দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। তেরেসিতা যে একদিন আমাদের সব প্ল্যানের মধ্যে ঢুকে পড়বে, সেটা নিয়ে আমরা খুব বেশি ভাবনা-চিন্তা আর করলাম না। আস্তে আস্তে সবকিছু মানিয়ে নিতে শুরু করলাম। আমি ঠিক করলাম ফেলোশিপটা ছেড়েই দেবো কারণ আগামী মাসগুলোতে কোন কাজই সেভাবে করে ওঠা যাবে না। তেরেসিতাকে নিয়ে ভাবনা চিন্তা না করলেও, ভেতরে ভেতরে সব সময় কেমন যেন একটা রাগ হয় মনে হয় সেই কারণেই, খাওয়া-দাওয়া কমাতে পারছি না! দিনের পর দিন মুটিয়ে যাচ্ছি শুধু। সোফার ওপরে, বিছানায়, বারান্দায় যেখানেই বসে থাকি না কেন মানুয়েল আমাকে খাবার এনে দেয় প্লেটে করে। রান্নাঘর সব সময় পরিষ্কার করে রাখে, খাবার দাবারের প্যাকেটগুলো  তাকের ওপরে গুছিয়ে রাখে। জানিনা কেন এত কিছু করছে ও! অপরাধবোধ না কি অন্য কিছু, ঠিক বুঝতে পারিনা। তবে কেমন একটা মনমরা হয়ে থাকে সারাদিন, অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে, আমার সঙ্গে খুব একটা কথাবার্তাও বলে না, বিশেষ করে তেরেসিতার ব্যাপারটা নিয়ে তো কোন কথাই বলতে চায় না।  

আরেকটা মাস কেটে গেল। মা একদিন এক গাদা জিনিসপত্র নিয়ে দেখা করতে এলো। আমি তো ভালো করেই চিনি মাকে! একটু মন খারাপ করে বলল, " ডায়াপার পাল্টানোর এই টেবিলটা দ্যাখ! ধোয়াও যায় আর এটাতে ভেলক্রো স্ট্র্যাপ লাগানো আছে- এগুলো সব সুতির জামা কাপড়- এই তোয়ালেটাতে আবার পিক হুড লাগানো আছে..! বাবা চুপ করে জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল আর একটু একটু করে মাথা নাড়ছিল।

" আমি না ঠিক বুঝতে পারছি না..!" একটু বিরক্তি নিয়েই আমি ওদের বলে বসলাম কথাগুলো। আসলে আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে আমি জিনিসগুলো নিয়ে কথা বলবো নাকি তেরেসিতাকে নিয়ে কিছু বলবো! মানুয়েলের মা যখন কতগুলো রঙিন রাবার ক্লথ নিয়ে আমাদের বাড়িতে এলেন, তখন ওনাকেও এই কথাগুলোই বললাম, "আমি ঠিকমতো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা! কিছু জানিনা আমি।" আর কী  বলবো সেটা বুঝতে না পেরে রাবার ক্লথগুলোকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম।

তিন নম্বর মাসে মনখারাপটা আরো বেড়ে গেল। প্রতিদিন সকালে উঠে আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম। মুখ, হাত-পা, সারা শরীর বিশেষ করে পেটটা বারবার দেখতাম। সব সময় মনে হতো মোটা হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। মানুয়েলকে পাশে এসে দাঁড়াতে বলতাম। খুব রোগা হয়ে যাচ্ছিল ও। আমার সঙ্গে কথাবার্তা খুব একটা বলতো না। রাতে বাড়ি ফিরে নিজের হাত দুটো কোলের ওপর রেখে টিভির সামনে চুপ করে বসে থাকতো। ওর ব্যবহার দেখে আমার মনে হচ্ছিল আমাকে আর ভালোইবাসেনা ও। কিন্তু আসলে তো আমাকে খুবই ভালোবাসে মানুয়েল আর ঠিক আমার মতোই তেরেসিতাকে নিয়ে ওর কোনো অভিযোগও নেই। আসলে তেরেসিতা আসার আগে আমরা অনেক কিছু করার প্ল্যান করে রেখেছিলাম।
 
