আজ থেকে প্রায় একুশ বছর আগে ইশকুল জীবনের শেষদিকে যখন কাগজ করা শুরু করি, তখন জীবনানন্দের ভূত মাথার ভিতরে ঘুরত। তখন ওইসব মনে হয়েছিল, ‘স্বপ্ন নয়– শান্তি নয়– ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়’। এখন বুঝি, সেসব নয়। বোধ থাকলে আরও অনেক মহৎ কাজের চেষ্টা করতাম, লিটল ম্যাগাজিন করতাম না।
    
তাহলে আজও লিটল ম্যাগাজিন করি কেন? উত্তেজনা। ঠিক যে-কারণে দু-টি মানুষ যৌনতা সেলিব্রেট করে, সঙ্গমে মেতে ওঠে উদ্‌ভ্রান্তের মতো, এ-ও তেমনই। দীর্ঘ ফোর-প্লে, একত্র জাপটাজাপটি যাপন, চেপে-বসা নখ-দাঁতের মধুরতম যন্ত্রণা, আর তারপর প্রকাশ। এক আদিম আনন্দ। শুধু আমি নই, ধুলো-ভরা মেলার মাঠে এমন অনেক প্রেসফেরতা সম্পাদককে আমি দেখেছি, তাঁরা সেদিন বাতাসে উড়ছেন। হাতে নতুন সংখ্যা, মুখে ঈশ্বরের দূতের মতো আলতো হাসি।
    
এই উত্তেজনাটুকুই আমার লিটল ম্যাগাজিন করার প্রধানতম পুঁজি। আজও দেখি লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে দশটা আলোচনা সভা হলে, তার মধ্যে অন্তত সাতটার বিষয় হয় – ‘লিটল ম্যাগাজিনের সমস্যা’। লিটল ম্যাগাজিনের এই কারুণ্যের জয়গানে আমি বিশ্বাস করি না। আমি চাই, লিটল ম্যাগাজিন রিচার্ডসের মতো চিউইংগাম চিবুতে চিবুতে ব্যাট করুক, আজাহারের মতো কলার তুলে ফিল্ডিং করুক। বাংলা ছোটো পত্রিকার ইতিহাসে কিন্তু এমন নিদর্শন কম নেই! ইদানীং জানুয়ারি ঘনিয়ে এলে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় জাতির উদ্দেশে লেখেন-টেখেন – ‘এবার বইমেলা থেকে অন্তত একটি লিটল ম্যাগাজিন কিনুন’। এই মরসুমি খদ্দের আমি অন্তত চাই না। এঁরা লিটল ম্যাগাজিনের ক্রেতা, ভোক্তা, পাঠক – কোনোটাই নন। এই চিড়িয়াখানা ঘুরতে আসা পাবলিকের যেন আমাদের পত্রিকাটি কোনোভাবেই ভালো না লাগে, সেই চেষ্টা যথাসম্ভব চালাই।
    
