"একটা আবছা রঙের প্রজাপতি উড়ে যায় আকাশের দিকে" - আকাশের দিকে চোখ রঙিন প্রজাপতির অপেক্ষায়। প্রতিটা মানুষ নির্জন দ্বীপ যখন, আমি তখন  নিমগ্ন  কবি তাপস দাসের তৃতীয় কবিতার বই "মৃত্যুতে ছায়া থাকবে না "পাঠে।  যা  পাঠকে জন্মকথার থেকে জন্মান্তরের অভিন্ন ঘোরের মাঝে নিয়ে যাবে। যেমন কবি বলছেন  "তুমি এই রোদটুকুর জন্য গর্ভবতী হও" ( হৈমন্তী) আবার
কবি চাইছেন - " তোমার স্তনের ভেতরে একদিন ঘুমোতে যাব  [ এত নরম কেন ]। ' শ্মশানের মতো ' শুনশান হয়ে গেছে এই জনবহুল  'বিকেল' । আবার এভাবেও বলা যায়  'শ্মশানের মতো' মুক্তির আস্বাদন পবিত্রতা প্রিয়জনের কাছে পেতে চাইছেন । একদিকে বসন্তের 'শিমুল' পলাশের লাল রঙ অন্যদিকে মৃত্যুর কড়াল রঙ গ্রাস করছে । তাই কবি " মৃত্যু শব্দটিকে ঝুলিয়ে দেব শিমুল ফুলের পাশে..."  [ এত নরম কেন ]।

কবি তাপস দাস  তাঁর কবিতায় মৃত্যু ও মৃত্যু চেতনাকে নতুন শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন । প্রতিটি মানুষের মধ্যেই মৃত্যুবোধ ও মৃত্যু চেতনা থাকে ।  কিন্তু এই বইটিতে কবি ঠিক মৃত্যু বলতে এই  নশ্বর দেহের  বিলীন হয়ে যাওয়াই শুধু বোঝায় নি যেন।  তাকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।  যদিও নামকরণ পাঠক মনকে এককেন্দ্রিক ভাবনায় আবিষ্ট করবে।  এখানেই একজন কবির উত্তোরণ।     

কবি তাপস দাস "সবখানে কবিতা" লিখতে চেয়েছেন, সে তাঁর ' মৃত শরীরের ' জন্য লিখবে ।  তিনি চাইছেন তাঁর আত্মা বাইরে এসে কবিতা পড়বে । কবি থাকবে না কিন্তু তাঁর কবিতা থাকবে । কবি তাঁর  কবিতায় বেঁচে থাকে । প্রত্যেক শিল্পী তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকেন । এই দেহ নশ্বর - কবিতা আত্মার মতো অবিনশ্বর - কবি বিলাপ করছেন  " আত্মার মুখে এই নশ্বর হাতের কবিতা কেমন শোনাবে / আত্মার আলোয় কেমন চকচকে দেখাবে সেই কবিতা " [ আনন্দ ] । এই তরুণ কবির প্রথম কবিতার বই "ঈশ্বর পেয়েছি একবুক " ও দ্বিতীয় কবিতার বই " ভাতের কস্টিউম" পড়লে কবির পরিবেশ,  বেড়ে ওঠার যে উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ দৃশ্য ও পরিবারের দায়বদ্ধতা মায়ের প্রতি যে আত্মিকযোগ তা পাঠক পাবে।  এই বইয়েও তার ব্যতিক্রম নেই " হৃদয়ে মা আর দুঃখ থাকেন, দুঃখের একটা স্যাতস্যাতে ও তেলচিটে গন্ধও থাকে"(প্রলাপগুচ্ছ)।  কিন্তু এই বইয়ের  মধ্যে দিয়ে নতুন কাব্যস্বর তৈরি করেছেন ।  দেখার মধ্যে দৃশ্যকল্প পরিণত হয়ে উঠেছে।দরিদ্রতা ফুটে উঠেছে " ভালোবাসার পেটে তুমি উনুন খুঁড়েছ / ওমে সেদ্ধ হচ্ছে আলুভাত" (প্রেমিকা বিলাস)।  
 শোনা ও দেখার মধ্যে যে স্পেশ তা পরস্পরের মিলনে  যে ধাতুরূপ জন্ম  হয়  তা কবির ভাষায় " ফুল গাছের পাশে কিছুটা নরম মেঘ  এসে দ্বিখণ্ডিত হল / তোমার শোনা শব্দটি দেখা শব্দটি জড়িয়ে তলিয়া গেল!"(হে প্রেম)।  

