গণ্ডগ্রাম

গণ্ডগ্রাম—ছোট ও সরল, তার মেঘ নীরবতার মতো কোমল, তার রোদ হেমের মতো তথাগত, তার ছায়া জননীর মুখের মতো মায়াপথ—তার বাঁশঝাড়ের বিস্তীর্নতার কাছে রেখে আসি পাতাঝরার হাওয়া, বহুদূর রোজার নিয়ৎ; তার বনদেবী হৃতসর্বস্বের সম্বল—

গণ্ডগ্রাম—সরু রাস্তার মাঝে মাঝে খোশকার গাছ, পাতায় কাঁপতেছে কষ, আড়ার মাঝখানে দুপুরের গোলাপী শূন্যতায় পড়ে আছে কবেকার পাতা, কে এসে সুড়ে নিয়ে যাবে সেসব, পূরবী বাতাস, বিষণ্নতার তারাসহচর—

গণ্ডগ্রাম—তার বকরিরা খুর দিয়ে আলো ভাঙে বিকালের, তাদের চোখে উপচে পড়ে নির্বাক দশদিকের কথা, ধুধু পিতরাজবনে ঘুঘুদের ডাক উড়ে আসে শস্যদানায়, পিতারা ক্রমশ মসজিদের দিকে যেতে দোয়া করে সন্ততির ভাষায়, যেন নীরবতার সমস্ত শরীর একদিন জড়ো হয় মাটির তলায়, গোরের দিগমণ্ডলে—


কররেখাগুলো

রাস্তাটায় রোজ বিকালেই যাওয়া হতো। একজন জুতাসারানিকে  দেখতাম চামড়া কেটে কেটে ভরাট করছে সময়—যেন ফুলেরও পা থাকে—তাদের হাঁটায় সাঁকো পেরোতে হয় কিনা জিজ্ঞাসা করি নি কোনোদিন। কেননা সব দুপুরই মনে হয় জাতিস্মর—

ছবির পেছনে যে ঘুম সে-ও গেরস্থ জামরুলের পোট্রের্ট। যেন তোতলা গাছটার হাওয়ায় প্যাগোডা লিখছে কেউ—

একদিন সেই লোকটার ভেতর বসে বসে জুতা সারাচ্ছে আরেকটা লোক, আর তার কররেখাগুলো মুছে যাচ্ছে আমারই স্যান্ডেলের ফিতায়—


মীরা

সেই যে মীরা নামের মেয়েটা—রজনীগন্ধার টানে হঠাৎ সন্ধ্যা হয়ে উড়ে গেল গণ্ডগ্রামের ধানখেতে। আকাশ পেরিয়ে দিন দিন তিল হয়ে যায়, আর সেই কালোর দূরত্বে কিছু গাছ একা। তটরেখা বদলের ভাষায় কথাও নদীর সমান—

জানা যাক, কে তাকে প্রথম দেখেছিল এই ফুলে, এই হাওয়ানো আলোয়। বুকের পড়শি বেয়ে কে তবে প্রথম মীরা!

শেকড়ে লাগছে মাঠ। জানু উপচানো শীত। তবুও দরজায় কিছু কিছু মেহগনি সেরে তুলছে পাতা। মীরাকে এভাবেই চিনে নেওয়া যায়:—গাছেরা হাওয়া সাজিয়ে দূর অস্তের মায়া তবুও সাইকেলবেলায় কোনো কোনো ঘর বেলের শব্দেই আলো—তার ডাকঘর, তার টুঙটাঙ, যেন সমস্ত চেনায় মীরা বইছে—


পাতা

পাতা, তুমি কার কথা বলো! এই যে অগ্রহায়ণ! স্রোতে মাছ ভেসে যায়, উপরে কুকুর বসে একা দেখে জিভের দুই পাশে মাছরাঙা পাখিদের ওড়া দ্রুত ঢেকেছে হাওয়ায়—কারা আজ মৌন আয়াতের নিচে জেগে থাকা রাত্রিকেশর নিস্তব্ধে পাঠিয়েছে ভুলে—তাদের শব্দ শুধু ক্রুর হতে হতে অরণ্যের হিম আলেয়ায়  মেশে সহস্র কাঞ্চন-রোদে তবু সন্তাপ ধ্বনিত হয় সারাদিন পিতার কামলা-ভরা গানে—  

এই মুখ বারবার কাঁপে দূরের বাতাসে, যেন অভিজ্ঞান ধুলার অযোগ্য—তাই পায়ে হাঁটা পথ ফিরে যায় অজ্ঞাতে—যে চোখ শব্দ নয় বসন্তের সেখানে অসংখ্য ফুটে আছে কামরাঙা ফুল, শিরাসহ উড়ে যাও পাতা নিঃসঙ্গতার দিকে—   


রেলইয়ার্ড

কে যেন ভুলে গেছে হরিণার চর—রেল ইয়ার্ডের ধারে সমস্ত দিন একটা কপাট নড়ে যায়—ওপারে নাকফুল, মোরগের কণ্ঠস্বরে বিরহগ্রস্ত এক দাহ আচমকা বেজে ওঠে সে কার ভেতর—

এই যে শোকের অবলুণ্ঠন—চলে গেলে, খোলা বইটাও আর নেভাতে আসবে না হাওয়া—কে যেন পায়ে পায়ে মেলে দেয় তালাকের স্মৃতি—বাতাসের ভাঁজ সরিয়ে দু একটা গরু চলে যাচ্ছে শাঁই শাঁই অন্ধকারের দিকে—স্টেশনে, কার যেন মুখ:—একবার ভেসে উঠে আবার ছড়িয়ে পড়ে কাঁপা কাঁপা ঢেউয়ের বনে—

কোথাও, তাসের সুরে ছুতারের হাসি খান খান করছে অন্ধকার


ডাকপথ

কীভাবে ফেলে আসি চিঠি! মেহগনি পাতার নিচে বসে থাকা হাওয়া উৎকণ্ঠায় চেয়ে আছে ডাকপথটার দিকে—

যেন ছায়া-কীর্ণ ওই বনগামারির ফাঁকে শত শত উড়ন্ত হারিকেন আলো ফেলছে ধুলাবিরহের পাশে—


মাঠ

বিশ্রুত কণ্ঠের পাশে আপারা স্নান সারে স্ত্রী-লোকের ঢঙে—