(মনে করো সেই দিন আর চোখের কোণে চিকচিক করে উঠছে না / দাঁড়িয়ে থাকছে না চুপ করে ফানুস হাতে নিয়ে / যেমনটা থাকে / উদাসী ঘরে একা পিয়ানো /আকাশের ঠোঁটে ফিকে চাঁদ / গলির ঘাড়ে একটা দর্জির দোকান / বরং ভেসে যাচ্ছে নুড়িদের সাথে ভাসিয়ে দিচ্ছে সমস্ত পাপ পুণ্য / তারপর থেকে থেকে থিতিয়ে পড়ছে / তোমার আমার সবচেয়ে প্রিয় / আদিতম মনখারাপ)
 
 
১.
বাইরে থেকে একটা গানের সুর ভেসে আসছে। খুব চেনা। কোথায় যেন শুনেছিলাম মনে করতে করতে হঠাৎ শখ হল এক কাপ কফি হলে বেশ হতো। আমি বারান্দায় উঠে এলাম।
 
আমার আর আজকাল কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। কারও সাথে কথা বলতেও। লিখতে বসলে শব্দেরা আসে না, বেইমানি করে। আমি গুছিয়ে ভাবতে বসি।
 
চেষ্টা করি বাইরে কান রাখতে। সুরটা এখনও ভাসছে হাওয়ায়। ছোটবেলায় শিখেছিলাম --- সা..রে..গা..মা..
মা বললেই মনে হয়, রোজ রাতে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর কথা।
মা...কড়ি মা... আমার গলা যায় না অতদূর। বুঝতে পারি তাল কেটে গেছে কোথাও।
 
এক একবার ইচ্ছে হয়, ভিতরে কান রাখি। মনে হয় কে যেন অজস্র শব্দ আওড়ে চলেছে পর পর। শুধু, যদি একটু অন্ত্যমিল...
 
আমি ঘরে ফিরে আসি।
একটু একটু করে বের করি তাকে। সেও বেরিয়ে আসে তার রক্তমাংসের খোলস ছেড়ে, হাঁটু আর হাতের পাতায় ভর দিয়ে।
সোজা করে দেয় বেঁকে যাওয়া দেওয়ালগুলো, ভেঙে পড়া কার্নিশগুলো। খুঁজে নেয় শক্ত চামড়ার আড়ালে কোন ঘা-গুলো এখনও শুকোয়নি। সেখানে উপশম এনে দেয়।
 
রাত ফুরোনোর আগে আমি তাকে আবার পুরে নিই।
সে তো আমার মধ্যেই থাকে।
আমার সমস্ত ব্যাধির উপশম।
আমার ঈশ্বর।
আমার ব্যক্তিগত কবিতার ঈশ্বর।
 
 
২.
ইদানীং শীত বোধটা যেন একটু বেশিই হচ্ছে।
নিজেকে বোঝাচ্ছি, আসলে দুপুরবেলায় ছাদে রোদ পড়ে না তো ভালো, তাই আর কি!
 
তবু দুপুর হলেই এসে দাঁড়াচ্ছি ছাদে, হেঁটে বেড়াচ্ছি এদিক থেকে ওদিক।
 
আমগাছের আড়ালে সূর্যটা এখনও দাঁড়িয়ে। কেমন একটা কমলা ঘেঁষা হলদে রঙ। আমার খুব শখ ছিল, তোমাকে এরকম রঙের পাঞ্জাবিতে দেখবো...
ভোরের কুয়াশা এসে বসবে তোমার কাঁধে আর পায়ের নিচে লুটোপুটি খাওয়া ঘাসগুলোকে দেখাবে আরও সবুজ।
 
এসব ভাবতে ভাবতেই সন্ধ্যেটা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ছাদের উপর। শীত বোধটাও বেড়ে যাচ্ছে হঠাৎ করে।
 
