কবি দেবারতি মিত্রের সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন কবি শংকর লাহিড়ী। কবিদের নিয়ে তাঁর ‘এম বি রাজমহল’ ছবিতে।
 

“ঝুপ করে ডুবে গেল এক কুনকে বাসমতী চাল
পিটুলি বাটার রঙে গলে যাচ্ছে আবছা চিবুক
দুটি দেবীভুরুর তলায়  
টানা টানা শাঁখ বেয়ে গড়ায় অঝোর অশ্রু
সমস্ত পুকুর ঘোরে তোলপাড়
উথলোয় অহনা ঢেউয়ের শূন্য ...”

[শংকর]- বাঃ ! এগুলো কতদিন আগে লেখা ? মানে, অনেককাল আগে লেখা কি ?
[দেবারতি]-দেখে বলতে হবে তাহলে।
[শংকর]-এগুলো আপনার কাব্যসংগ্রহে আছে ?
[দেবারতি]-হ্যাঁ
- আপনার কবিতায় অনেক নতুন নতুন শব্দ পাই আমি। বা, নতুন শব্দ নয়, হয়তো শব্দগুলো পুরোনো, কিন্তু তার ব্যবহার নতুন। যেমন ‘সতিন’ কবিতাটায় আছে, ‘বুকের নিনাড় খোপে ঝিঁঝিঁপোকা মরে গেছে কবে !’  
- হ্যাঁ, ‘নিনাড়’ মানে হচ্ছে নির্জন।
- আরেকটা যেমন ‘ফিট’। ফিট গৌরবর্ণ। এটা একদম নতুন, আমি শুনিনি।
- ফিট গৌরবর্ণ মানে, পরিস্কার রঙ। এটা আমাদের দেশে বলে।
- মানে, কোন অঞ্চলে ?
- আমরা তো ঘটি, হুগলি জেলার লোক, চন্দননগর।
- মানে, খুব ফর্সা রঙ?
- হ্যাঁ, খুব ফর্সা।
- আচ্ছা, বেশ। তবে মণীদার দেশে, বরিশালে, একে কী বলে জানি না। আপনার জন্ম কোথায় হয়েছিল ?
- আমি তো সারা জীবন কলকাতাতেই কাটিয়েছি, জন্মও এখানে। আমি ছোটবেলায় ক্লাস থ্রি থেকে সিক্স অব্দি আমার মামার বাড়িতে থেকে স্কুলে পড়তাম। ডাফ স্কুলে।
- ডাফ স্কুলে ? আচ্ছা, আচ্ছা।
- আমি সেখানে ছিলাম, আর সেখানে একটা খুব বৈশিষ্ট হচ্ছে যে, আমার মাসি ছিলেন একজন গায়িকা। উনি রবীন্দ্রভারতীর প্রথম ব্যাচ। বাড়িতে সবসময় ধ্রুপদ, ধামার, রবীন্দ্রসঙ্গীত, শ্যামাসঙ্গীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদের গান। কোর্সে ছিল। খুব গানবাজনা ছিল ওই বাড়িতে। আমি সেইগুলো, সুরগুলো আমাকে যত না আচ্ছন্ন করতো, গানের বাণীগুলো আমাকে অবাক করতো। মানে, আমি শুনতাম সেগুলো, মন দিয়ে। আচ্ছা, আমার মামাও ছিলেন, তিনি করতেন কি, তাঁর ঘরে কবিতার আসর বসাতেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়া হোত, মোহিতলাল মজুমদারের কবিতা পড়া হোত, যতীন বাগচি। এমন কি সুধীন্দ্রনাথের কবিতাও আমি দেখেছি। মানে, শুনেছি আর কি। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ আমি তখনো শুনিনি।
- এগুলো সব ছোটবেলায়, স্কুলজীবনে?
- হ্যাঁ, ওই ক্লাস সিক্সে।
- বাঃ
- এগুলো সব শুনে শুনে, তারপর আমি বাড়ি চলে এলাম। টালিগঞ্জে আমাদের বাড়ি। নিয়মিত স্কুল কলেজে যেতাম না। কিন্তু আমি খুব নিঃসঙ্গ হয়ে গেলাম। নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি এই কারণে যে, আমি স্কুলে গেলে লোকে আমাকে ঠাট্টা করতো আমি খুব মোটা ছিলাম বলে।
- তাই ?ভাবা যায় না !
- হ্যাঁ। আমি তখন বইটই পড়তাম।
- সেই সময়ের ছবি আছে ?
