সবচেয়ে মজার হোল পৃথিবীটা গোল। ফারদিনান্দ ম্যাগেলান এর জাহাজ কেন কোনও জাহাজেই চড়িনি কোনদিন। নাবিকের মত ঘুরে বেড়াই নি বন্দরে বন্দরে। ইচ্ছে ছিল অবশ্য, আছেও, ষোলোআনা। সাবেক দিল্লির মিশমিশে কালো হোস্টেলের ঘরে মইত্রেয়ীশ দা বলেছিল বিয়ার খেতে খেতে; - নাবিকের মত ইকনমিস্টদেরও সম্পর্কের নোঙর পোঁতা থাকে বন্দরে বন্দরে। তারপর থেকে গভীর সবুজ ঘুমে সম্পর্কের ঢেউ প্রায়শই টলমল করে। গঙ্গা ফড়িঙের মসৃণ শরীরের মত সবুজ নীল জল। সূর্যের নিচে টান টান শুয়ে থাকা বালির শরীর খোঁজে দূরবীনে লাগানো চোখ। বালির কোমরে ছায়ার চাদর। নোঙরের খোঁজে ঘুম ভেঙ্গে যায়। গুড়ো গুড়ো চাঁদ ঝরে পড়ে জ্যোৎস্নায়। জেগে থাকে গোল পৃথিবী। জেগে থাকে নোঙরের অপেক্ষায়। জেগে থাকা গোল পৃথিবীর প্রাচীন শরীরের ওপর ম্যাগেলানের জাহাজেরা ঘুরে বেড়ায়। নোঙর খোঁজে তারাও। আমিও ওদেরই মত, ঢালু বৃত্তের গায়ে নোঙর পাততে চাই, পারিনা, গড়িয়ে পড়ি। পড়তে পড়তে খুব নিচে পড়িনা। অল্প গড়িয়ে বুঝি পড়া সম্ভব নয়; পৃথিবীটা আসলে গোল। গড়াতে পারি যত খুশি কিন্তু খসে পড়া হবেনা। বেদুইনেরও ঘর আছে। সে ঘরের নাম পৃথিবী। আরও বুঝি পৃথিবী গোল বলেই কলকাতার মাছের বাজারে কাতলার আঁশে যখন সূর্যের রোদের নোলক ঝোলে তখন আমার এখানে শীত রাতের জানালারা টুকরো টুকরো চাঁদ ভাগ করে খায়। বাইরে বরফ ঠাণ্ডা। দূর আকাশের নক্ষত্রেরাও জমাট হিমের মত। নিচে পড়ে থাকা তুষারের গায়ে চাঁদের রূপালি ঘাম জমা হয় অবিরত।
কনেক্টিকাটের রাতগুলো যেন বিহ্বল নিসর্গের নগ্ন নির্জন হাত। ডর্মের ঘরের ভিতরে লেপের নিচে নিঃসঙ্গ আমি সেইসব শীতের রাতে। ভিতরে সিগারেট খাওয়া আইনি অপরাধ। বাইরে বেরোলে তুষার মানব। ঘুমের খোঁজে জানালায় চোখ রাখি। সবুজ আলো ভাসে জানালার কাঁচে। লোরকার মত আমিও বলে ফেলি আমি সবুজের অভিলাষী। জানালার বাইরে ভেসে ওঠে আমার সবুজ শহর, শহরের গায়ে লেগে থাকা মুখ, চাল ধোয়া সাদা হাতের মত ভোরের কুয়াশা। এবড়ো খেবড়ো ট্রাম। ঘুম ভাঙ্গা ট্রাম লাইন। সাদা কাল খবরের কাগজ, দার্জিলিং চা, আর তারা বেকারির গাড়ির পেছনে দৌড়নো রোঁয়া ওঠা কুকুর। জানালার এদিকে পড়ার টেবিল, বই এর তাক, নিথর বিছানা, আচমকা থেমে যাওয়া দেওয়াল আর অগোছালো যাপন। ভিতরের আমি বাইরের আমি হতে চাই। লোরকার কবিতার মত। পারিনা। এসবই ঘুমিয়ে পড়ে একসময়, অথচ ঠিক কখন কেউ জানেনা। স্বপ্নে জেগে থাকে সবুজ জল, অসংখ্য ঢেউ, ম্যাগেলানের জাহাজ, আর এক রুপোর ঢালাই করা চোখ নিয়ে সবুজ শরীরের নারী।
সবুজ, আমি কি ভীষণ সবুজ অভিলাষী
সবুজ হাওয়ার ঢেউ সবুজ গাছের শরীর।
সবুজ সাগর জলে জাহাজেরা ভাসে
ঘোড়া চড়ে দূরের পাহাড়ে ঘাসের সবুজে।  

