কবিতা লিখতে শুরু করার পর থেকেই সমালোচকেরা কিংবা কখনো কবি নিজেই নিজেকে একটি দশকে চিহ্নিত করতে চান।কখনো দেখা যায় অনেক আগে লিখতে শুরু করলেও তিনি পরবর্তী দশকের কবি বলে চিহ্নিত হন। সাধারনতঃ সমালোচকেরা একজন কবির বয়েস এবং তার লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ শুরুর সময়টাকে তার দশক হিসেবে চিহ্নিত করেন। একজন কবি কোন দশকের সেই পরিচয় তার কাছে কখনোই গুরুত্বপূর্ন নয়। তার লেখাই বিচার্য। তবু যে সময় তিনি বেড়ে ওঠেন ,যে পরিসরে তার কবিতার মানসভূমি তৈরী হয়,তাকে উপেক্ষা করা যায়না। সত্তর দশক আমার দশক। কৈশোরের আবেগ রোমান্টিকতা এবং সেই সময়ের আবেগতরল উচ্চারণগুলি  ভেঙে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলি যেন আমাকে নতুন ভাবে দেখতে শেখালো। সেই সময়ের নষ্ট করে ফেলা অনেক কবিতার মধ্যে একটিকে রেখেছিলাম আমার প্রথম কবিতার বইয়ে প্রথম পাতায়।

বশ্যতা

আমরা যারা বশ্যতা মেনেছি
তাদের প্রতিটি বিকেল কাটে নদীর নরম জলে
রূপোলী মাছের ছায়া খুঁজে

সুখে লিপ্ত হয়ে আছি
স্বপ্নে আজ আর মানুষ প্রসঙ্গ নেই
বরং সাদা আরবী ঘোড়া বারবার
নিয়ে যেতে আসে

তারা যারা বশ্যতা মানেনি
ডাক দিয়ে বলেছিল বুকের ভিতরে
কতকাল হাওয়া নেই

তাদের বুকের দেয়াল ভেঙ্গে
প্রতিদিন রক্তক্ষরণ
প্রতিদিন হাওয়ার প্রবেশ
( ম্যাজিক লন্ঠনঃআবর্ত প্রকাশনীঃ১৯৮০)

আজও আমি স্পষ্ট উচ্চারণে বলি- আমি সত্তর দশকের মানুষ।শুধু আমাকে নয়।সেই সময়কার সমস্ত মানুষের  মধ্যে তখনকার ঝড় এক পরিবর্তন এনেছিল। সমাজ সংস্কার সম্পর্ক সবকিছুর গোড়াতেই এক তীব্র ঝাঁকুনি অনুভব করেছিলাম।


স্মরণ সভা

কালো বেঁটে শহীদ বেদীর পাশে দাঁড়িয়ে
বৃদ্ধা বললেন-

আমার ছেলে ছিল ফর্সা লম্বা
হাসলে চোখের নীচ দিয়ে উড়ে যেত তিতির পাখী
আর গুলিটা
লেগেছিল ঠিক সেখানেই
(বরফঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ১৮৮৪)

 

ইতিহাস

১৯৭২

আমাদের জন্য ক্যারম স্ট্রাইকার নয়
আমাদের জন্য রাইফেল ট্রীগার
বলতে বলতে ইন্ডোর স্টেডিয়াম থেকে
কয়েকজন ছুটে গেল বাইরে

১৯৮২

তারা এখনও ফেরেনি
(বরফঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ১৯৮৪)

যখন ঝড় শান্ত হয়ে এলো, তখন রাজনীতিতে দেখা গেল এক বিচিত্র পরিস্থিতি। আদর্শবান কিছুকিছু মানুষের বাইরে ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকলো কিছু মানুষের সমাজবিরোধিতা।
সত্তর দশকের দেয়াল লিখনগুলি- “ পার্লামেন্ট শুয়োরের খোঁয়াড়” “বন্দুকের নলই শক্তির উৎস” গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো” মুছে গিয়ে বিপরীত স্রোত বইতে থাকলো।

 

