। ১ ।

আয়লার কান্ট্রি ক্যাফে,নিউ জার্সির ওয়াইকফ অঞ্চলের একটি মাঝারি মাপের দোকান।কে-লেনের ঠিক শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এই ক্যাফের অন্দরমহলে রয়েছে কিছু অ্যানটিক আসবাবপত্র,প্রায় ছাদ ছুঁই ছুঁই একখানা গ্র্যান্ডফাদার ক্লক,লাল-হলুদ ফুলের রকমারি মোটিফ করা বিভিন্ন রঙের টেবিল-ক্লথ। বছরভর  জানলার পাশে একটি লাল গাউন পরা পুতুল রাখা থাকে।পুতুলটি ঠিক রূপকথার কোনো পরীর মতো দেখতে।পরীদের কথা ভাবতে গেলে চোখের সামনে সুসজ্জিত নিটোল কোনো সৌন্দর্য ধরা দেয়।
আয়লা যেন নিজের কন্যাকে, তার আগামী জীবনকে এই পুতুলটির মতোই সাজাতে চায়। নিখুঁত রূপকথায়।

 এছাড়া ওর ক্যাফের বিভিন্ন কর্ণারে রাখা থাকে নানা ধরণের ্ফ্রেশ ফ্লাওারস।আয়লা সকালে ক্যাফে আসার পথে এইসব ফুল জোগাড় করে নিয়ে আসে। গোলাপ, লিলি,ল্যাভেন্ডার,অ্যাস্টার --- যখন যে মরসুমে যা পায়।নিউ জার্সির ফুলের মরশুমও তো স্বল্প মেয়াদী।ওর  ফুলের সৌখিনতা যৌবন থেকেই। ছোটবেলায় কেউ ফুল উপহার দিলে আয়লা ভাবত সেই ব্যাক্তির মনও বুঝি সেই ফুলের মতোই কোমল!

ওর ক্যাফের জানলা দিয়ে বাইরে প্রকাণ্ড এক পৃথিবী দেখা যায় ।কখনো ব্যাস্ত, কখনো স্থির সে ভুবন।ওয়াইকফ, নিউ ইয়র্কের পার্শ্ববর্তী একটি শহর। সারাদিন রাত এই শহরে নিয়মিতি নিউ ইয়র্ক গামী সমস্ত বাস আসা-যাওয়া করে।আয়লার ক্যাফের উল্টোদিকেই বাস স্ট্যান্ড।

 রোজ ওর ক্যাফের জানলা দিয়ে কত মানুষের এই আসা-যাওয়া দেখে সে।কেউ কাজের সূত্রে বাবু-বিবি হয়ে বাসের অপেক্ষায়,কেউ ছোট্ট বেবি-স্ট্রোলার এবং বেবিকে কোলে নিয়ে বাসে উঠতে নাজেহাল,কেউ কেউ বাউন্ডুলের মতো কেবল ঘুরে বেরায়। তাঁদের কে কখন আসবে,কিভাবে আড্ডা দেবে, কে কখন চট করে মেক আপ করে নেবে, কে স্ন্যাক বাইট করতে করতে ঘড়ি দেখবে, কে টেক্সট করতে করতে কী জাতীয় সেলফি নেবে,সব অয়লার  নখদর্পণে।সকালে ব্ল্যাক বোর্ডে একটু প্রাত্যহিক মেনু লিখে বাইরে টাঙিয়ে দেওয়ার মিনিট পনেরো পর থেকে, এই ক্যাফেতে ঘণ্টা দেড়েকের বেসামাল একটা ভিড় হয়। তারপর লাঞ্চ পর্যন্ত প্রায় ফাঁকাই চলে।আবার ভিড় বাড়তে বাড়তে বিকেল অথবা সেই সন্ধে।