কোমরে জড়িয়ে নিয়ে ছায়ার আদর
ব্যালকনিতে স্বপ্ন গোনে একা সে মেয়ে।
সবুজ শরীর নিয়ে, সবুজ চুলের চাদর
নিথর দৃষ্টি তাহার ঠান্ডা রুপোর।

কনেক্টিকাটে এসে প্রথম কিছুদিন নাকে একটা অচেনা গন্ধ লেগে ছিল, ঘুরে বেড়াত পোষা বিড়ালের মত - ঘ্যান ঘ্যানে। জানিনা কিসের, হয়ত স্প্রুস, ফার, বা ফার্ন এর গন্ধ হয়ত তুষারের কিম্বা হয়ত কিছুরই না। তবে সব শহরেরই নিজস্ব একটা গন্ধ থাকে। কেউ পায় কেউ পায়না। এদেশে আসার আগে বম্বে ছিলাম কিছুদিন বাবলু মামার কাছে চাকরীর সুবাদে। রেল ষ্টেশনে নামা ইস্তক এক আদ্ভুত গন্ধ তাড়া করে বেড়াত। পরে বুঝেছিলাম গন্ধটা রসুনের। বম্বে ফিরে যাওয়া হয়নি আর, হবেও না। শহরটাই রাতারাতি পালটিয়ে মুম্বাই হয়ে গেছে। তবে এখনও রসুনের খোলা ছাড়ালে আমি নিয়মিত ভি টি থেকে চার্চ-গেট যাই বা রাতের ট্রেন ধরে আন্ধেরি। আমার ধারনা কলকাতায় যারা প্রথম আসে তারাও এরকম মাছের গন্ধ পায়। আসলে আমি এখনো পাই, কলকাতা গেলে। গন্ধটা নিয়ে ফিরে মনে মনে ফিরে আসি প্রতিবারই। আর প্রতিবারই বিমানে তন্দ্রার মধ্যে হাইজ্যাক হয়ে যায়।

