছড়িয়ে পড়েছে। কালোধোঁয়ায় ঢাকা,
ভারী বাতাস বিড়বিড় করে বলে
উপচে পড়া মৃতদের কথা।
এই বিষণ্ণ দেশের
নিখোঁজ শিশুরা
কালো বেলুন হাতে
সরুগলিতে দৌড়ায়।
চিরদুঃখী দেশের শিশুরা
রোদ ছাপিয়ে যাওয়া
ছায়াগুণেচলে। বিকেলে
ঘুমিয়ে পড়ে বৃষ্টির
ঘুম পাড়ানি সুরে। অপর্য়াপ্ত খাবার।
দুধনেই। বেঁচে থাকার রসদ বয়ে আনতে আনতেই
তা পাথরে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রতিসন্ধ্যায়,
রাতের খাবারের টেবিলে
আমরা প্রস্তুতি নিই লড়াইয়ের
যে লড়াইয়ের শুরু হয় রোজ সকালে।

--
 

The Graveyard of Paradise
Uzma falak

I hear the army truck grumbling
Its engine howling
Dogs on the streets now silent
I am lonely, suddenly
I think of the gasoline rainbow the truck may have left in the puddle
Image in the puddle is of a massacre
Night doesn’t end
I and the lamb sob

When I looked up
Sky became paper
I began writing images
With my eyes
Rain fell in unknown villages on numbered graves
1, 40, 100
“And it is He who sends down rain after you have lost all hope, and unfolds His grace…”
Ya Musawwir,
The Artist
Will you paint us again?

Memories surface from the deepest rubbles
like the promise of resurrection

My mind is a trellis
where
the ivy grows
inconsolably.

 

বেহেশ্তের কবর খানা
উজমা ফালাক

 
সেনাবাহিনীর ট্রাক থামার শব্দ শুনলাম,
ইঞ্জিনের ঘড়ঘড়ে শব্দ
রাস্তার কুকুররা এখন চুপ
আমি একা, হঠাৎ
মনে হলো গ্যাসোলিন রংধনুটাতে কাদা ছিটিয়ে গেছে ট্রাকটা
কাদার ছাঁটে গণহত্যার ছবি আঁকা
রাত শেষ হয়না
আমি আর মেষশাবক, ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি
 
উপরে তাকাতেই
আকাশটা কাগজের মতো হয়ে গেল
আমার চোখ দিয়ে
ছবি আঁকতে শুরু করলাম
অজানা গ্রামে অগণিত কবরে বৃষ্টি ঝরছিলো
১, ৪০, ১০০
"এবং তিনি পরমকরুণাময়, যখন তুমি সমস্ত আশা হারিয়ে ফেলো, তখন তিনি বৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর অনুগ্রহ পেশক রেন..."
হে মুসাফির
হে শিল্পী
তুমি কি আবার আমাদের আঁকবে?
 
পুনরুত্থানের প্রতিশ্রুতির মতো
স্মৃতিরা উঠে আসে গভীরতম ধ্বংসস্তুপ থেকে

আমার মন পাঁচিল-ঘেরাবাগানের মতো
যেখানে
আইভিগাছ বেড়ে উঠে
প্রবোধহীন।

 

A poem for a death
Inshah Malik

You are on your own
Do not grieve,
Do not wail,
Endure,
Be strong,
If the world fails to respond,
There is always your inner self
which witnesses,
and strives
Be a means of hope,
cure injured,
Heal
Avoid death,
Yes, avoid it
It is the easiest thing
that can happen
Your enemy knows
no value for life
teach the struggling teens,
learn from your elders,
respect your women,
and let them lead
your strength will teach you,
unknown secrets of life
and treat your children as your equal
Walk tall,
in this life
and ever after
You have crafted
Your today
Don't forget,
to water your plants,
and feed the strays
Don't panic,
in any case,
Nothing worse can happen
to a people in resistance
Don't let despair
distract you from the path
Don't forget to write,
not just with stones
But on pieces of paper,
on the leaves of the trees,
and those bloodied roads
the beloved word
Azadi
Remember
I'm just an apology
and I offer you my soul
redeem me of the sin
of not suffering any physical harm
Know well,
I write from a bleeding heart

 

মৃতের জন্য কবিতা
ইনশাহ মালিক

 
নিজের জন্য
দুঃখ করো না,
বিলাপ করো না,
সয়ে যাও,
শক্ত হও,
গোটা পৃথিবী যদি সাড়া না-ও দেয়,
তোমার অন্তর জানে
তুমি দেখছো,
ছটফট করছো
একটু আশার নিমিত্তে
আহতের নিরাময়ের জন্য,
আরোগ্য লাভে
মৃত্যু এড়াতে
হ্যাঁ, এড়ানো
এটাই সবচেয়ে সহজ
যা কিছু ঘটবে
তোমার শত্রু জানে
জীবনের কোন মূল্য নেই
শেখাও লড়াকু কিশোরদের,  
শিখে নাও প্রবীণদের কাছ থেকে,
নারীদের সম্মান করো,
এবং তাদের নেতৃত্ব দিতে দাও
তোমার শক্তি তোমাকে শিখিয়ে দেবে,
জীবনের অতল রহস্য
এবং শিশুদের শেখাওসাম্য,
হাঁটো দীর্ঘ পথ,
এ ইজীবনে
এবং পরেও যতবার
আজকের কথা
ভাববে
ভুলে যেও না,
গাছেদেরও জল চাই,
গবাদী পশুর চাইখাবার,
কোন কিছুতেই
আঁৎকে উঠোনা,
বন্দীমানুষের চেয়ে
বিপন্ন আর কিছুই হতে পারে না,
হতাশাকে পথ
বিচ্যুত করতে দিবেনা,
লিখতে ভুলবেনা,
শুধু পাথর দিয়ে নয়,
কাগজে,
গাছের পাতায়,
এবং সেই সব রক্তাক্ত সড়কে
প্রিয় শব্দটি
‘মুক্তি’
মনে রেখো
আমি এক অক্ষম-মাত্র
এবং আমার আত্মাকেসঁপে দিয়েবলছি
আমাকে শরীরী কষ্টের
পাপ থেকে মুক্তি দাও
তুমি তো ভালো করেই জানো,
আমি রক্তাক্ত হৃদয় হতে লিখি।

সূত্রঃ ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে, কাশ্মীর লিট, গ্রেটার কাশ্মীর