মা মাঝেমধ্যে ফোন করে আমাকে পেটের উপর হাত বোলাতে বলতো। আমি সোফায় বসে পেটের উপর হাত বোলাতাম আর মা আদর করে তেরেসিতার সঙ্গে গল্প করত। মানুয়েলের মা অবশ্য বেশিরভাগ সময়ই ফোন করে, আমি কোথায় আছি, কি করছি, কি খাচ্ছি এইসব জানতে চাইত।

আমি আস্তে আস্তে ইনসোমেনিয়া ভুগতে শুরু করলাম। সারারাত ধরে খাটের ওপর জেগে শুয়ে থাকতাম, হাত দুটো তেরেসিতার ওপর রেখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম শুধু। অন্য কিছু ভাবতে পারছিলাম না আমি! বুঝতে পারছিলাম না যে দুনিয়াতে এখনও অনেক কিছু আছে যেগুলো আমাকে অবাক করে দেয়, যেমন এক দেশ থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়ে অন্য দেশে সেটা ফিরিয়ে দেওয়া, ডিপ ফ্রিজের ভেতর থেকে টাটকা মাছ বের করে নিয়ে আসা যেটা আদতে এক মাস আগে মারা গিয়েছে অথবা বাড়িতে বসেই কোনো বিল মেটানো- এত ছোট ছোট ঘটনা যে পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটু ওলট পালট হলেও আলাদা করে কোন সমাধান করা যাবে না। আমার পক্ষে এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব ছিল না।

আমি সোশ্যাল সার্ভিস এর ডাইরেক্টরিটা তুলে রেখে অন্য উপায়গুলো খুঁজে দেখতে শুরু করলাম। ডাক্তার, গাইনি এমনকি ঝাড়ফুঁক করে, এমন একজনের সঙ্গেও যোগাযোগ করলাম। একজন ধাইয়ের সঙ্গেও ফোনে কথা হল। কিন্তু সবাই একই ধরনের মানিয়ে নেওয়ার কথা বললো অথবা একদম খারাপ কিছু রাস্তা বাতলে দিল, যেগুলো আমি একদমই শুনতে চাইছিলাম না। আসলে এত তাড়াতাড়ি তেরেসিতাকে নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না আমি কিন্তু ওর কোন ক্ষতি হোক সেটাও চাইছিলাম না। শেষ পর্যন্ত আমি ডঃ ওয়াইজম্যানের কাছে গেলাম।

ডঃ ওয়াইজম্যানের চেম্বারটা শহরের একদম বাইরে একটা পুরোনো বাড়ির দোতলার ওপরে ছিল। কোনও সেক্রেটারি, ওয়েটিং রুম কিছুই ছিলনা ওখানে। ছোট একটা বারান্দা আর দুটো ঘর। ডাক্তার বাবু খুব মিশুকে ছিলেন, আমরা যাবার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের কফি অফার করলেন। আমাদের পরিবার, বাবা-মা, আমাদের বিয়ে, বাড়ির সবার সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক আমাদের এসব বিষয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। উনি যে প্রশ্নগুলো করলেন সেগুলোর জবাব দিলাম আমরা। উনি আঙ্গুলগুলো জড়ো করে হাত দুটো টেবিলের ওপর রেখে কিছুক্ষণ বসে থাকলেন। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছিলো আমাদের কথাবার্তা পছন্দই হয়েছে ওনার। এরপর উনি আমাদেরকে ওনার গবেষণার ব্যাপারে বেশ কিছু কথা বললেন। ঠিক কি বিষয়ে উনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন সে ব্যাপারটাও বললেন। আমার এটা ভালো লাগছিল যে উনি একবারও আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন না, শুধু কী ধরণের চিকিৎসা হবে সেটা নিয়েই  আলোচনা করছিলেন। আমি বারবার শুধু মানুয়েলের দিকে তাকাচ্ছিলাম। খুব মনোযোগ দিয়ে ও ডাক্তার বাবুর কথাগুলো শুনছিল আর মাঝেমধ্যে মাথা নাড়ছিল। মনে হচ্ছিল ডাক্তারবাবুর কথাগুলো পছন্দ হয়েছে ওর। খাবার দাবার, ঘুমের চার্ট, প্রাণায়াম এবং কী কী ধরনের ওষুধ খেতে হবে সেগুলো বলে দিলেন ডাক্তারবাবু। আমার মা বাবা, মানুয়েলের মা ওদের সঙ্গেও কথা বলবেন বললেন কারণ পুরো ব্যাপারটাতে ওদেরও অনেক কিছু করার আছে। আমি আমার নোটবুকে সবকটা পয়েন্ট লিখে রাখলাম।