এই যে এক শূন্যতা এক পরিসরের বিস্তৃতি আরও পাওয়া যায় - " শুধু ভাবছি, আর দুঃখের পৃথিবী থেকে একহাত উঁচুতে  বসে থাকছি ..." [ আনন্দ ] ।এই বিস্তার যে শেষ নয় তা এই তিনটে ডট দিয়ে বুঝিয়েছেন । একটা স্পেশ - দৃশ্য ও অদৃশ্য বস্তুর মধ্যে । এই  এক  অমোঘ শূন্যতা । এই শূন্যতা বাস্তবতাকে অতিক্রম  করে অধিবাস্তবে নিয়ে গেছেন - সেখান থেকে ' দুঃখগন্ধ ' ছিটিয়ে দিয়ে আবার বাস্তবে ফিরতে চাইছেন - " আবার, আবার ফুটে ওঠে জগৎফুল..." [ আলো নিভিয়ে গান ]।

"  রক্ত পড়ছে / আমি কিছুতেই ব্যথা পাচ্ছি না ... " [ আনন্দ ]  - এই উদাসীনতা কিসের - নিজের প্রতি ! কেন নির্লিপ্ত কবি ? তবে কী কবি চাইছেন যা সৃষ্টি হয়ে গেছে তার শেষ সেখানেই । তাকে নিয়ে ভাববার আর কিছু নেই , তার ছায়া মানে প্রভাব যেন না থাকে । কিন্তু কবি নিজেই নিজেকে লঙ্ঘন করছেন । কবি দ্বিচারিতা করছেন নিজেই নিজের সাথে । কবি তাঁর আত্মজাকে দেখতে চান - " এই অল্প রোদ আর গাঁদাফুলের দিকে তাকিয়ে থাকো / আমরা একটি মেয়ের জন্ম দেব ..." [ হৈমন্তী ] কবির কল্পনাতে কবি মেয়ে সন্ত্বানের জন্ম দিতে চাইছেন । এই  'মেয়ে ' - নারী - প্রকৃতি । হেমন্তকালীন ধান  তাকেও তো হৈমন্তী বলে । তাই কী কবি তার 'সুগন্ধ নাও, সুগন্ধ ধরো / হৈমন্তী জন্মাবে। [ হৈমন্তী ] আবার  পাঠক দেখতে পাবে এই কবিতার মধ্যে দিয়ে কবি চেতনায় ইলেকট্রা কমপ্লেক্স  কাজ করছে ।  এ যেন এক বাঁচার তাগিদ । সমস্ত গ্লানি মুছে ( গ্লানির ছায়া মুছে ) ভোরের স্বপ্ন ।  দূষণ , রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক , সামাজিক দুরাবস্থাকে  নিঃশেষ করে নতুন দিনের নতুন প্রকৃতির স্বপ্ন  দেখেছেন পাঠকে দেখাতে চাইছেন ।
অর্থনৈতিক পরিকাঠামো আমাদের দেশের যে কত দুর্বল তা পরিস্ফুট হয়েছে কবির বেশ কিছু পংক্তিতে - " এই দ্রারিদ্রতা শুকোতে দেব, আর " [ এত নরম কেন ]  "অভাবের হাতপাখায় করে ফুসফুসে ভরে নাও বিশ্বাস ..." [ হৈমন্তী ] - পরের পংক্তিতে ' বিশ্বাস ' শব্দটি যে মানুষ ও সমাজের মধ্যে থেকে উঠে যাচ্ছে তারই দৃষ্টান্ত বহন করছে । এই অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় কবির দৃষ্টিতে ' সুখ' এতো সীমিত যে " সুখ আর  শরীর দুহাতে তুলে ওজন করি ..." [ আলো নিভিইয়ে গান ] ।