এই অঞ্চলের মানুষের কাছে আয়লার এই ক্যাফের আকর্ষণ কিন্তু অন্যত্র। ক্যাফের গা-ঘেঁষে যে - বুড়ো ম্যাগ্নলিয়া গাছটা আছে,তার ছায়ায় আয়লা ক’টা কাঠের বেঞ্চ - টেবিল পেতে রেখেছে।ওই বেঞ্চ গুলোতে বসলেই যেন সকলের আড্ডার নেশা ভর করে মাথায়। বয়োবৃদ্ধরা অবিশ্যি ক্যাফের ভিতরে বসেই কফি খেতে স্বাছন্দ বোধ করেন। আসলে বয়েস বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ভীতিটাও বাড়তে শুরু করে। অসুস্থ হওয়ার ভয়, বেসামাল হওয়ার ভয়, মৃত্যুর ভয়। তাঁদের কথাবার্তাও এইসব সমস্যা ঘিরেই।আবার সমস্যা সমাধানের আলোচনাও এই ভয় জুড়েই।

এ পৃথিবীতে এক পেয়ালা চা কিংবা কফির সঙ্গে সকলেই অকুতভয় হয়ে যায়। নিজের ব্যবসা সামলাতে সামলাতে এঁদের সব গল্পই  আয়লার কানে আসে।

    
                                 ।২।

আজ বিকেলে ক্যাফে বেশ ফাঁকা। বাড়িতে কন্যার সঙ্গে একটু টেলিফোনে আড্ডা দিয়ে, আয়লা এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে বাইরের ওই জনশূন্য রাস্তাটার দিকে।অবসরে, আনমনে।এমন দিন গুলোয় ওই ম্যাগ্নলিয়া গাছের তলাটা তার সমস্ত মনকে তীব্র ভাবে অধিকার করে নেয়।তার কন্যা ব্রুকলীন চরম গ্রন্থপ্রেমী। আয়লার স্বামী ওদের ছেড়ে চলে গেছে।ব্রুকলীনের তখন ঠিক তিন বছর বয়েস।তারপর,নিজেকে বেশ কয়েক বছর সিঙ্গল মাদার ভাবতে গিয়ে,অনেকগুলো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে সে।কেউ - ই একগামিতায় কামিট করতে পারেনি আয়লার কাছে। নারী-শরীরের সংস্পর্শে আসতে পুরুষের মনে যে ভালোলাগা উপচে পড়ে, তার অনেকটাই ক্ষীণ হতে থাকে কোনো সিঙ্গল মাদারের দৈনন্দিন সংগ্রামের সংস্পর্শে এলে।এই অভিজ্ঞতাই আয়লাকে পূর্ণ করেছে তীব্র এক অতৃপ্তির মাঝে। তাই সে এখন আর তার কিশোরী কন্যার সিঙ্গল মাদার নয়। তার পরিচয়,সে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ নারী এবং পাশাপাশি ব্রুকলীনের মা।

সেদিন ক্যাফের উল্টোদিকের বাস স্ট্যান্ডে,ঠিক সন্ধের মুখে বাস থেকে নামল ছিমছাম এক যুবক।তার হাতে এক খানা ট্রলি ব্যাগ আর পিঠে ইয়া ভারী একটি ল্যাপটপের ঝোলা।রাস্তার এপার থেকেই তার চোখ,মুখ, আড়ষ্টতা দেখে বোঝা যাচ্ছিল , এই যুবক ওয়াইকফ অঞ্চলের নয়। বাস থেকে নেমে চারপাশ একটু চোখ বুলিয়ে আয়লার ক্যাফের দিকে এগিয়ে এল সে। ফেব্রুয়ারির হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় বেশিক্ষণ বাইরে দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছিল তার। ক্যাফেতে ঢুকে একটা কফির ফরমাশ দিয়ে সে  জিজ্ঞেস করল, “এই অঞ্চল থেকে হলিডে-ইন হোটেল কতদূর?’’

“হলিডে - ইন? এই  তো কাছেই।এই মেন রোড শেষ হলেই বা দিকে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে। হেভেন অ্যাভিনিউ।এক ব্লক হাঁটলেই আপনার হোটেল পেয়ে যাবেন,” মিষ্টি হেসে বলে আয়লা।
একটু বাদে সামান্য বাড়তি আগ্রহে জানতে চায়, “এখানে নতুন?’’

