পৃথক্করণ - বিচ্ছিন্নতা পর্ব ১

আমি সোফার ডান দিকের কোনে বসে আছি। এই কোনটা আমার প্রিয়। ওদেরও প্রিয়। অনেকটা মিউজিকাল চেয়ার খেলছি খেলছি মনে হয় এই কোনটা নিয়ে। প্রত‍্যেক সময়ই একটা বা তার বেশি বা তারও বেশি গল্প তৈরী হয়। সবচেয়ে বেশি যেটা মজার টিভিস্ক্রিনটাও কোনো এক মায়াবী মন্ত্রের টানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে এই কোনটার দিকে। সোফার সামনে একটা ছোট টেবিল ধূসর খয়েরী কার্পেটের ওপর। টেবিলের বেশিরভাগটা এই কোনে বসে থাকা মানুষটার আমার বা ওদের।

সোফার কোনে যে চওড়া আর্ম রেস্ট তাতে গরম চা ম‍্যাগির বাটি পাকা পেঁপের থালা আধ ভর্তি ছাই ঘট কালো মোবাইল সোনালী মোবাইল নীল গাড়ি ধূসর ডাইনোসর একের পর এক বদলায় ঠিক আমার আর ওদের মতো। বদলায় টিভি থেকে আসা আলোর গতিপথ।বদলায় শব্দ।

ক্লান্ত ঘরে এক একটা আলো নেভে। ডেবে যাওয়া সোফার কোনে পরে থাকে পজ্ এ থাকা কালো রিমোট।

পৃথক্করণ - বিচ্ছিন্নতা পর্ব ২

ঘরটায় তোর একচ্ছত্র অধিকার। নীল কালো ব‍্যাটম‍্যান চাদরে ঢাকা ছোট খাট রংপেন্সিল ছবি দেওয়া পর্দা দুদিকে সারি সারি খেলনার ঢিবি কম্পিউটার টেবিল বইয়ের আলমারি পড়ার টেবিল। সারা টেবিল জুড়ে বই খাতা কাগজ পেন্সিল পেন রং কাগজের নৌকো দলা পাকানো মডেলিং ক্লে বিস্কুটের গুড়োয় ওলোট পালোট।

ছুটির দিনে ছোট খাটটায় আধ ঝোলা হয়ে ছবি আঁকা বই পড়া থেকে কমপিউটারে খেলা করা। পড়ার টেবিলটার ওপর হুমড়ি খেয়ে এক মনে কিছু একটা করতে করতে মাটিতে শুয়ে শুয়ে ডাইনোসরের মারামারি সিকোয়েন্স তৈরি সবই তোর ঐ ঘরটায়। আমাদেরও যাতায়াত আছে তবে প্রয়োজনে। তোকে পড়াতে কম্পিউটার শাট ডাউন করতে আলমারি থেকে বই বের করতে বা তোকে অন‍্য ঘরে দেখে সিগারেট খেতে।

কয়েকদিন হলো তুই ঐ ঘরে যাস প্রয়োজনে ঠিক আমাদের মতো। তোর ওলোট পালোট টেবিল পরিষ্কার হয়েছে। বই খাতা কাগজ পেন্সিল পেন রং এখন কেবিনেটের ভিতর। কাগজের নৌকো দলা পাকানো মডেলিং ক্লে কোনো এক বাক্সবন্দী। ঠিক অন‍্য ঘরের জিনিসপত্রের  মতোন। টেবিলের ওপর এখন ভারী বড় ল‍্যাপটপ মাউস তার হার্ডডিস্ক হেডফোন অ্যাশট্রে। পাশে রাখা দুটো বড় বড় মনিটর। ঘরের দরজা এখন আধ বন্ধ। তুই ঐ ঘরে ঢুকতে গেলে দরজায় টোকা দিয়ে বলিস বাবা আসবো?

পৃথক্করণ - বিচ্ছিন্নতা পর্ব ৩

ভেবে দেখলাম তিনজনে একসঙ্গে একজায়গায় একটানা সবচেয়ে বেশী সময় কাটাই ঐ বিছানায়। অনেকটা গল্প কিছুটা বকাবকি শেষে তোদের দুজনের ঘুম নিশ্চিত করে খালি পাশটায় একটা বড় পাশবালিশ রেখে আমি আমার প্রিয় সোফার কোনটায় গিয়ে বসি। কোনো একটা বা দুটো বা তার বেশি বিষয় একই সঙ্গে চলতে থাকে। ক্লান্ত হলে ফিরে আসি বিছানায় পাশবালিশের জায়গায়। রোজ রাতে।