মেটাফিজিক্যাল ভাবনায় বিশ্বাসী কবি বলছেন  মৃত্যুই  চরম বা চূড়ান্ত রূপ নয় । কবির জীবনের প্রতি প্রেম এবং তার জীবনে প্রেমিকার সাথে রোমান্স , দর্শন - একাত্ম হয়েছে । তাইতো কবি কখনো জাতিস্মর ,  তাই কবি মৃত্যুর পরে পুনঃজন্মে   ফিরবে প্রেমিকার কাছে । আবার কখনো দূর থেকে আতিজাগতিক হয়ে দেখবে গতজন্মের  ফেলা আসা স্মৃতিকে । " কী হারিয়ে গেছে কাঁদছ কেন? " / ... " ভীষণ যাদুঘর হয়ে যাচ্ছি আমি "  / ... ঘাসের/ আগায় আমার পূর্বজন্মের সুখ টলমল করে জ্বলে ! [ তুমি কি আসবে ]  - কবি এখানে জাতিস্মর । তাঁর মৃত্যুর পর পুনঃজন্ম হয়েছে  এবং তিনি দেখতে পাচ্ছেন । আবার অতিজাগতিকতার থেকে তিনি পাখিদের থেকে জেনে নিতে চাইছেন তাঁর গতজন্মের কথা " একদিন পাখিদের মন এসে বসুক /  পাখিরা হয়তো গতজন্মের কথা জানে " [ পাখিদের মন ]

Ironically কবি তার ঠাকুমার বাল্যজীবনের প্রেমকেও সুন্দর তুলে ধরেছেন । যেখানে কবি নিজের প্রেমের " জ্যোৎস্না" আবার " বানানহীন চাঁদ " কে রোমাঞ্চকর  করে তুলেছেন । এ জীবন এ দেহ যে " মাটির " - কবির ভাষায় - " মাটির ঘরে ঘুমালে কী ভীষণ মাটি হতে হয় !"[ তুমি কি আসবে ] "তাদের প্রেম মাটির সাথে মিলিত হবে - কবি তাই তার প্রমিকাকেও ডাকছে '" তুমি কি আসবে এভাবে / প্রতিটা চুম্বন বানান বিধি হবে..."[ তুমি কি আসবে ]  । এই 'বানান' কীসের সংকেত ! পাঠক যেন প্রেমের  প্রতিটা বর্ণপরিচয় পাঠ করছে নিজের মত করে ।

এই লেখা পড়তে গিয়ে আমার পাঠক মনে " ও তোর মাটির দেহ মাটি হবে , / পুড়ে হবে ছাই / এ দেহ পচা দেহ / গরব কিসের ভাই " - বাউল গানটি মনে পড়ে গেল । কবিও গান শুনছেন  " আলো নিভিয়ে গান শুনি / ধ্যানে মগ্ন জ্যোতির মতো কাঁপি " - [ আলো নিভিয়ে গান]  । এখান থেকেও দেহতত্ত্বের সন্ধান উঠে আসে ।

কবির গ্রাম্য জীবনের চলন দর্শন তাঁর প্রতিটি কবিতায় ছত্রে ছত্রে ছাপ ফেলেছে । উত্তরের জলবায়ুতে যে কুয়াশা বেশি সেই 'কুয়াশা', 'শীত', 'তিসিখেত','চিচিঙ্গা', 'জিগার গাছ' উঠে এসেছে। কখনো কখনো এই প্রেম যেন সাহসী চূড়ান্ত পরিণতি চায় অথচ তা যেন বাস্তবকে অতিক্রম করে অতিবাস্তব ! - যেখানে " সে-ই একমাত্র মেয়ে যার ঠোঁটের মাপে আমার নাম / তৈরি হয়েছে ।" [ঠোঁট ]তারপরেই কবি একটা " সাদা কাগজে " " আচ্ছা করে " এই 'আচ্ছা করে ' শব্দটাতে একটা তীব্রতা উগ্রতা কাজ করছে । 'ছাপ' ও 'বসিয়ে' শব্দ দুটির মধ্যে ডবল স্পেশ দিয়ে জোড়ালো করে তুলেছে , কাম 'লোভ'  ফুটে উঠেছে । যেন দাঁতে দাঁত চেপে কবি বলেছেন - " পাঠিয়ে দিতে । এক অলৌকিকতা । তিনি  " তার ওপর বাতাসা রাখব, মন্ত্র পড়ব ,/ পাখিদের গান মেশাব/ পচাপাতার মদ মেশাব, সব ..." ।

কবি তারপরেই ফিরেছেন নির্লিপ্ততায় " অপূর্ণ কবিতা, অনেকগুলো পাপ, / পুড়ে যাবে "
 

[ঠোঁট ]

