শংকর লাহিড়ীর সাথে কথোপকথনে ‘নয়া দশক’ পত্রিকার সম্পাদক রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়
৪ জুলাই ২০২০

রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায় :
রিয়ালিটি হচ্ছে, দুহাতে টেনিস এলবো। গত এগারোদিনে কিছু লিখে উঠতে পারিনি। তোমার জন্যে প্রশ্নগুলো মনে মনে তৈরি করে রেখেছিলাম, পাঠানো হয়নি। এখানে কতগুলো অডিও প্রশ্ন পাঠালাম। এই কোভিডের দিনগুলোয়, তোমার যে সদা সৃষ্টিশীল মন, তোমার যে মানবলোক, এবং মানবলোক ছাড়িয়েও যে চিন্তা, সেই চিন্তার সঙ্গে এই করোনার দিনগুলোর সম্পর্ক তুমি কীভাবে নিরুপণ করবে?
শংকর লাহিড়ী :
তোমার প্রশ্নটা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার ব্যাপ্তি তো অনেকটা। কয়েক কথায় তাকেকিভাবে বোঝাবো ! দেখো, আমাদের প্রত্যেকের কাছেতার বিশ্ব বা, মানবলোক একেক রকম। আমরা সবাই নিজ নিজ অন্ধকার সংঘারাম থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসি। একজন প্রান্তিক কৃষক, একজন বিচারপতি, পুরোহিত, অ্যাথেলিট, পিয়ানিস্ট, অস্ত্রব্যবসায়ী, রেস্তোরাঁ মালিক —এদের সকলের বিশ্ব ভিন্ন ভিন্ন। হয়তো তাঁরা একই পাড়ায় বাস করেন, একই শহরে, জেলায়, বা একই দেশে। অথবা হয়তো একই মহাদেশে। তবুও,খুঁটিনাটি বিষয়েতাঁদের ব্যক্তিগত দর্শন, পক্ষপাত, নির্বাচন সবই ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। মেট্রো রেলের কামরায় অথবা শপিং মলের কাউন্টারে দুজন পাশাপাশি দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য, তার চেয়ে বরং প্রাণীজগতে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য অনেক কম। মানুষের চেতনা, মেধা ও বিশ্বাস তার মনোজগতকে, তার রাগ-অনুরাগকে এতখানি ভিন্ন করে রেখেছে। এই ভিন্নতা প্রকৃতির একটা বৈশিষ্ট্য, এর মধ্যে সৌন্দর্য আছে। এটা দক্ষিণপন্থী বা বামপন্থী- কেউই বোঝেন না। এইজন্যে তাবড় কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের বদলে দমনপীড়নে বেশি আস্থা রাখা হয়। সেটা স্বৈরাচারী কম্যুনিজম। কারণ, তাদের অন্য পথ ছিলো না। কায়িক শ্রমজীবি মানুষ চতুর নয়, পন্ডিত নয়। আর যারা চতুর, পন্ডিত, তারা শ্রমজীবি নয়। মানুষ কতকাল কাটিয়েছে এই শুনে যে, একদিন সমাজে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। সম্ভব নয়। কারণ, প্রকৃতিতে সাম্যবাদ বলে কিছু নেই। সেখানে ভিন্নতাই বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তার সমস্ত ব্যবস্থাটাই একটা গ্র্যান্ড নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে আছে, একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। স্বয়ংবিন্যস্ত, রূপময় ও সন্তুলিত ব্যবস্থাপনা। সেলফ অর্গানাইজিং অ্যান্ড প্যাটার্নিং সিস্টেম। -এইটা বিজ্ঞানীদের বুঝে উঠতে বিংশ শতাব্দীর অনেকটা কেটে গেছে। তবে অদূর ভবিষ্যতে মানুষ যদি বিজ্ঞানে বলীয়ান হয়ে গবেষণাগারে নিজের ক্লোন তৈরি করে, অর্থাৎ একই রকমের রূপবান, মেধাবী, ও বিশেষরকমে শক্তিশালীহুবহু একই রকমের অনেক মানুষ, অথবা কৃত্রিম মেধার অধিকারী মানব-রোবোটিক্স, তবে এক অন্য জটিলতায় পৌঁছে যাবে সে। যে খেলার নিয়ম আজ জানা নেই। এখনই এমন সব কৃত্রিম অঙ্গ মানুষ তৈরি করতে পারছে, যার লোভে মানুষ হয়তো একদিন নিজের জৈবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গকেই দায়ভার মনে করবে, তার থেকে মুক্তি চাইবে।