কনেক্টিকাটের হয়ত এরকম কোন গন্ধ আছে, হয়ত বা নেই। আর এই না-গন্ধটাই আমাকে ঘিরে ধরেছিল প্রথম প্রথম। আমি ধরে নিয়েছিলাম এটাই বিদেশের গন্ধ, আমেরিকার গন্ধ। গন্ধের ব্যাপারে অবশ্য আমেরিকানরা খুবই সচেতন। আর সে ব্যাপারে প্রথমেই ঘরে ডেকে সাবধান করে দিয়েছিল সুভাষদা। প্রফেসর সুভাষ রায়, আমার কনেক্টিকাটে আসার ব্যাপারে অনেকটাই সাহায্য করেছিলেন। ওনার সাথে আমার আলাপ (সুগত) মার্জিতদার মাধ্যমে। সে গল্প আরেকদিনের। ছোটখাটো চেহারার সুভাষদাকে ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর থেকে ছাত্ররা সমীহ করে চলতো। ভিনদেশী ছাত্ররা ভয় পেত যেন সুন্দরবনের জঙ্গলে রয়াল বেঙ্গল টাইগার। কেন কে জানে। পদবী মানে যাকে আমেরিকায় লাস্ট নেম বলে আমার সাথে মিলে যাওয়ার দরুন আমাকে অনেকেই ওনার ভাইপো ধরে নিয়েছিল। ছোটখাটো চেহারার আমিও সে ভুল ভাঙ্গাইনি। গোল পৃথিবীতে সুভাষদার নাম ভাঙিয়ে সমীহ আদায় করার নেশায়। ডেস্ক ভর্তি খাতাপত্রের পিছনে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বেঁকে দাঁড়ানো গম্ভীর সুভাষদা বলেছিলেন সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে চেষ্টা করো যাতে এরা নিচু চোখে দেখার সুযোগ না পায়। ভারতীয়দের গায়ে গন্ধ থাকে এটা নাকি রটনা। আসলে ঘটনাও। আমার আর্ট প্রফেসর ক্যাথরিন মায়ারস আমাকে বলেছিল দুবছর বাদে তেলরঙের গন্ধ ভরা স্টুডিয়োর আলয়। শীতের জানালা কবাট আঁটা ঘরে তেল মশলায় কষান রান্নার গন্ধ জ্যাকেট ছেড়ে যেতে চায়না। সুভাষ-দার মতই বলেছিল পঙ্কজ মামা। আমেরিকা দেশটা নাকি শক্তের ভক্ত তাই কোন পরিস্থিতিতেই মাথা নোয়াবার নয়। দুটোই মজ্জাগত হয়ে গেছিল প্রথম সপ্তাহতেই। ডর্ম রুমে রোজ সকাল সন্ধ্যা রুম ফ্রেস্নার স্প্রে করে যেত। বাথরুমে তো কথাই নেই।এমন কি তাজা ফুলের গন্ধ লেগে থাকত মুখ বা অন্য কিছু মোছার কাগজ-গুলতেও (টিস্যু) । ব্যাপারটা যত না অবাক করেছিল তার চেয়েও বেশি আশ্চর্য হয়েছিলাম কাগজের ব্যাবহারে। টেবিল ক্লথ থেকে বালিশের চাদরের ওপর পাতার টাওয়েল পর্যন্ত সবই বিভিন্ন কোয়ালিটি র কাগজের। সবচেয়ে আপত্তিকর আমার কাছে ছিল মলত্যাগের পর কাগজের ব্যাবহার। এক ধাক্কায় কাগজ যে বিদ্যা এবং পায়ে লাগালে তাকে প্রণাম করার অভ্যাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আর সেই সব সবুজ গাছদের কথা ভেবে মন খারাপ হত প্রথম প্রথম। কোন এক বন্ধুকে লিখেছিলাম আমরা প্রস্তর বা ইস্পাত যুগের মত এখন কাগজের যুগে আছি। তখনো রি-সাইকেল ব্যাপারটা এতো ছিলনা তাই অবাকই লেগেছিল। তবে এখন আরও বেশি অবাক লাগে ভাবতে কি তাড়াতাড়ি আমরা কাগজের ব্যাবহার কমিয়ে আনছি রোজকার জীবনে। পৃথিবীর অনেক কিছুই গোল আকারে ঘোরে।  কিছু ধরা পড়ে আমাদের কাছের দৃষ্টিতে আর কিছু হয়ত দূরদৃষ্টিতেও ধরা পরড়েনা।  
    