"আচ্ছা, পুরো ব্যাপারটার গ্যারান্টি দিচ্ছেন তো আপনি?" আমি ওনাকে দুম করেই জিজ্ঞেস করে বসলাম।

"চিন্তার কিছু নেই, ঠিকঠাক চিকিৎসার জন্য যা যা দরকার সবই পেয়ে গেছি!" উনি আমাকে বললেন।

পরদিন মানুয়াল আর ঘর থেকে বেরোলো না। আমার মা বাবা, মানুয়েলের মা আমাদের বাড়ি এসেছিল,  সবাই মিলে বসার ঘরের টেবিলে গিয়ে বসলাম চারিদিকে ছড়ানো চার্ট আর কাগজপত্রের মধ্যেই কাজ শুরু করে দিলাম। যেদিন থেকে আমরা সন্দেহ করতে শুরু করেছি যে তেরেসিতা চলে এসেছে সেদিন থেকে ঠিক কি কি ঘটেছে, যতদুর পারা যায় সেগুলো মনে করে লিখলাম। সবাইকে পুরো ব্যাপারটা  বুঝিয়ে বললাম। এটাও বললাম যে নতুন করে আর কিছু ভাবার নেই চিকিৎসা শুরু হয়ে গিয়েছে। বাবা কিছু একটা বলার চেষ্টা করল কিন্তু মানুয়েল বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলল:

"আমরা তোমাদেরকে যেগুলো করতে বলব তোমরা শুধু সেগুলোই করবে। আর যখন করতে বলব ঠিক  তখনই শুধু করবে।" বুঝতে পারছিলাম যে মানুয়েলের কথাগুলো শুনে বাবার হয়তো খারাপ লাগছে, কিন্তু ব্যাপারটাকে আমরা সিরিয়াস ভাবেই নিয়ে ফেলেছিলাম আর চাইছিলাম সবাই যেন ওভাবেই নেয়।

ওরা একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল। আমরা ঠিক কী করতে যাচ্ছি সেটা ওরা বুঝতে পারছিল না। যা হোক আমাদের পুরো সাহায্য করবে এটা ওরা বলল আর যে চার্টগুলো আমরা ওদের দিলাম সেগুলো নিয়ে বাড়ি চলে গেল সবাই।