যুবক স্মিত হেসে বলে, “ হ্যাঁ। … আমার বাড়ি নিউ ইয়র্কের হোয়াইট প্লেনস শহরে।হটাৎ এই এলাকায় এসে খুব শান্ত মনে হচ্ছে চারদিক।’’

“হোটেলে উঠছেন?’’

‘’হুম, যতক্ষণ না  একটা অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজে পাচ্ছি,’’  কফিতে চুমুক দিতে দিতে অন্যমসস্ক হয়ে উত্তর দিল যুবক।
তারপর,সেদিনের মতো কফি শেষ করে হোটেলের পথে রওনা দিল সে।
আয়লা আজ বাড়ি ফেরার পথে কিছু গ্রসারি করে ফিরবে।টুকিটাকি স্টেক, কিছু সবজি, ক্লিনার ও বাথ টিসু নিয়ে নিল।তারপর,কাউন্টারে পেমেন্ট করতে গিয়ে,হটাৎ ওর চোখ চলে যায় দোকানের দরজায় সাঁটা বেশ কিছু বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপনের দিকে।কোনোটা এক-শয্যা, কোনোটা দুই-শয্যার কামরা।আয়লা পকেট থেকে একটা ছোট্ট পোস্ট - ইট  বার করে নোট করে নেয় প্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপন।সেই যুবক তার ক্যাফেতে আর কোনোদিন আসবে কিনা সে জানে না।তবুও নিয়ে ইনফরমেশন সংগ্রহে রাখতে তো ক্ষতি নেই।
মাঝে বেশ ক’-টা দিন কেটে গেল।আয়লা এখন আর সেই যুবকের অপেক্ষা করে না।শুরুর দিকে অবশ্য  অপেক্ষা ছিল না বোধহয়। ছিল অন্য কিছু। কী, তা সংসার জগতে সকলেরই অজ্ঞাত।তাই এত ভালো লাগা। তাই তার স্রোতে ভেসে যাওয়া। তবে পোস্ট-ইটে লেখা বিজ্ঞাপনটি স্বযত্নে  নিজের ডেস্কের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিল সে।
এরপর,এক শনিবারের বার বেলায় সেই যুবক এসে হাজির। আগের দিনের মতো আজ তেমন ছিমছাম দেখাচ্ছে না তাকে।হাত ঘড়িটা মিসিং, চুল বেশ অবিন্যাস্ত। ক্যাফেতে ঢুকে আয়লার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে সে। তার পরনের জ্যাকেটটি বসার চেয়ারে জড়িয়ে রেখে, প্রথমে এক কাপ কফি চাইল। তারপর,টেবিলে নিজের একটি বিলাসবহুল জার্নাল খুলে বসল।সঙ্গে লেখার পেনটি বেশ সাবেকি দেখতে।

আয়লা ওর সামনে কফি নিয়ে গেলে, যুবক ভীষণ এক আপন-করে-নেওয়া ভাব জড়িয়ে জানতে চাইল, “ আমায় আজ এখানে বসে লিখতে দেবে?অনেক রাত অবধি? তোমার ক্যাফে বন্ধ হয়ে গেলে আমিও চলে যাব…’’

আয়লা হেসে বলে, “লেখো যতটা পারো, আমার কন্যা অ্যাভিড  রাইটার,ও-ও  লেখায় ব্যাঘাত পছন্দ করে না।আমি জানি’’

“থ্যাংক্স। তোমার মেয়ে কত বড়?’’
“ চোদ্দো। তুমি বাড়ি পেলে?
“ আমি ভীষণ খুঁতখুঁতে আয়লা, এখনো কিছুই ভালো লাগাতে পারিনি… বাড়িও না,সম্পর্কও না।আই কন্সিডার মাইসেলফ আ বিগ ফেইলিউর!‘’

শেষের ‘সম্পর্কও’  শব্দটা  যেন জোর করে না শোনার ভান করল আয়লা।
“ আমি তোমার জন্য ক’টা বাড়ি ভাড়ার খোঁজ,তার টেলিফোন নম্বর রেখে দিয়েছি,সেদিন বাড়ি ফেরার পথে।যোগাযোগ করে দেখতে পারো।”
“তুমি আমার জন্যে ঠিকানা রেখে দিয়েছ আয়লা? আমি তো ভাগ্যবাণ!’’