আমরা যারা মঙ্গলগ্রহের জীব নই, যারা টাইটান, ইউরোপা, বা গ্যানিমিড থেকে এখানে আসিনি—যেগুলো শনি ও বৃহস্পতির উপগ্রহ-- আমরা তো সবাই এই নীল-সবুজ পৃথিবীরই বাসিন্দা। এই গ্রহই তাইআমাদের প্রথম সম্মিলিত পরিচয়। অবশ্যসমগ্র সৌরমন্ডলও। আমরা একই সৌরমন্ডলের নাগরিক—যদি এভাবে বলা যায়।
রাজর্ষি :
পরে যেটায় আসবো সেটা হচ্ছে যে তুমি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ জানিনা, তোমার পাঠ খুব গুরুত্বপূর্ণ, তোমার লেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ...একদম সাম্প্রতিক ‘অপরজন’-এ লেখাটা অসামান্য। এবং আমি খুব গর্বিত যে,তরুণরা আবার তোমার লেখা সম্যকভাবে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এটা আমি অনেক আগে থেকে ভাবতাম, একটা জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছিলাম।
শংকর :
অপরজন পত্রিকায় ‘মহাকাশ, মহাবিশ্ব’ নামে যেটা সবে লিখতে শুরু করেছি, সেটাই তো। লেখাটা হাতে পেয়েই ‘অসাধারণ শুরু হয়েছে’ বলে মেসেজ করেছিল ওরা। আর প্রকাশিত হওয়ার পরে আরও অনেকেই তো প্রশংসা করেছেন। ব্যক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হতে গেলে ক্ষমতাবান হতে হয়; সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আকাদেমিক। আমি সামান্য লেখাপড়া করেছি, জগৎ ও জীবন নিয়ে সামান্য দেখাশোনা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, মহাকাশ, আমাকে আকর্ষণ করে। -আমার ভালো লাগছে যে, আজকের তরুণরা আমার লেখাগুলো পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
রাজর্ষি :
আমাদের জীবদ্দশায় মারী কিরকম ভয়ংকর রূপ নিয়ে এসেছে তা আমরা কখনও প্রত্যক্ষ করিনি, এই কোভিড ছাড়া। কোভিডও কি সত্যি খুব ভয়ংকর মহামারীর রূপ নিয়ে এলো? মানে, ইজ ইট রিয়েলি প্যান্ডেমিক, ইন দ্যাট স্পিরিট,ইন ট্রু সেন্স ? আমরা কি সত্যি সত্যি একটু বেশি আতংকিত হলাম ? বুঝতেই পারলাম না, এটা কোথা থেকে কীভাবে কেন ? এটা আগামীদিনে পৃথিবীকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, নির্ধারণ করবে, তার একটা  প্রস্তুতি মনে হয় শুরু হয়ে গেলো। এখান থেকে তোমার কাছে যেটা জানতে চাইবো সেটা হচ্ছে যে, শিল্পসাহিত্য আগামী পৃথিবীতে, বিশেষ করে কবিতা--এই লকডাউন পিরিয়ডে সোশ্যাল মিডিয়ায় তো বহু ধরণের লেখালিখি হয়েছে, শুধু লেখালিখি কেন অনেক অডিয়োভিশুয়াল কাজ হয়েছে, অনেক মানুষ অনেকভাবে ভেবেছেন। এবং আমি জানি তুমি অনেকের ভাবনাগুলোকে আত্মস্থ করে, তার সাথে নিজের ভাবনাকে একটা অপূর্ব মিশ্রণে নিয়ে গিয়ে একটা সম্যক কিছু ধারণার জায়গায় গেছো। তুমি কি সেই ধারণাটা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেবে?