নিজের কথা, নিজেদের কথা বেশি বলা শুধু সমস্যার নয়, অশ্লীলও। ফেসবুকবাজির কল্যাণে বাংলা বই বাজারের কার্পেট বোম্বিং সেই আগল খুলে দিলেও, তার সঙ্গে তাল মেলাতে রুচিতে বাধে। বছর কয়েক আগে ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন ফর দি আর্টস-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে আমাদের পত্রিকা ‘বোধশব্দ’ সম্পর্কে দু-চার কথা বলতে হয়েছিল। কিছুটা হতাশা থেকেই কথাগুলো বলেছিলাম। নতুন করে কাঁসর-ঘণ্টা না বাজিয়ে সেই কথাগুলিই সংক্ষেপে সামনে রাখি। ১৯৯৯ সালে শুরু হলেও, ২০০৮ থেকে মূলত কবিতাকেন্দ্রিক, কিন্তু বিষয়ভিত্তিক কাজই করে আসছে ‘বোধশব্দ’। কোথাও একটা ফোকাস্ড হওয়া জরুরি মনে হয়েছিল। যে-কাজ কেউ করছে না, আদৌ করা যায় কি না তা নিয়েই হয়তো সংশয় রয়েছে, অথচ করা উচিত – সে-কাজই করতে চেয়েছি। বিষয়গত দিক থেকে একটা এক্সপেরিমেন্টের রাস্তা বেছে নিয়েছিলাম। হয়তো সেই বিষয়টা লোকাল, কিন্তু তাকে ধরার ভঙ্গিটা যদি আন্তর্জাতিক হয়; এইরকম ভাবনা ছিল আর কি! সবই যে বিশেষ উতরেছে, তা নয়; কিন্তু চেষ্টা করেছি। কারণ, বিষয় বৈচিত্র্য ও দৃষ্টিভঙ্গিতে আজকের বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের একটা বড়ো অংশ ভয়ংকর পিছিয়ে পড়েছে বলেই মনে হয়। গতানুগতিকতার বাইরে, গত বছরের মৃত কবিদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনকে অতিক্রম করে অনেকেই ইদানীং যেন বেরোতে পারছেন না। আবার আলটপকা অভিনব কোনো-একটা বিষয় বাছলেই তো হল না, তার প্রাসঙ্গিকতা বা প্রয়োজনীয়তাও যাচাই করে দেখা দরকার। তাকে থ্রি-সিক্সটি-ডিগ্রি অবয়ব দেওয়াও দরকার। আমরা সবাই বিশ্বাস না করি, অন্তত মুখে তো বলি – কুড়িটা প্রবন্ধের কমপাইলেশন আর যা-ই হোক, লিটল ম্যাগাজিন নয়। আড়াই-শো পাতা প্রুফ দেখাও নিশ্চয়ই সম্পাদনা নয়। আবার লিটল ম্যাগাজিন মানে তো দৈনিকে রবিবারের ফিচারপাতাও নয়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ঠিকঠাক একটি লিটল ম্যাগাজিন নির্মাণ বা যথাযথ একজন সম্পাদক হয়ে ওঠার সেই কঠিন ক্লাসে পিছনের বেঞ্চিতে জায়গা পেয়েছি মাত্র, ‘বোধশব্দ’-র প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট কিছু ক্রেতা বা পাঠকের থেকে গ্রেসমার্ক না পেলে পাশ নম্বর তোলা সত্যিই আজও মুশকিল হয়!
    
বছর তিরিশেক আগে ‘কৌরব’ পত্রিকার লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যায় শিবনারায়ণ রায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন – ‘অভিযাত্রী সাহিত্যপত্র’। সাঁটে তাঁর বক্তব্য ছিল এইরকম – ‘...স্বকীয়তা, পরীক্ষা প্রবণতা, বেহিসেবিপনা, তারুণ্য, পরম্পরাবিমুখতা, বিক্ষোভ-বিদ্রোহ। এ সবই লিটল ম্যাগাজিনের সাধারণ লক্ষণ, যেসব পত্রিকায় এসব লক্ষণ দেখতে পাই না তারা আকারে ছোট হলেও লিটল ম্যাগাজিন বলে গণ্য করি না। যারা অক্ষম, লোভী, হিসেবী, যারা শক্তিমান ও বিত্তবানের চামচা, যারা অস্মিতাবিহীন অনুব্রজী তাঁদের পক্ষে লিটল ম্যাগাজিন বার করা ধৃষ্টতা।’ সময় ঢের বদলেছে, তবু বিশ্বায়নের ঠিক প্রাক্‌মুহূর্তে লেখা এই চেকলিস্টটি মাথার কাছে না হোক, নিদেনপক্ষে হাতের স্মার্টফোনটিতে রাখা জরুরি। উত্তেজনা পবিত্র; তাতে খাদ মেশা কাজের কথা নয়। অন্তত ‘বোধশব্দ’ কখন বন্ধ করে দিতে হবে, তা বুঝতে যেন ভুল না করি।

 

little-mag-2020


little-mag-2019


little-mag-2018


little-mag-2017


little-mag-2016


little-mag-2015