যুবকের মুখে নিজের নামাচ্চরণ শুনে সে বুঝল এই ক্যাফেতে বসেই সেদিন সে তার নাম জানতে পেরেছে। অন্তত এই মুহূর্তে আন্দাজে তাই তো মনে হয় । সেটাই কী জানান দিল সে ?

যুবক এখন প্রায়ই  রাত পর্যন্ত লিখতে থাকে ক্যাফেতে বসে।এক-আধ কাপ কফির বদলে।
“যুবকের  নাম জানার কোন প্রয়োজন নেই,” মনে মনে বলতে বলতে আয়লা নিজেকে সামলানোর পথ এখন থেকেই খুঁজে নিতে চাইছে।নিজের চাওয়াটা স্পষ্ট থাকলে, পরে নিজের কষ্টের খুঁটিনাটিও কমতে থাকে আগামী দিনে।
 বেশ ছকেই চলছিল সমস্তটা, ওয়াইকফ অঞ্চলে।আয়লার ক্যাফে, বাসের আসাযাওয়া, সবই চলছে যেমন চলার কথা।সেই যুবকেরও একটি অ্যাপার্টমেন্ট পছন্দ হয়ে গেল। হেভেন অ্যাভিনিউতে। ওর ঠিকানা খোঁজার কাজ খানিকটা এগিয়ে দিতে পেরে, আয়লাও বেশ তৃপ্ত।নিজে যদি কারোর উপকারে কাজে লাগে সে নিজেকে বেশ বড়লোক মনে হয় তার। সে ভাবে,ওর - ও পৃথিবীতে কাউকে কিছু দেওয়ার রয়েছে।এই এত এত না-থাকার মাঝে। আর বড়লোক হতে কে না চায়! সে জন্যই কী সে ঠিকানা জোগাড় করে দিল যুবক'কে ?

ইদানিং,আয়লা বাড়ি থেকে নানা ধরণের বইপত্র নিয়ে আসে তার ক্যাফেতে। সন্ধের পর ভিড় কমলে, শহরের রাস্তা সান্ধ্য অন্ধকারে থিতু হলে, একদিকে যুবক ব’সে জার্নাল লেখে,আরেকদিকে আয়লা মন দিয়ে বই পড়্তে থাকে। সে কখনো  কৌতূহলবশত জানতেও চায়নি যুবক তার জার্নালে কী লিখছে এত মন দিয়ে?

ইদানিং অয়লার যত্ন নেওয়া ত্বক, কিছুতেই যুবকের চোখ এড়াতে পারে না। আয়লাও একটু নিজেকে সময় দিতে শুরু করেছে। দিনান্তে কলম থামিয়ে মাঝে-মধ্যেই একপৃষ্ঠে সে তাকিয়ে থাকে আয়লার দিকে। ওর এই তাকানোতে, অন্ধকার নেমে আসা নিঝুম পাড়াতেও আয়লা কোনোদিন ভয় পায়নি।অস্বস্তি বোধ করেনি..

                                      ।৩ ।

বেশ কিছুদিন যাবৎ, শহরের নানা অঞ্চলে এক ভাইরাল রোগ দেখা দিয়েছে।শোনা যায় চীন থেকে এসেছে এই জীবাণু।দ্রুত ছড়াচ্ছে মানুষের মধ্যে। সংক্রমিত হচ্ছে একের পর এক প্রাণ। নিউ ইয়র্ক,এই ব্যাধির এপিসেন্টার ঘোষণা করেছেন আমেরিকান সরকার।একের পর এক অফিস, স্কুল, কলেজ, বিভিন্ন রেস্তরাঁ, সিনেমা হল, মল --- সব লকডাউন করার নির্দেশ দিচ্ছেন সরকার।