প্রথম দশ দিন বেশ ভালোই কাটলো। কোন রকম অসুবিধা হলো না। আমি ঘড়ি ধরে দিনে তিনটে করে পিল খেলাম আর মনোযোগ দিয়ে প্রাণায়ামগুলো শুরু করে দিলাম। ডঃ ওয়াইজম্যানের চিকিৎসাটা পুরোটাই দাঁড়িয়েছিল এই প্রাণায়ামগুলোর অপর। শ্বাস নেওয়া আর শ্বাস ছাড়ার এক আশ্চর্য ব্যাপার। উনি নিজেই এটা আবিষ্কার করেছিলেন এবং কীভাবে করতে হয় আমাকে তা নিজে করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। বাড়ির পেছনের বাগানে, ঘাসের ওপর বসে এগুলো করার সময় আমার মনে হতো আমি যেন সত্যিই পৃথিবীর ভেজা জঠরকে ছুঁয়ে আছি। একবার শ্বাস নিতাম আর দুবারে সেটা ছাড়তাম। প্রথম দিকে বেশি সময় ধরে পারতাম না। আস্তে আস্তে সময় বাড়তে লাগলো। পাঁচ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিতাম আর আট সেকেন্ড সময় নিয়ে ছাড়তাম। কয়েকদিন পর সময়টা আরো বেড়ে গেল আমি দশ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিতাম আর পনের সেকেন্ড ধরে শ্বাস ছাড়তাম। এরপর ডাক্তারবাবু প্রাণায়ামের যে লেভেলের কথা বলেছিলেন সেগুলো করতে শুরু করলাম। আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম আমার শরীরের ভেতর এনার্জি কোন দিক থেকে কোন দিকে যাচ্ছে! ডাক্তারবাবু বলছিলেন ব্যাপারটা কঠিন হলেও প্র্যাকটিস করতে করতে ঠিক হয়ে যাবে আর আমি যেভাবে সবকিছু নিয়ম মেনে করছি তাতে কোন রকম অসুবিধে হবে না। এভাবে সবকিছু ঠিকঠাক করতে পারলে একসময় নিজেই বুঝতে পারা যাবে শরীরের ভেতর এনার্জি কীরকম গতিতে একদিক থেকে অন্যদিকে চলাফেরা করছে। কেউ হয়তো দেখল তার ঠোঁট, হাত বা পায়ের মাংসপেশি অল্প কাঁপছে, সে ইচ্ছে করলে ওই কাঁপুনিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, আস্তে আস্তে কমাতে পারবে মাংসপেশীর কাঁপুনি। আসল লক্ষ্যটা হল একসময় একটু একটু করে পুরো ব্যাপারটাকে থামিয়ে দেওয়া, এনার্জির রাস্তাটাকেই পাল্টে দেওয়া।

মানুয়েল কিন্তু কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিল না! চার্ট অনুযায়ী কখন কী করতে হবে সেগুলো ঠিকঠাক করে দিত কিন্তু আগের মতো আমার কাছাকাছি থাকত না! পারলে এড়িয়েই চলতো আমাকে, টুকটাক কাজের কথাবার্তা বলত আর মাঝেমধ্যেই অনেক রাত করে বাড়ি ফিরতো। প্রায় মাস দেড়েক ধরে এরকম করে চলল ও। আমি কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারছিলাম যে আগের থেকে অনেকটাই আনন্দে আছে ও! আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করার জন্য ছটফট করছে! কিন্তু স্ক্রিপ্টে যা লেখা আছে তা থেকে একচুল নড়ার রিস্ক নিতে চাইছিলাম না আমরা দুজনের কেউই।

আরো একমাস এভাবেই চলল। প্রাণায়ামগুলো আমি একদম দখলে এনে ফেললাম। আমি ভালোমতো বুঝতে পারছিলাম যে আর কিছুদিনের মধ্যেই আমি শরীরের ভেতরের এনার্জির স্রোতটাকে নিজের খুশিমতো থামাতে পারবো। ডাক্তারবাবু তাই বললেন, আর অল্প চেষ্টা করলেই ব্যাপারটা আমার আয়ত্তে চলে আসবে। উনি ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে দিলেন। আগে মনের মধ্যে যে আতঙ্ক ভাবটা থাকতো সেটা ক্রমশ কমে আসছিল, খিদেও আস্তে আস্তে কমে আসলো। ডাক্তারবাবুর লিস্ট মিলিয়ে মানুয়েলের মা ওনার কাজগুলো ঠিকমতো করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন- উনি যাতে আমাদের কম ফোন করেন এবং তেরেসিতাকে নিয়ে সবসময় খুব বেশি চিন্তা না করেন এই ব্যাপারটা আমি ওনাকে বারবার বোঝাচ্ছিলাম।

পরের মাস থেকে অনেক কিছু পাল্টাতে শুরু করলো। আমার ফোলা ভাবটা আগের থেকে আস্তে আস্তে কমে গেল, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার পেটটাও ছোট হয়ে যেতে শুরু করল। এসব দেখে বাবা-মায়েরা অবশ্য খুব ঘাবড়ে গেল। সম্ভবত ওরা বুঝতে পারছিল চিকিৎসার ফলে ঠিক কী হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে মানুয়েলের মা খারাপ ব্যাপারটাই ধরে নিলেন এবং নিজের কাজগুলো ঠিকমতো করে গেলেও ভয় পেতে শুরু করলেন। আমার কেন জানি না বারবার মনে হচ্ছিলো যে ওনার এই দুশ্চিন্তা, ভয় পাওয়াটা যেন পুরো ব্যাপারটাকে গুবলেট করে দেবে!