টানটান বিছানায় তোর একপাশে আমি আর একপাশে বাবা। অভ‍্যাস হোক বা সূক্ষ্ম রাজনীতি তুই যারদিকে ঘেঁষে শুয়ে থাকিস অপরজন আমি বা তোর বাবা আমাদের হাতটা তোর গায়ে দিয়ে তোকে একটু নিজের দিকে টেনে নিই। তোর গায়ের চাদর সরে গেলে তোর বাবা বা আমি চাদরটা ঠিক করি। রোজ ঘুমন্ত রাতে।

সেদিন কোনো একটা খবর পড়ে বা শুনে জানলাম নিজেদের মধ‍্যে দূরত্ব রাখতে বলছে। বিছানায় ঘুমোনোর আগে ঐ গল্পের সময়টায় এটা নিয়ে আলোচনা হলো। তুই বলেছিলি তাহলে তুই একা শুবি। আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল। রাতটা রোজকার মতো ছিলোনা। আমি বকাবকি পর্ব একটু আগে ঐ গল্পের সময় সেরেছিলাম।

পৃথক্করণ - বিচ্ছিন্নতা পর্ব ৪

আমাদের বাড়ি যা আদপে একটা ফ্ল্যাট যা আদৌ আমাদের নয় যেখানে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে মাসিক ভাড়ার বিনিময়ে সেই বাড়ি আমার শহর বলে যাকে জানি যাকে ঘিরে উত্তরাধিকার বোধ জোরদার তার থেকে প্রায় দুইহাজার কিলোমিটার দূরে। তিন বছরে এই দূরত্ব বেড়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বা তারও বেশি। ইতিমধ্যে তিন বছরে আমি আমাকে যাওয়াআসা আর আসাযাওয়ার মাঝের সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। বোধহয় সক্ষম হয়েছে ওরাও। নিজেকে একটু দূরে‌ রেখে দূর থেকে দেখে নেওয়া চারপাশ। এইটুকুই যা বিচ্ছিন্নতা গুটিকতকের।

কখনো কখনো বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ঐ আসাযাওয়ায় সামিল হয়। কারোর কারোর সঙ্গে কথা হয় দেখা হয় ভিডিও কল করে। বিচ্ছিন্নতাকে বেশ কায়দা করে কালো প্লাস্টিকে মুড়ে আমিও সময়ের আহ্লাদী। ঐ আহ্লাদ ছড়িয়ে দিই ওদেরও মধ্যে। সময় যায় আহ্লাদে মরচে পরে। মরচে পরে কালো প্লাস্টিকে। হলুদ কমলা মরচে কেমন গাঢ় হয়। আত্মীয় বন্ধু সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট নিউজ চ‍্যানেল দেশ রাজ‍্য শহর গ্রাম অঞ্চল পোশাক খাবার সর্বত্র সেই গাঢ় মরচে। কালো প্লাস্টিক ছিঁড়ে ফেটে বেরিয়ে আসা বিচ্ছিন্নতা।

আমরা এখন গুটিকয়েক এই বাড়িতে। কখনো আলাদা ঘরে কখনো একই। তোর চোখে বই টিভি কম্পিউটার মারি পোপ অসবোর্ন স্টিভেন কেলগ রোল্ড ডাল হয়ে মিয়াজাকি ছুঁয়ে ব্ল‍্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টু। তোর বাবা ঠিক তখনই ফোনে কারোকে কিছু বোঝাতে বোঝাতে ট‍্যাঙ্কের মাছগুলোকে রেফ্রিজারেটরে জমিয়ে রাখা ডিম সেদ্ধ গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে বড় ল‍্যাপটপটার স্ক্রিনের সামনে। তোর দিদুন গরম চা এর কাপ হাতে বিষণ্ণ টেবিলে একটু চিন্তিত নতুন কয়েকটা জামাকাপড় এখনও পরা হয়ে ওঠেনি বলতে বলতে উঠে এগিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে একটু দাঁড়ায় কিছু একটা বিড়বিড় করে এগিয়ে এসে আমায় বলে পড়ে থাকা কুমড়ো দিয়ে মিষ্টি বানাবে। আমার তখন এক হাতে মপ আর অন‍্য আধ ভেজা হাতের বুড়ো আঙ্গুল সরে চলেছে মোবাইল স্ক্রিনে। আমরা এখন একে অপরের সঙ্গে কথা আদান প্রদান করি নিজের কাছ থেকে নিজের একটু ব্রেক নিতে। আদপে আমরা সকলেই এই বিচ্ছিন্নতা উপভোগ করছি।

দেশ রাজ‍্য জেলা শহর গ্রাম অঞ্চল থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন। অন‍্য বাড়ি থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন। ওঘর থেকে এঘরে আমরা বিচ্ছিন্ন। সোফায় বসা আমরা বিচ্ছিন্ন খাওয়ার টেবিলে আমরা বিচ্ছিন্ন। আমাদের বিষয় বিচ্ছিন্ন। আমাদের একে অপরের স্পর্শে এখন স‍্যানিটাইজারের পর্দা।