আজ সোমবার।গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ব্রুকলীন স্কুল থেকে ফিরে জানায় যে,ওদের স্কুল নাকি আগামিকাল বন্ধ রাখবে।ডিপ - ক্লিনিং করা হবে স্কুলের বিভিন্ন অংশ।তত দিনে আয়লা সংবাদ মাধ্যম, বন্ধু, আত্মীয়পরিজন সূত্রে খবর পেতে শুরু করেছে বিভিন্ন শহর সম্পূর্ণ লকডাউন করে দেওয়ার ব্যাবস্থা নিয়ে ফেলছেন সরকারের তরফ থেকে ।আয়লার ব্যবসা অত্যন্তই গুরুত্বপূর্ণ।এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে,ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকলে,বিপুল পরিমান আর্থিক ক্ষতি হতে পারে সেই কথাই সর্বদা মাথায় ঘুরছে তার!গাড়িতে চালকের সিটে বসে, আয়লা তাকালো পিছনের সিটে হেলান দিয়ে বসা নিষ্পাপ ব্রুকলীনের কপালে দিকে।।গাড়ির লুকিং গ্লাস দিয়ে খুব অনিশ্চিত একটা পাখির বাসা চোখে পড়ে তার। ঝড়ে বাসা ভেঙে গেলে কি করে পাখিরা?বাইরে এখনো শীতের দাপট কমেনি এতটুকুও।আয়লার কষ্ট হচ্ছে।চিন্তায় মাথায় একটা অদ্ভুত দপদপানি!


“ তোমার স্কুল কাল থেকেই হয়তো অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হতে চলেছে,’’ কন্যাকে জানিয়ে রাখতে চায় আয়লা।

“কেন মম? এত ভয়ানক এই ভাইরাস?’’

“ দিস ইজ টার্নিং ইন্টু আ প্যান্ডেমিক।আসলে জীবাণু খুব ভয়ানক হয় না। ভয়ানক হয় সংক্রমণ!”

মুহূর্তে আয়লার চোখের সামনে ওর এক্স-হাসব্যান্ডের মুখখানা ভেসে উঠল! কোথায় আছে অ্যাডাম?ঠিক এই মুহূর্তে? গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ? বিয়ে করে নিলেই তো পারে ! ল্যাঠা চুকে যায়..’’

ল্যাঠা! সত্যিই কী কোনোকিছুর,কারোর ল্যাঠা চুকে যায় এক জীবনে? না আমরা চাই চুকে-বুকে  যাক? না চুকতে পারে আদৌ?

“হয়তো শনিবার থেকেই সেই যুবক আর আসবে না ক্যাফেতে। কাল গিয়ে কিছু সাফাই করে আসলেই হয়। ডিপ- ক্লিনিং..,” মনে মনে ভাবল আয়লা…

 সে সপ্তাহের শনিবার ও রবিবার  আয়লার ক্যাফে প্রায় ফাঁকাই থাকে। চারিদিকে সকলে তখন খাবার,পানীয় জল কিনে বাড়িতে হোর্ড করতে শুরু করছে।এরই ফাঁকে,যুবক এক রবিবার বিকেলবেলা ঘণ্টা খানেক কাটিয়ে যায় আয়লার সঙ্গে।তার ক্যাফেতে।

“ আয়লা, বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে জীবন, তৈরী হও!ক্যাফেতে চুমুক দিয়ে বলে ওঠে সে। ঠিক কীসের জন্য তৈরী হতে বলছে সে আয়লাকে? যুবক নিজেও তা অবগত কী?

“কবেই বা আঁট বেঁধেছে আমার জীবন! চিন্তা হয় ব্রুকলীন'কে নিয়ে। ওকে,ওর ভবিষ্যৎ'কে নিশ্চিত করতেই তো এত কিছু!’’

যুবক এই প্রথম ব্রুকলীনের মা- কে দেখতে পায় চোখের সামনে। অশ্রান্ত, সর্বাঙ্গসম্পূর্ণা।এত দিন  আয়লা তার কাছে এই শহরতলির প্রথম বান্ধবী। যাকে দেখে পরন্ত বেলায় ঘরে ফেরার তাগিদ খুঁজে পায়নি সে।দিনের পর দিন।

গতকাল এই শহরে সামান্য বরফ পড়েছে সন্ধের দিকে। এখানে - ওখানে।সেই বরফ কুচির ছোট ছোট অংশ আজও পথের ধারে জমে রয়েছে। মার্চের ঠাণ্ডা বাতাস তাকে তৎক্ষণাৎ গলতে দেয়নি।
আমেরিকায় শীতের শেষে বসন্তকালীন বাতাস বয় সন্ধে নামলে। যুবক ভাবে সে এক আশ্বাসের বাতাস। যতটা আশ্বাস নিয়ে,  বাকি বছরটুকু গুজরান হয়!