আমার রাতে খুব ভালো ঘুম হচ্ছিল। আগের মতো আর ডিপ্রেশন হচ্ছিল না। আমি ডাক্তারবাবুকে বললাম যে শ্বাস নেওয়া আর ছাড়াটা আমি খুব ভালো মতোই করতে পারছি। উনি খুব খুশি হলেন, আমাকে বললেন যে আর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমি শরীরের ভেতর এনার্জির রাস্তা পাল্টে দিতে পারব। পুরো ব্যাপারটার একদম কাছে চলে এসেছি আমি। উনি যা চাইছেন তার সঙ্গে মাত্র একটা চুলের ফারাক রয়েছে আমার!
দেখতে দেখতে তিন নম্বর মাস মানে অন্যভাবে দেখলে শেষ মাসের আগের মাসটা চলে এল। এই মাসে  আমাদের বাবা-মায়েদের বিরাট ভূমিকা ছিল। আমরা একটু ভয় পাচ্ছিলাম তো ঠিকমতো সবকিছু ওরা করে উঠতে পারবে কিনা! শেষমেষ ওরা অবশ্য সবকিছুই নিখুঁত ভাবে করে উঠলো। একদিন বিকেল বেলায় মানুয়েলের মা, তেরেসিতার জন্য যে রঙিন রাবার ক্লথগুলো আমাদের দিয়েছিলেন সেগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এলেন। আমার মনে হচ্ছিল জিনিসগুলো উনি আমাদের কীভাবে দিয়েছিলেন সেসব নিয়ে উনি অনেকক্ষণ ধরে ভাবনা-চিন্তা করে এসেছিলেন। আমাকে একটা ব্যাগে রাবার ক্লথগুলো ঢুকিয়ে দিতে বললেন। " আমি এগুলো ব্যাগের মধ্যে পুরে নিয়ে এসেছিলাম ওভাবেই ফেরত নিয়ে যেতে চাই।" চোখ টিপে কথাগুলো বললেন উনি। এরপর আমার মা বাবার পালা, ওরা ওদের দেওয়া জিনিসগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এলো। একটা একটা করে জিনিস ফেরত নিল ওরা। প্রথমে পিকে হুড দেওয়া তোয়ালেটা নিল তারপর সুতির জামা কাপড়গুলো আর একদম শেষে ভেলক্রো স্ট্র্যাপ দেওয়া ডায়াপার পাল্টানোর টেবিলটা। আমি একটা প্যাকেটের মধ্যে সবকিছু ঢুকিয়ে দিলাম। মা শেষবারের মতো আমার পেটটা ধরলো। আমি সোফার উপর বসলাম। মা আমার পাশে বসে পেটের উপর হাত বোলাতে বোলাতে আদর করে তেরেসিতার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল, "আমার সোনা,  আমার তেরেসিতা! আমার খুব খারাপ লাগবে তোমার জন্য! " আমি কিছু বললাম না চুপ করে থাকলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম যে ডাক্তারবাবুর চার্ট মেনে যদি মাকে সবকিছু না করতে হতো তাহলে মা ঠিক কেঁদে ফেলত।

শেষ মাসটা খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল। মানুয়েল আস্তে আস্তে আমাকে বেশি সময় দিতে শুরু করলো। ওকে কাছে পেয়ে আমারও খুব আনন্দ হচ্ছিল। দুজনে আয়নার সামনে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর হাসতাম। কোথাও চলে যাওয়ার আগে মনের মধ্যে যে রকম হয় ঠিক সে রকম না, একদম অন্যরকম মনে হচ্ছিল আমার। যাওয়ার আনন্দ না ! থেকে যাওয়ার আনন্দ। মনে হচ্ছিল জীবনের সবথেকে ভালো সময়ের সঙ্গে আরও একটা বছর জুড়ে গেছে। সবকিছু একই রকম। দুম করে থেমে না গিয়ে একইভাবে চলতে থাকার একটা সুযোগ ।