আমি যে ডর্মে থাকি তা আসলে কোএড। মজার ব্যাপার ছেলেদের ঘরের দিকে মেয়েদের বাথরুম আর মেয়েদের ঘরের দিকে ছেলেদের বাথরুম। নিচে কিচেনে অনেকে একসাথে রান্না করে সাঁঝা চুলার মত। প্রথমে ব্যাপারটা মজার হলেও পরে বুঝলাম এত ভিড় যে হাড়ি করা ঠেলা দায়। আমার এক সিনিয়র দাদা গোলগাল বাঙালি দেবুদা উপায় বলে দিয়েছিল। তেল জ্বলে উঠলে শুকন লঙ্কা ছাড়বি; ঝাঁজে সবাই চলে যাবে; হলও তাই। শুধু মশা মারতে কামান দেগে বসলাম। ধোঁয়ার চোটে ফায়ার অ্যালার্ম সবাইকে বাড় করে নিয়ে এল রাস্তায়। হাড় কাঁপান ঠাণ্ডায়। প্রথম রাত তাই ভয় পেয়েছিলাম খুবই; এই বোধ হয় আমাকে এসে ধরল। ধোঁয়ার গায়ে যেন গোল অক্ষরে আমার নাম লেখা। তবে বৃত্তের Pi যেমন কন্সটান্ট, সেরকম ভাল মন্দের অনুপাত টাও। পরিধি বরাবর হাঁটতে হাঁটতে কখন যে মন্দ পেড়িয়ে ভালয় ঢুকে পড়া বোঝা দায়। ঠাণ্ডায় ঠকঠকে হাঁটু নিয়ে উল্টোদিকে দেখেছিলাম এক সুন্দরী স্নানরতা। অ্যালার্ম বাজতে তাকেও বেড়িয়ে আসতে হয়েছে গরম জলের আদর বাকি রেখে। বরফ ঢাকা উঠোনে তোয়ালে জড়ানো ভেজা চুলের হাড় কাঁপান দৃষ্টি এর আগে সিনেমার স্ক্রিনেই শুধু দেখা। তাও নিঃসঙ্গ আমেরিকায়। পাড়ায় থাকলে গল্প হতো জাঁকিয়ে। এতকিছুর মধ্যে মহিলার নামটাই জানা হয়নি কোনোদিন শুধু জানি কেমিস্ট্রির ছাত্রি। কারণ ওর যাওয়া আসার পথে আমি নিয়মমাফিক সিগারেট ধরিয়েছি অনেক। এরকম কতশত চরিত্র বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়ে রোজকার জীবনে। দেশ কাল ভাষা টপকে। যেমন বাংলাদেশী বন্ধু রেজা। আর রেজার গার্ল ফ্রেন্ড জেসিকা। এদেশে বাংলাদেশের বন্ধুদের দুভাগে ভাগ করা যায়। প্র-ভারত আর অ্যান্টি-ভারত। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর থেকে অবসর নেওয়া রেজা দ্বিতীয়টা আর জেসি প্রথমটা। দাম্পত্যে মেয়েদের পাল্লা ভারী তাই উইক এন্ডের রোদ ঝলমল দুপুরে একলা ভারতীয় হিসাবে মাইলের পর মাইল গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ানো রেজাদের সাথে। সামনে প্রেমিকার হাতে প্রেমিক আর প্রেমিকের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং, এখানে যাকে বলে হুইল। পেছনে আমি আর আমার দুচোখে মাইলের পর মাইল পাহাড়, সবুজ জঙ্গল, ম্যাপেল গাছ, দোয়েল পাখি, এবড়ো খেবড়ো নদী, হঠাত হঠাত গুঁজে দেওয়া দুএকটা বাড়ি আর রঙিন গোলাকার আকাশ। ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকার মত আমিও সবুজ ভালবেসে ফেলি। - ভারদে কুএ তো কিএরো ভারদে - সবুজ, কি ভীষণ সবুজ ভালবাসি।