এই বিশ্বের মানুষ, উদ্ভিত,পশু-পাখি ---- সকলেই আসলে কোনো না কোনো ভাবে নিশ্চিত হতে চায়। প্রকৃতিকে ধারণ করে।প্রাকৃতিক রূপে।
সেদিন অল্প কথার ঘোরে,খানিকটা অনিশ্চয়তায়,খানিকটা অস্থির হয়েই ক্যাফে থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ল দু’জনে।সামনের মোড় থেকে দু'জন দু’দিকে বেঁকে, খানিকটা এগিয়ে গেলেই তাদের নিজেদের ঠিকানা।

   দিন পনেরো পর, শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে কারফিউ জারি করলেন  নিউ জার্সির গভর্নর।পথঘাট অধিকাংশ সময় সুনশান থাকে।মানুষ ধীরে ধীরে আতঙ্কে, মৃত্য ভয়ে অভ্যস্ত হচ্ছে নিজেদের বন্দীদশার জীবনের সঙ্গে।
ব্রুকলীনের হোম স্কুলিং শুরু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। আয়লার ল্যাপটপেই আজকাল সাড়া সকাল স্কুলের কাজকর্ম সেরে নেয় সে ।প্রথম কয়েকদিন এই ব্যবস্থা আয়লার খানিকটা ইনট্রুসিভ মনে হলেও ব্রুকলীন এবং আয়লা খুব দ্রুত এই নতুন সিসটেমের সঙ্গে নিজেদের অ্যাডাপ্ট করে নেয়।আয়লার পক্ষেও কন্যাকে এই মুহূর্তে নতুন ল্যাপটপ কিনে দেওয়ার সামর্থ নেই।অগ্যতা অ্যাড্যাপটেশনই একমাত্র সল্যুশন, উভয়পক্ষেই।

এই আমরা মানুষ, এই আমাদের মনুষ্য জাতি!

আরও কয়েকদিন এভাবেই চলতে থাকল। আয়লা ধীরে ধীরে ক্যাফের বদলে গ্রসারি হোম ডেলিভারি করার ব্যাবস্থা শুরু করে। তার ক্যাফের নতুন নাম হয়ে গেল ‘লিভ অ্যাট দা ডোর’।সরকারের  ‘Cares Act Fund’ তেমন কাজে আসল না আয়লার। ওই ফান্ডের অর্ধেক টাকা এখনো পুরোপুরি এসে তার অ্যাকাউন্টে জমাহয়নি ।যেটুকু যা এসেছে তা এই হোম - ডেলিভারির ব্যবসার পুঁজিতেই চলে গেল।

আজ রবিবার।ব্রুকলীনের স্কুলের এক বান্ধবীর ‘ড্রাইভ -ইন’ জন্মদিন পার্টি। বান্ধবীর মা ই-মেল করেছেন,সকলেই যেন নিজেদের গাড়িতে বসে তাঁদের বাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে যায়।কোনো উপহার গ্রহণ করা হবে না।কেবল বন্ধুদের মুখ দেখে ‘সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং’ প্রাকটিস করে সোস্যালাইজ করা যেতে পারে।

“মানুষ একাকিত্বে এইভাবেই কী জীবনের সঙ্গ নেয়? এত ভালোবাসা রয়েছে ? নাকি এ কেবলই দেখনদারিতা? এত ভেবে আমিই বা কী অ্যাচিভ করলাম!’’ -- সাতসকালে নিজের মনে বিড়বিড় করে চলে আয়লা।

ব্রুকলীন'কে এই ড্রাইভ - ইন পার্টি থেকে ঘুরিয়ে বাড়িতে রেখে,সে  প্ল্যান করে সোজা ক্যাফে চলে যাওয়ার।সেখানে  খানিকটা ডিপ-ক্লিনিং করতে হবে,কিছু কাগজপত্রও ঘরে নিয়ে আসা প্রয়োজন।তাছাড়া কত দিন ক্যাফেতে যায় না সে! ইস! পরের মাসে হয়তো লকডাউন তুলে দেবে সরকার।তাই কিছু গ্লাভস, স্যানিটাইজার, মুখোশও তো রাখা দরকার ওখানে।আজই সে গুছিয়ে আসবে সব..
 