আগের থেকে অনেকটা হালকা হয়ে গিয়েছিলাম আমি। চনমনে লাগছিল, কাজ করতে কোন অসুবিধে হচ্ছিল না। আমি শেষবারের মতো ডঃ ওয়াইজম্যানের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।

“ আপনার সময় চলে এসেছে", কথাগুলো বলে ডঃ ওয়াইজম্যান আমার দিকে সংরক্ষণ করার বোতলটা এগিয়ে দিলেন। বরফের মত ঠান্ডা ছিলো বোতলটা। ওভাবেই ওটাকে রাখতে হবে বলে আমি একটা কুলার কিনেছিলাম কয়েকদিন আগে। বাড়ি গিয়ে বোতলটা ফ্রিজারে ঢুকিয়ে রাখার জন্য তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। বোতলটার ভেতরে সিরাপের মতো ঘন কিছু একটা ছিল।

একদিন সকালে প্রাণায়াম করতে করতে আমি লাস্ট লেভেলটায় পৌঁছে গেলাম। আমি খুব ধীরে শ্বাস নিচ্ছিলাম, দিব্যি বুঝতে পারছিলাম একটা এনার্জির চাদর পৃথিবীর জলকণাগুলোকে মুড়ে রেখেছে। আমি পরপর দুবার শ্বাস নিলাম, তারপর সবকিছু থেমে গেল। আমি টের পাচ্ছিলাম, একটা অদ্ভুত স্রোত আমার সামনে থমকে দাঁড়ালো তারপর একটু একটু করে উল্টোদিকে বইতে শুরু করল। অদ্ভুত রকমের অনুভূতি, সবকিছু নতুন মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল জল-হাওয়া সব যেন আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে! সৃষ্টির শুরুতে যেখানে ছিল, সেখানেই ফিরে যাচ্ছে সবকিছু!
 
দেখতে দেখতে সেদিনটা এসে পড়লো। ফ্রিজারের গায়ে আটকানো ক্যালেন্ডারে তারিখটা লাল কালি দিয়ে গোল করে রেখেছিল মানুয়েল। যেদিন আমরা ডঃ ওয়াইজম্যানের কাছে প্রথম গিয়েছিলাম, সেদিন ফিরে এসেই তারিখটা দাগিয়ে রেখেছিল ও। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কখন ঘটবে সবকিছু। বিছানায় শুয়ে ছিলাম আর মানুয়েল ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল। মাঝেমধ্যে আমার পেটটা ধরে দেখছিল। সাধারন একটা পেট, অন্যান্য মহিলাদের পেট যেরকম থাকে মানে প্রেগন্যান্ট মহিলাদের পেট না! ডাক্তারবাবু বলেই দিয়েছিলেন যে পুরো চিকিৎসাটা খুব নিখুঁত ভাবে করা হয়েছে, কোনোকিছুর খামতি ছিল না কোথাও! আমাকে অবশ্য আগের থেকে একটু বেশি ফ্যাকাশে আর রোগা লাগছিল।

আমি দুপুর অবধি ঘরের ভেতর বিছানায় শুয়ে থাকলাম। বাইরে বের হলাম না, খেতেও উঠলাম না। মানুয়েল কিছুক্ষণ পর পর দরজা খুলে মাথা ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করছিল সবকিছু ঠিক আছে কিনা। আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছিল আমাকে দেখার জন্য মা হয়ত পারলে দেওয়াল বেয়ে উপরে উঠে আসবে। কিন্তু ডাক্তারবাবু স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন যে ওরা এই সময় কোনমতেই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে পারবে না এমনকি ফোনও করতে পারবে না।  