পুরনো সময়ের চড়ুইভাতিতে ফেলে আসা চরিত্রেরা হাসে-খেলে-গান গায়; আটকা পরে থকে। তাদের বয়স এগোয় না। সরু ইস্পাতের মত বখাটে স্টিভ, লাল গালের লাজুক ক্রিস, বদখৎ ওলন্দাজ রুবেন, শুকন ঝাউপাতার মত রুশ আনা তঞ্ছইভা, আনার গম্ভীর বন্ধু ইশিতাদি, গাঁট্টাগোট্টা গাছ পাকা উজবেক ববুর আলিমভ। বাবুর বলেছিল মোগল সম্রাট বাবরের নামে ওর নামকরণ। আমি যখন প্রেশার কুকারে খিচুড়ি বসিয়ে সিটি গুনছি বাবুর তখন ইয়া বড় মুরগির ঠ্যাং ওভেন থেকে বার করছে। পরে বুঝেছিলাম ওটা আসলে টার্কি। টার্কির সাথে তুর্কির (দেশ) নিশ্চয়ই কোনও সম্পর্ক আছে ঠিকই কারন ওই যে বললাম পৃথিবীটা গোল। তবে তুর্কির দুই ক্লাসমেট হুলিয়া ভারল আর সাদিক ইয়েলদিরাম কেন নিজেদের মধ্যে কথা বলেনা ভেবে আমি অবাক হতাম। আরেক তুরকী ভালোমানুষ আলী অযদেমীর পরে আমাকে বলেছিল আসলে দেশ এক হলেও একজন কুরদ। নিজেদের অধিকার কায়েম করার সেদিনকার লড়াই  কুরদরা আজও লড়ছে।  হয়ত আমরা সবাই লড়ি - কাশ্মীর থেকে কানেক্টিকাট। একদিন দুজনেই অবাক হয়েছিল আমাকে আর পাকিস্তানি ফাহাদ কে একসাথে সিগারেট খেতে দেখে। দুজনেই পরে আলাদা করে জিজ্ঞাসা করেছিল তোমাদের না কার্গিলে যুদ্ধ চলছে? বলেছিলাম পৃথিবীটা গোল - কোনও একদিন আমরা এক দেশ ও ছিলাম বটে। যুদ্ধ দেশে দেশে হয়; মানুষে মানুষে নয়। আরও ছিল বলিভিয়ার লুনা, মেক্সিকোর মারশ্‌ বাংলাদেশের তীর্থ দা যে আমার দিল্লীর সিনিয়রও বটে।
কলকাতায় থাকা কালীন আমি আমেরিকা বলতে বুঝতাম সাদা ইংরেজি শব্দের সাম্রাজ্যবাদী মানুষ, মোটা আঙ্গুলের আঙ্কেল স্যাম আর কিছু অভাগা আঙ্কেল টমের নাতি নাতনিরা। আসলে আমেরিকা যে একটা একুরিয়াম যেখানে সারা পৃথিবীর মাছেদের ছায়া ভিড় করেছে, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে জড়ো করে আনা রঙ্গিন পশমের নিরেট বুনন; এখানে না এলে অজানা রয়ে যেতো। পৃথিবীর বড় বৃত্তটা মাঝারি হতে হতে আমেরিকা হয়ে গেছে। বাজার অর্থনীতিতে ‘মূল্য’ বা 'প্রাইস' একটা সাঙ্ঘাতিক তাৎপর্যপূর্ণ কাজ করে। দায়িত্ব নিয়ে ঠিক করে দেয় কোথাকার জল কতটা গড়াবে। পৃথিবীর দশদিকে সংকেত পাঠায় যে সংকেতে জড় হয় উপাদান। মানুষের ভোগের তরে। যেমন ব্রাজিল থকে কাঠ, ভারত থেকে শীশা, ইন্দোনেশিয়া থেকে রঙ, চায়না থেকে শ্রম যোগাড় করে একটা শিশুর হাতে পেন্সিল তইরি হয় ঠিক সেরকমই। প্রত্যেকটা উপাদান আলাদা কিন্তু উদ্দেশ্যর অস্তিত্ব এক। আমেরিকায় সেরকমই বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ আসে, মহামানবের সাগর তটে মিলতে চেয়ে। হয়ত এরকমই মানুষের ঢল নামত একদিন প্রাচীন ভারতে। কিন্তু ইদানিং কালে যে যেখানে চায় যেতে পারে কই। কাঁটা তারের বেড়ায় আটকা পড়ে যায়। সাদা কাপড়ে রক্তের গুচ্ছ গুচ্ছ গোলাপ ফুটে ওঠে।
    