- হ্যাঁ, আছে। তারপরে, তখন নিঃসঙ্গতাকে কাটানোর জন্যে নিজের খাতায় একটু একটু লিখতে শুরু করি। কবিতা হিসেবে যে লিখছি, তা নয়, নিজের মনের কথাই লিখছি। যেহেতু এত সাহিত্য পড়েছি, শুনেছি, গানগুলোও তো সাহিত্য, উঁচুদরের সাহিত্য।
- তাই তো।
- বাবা আমায় ছোটবেলায় বুকে নিয়ে, তখন আমার বয়েস একবছরও হয়নি, অফিস থেকে এসে ইজিচেয়ারে শুয়ে আর আমাকে কোলে নিয়ে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা--
- সেই স্মৃতি মনে আছে ? নাকি এটা পরে শুনেছেন ?
- না, আমি শুনেছি। তখন অনেক কবিতা বলতেন, শাজাহান, আবির্ভাব, এই সমস্ত।
- এগুলো তখন হয়তো অবচেতনে একটা --
- হ্যাঁ, তখন অনেক কবিতা আমার শোনা হয়ে গেছে। সন্যাসী উপগুপ্ত, হোরি খেলা—এই সমস্ত। হয়েছিল কি, এত কবিতা শোনার ফলে, ঘটনাচক্রে আমার মনে একটা প্রভাব পড়েছিল। ছোটবেলায়। সকলের তো সুযোগ হয় না, এতটা আর কি।
- বাঃ। মণীদার সঙ্গে আপনার প্রথম দেখা কখন ?
- তখন আমার বয়েস পঁচিশ ছাব্বিশ বছর। আমার তখন অন্ধস্কুলে ঘন্টাবাজে বইটা বেরিয়েছে। ওঁর পরমা বলে একটা পত্রিকা ছিল। পরমাতে উনি (আমার বইয়ের) একটা রিভিউ করেছিলেন। তখন আমার স্বামী আমাকে দেখেন প্রথম। আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। মানে, লেখিকাকে আসলে দেখবার জন্যে।
- আচ্ছা, আচ্ছা। মানে, বইটা পড়ে ওঁর এত ভালো লেগেছিল যে,
- অন্ধস্কুলে ঘন্টা বাজে পড়ে ওঁর ভালো লেগেছিল।  
- হ্যাঁ, তাই উনি লেখিকাকে দেখবেন বলে বাড়িতে এসেছিলেন।
- মানে, হয়তো তাই। এসেছিলেন তো।
- বাঃ।
- সংখ্যাটাও দিয়ে গিয়েছিলেন, পরমার। আমি তো আর বাড়ি থেকে খুব একটা বেরোতাম না।
- এটা কোন সময়, কোন সাল ? মনে আছে ?
- তখন আমার পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়েস। আমাদের বিয়ে হয়েছে ’৭৫ সালে।
- উনিশশো পঁচাত্তরে। তার অনেক আগে ?
- হ্যাঁ, অনেকটাই আগে, অন্ততঃ চার পাঁচ বছর আগে।
- বাঃ
- সত্তর একাত্তর সাল হবে।
- দুজনে মিলে কোথাও বেড়াতে গেছেন ?
- বিয়ের পরে ?
- বিয়ের পরে, বা বিয়ের আগে।
- বিয়ের আগে যাইনি। বিয়ের পরে গেছি, যেমন লোকে যায়। পুরী গেছি, তারপর মুসৌরি গেছি।
- আচ্ছা।
- এই সমস্ত। পাঁচমাঢ়ি গেছি।
- পাঁচমাঢ়ি। বাঃ । তখন কবিতা লিখেছেন। দুজনে মিলে কবিতা পড়েছেন। কোনও সুখস্মৃতি ?
- সুখস্মৃতি আর কি, সবটাই। খুবই ভালো লাগতো। ওঁর সঙ্গে তো প্রথম দিকটা খুব বেশি কবিতার কথাই হত। সংসারের দিকটা আমিও ওঁকে বলতাম না, উনিও মাথা ঘামাতেন না।
- উনি তখন কোথায় থাকতেন ?
- তখন হিন্দুস্থান পার্কে থাকতাম আমরা।
- আচ্ছা। ওঁর ফৌজি জীবনের অনেক পরে।
- অনেক পরে। তারপর উনি ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্ণমেন্টের চাকরি নিয়েছেন।
- তারপর মধ্যপ্রদেশেও তো ছিলেন কিছুদিন।
- সে অনেক আগে।
- ফৌজ থেকে ফিরে গেছিলেন সেখানে।
- হ্যাঁ।
- খুব সুন্দর। এখন কি লেখালিখি আসছে কিছু?
- লেখালিখি একটু আধটু আসছে কিছু। আর আমার স্বামীর উপন্যাসসমগ্র বেরোচ্ছে। অবভাস- তারা বলেছিল ভূমিকাটা আমাকে লিখতে। আমি বলেছিলাম পারবো না, কিন্তু জোর করতে লাগলো। তো আমি লিখেছি ছোট করে একটা। উপন্যাস সমগ্রের একটা ভূমিকা।
- কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে?