                                   ।৪।

এই ক্যাফের ইতিবৃত্ত এখানেই শেষ হতে পারত।কিন্তু সেই নবাগত যুবকের মনের অবস্থা না-জানলে এই গল্প অসমাপ্ত থেকে যায়।
 
    আয়ালা ক্যাফে পরিষ্কার করতে করতে টেবিলের ওপর যুবকের ফেলে রেখে যাওয়া জার্নালটি পায়।জার্নালে তার নাম,ঠিকানা  কিছুই লেখা নেই।
‘কী অদ্ভুত মানুষ রে বাবা!’ -- মনে মনে হাসে সে।তবে এই রঙের জার্নালটিই সঙ্গে আনত।আয়লার স্পষ্ট মনে পড়ে।তাছাড়া ওর ক্যাফেতে কেউ কোনোদিন এভাবে বসে এরকম জার্নাল লেখেনি।এও সত্যি!তাহলে কী পাতা উল্টে পড়া যায় যুবকের জার্নাল?

নিজের দ্বন্দের সঙ্গে লড়তে লড়তে অবশেষে অতি কৌতূহলে আয়লা চোখ রাখে সেই জার্নালের পাতায়।যাতে নিখুঁত ইট্যালিক হরফে লেখা:

‘ওয়াইকফে আজ আমার প্রথম দিন। খোদ নিউ ইয়র্ক শহর থেকে একেবারে অজ-পাড়াগাঁয়ে।জীবনের দুটি ব্যর্থ সম্পর্ক পরপর সামলাতে অক্ষম হয়ে, প্রায় সমস্ত পিছুটান থেকে পালাতে, আজ  চলে এসেছি সেই জীবনকেই ধাওয়া করে। আমি ক্যাটি, ভেনেসা -- কাউকেই ভালো রাখতে জানি না।অন্তত ওঁদের তাই বক্তব্য।সব নিয়ে আমার মনটা এমনিতেই দমে আছে।এখানকার লোকজন একটু ভিন্ন ধরণের।দেখা হলে মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি দেয়, ওঁদের ব্যাস্ততা শহরের সাধারণ কোন জীবন যাপনের তুলনায় অনেক কম।ওঁরা কৌতূহলী নয়।কিন্তু ভীষণই হেল্পফুল।এখানে সকলের জীবনে একটা যত্নে রাখা অবসর সময় রয়েছে।আমি স্পষ্ট তা  দেখতে পাই।

আয়লা এই শহরে আমার প্রথম বান্ধবী।ওর  প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। ও আমায় বেশ কিছু অ্যাপার্টমেন্টের  ঠিকানা জোগাড় করে দিয়েছিল।তার-ই মধ্যে ওর ক্যাফে যে অঞ্চল থেকে সব চাইতে কাছে, আমি সেই বাড়িটা নিয়েছি। আমার ঘরে অল্প আলো ঢোকে। কিন্তু আমার তাতে অসুবিধে হয় না।আলোর খোঁজে আমি আয়লার ক্যাফেতে যাই ।রোজ বিকেলে। এই আলোরই কী আশ্রয় পেতে চেয়েছি এদ্দিন?