একবার একটা গোল ননস্টিক প্যান এ সবুজ বেগুন ভাজার সময় ধোঁয়া উঠল অঢেল, পাশ থেকে সাদা হাত এগিয়ে এসে আঁচ কমিয়ে দিলো নব ঘুরিয়ে ইলেকট্রিক স্টোভ টপের। মুখ তুলে দেখি সবুজ চাদরে মোড়া লোরকার সেই জিপসি নারী। স্প্যানিশ আন্দুলেশিয়ার মারিয়া আল্ভারেয। অলিভ স্কিনের মারা এদেশে আমার প্রথম বন্ধু। আলাপের রাতে গাড়িতে বসিয়ে নিয়ে গেছিল এক স্প্যানিশ নাইট ক্লাবে ফ্লামেঙ্ক নাচের আসরে। হলুদ রঙের মদালসা ছন্দ হঠাৎই নেশা ধরায় চোখে। ছিঁড়ে যায় মায়ের আঁচল আর পিছুটান। নিয়ে যায় আন্দুলেশিয়ার যাযাবর রাতের সবুজ চাঁদের কাছাকাছি। স্প্যানিশ কালচার সম্বন্ধে আমার কোনরকম ধারনা ছিলনা। সেই স্পেন যেখানে আলতামিরার গুহার দেওয়ালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাইসনেরা রাত জাগে; সেই স্পেন যেখানে আঠেরো বছরের ইসাবেল বিয়ে করেছিল ছোট ফেরদিনান্দ কে ক্যাথলিক ধর্মের দোহাই দিয়ে একটা গোটা দেশের জন্ম দেবে বলে। সেই স্পেন যার দুনিয়া খ্যাত পাবলো পিকাসো রঙের বদলে রঙ্গিন কাগজ সেঁটে দিয়েছিলেন ক্যানভাসে ক্যানভাসে। যেখানে লোরকার নারী সবুজ শরীর নিয়ে ব্যাল্কনিতে দাঁড়িয়ে হাওয়ার রেলিং ধরে।দূরে জাহাজ ভেসে যায় রুপোর চাঁদের নিচে, প্রেমিকের মৃত্যু হয় আর জাহাজে চড়ে কলম্বাস আমেরিকা ছোঁয়। আন্দুলেশিয়ার জিপ্সি মারিয়া আর আমি ঠাণ্ডায় জমাট বরফের অপর হেঁটে গেছি কতদিন না জেনেই ওটা আসলে লেক, তলায় সবুজ জল আর মাছেদের ছায়ার শরীর ঠাণ্ডায় নিরেট।  প্রথম সেমিস্টারে আমার কাজ ছিল প্রফেসর টি সি লি র অ্যাডভানস ইকনমিক্স এর টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট। মারিয়া আমার সিনিয়র হলেও সেই ক্লাসে আমার স্টুডেন্ট আর আমার ভারতীয় পদ্ধতিতে খাতা দেখার ঘোর বিরোধী। এই নিয়ে আপোষ হয়নি কোনদিন হয়ত হবেও না। কারন গোল পৃথিবীতে মারিয়াও হারিয়ে গেছে। মারার এক প্রেমিক ফেরনান্দ পরে পুয়ের্তোরিকর অর্থমন্ত্রকের উপদেষ্টার কাজে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আনন্দে ভেবেছিলাম মারার দেখা পাব। না, ফেরনান্দ দিতে পারেনি মারার খোঁজ। দীর্ঘশ্বাসের আয়ু ফুরলে বলেছিল ও নিজেও খুঁজছে সবুজ সেই জিপ্সিরমনিকে। আটত্রিশ বছরে থেমে থাকা ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকার মতই।

Romance sonámbulo
FedericoGarcía Lorca, 1928
সবুজ, আমি কি ভীষণ সবুজ অভিলাষী
সবুজ হাওয়ার ঢেউ সবুজ গাছের শরীর।
সবুজ সাগর জলে জাহাজেরা ভাসে
ঘোড়া চড়ে দূরের পাহাড়ে ঘাসের সবুজে।  

কোমরে জড়িয়ে নিয়ে ছায়ার আদর
ব্যালকনিতে স্বপ্ন গোনে কোন সে নারী।
সবুজ শরীর তার সবুজ চুলের চাদর।
নিথর দৃষ্টি তাহার ঠান্ডা রুপোর।

সবুজ, কি ভীষণ সবুজ অভিলাষী।
বানজারা চাঁদের নিচে সে মেয়ে।
এ পৃথিবীর সবকিছু দেখে তারে চেয়ে
সে শুধু দেখে না কিছু অনিমিখে।

তুহিন বাষ্পে গড়া নক্ষত্র নেমে আসে,
মাছেদের ছায়ার শরীর সাথে নিয়ে,
ভোরের সুড়ঙ্গ খোলে।
কর্কশ শিরিষ কাগজের মত ডালে
ডুমুরের গাছ হাত বোলায় হাওয়ার শরীরে।
সবুজ পাহাড় যেনো মস্ত বিড়াল
কাটাঝোপ গোঁফ তার জ্বলে আর নেভে।