হঠাৎ করে কেমন যেন বমি পেতে শুরু করল। পেটের ভেতরটা অসম্ভব জ্বলছিল আর শক্ত হয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল পেটটা ফেটে যাবে। মানুয়েলকে ডাকার জন্য আমি ওঠার চেষ্টা করলাম কিন্তু মাথাটা এত ঘুরছিল যে আমি উঠতে পারলাম না। আমার শুধু মনে হচ্ছিল ডাক্তার বাবুকে একবার ফোন করা দরকার। বিছানা থেকে কোনমতে নামলাম কিন্তু মাথা এতটাই ঘুরছিল যে মেঝের ওপরেই হাঁটু গেঁড়ে  বসে পড়লাম। আমি প্রাণায়াম গুলোর কথা ভাবার চেষ্টা করলাম কিন্তু আমার মাথা কোন কাজ করছিল না! ভয় লাগছিল খুব। আমার শুধু মনে হচ্ছিল খারাপ কিছু একটা ঘটবে, তেরেসিতার কোন ক্ষতি হয়ে যাবে! তেরেসিতা হয়তো বুঝতে পেরে গেছে কী হতে যাচ্ছে আর এই ব্যাপারটাই সবথেকে ভয়ানক। মানুয়েল দরজা খুলে আমাকে মেঝের ওপর বসে থাকতে দেখে দৌড়ে এলো।

"এটা না হয় পরেই করবো..আমি চাইনা..” মানুয়েলকে কথাগুলো বলার চেষ্টা করলাম।

আমি ওকে বলতে চাইছিলাম যে আমি এভাবেই থাকি কিছুক্ষণ,  আমার কিছু হবেনা ও বরং ডাক্তারবাবুর  সঙ্গে কথা বলুক, কেন জানিনা মনে হচ্ছিল খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে। কিন্তু একটা কথাও  বলতে পারলাম না, সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিল। আমি  কোন কিছু সামলাতে পারছিলাম না। মানুয়েলও আমার পাশে মেঝের উপর বসে পড়ে আমার হাত দুটো তুলে নিল। কি একটা বললো কিন্তু আমি কোন কথা শুনতে পারছিলাম না। গলার একদম কাছে বমি উঠে আসছিল । আমি কোনমতে মুখটা চেপে ধরলাম। মানুয়েল উঠে রান্নাঘরের দিকে দৌড়ে গেল, পরিষ্কার একটা গ্লাস আর 'ডঃ ওয়াইজম্যান' লেখা প্লাস্টিকের বোতলটা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এলো। বোতলটার সিল খুলে ভেতরের ঘন জিনিসটা গ্লাসের মধ্যে ঢেলে দিল। আবার ভেতর থেকে বমিটা উঠে এলো, কিন্তু হলো না! আমি চেয়েছিলাম আরেকটু পরে বমি করতে। কয়েকবার হেঁচকি উঠলো। দম আটকে যাচ্ছিল আমার। হঠাৎ কেন জানিনা মনে হল মরেই যাব আমি! নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। মানুয়েল কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না! আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ হেঁচকি ওঠা বন্ধ হয়ে গেল আর গলা বেয়ে কী একটা যেন উঠে আসতে শুরু করলো ! আমি মুখ বন্ধ করে মানুয়েলের হাতটা চেপে ধরলাম। মনে হলো ছোট একটা বাদামের মতো কিছু একটা আমার জিভের ওপরে উঠে এলো, খুব নরম, পাতলা কিছু একটা! আমি জানতাম এখন আমাকে কী করতে হবে কিন্তু আমি পারছিলাম না! অদ্ভুত একটা অনুভূতি, যেটা যতদিন না আবার দরকার হচ্ছে আমার সঙ্গেই থেকে যাবে! আমি মানুয়েলের দিকে তাকালাম। মনে হল ও চাইছে যতটা সময় আমার লাগে লাগুক! তেরেসিতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। যতক্ষণ না আমরা ওকে নিতে পারছি, ওর খারাপ কিছু হবে না! মানুয়েল গ্লাসটা আমার মুখের কাছে নিয়ে এলো। আমি খুব সাবধানে তেরেসিতাকে মুখ থেকে বের করে দিলাম।


অনুবাদঃ শৌভিক দে সরকার