চেয়ারপন্থী

তারা তাদের চেয়ারপন্থী বলে ঘোষণা করেছিল

চেয়ারের হাতল গদী কিংবা উচ্চতা অনুযায়ী
তারা বসতো আদেশ দিত এবং ঘুমিয়ে পড়তো

জল থেকে মাছ উঠে আসতো তাদের কাছে
ক্ষেত থেকে ফসল উঠে আসতো তাদের কাছে

এইসব গোপন গল্পগুলো কেউ কাউকে বলেনা
ফসল কেটে নেওয়া
ভেড়ী লুঠের খবর
(বরফঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ১৯৮৪)

 

দেওয়াল-১৯৮২

এই চিহ্নে
ছাপ দিন

লেখাটার আশে পাশে কোনও চিহ্ন আঁকা নেই
(বরফঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ১৯৮৪)

এতগুলি দশক পার হয়ে এসেছি।পেরিয়ে এসেছি আর একটি শতকেরও দুটি দশক। তবু মনে হয় আমার যা কিছু বিশিষ্টতা সত্তর দশকের বেঁচে থাকা থেকে পাওয়া। একে কি সংস্কার বলে? জানিনা।আমার কবিতায় পথচলা চিরকাল সময়কে সঙ্গে করেই।সবসময়ে সমকালকে ধরতে চেয়েছি। তবু মাঝেমাঝে লেখা হয়েছিল এইসব কবিতা।

 

কানাগলির মোড়

দড়ি জড়ানো ল্যাম্পপোস্টে চপারের দাগ
এখনও সেখানে বিন্দু বিন্দু রক্তঘাম দেখি

তুই ঠিক মরেছিলি তো রূপম
তেসরা এপ্রিল ঊনিশশো সত্তর বিকেল পাঁচটায়?

ওখানে এখনও তবে নিঃশ্বাস কেন কান্নাভেজা?
(তরুনতম কবিকেঃমহাদিগন্তঃ১৯৯৯)

 

কবরস্থান

গলিতে এত অন্ধকার
আর্তনাদেও কোনও ফাটল ধরেনি
মুক্তির দশক স্বপ্ন থেকে ছিঁড়ে এসে রক্তে ভেসেছিল
এ শহর রক্ষা করেনি তাকে

শতাব্দীর শেষে এখনও কেউ কেউ শোনে
মাটির নীচে পাশ ফেরার শব্দ
(কাচঘরঃমহাদিগন্তঃ২০০২)

হয়তো কিছু লোক এখনও অন্ধকারকে ভেঙ্গে আলোময় দিনের স্বপ্ন দেখে। কেননা
সত্তর দশক মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল।সেই স্বপ্নও তো মাঝে মাঝে ধরা পড়ে কবিতায়।

 

বাতিঘর

সকলেই চুপ করে যাবে
আর ছিলাটান সময় তৈরী করে আমাদের শুধু
গর্জন শোনাবে অন্ধকার
এরই জন্য ভেসেছিলাম বুঝি?

জনসমুদ্রে ডুবোপাহাড়ের খবরটা সত্যি
কিন্তু মিইয়ে যাবার মত নয়
আমরা জানি বিশেষ সময়ে আবার পাবো কোলাহল

বাতিঘরের স্বপ্ন ছাড়া নাবিক বাঁচেনা
(লক্ষ করার বিষয়ঃমহাদিগন্তঃ১৯৯০)

কবিতার বিচারে কবিতার উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে তার রচনা শুরুর কালটা বিচার্য কিনা জানিনা। তবে একজন কবি অবশ্য রচনার সময় এসব মাথায় রাখেন না। সে কাজ সমালোচকের। সত্তর দশক যেমন বাংলাদেশের কবিদের স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছিল তেমনই টালমাটাল পরিস্থিতিতে এপার বাংলায় কবিরা অস্থিরতাকে এড়াতে পারেনি। এইসমস্ত কিছু নিয়ে আমার সময়ের কবিদের মত আমাকেও কবিতার পথে হাঁটতে হয়েছিল।তাই এই প্রসঙ্গের অবতারণা।