 - 'লোভ ' , ভোগ তৃপ্ত হয়ে কবিতা যেন অপূর্ণ হয়ে গেছে । এই বোধ জীবন বোধ । তাঁর নিজের প্রতি পাপবোধ কাজ করেছে । কবির " প্রেম  বারবার বেঁচে উঠেছে " জিগার গাছের মত ..." [ প্রেমিকা বিলাস ] । ভালোবাসা একটা শুশ্রূষা  - ব্যঞ্জনায় ব্যাখ্যা করেছেন " ভালোবাসার ভেতরে সাদা পোশাকে তুমি"  [ প্রেমিকা বিলাস] এই 'তুমি' - তে কবি শুশ্রূষা পেতে চেয়েছেন " নার্সের " মতো করে সমস্ত শরীরে ও মনে ।
 কবি আবার নস্টালজিক হয়ে পড়েছেন ।  তাঁর ছোটবেলায় ' দিদি'  তাকে ' বর্ণমালা ' শিখিয়েছেন । গ্রাম্য চিত্রের মধ্যে এক আধুনিকতার ছোঁয়া কবিতায়- স্বতন্ত্র সত্তা কাব্য ভাষা তাপস সৃষ্টি করেছে - " ধানের মধ্যে দেখতাম কান মুছুরি ধ গোছানো আছে কি না! " [ প্রলাপগুচ্ছ ] যেন পাঠকে হাঁটু ভাঙা দ আর পেট কাটা ষ সুর করে পড়ার দিন মনে করিয়ে দেবে  ।

 " আবৃত্তিকারের মুখ থেকে তোমাকে এনে দেব হেমন্ত  ঋতু" - এই হেমন্ত ও ঋতুর  মাঝে আবার ডবল স্পেশ দিয়ে "ঋতু" শব্দটিকে কালোর্ত্তীণ করে , personified করে তুলেছে ।

কবিতায় অনেক লাইনে্র শেষে  '... ' ব্যবহার করেছেন কিন্তু সেখানে সেই লাইনের ব্যাপ্যতা নেই  । সেটা সেখানেই শেষ  সেদিকে নজর দিতে হতো । এবং কিছু কিছু কথা সরাসরি না বলে কবিতা যে আড়াল দাবি করে তাতে আবদ্ধ করলে পাঠক মনকে বাঁধতে পারতো আরো বেশি করে।  কিছু কবিতার নামকরণ নিয়ে আরো ভাবনার দরকার ছিল বলে মনে হতেই পারে। তবে কবি বলেছেন " এতো ভাবতে পারি না,  যখন যা মনে আসে লিখলাম, একটা নাম দিয়ে দিলাম।  কবিতা লেখার পর আর সেটা নিয়ে ভাবি না।  সেটা সেখানেই শেষ। "
 প্রতি কান্নার আগে বলি একটি হৃৎপিণ্ড এঁকে দে কেউ / মাটির... " [ মাটির হৃৎপিণ্ড ] - কবি ও কবিতা যে সমাজের প্রতি দায়বব্ধ সেই জায়গা থেকে কবি উত্তীর্ণ হয়েছেন । কবি মন গ্লানিময় সময়ের ছায়া মুছে মাটির মতো স্বচ্ছ পবিত্র নরম পৃথিবীর স্বপ্ন দেখছেন পাঠকেও দেখিয়েছেন , তাই তিনি এই মৃত্যুতে ছায়া দেখতে চান নি । এ মৃত্যু আপেক্ষিক এ মৃত্যু যেন এক কালের অবসানে  নতুন সূর্যের অপেক্ষা। পবিত্র সৌমতা  নিয়ে আসার কথা বলেছেন ।  কবি আফশোশ করছেন ' এই বোধ প্রতিটি অঙ্গে পৌঁছে দিতে পারি না " ...
কবি তাপস দাসের ১২ টি কবিতা নিয়ে " মৃত্যুতে ছায়া থাকবে না "  বইটি পাঠক মনে নিজস্ব সত্তায় নিজস্ব কাব্যভাষায় ভাঙা - গড়ার মধ্যে দিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছেন ও দেখেছেন ।কবিতা আশ্রম ২০ জন কবির বই করেন এবং এই ২০ জন কবির বইয়ের সংকলনটির নাম   "পাখির চোখ " রাখেন। তাই এই বইগুলির প্রত্যেকের প্রচ্ছদ এক।  তাই এক্ষেত্রে আলাদা করে প্রচ্ছদ নিয়ে কিছু বলার নেই।    কবির ভাষায় শেষ করি -  " কেউ আমাকে একটা মাটির হৃৎপিণ্ড এঁকে দে "

মৃত্যুতে ছায়া থাকবে না - তাপস দাস
প্রচ্ছদ ফোটো - নিহাদ এন ওয়াজিদ
প্রকাশক  - কবিতা আশ্রম
মূল্য -৬০/-

boi-pora-Nayadashak-3


Tapash Das