কে আসে ও? কোথা থেকে? অপেক্ষায়
বুঝিবা একা নারী বারান্দায়
সবুজ শরীর নিয়ে সবুজ চুলের চাদর,
স্বপ্নে ভেসে আসে লোনা হাওয়া, জলের সাগর।

-কমপাদরে আমি লেনদেন চাই
আমার ঘোড়ার বদলে ওর নিবিড় বাড়ি।
ঘোড়ার বাহার বদলে ওর মুখ দেখা আয়না।
আমার ছুরির বদলে ওর কম্বলের ঔষ্মা।
কমপাদরে আমার, -
আন্দুলেশিয়ার প্রাচীন কাবরা থেকে
ঘোড়ার খুঁড়ে খুঁড়ে
আমার আহত ক্ষত রক্ত হয়ে ঝরে।

- যুবক, যদি এমন হত
আমি তোমায় দিতাম যা চাও।
কিন্তু এখন এ বাড়ি আমার নয়।
কিন্তু এখন এ আমি আমার নয়।

-  কমপাদরে, আমি চাই
শান্তির মৃত্যু আসুক নেমে
নিজের ভারী বিছানায়
জড়ানো লেপের নিচে।
আমার বুকের থেকে গলা
দেখছনা, লম্বা ফালাকাটা  
রক্ত চুয়ে পড়ে, বন্ধু, রক্ত চুয়ে পড়ে।

-যুবক, তোমার পিপাসার্ত সাদা শার্টে
লাল গোলাপ ফোটে ওঠে
তোমার ক্ষত ঘুরে ঘুরে
যুবক,রক্ত ঝড়ে পড়ে।
কিন্তু এখন এ বাড়ি আমার নয়।
কিন্তু এখন এ আমি আমার নয়।

-আমাকে উঠতে দাও কমপাদরে
অন্তত একবারসবুজ বারান্দায়
আমাকে উঠতে দাও
চাঁদের রেলিং এ যেখানে জল ঝরেপড়ে।

দুজন মানুষ মিলে তারপর
সিঁড়ি ভাঙে আর ভাঙে,প্রতিটা পদক্ষেপে,
একজনের রক্ত ঝরে
অন্যজনের অশ্রু লেগে থাকে।
হাজার ঘুঙ্গুর বেজে ওঠে উঁচু বারান্দাতে।
অনেক কাচের খঞ্জনি হাওয়ায় বাজে।
সবুজ, আমি কি ভীষণ সবুজ অভিলাষী।
সবুজ হাওয়ার ঢেউ সবুজ গাছের শরীর।
দুজনে উঠতে থাকে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে,
বাতাসস্তব্ধ হলে পর
জিভেতে বিষাদ ছোঁয় পলাগ্নি পুদিনা তুলসী।

কোথায় গেলো তোমার সেই নারী?
বলো কোথায় হারায় লোনা যুবতী।
কতনা বছর অপেক্ষা করেছিলো
কত না সময় দাঁড়িয়ে থাকবে আর-
কালো চুলে ঠান্ডা মরা ঠোঁটে।

দুলতে থাকা সবুজ বারান্দাতে,
ঝুলতেথাকে সবুজ বারান্দাতে,
জল ট্যাংকের মুখে,
জিপসি মেয়ে ঝোলে।
সবুজ শরীর, সবুজ চুলের চাদর,
নিথর দৃষ্টি নিয়ে ঠান্ডা রুপোর।
চাঁদের শলাকায় শরীর আটকে,
ঠান্ডা জল স্পর্শকরার অল্প কিছু আগে।

রাত্রি ঘনিষ্ট হয় চাঁদনি চকের মত।
মাতাল প্রহরীরা দরজায়কড়া নাড়েঅবিরত।
সবুজ, আমি কি ভীষণ সবুজ অভিলাষী।
সবুজ হাওয়ার ঢেউ, সবুজ গাছের শরীর।
সবুজ সাগর জলে জাহাজেরা ভাসে।
ঘোড়া চড়ে দূরের পাহাড়ে ঘাসের সবুজে।

 

nayadashak ei prithibir baranday