ওর ক্যাফেতে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যায় ভাবে বসে লিখতে থাকি।মাঝে মধ্যে পাঁচ ছয় ঘন্টার বদলে নিই কেবল এক কাপ কফি!আয়লার মুখটা ভীষণ দরদী। কিশোরবেলার কত কত ছাপ রয়ে গিয়েছে এখনো।কেউ কী খুঁটে দেখেছে তা? খুঁটে নয়, অন্তত ডিস্টান্টলি? আবার এক ধরণের চাপা কান্নাও জমানো রয়েছে ওর বুকে।এখানে প্রতিদিন সন্ধেবেলায় অ্যাস্টার ফুলে ফুলে ভ্রমর উড়ে যায়।দিয়ে যায় এক-একটা অবুঝ প্রাণ।বেগ্নে বেলার কোনো নিষিদ্ধ প্রয়াসে।

আয়লা স্বল্পভাষী। ও আমার নাম ঠিকানা কোনোদিন জানতে চায়নি। চাইবেও না হয়তো। এই শান্ত প্রান্তিক শহর আস্তে আস্তে জীবাণুর কবলে অশান্ত হয়ে উঠছে।আমি আয়লার জন্য পৃথিবীর জাহান্নুমেও যেতে পারি, ইতিমধ্যেই। সত্যিই পারি। ও জানে না। ওর ঠিকানা আমিও জানি না।চাইতেও দ্বিধা বোধ হয়। পূর্ব জীবনে কাউকে সুখ দিইনি।তার ওপর আমার এই অসুখ! করোনা না হলেও আর ক'টা কেমোথেরাপিতে পয়সা ঢালতে পারব আমি? গতকাল কোম্পানি ফারলো করার পর,হেলথ ইন্সুরেন্সটুকুও  নেই আমার।
আয়লাকে আমি কোনোমতেই কষ্ট দিতে চাইনা।একদমই নয়।ডিভোর্সি হলে মানুষ কী অনেক বেশি সাবধানী হয়ে যায়? তখন কী জীবনের সমস্ত স্বার্থপরতার অবসান ঘটে? সম্পর্কের মূল্য বুঝতে শেখে?

        আয়লাকে কোন ব্যাধি ছুঁতে পারবে না।আমি আছি ওর পাশে। ওর অজান্তেই।জানলেই তো সেই অধিকারবোধ, সেই ভাঙাগড়ার খেলা।আমি ক্লান্ত এ নিয়ে আয়লা !
     এইবার কিছুতেই ভাঙবে না আমার শেষ ভরসাটুকু।আমি তোমায় পেতে চাই না আয়লা।পেলেই সব শেষ!শেষের শেষে শেষ করব কেন বলো নিজেকে?

ওয়াইকফ ছোট্ট শহর।আমি তোমার ঠিকানা খুঁজে নেব।তোমার  খোঁজ নেব আমি।ঠিক পারব.. দেখো তুমি। শুধু আড়ালেই যেন রয়ে যাই… হারিয়ে গেলে চুমুতে ভরিয়ে দিও আমায়।কোভিড হলে আর চুমু চাইব না।আচ্ছা, কোভিড তোমার থেকেও সংক্রামক আয়লা?

তোমায় আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে। তোমার মন খুব অশান্ত।আমার-ও।তোমার মাথার ওই ঝাঁকরা কার্লের পরতে আমার খুব হাত বোলাতে ইচ্ছে করছে।আজ ঠোঁটে লিপস্টিকও নেই তোমার।এই ঠোঁট-ই কিন্তু আমার,একদম মৌলিক। মুখোশহীন…’

আয়লা জার্নাল বন্ধ করে ঠায় তাকিয়ে রইল সেই বাস স্ট্যান্ডের দিকে। “চলে গেল? কোথায় আছে ও এই মুহূর্তে ?” এই প্রথম যে না ছুঁয়ে আয়লাকে এত কাছে টানলো, সেও চলে গেল? চলে যাবে?

যদি কোনোদিন এই মহামারীর মাঝপথে যুবক তাকে , তার নম্বর খুঁজে কল করে,তখন যেন ওর  ‘আনসেভ্ড নম্বর’ - ই ভেসে ওঠে আয়লার ফোন স্ক্রিনে।

বাকিটা কান্ট্রি ক্যাফেতে।মহামারীর শেষে, কোনো এক সনে।বাকিটা ব্যক্তিগত না ব্রুকলীনও জানবে তার মা'কে? জানবে তার মা'কেও ছেড়ে চলে যাওয়া যায় অত্যন্ত ভালোবেসে, ক্ষতজাত প্রেমে পড়ে...