আমি আরও কিছুক্ষণ দাঁড়াবো কি দাঁড়াবো না ভাবছি, এমন সময় দেখি, তুমি দাঁড়িয়ে আছো কোনো এক গাছের গায়ে হেলান দিয়ে। কোমরে জড়িয়ে নিয়েছো অন্ধকার যেটা নেমে এসেছিলো তোমার হাত আর উপরের হাতে। তুমি একটা একটা শুঁয়োপোকা ধরছো আর বসিয়ে নিচ্ছো পিঠের উপর।
 
তারা সবাই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে গহীনঘরে, আর বেরিয়ে আসছে সারা গায়ে রং মেখে। এতদিন বুকে ভর দিয়ে হেঁটে চলা প্রাণগুলো ডানা মেলছে একটু একটু করে, উড়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। তুমি তাদের পথের গতি দিচ্ছো, কিংবা, তাদের দেখিয়ে দিচ্ছো গতির পথ।
 
আমি একটা আস্ত মেটামরফোসিস দেখছি চোখের সামনে।
 
আরও দেখছি, তুমি আমাকেও বসিয়ে নিচ্ছো পিঠের উপর, আমিও লুকিয়ে পড়ছি গহীনঘরে, বেরিয়ে আসছি ডানা নিয়ে।
 
তবে উড়ে যাওয়ার আগে, আমি শুধু তোমাকে বসিয়ে নিচ্ছি
আমার ডানার উপর।
আমার সমস্ত ব্যাধির উপশমের উপর।
 
 
৩.
(০৫/১২/২০১৯)

 
একটা তারা এই সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠলো।
এখনই হয়তো ছোট্ট ছোট্ট টলমল দুই পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইবে। কিংবা, মুখে আঙুল দেওয়ার জন্য প্রচন্ড জেদ ধরবে। যদিও এসবের কিছুই আমি ভাবতে চাইছি না,
 
কিন্তু এগুলো অদ্ভুতভাবে ভাবাচ্ছে আমাকে।
 
ভাবাচ্ছে গলা-অবধি অন্ধকারে ডুবতে থাকা আকাশের কথা, নোনা গন্ধে রোজ ভিজতে থাকা বাতাসের কথা আর রোদ্দুর!
 
আহা, কতদিন দেখা হয় না তার সাথে!
 
চারদিকে শুধু জল আর জল। হঠাৎ মনে হল, বাড়ি থেকে বহুদূর চলে এসেছি। সেই যে ক্লান্ত নোঙর মুখ ফেরালো, আর অমনি, স্রোত এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল আমায়।
যতদূর এই নোনা জল-হাওয়া গড়াবে, যতদূর এই ঢেউ ছুটবে, যতদূর যেতে পারলে সমুদ্র পাশ ফিরে শোবে, আমি জানি আমি ভেসে যাবো।
 
তারা সবাই ফিরে গেল, আলো থাকতে যারা এসেছিল। তখন মাঝি-মাল্লার গান ছিল, বৈঠা টানার শব্দ ছিল, ছিল নিজেকে ব্যস্ত রাখার একটা ছেড়ে আরেকটা অনুষঙ্গ। এখন আকাশ কালো মেখে নিয়েছে অনেকটা।
 
ফলে একটা শূন্য তৈরি হলো। সেই সঙ্গে তাকে ভরাট করার একটা তাগিদ। অবশ্য দ্বিতীয়টা আমি টের পেলাম না।
 
আমি চোখ বুজলাম।
আমি এখানেই তোমাকে পাই। দৃষ্টিসীমার ওপারে। বারবার।
আলোতে তোমায় দেখা যায় না ভালো।
 
তুমিই তো আমায় অকূল দরিয়ার কূল এনে দাও, রাতের শেষে রোদ্দুর আর ব্যাধির মুখে উপশম।
 
তুমিই তো সারারাত বালিতে আঁচড় কেটে গেয়ে ওঠো,---
Somos el barco,
Somos el mar
Yo navego en ti, tu navegas en mi
We are the boat, we are the sea
I sail in you
You sail in me
 
আমি চোখ খুললাম। আকাশের হাতে একতারা। একটাই তারা।
আমি তাকে জাপটে ধরলাম বুকের মধ্যে।
 
এই তো আমার নিরাময়!
আমার আরও একবার জন্ম হল।