- কবিতা খুব অল্প। স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারছি না আমি। এত কষ্ট হয় আমার স্বামীর জন্য আমি লিখতে পারছি না।
- হ্যাঁ, একটা একাকীত্ব। এই সময়টা আপনার কী করতে ভালো লাগে ? চুপচাপ বসে থাকতে, প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকতে ? স্মৃতি রোমন্থন ?
- কিছু ভালো লাগে না আমার। বুঝতে পারি না আমি কী করে দিনগুলো কাটাবো।
- একা থাকতে ভালো লাগে ? নাকি কোনও লোক এলে-
- লোক এলেও যে খুব একটালঘু হয় তাও নয়। একাও থাকতে পারি না। ৩১ শে জানুয়ারি তিনি মারা গেছেন, তারপর থেকে কিছুতে আমি এক মিনিটও স্থির হতে পারছি না।
- কিন্তু মনে মনে তো তাঁর সঙ্গে একটা যোগাযোগ সবসময়ে রয়েছে।
- সেটা কি থাকে ?
-হ্যাঁ, থাকে। মনে মনে যোগাযোগ থাকে। মনে মনে আছে মনে করলেই থাকে। নেই মনে করলেই থাকে না।
- সবটাই তো আমার কল্পনা, না?  
- হ্যাঁ, সবটাই।
- কোনওদিন তো তাঁকে দেখতেও পাই না, তাঁর গলাও শুনতেও পাই না।
- আমাদের অস্তিত্বটাই তো একটা কল্পনা।
- সেই বড় কষ্ট হয় আমার। আমরা সাতচল্লিশ বছর একসঙ্গে আছি। সেইজন্যে এখন যেন আমার আর কিচ্ছু নেই জীবনে।
- ওঁর লেখা পড়তে পারেন। নতুন করে অক্ষয় মালবেরি।
- ওঁর লেখা পড়ি। তখন যেন কষ্টটা আমার আরো বেড়ে যায়। পড়ি, মাঝে মাঝে কবিতা পড়ি, মালবেরি পড়ি, গদ্যসংগ্রহ পড়ি।
- এই যে অবস্থাটা যাচ্ছে, এটা খুবই স্বাভাবিক। এবং এটা আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠবেন, একটা নতুন উদ্ভাস আসবে, একটা নতুন আশ্রয় পাবেন আপনি। মনই তৈরী করে নেয়।
- হয়তো তিনিই করে দেবেন।
- তাই। রবীন্দ্রসঙ্গীতে অনেকে আশ্রয় নেয় এই সময়ে। আপনার কি ভালো লাগে কোনও রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ?
- সেরকম আর ভালো লাগে না। আগে যা লাগতো, সেরকম আর কোনটাই ভালো লাগে না।
- একটা অস্থিরতা, একটা চাঞ্চল্য ভেতরে। তাই না?
- ভয়ানক অস্থিরতা।
- বুঝতে পারছি। আজকে যারা লিখছে, তাদের জন্যে কিছু বলতে চান ? তরুণদের জন্য ?
- আমি আর কি বলবো। তবে ছোটবেলা থেকেই কবিতা ভালো লাগার ব্যাপারে একটা আমি ভাবি যে, মৌলিকত্ব। এবং প্রথানুগত্যহীন। এমন কি যা খুশি তাই লিখুক, কিন্তু পুনরাবৃত্তিমূলক লেখা আমার একেবারেই ভালো লাগে না। তাতে যদি একটু অবিন্যস্ত হয়, একটু উচ্ছৃঙ্খল হয়, হোক। কিন্তু একই লেখা আমার ভালো লাগে না, ছোটবেলা থেকেই।
- ঠিকই তো।
- কতটা করতে পেরেছি, সেকথা নয়, আমার ভালো লাগাটা বললাম।
- আর লেখা তো অনেক রকমের হয়। তার অনেক রকমের পাঠকও হয়। যে লেখা পড়ে আমার ভালো লাগছে, তার হয়তো সেটা লাগছে না। আবার যা আমার ভালো লাগছে না, তারও অনেক পাঠক আছে।
- হ্যাঁ। সেই তো।
- ফলে, যত মত তত পথ, নানাভাবেই লেখা যায়। তবে আপনি যা বললেন, পুনরাবৃত্তি, সেটাকে এড়িয়ে চলতে হবে।
- আমার ভাল্লাগে না, ছোটবেলা থেকেই ভাল্লাগে না।
- তাই তো।

debarati-mitra

দেবারতি মিত্র