শংকর :
দেখো, পৃথিবীজুড়ে আজ করোনা-ভাইরাসের হঠাৎ আবির্ভাবে—সে তো একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণ, তাকে চোখে দেখা না—তবু দেখো কীভাবে নড়ে উঠেছে গোটা পৃথিবী, আমাদের সমস্ত পরিচয় বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এই পৃথিবীর সব শস্যভান্ডার, পশুখামার, বিশ্ববিদ্যালয়, আর্ট গ্যালারি, ব্যাংকোয়েট হল, মিসাইল লঞ্চার, টানেল বোরিং মেশিন, মানুষের তিনশো ফুট স্ট্যাচু আর পাঁচশো পাউন্ডের কেক, সকল সামগান, যজ্ঞবেদি, পবিত্র ক্রুশ, মঙ্গলারতি--- সবই এক লহমায় কিরকম হাত তুলে থমকে দাঁড়ালো, মৃত্যুভয়ে, অসহায় অবিশ্বাসে। যেন একটা ঘোর দুঃস্বপ্নের মতো। আজ সমগ্র পৃথিবীই যেন একসাথে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বলছে—উই কান্ট ব্রীদ! এই জৈবজীবনে আমরা সত্যিই এমন অসহায় ! এখনও।  
এবার তুমি যদি এই দুইয়ের অস্তিত্বকে মেনে নাও, এই ভাইরাস আর মহাবিশ্ব, যদি তাদের অনুভব করতে চেষ্টা করো একই ফ্রেমে—একটা ভাইরাসের মাপ হচ্ছে এক ন্যানোমিটার মানে, এক মিটারের একশো কোটি ভাগের একভাগ। আর জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এই ব্রহ্মান্ডের যতটুকু দৃশ্য, তার ব্যাস হচ্ছে নয় হাজার তিনশো কোটি আলোকবর্ষ। তার বাইরেও আছে। এর মানে, প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে ছুটে গেলে নয় হাজার তিনশো কোটি বছর কেটে যাবে, এতটাই দূরত্ব। আমি বিস্মিত হয়ে দেখছি, এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করোনা ভাইরাস কিভাবে এতগুলো দেশকে বিভেদ ভুলিয়ে, যেন এক যাদুবলে, একসুত্রে বেঁধেছে। যদি আগামীদিনে চীনের সাথে বিশ্বব্যাপী সংঘাত বাধে, যদি আবার একটা বিশ্বযুদ্ধ হয়, তবে তার স্বরূপ কেমন হবে কেউ জানি না। ইতিহাসে আগেও অনেক মহামারী মানুষ দেখেছে, কিন্তু তার সাথে আজকের কোনও তুলনা হয় না, কারণ আজ আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা পৃথিবীতে রয়েছি, মহাজাগতিক একদমই এক অন্য স্থানাংকে। আজকের পৃথিবীর পরিবেশ, প্রতিযোগীতা, যোগাযোগ, জ্ঞান, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, সবই আলাদা। তাই একথা বলার মানে হয় না যে, প্লেগ বা, স্প্যানিশ-ফ্লু তো আমরা আগেও দেখেছি।
আজকের করোনা ভাইরাসও একদিন চলে যাবে, কিন্তু তার আগে নানাভাবে ক্ষতচিহ্ন রেখে যাবে এই পৃথিবীর গায়ে। অনেক কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। কারণ সমাজ ভয় পেয়েছে। শিল্প ভয় পেয়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, ভয় পেয়েছে। মানুষের অন্তর্লোকেও প্রবেশ করেছে সেই ভয়। -তবে এই অনিশ্চয়তাকে মানুষ হয়তো একদিন অনেকটাই বশ করে ফেলবে। কিন্তু আবার একটা নতুন মারণ ভাইরাস তো আসতেই পারে। যেকোনও দিন পৃথিবীতে আবার এসে আছড়ে পড়তে পারে এক বিশাল গ্রহাণু, যেভাবে সাড়ে ছকোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়েছিল ডায়নোসররা। এভাবে একটা বিশাল সভ্যতা টলোমলো পায়ে বারবার নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে—মহাকালের স্রোতে এই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটার ক্ষণিকের সাক্ষী হয়ে থাকছি আমরা, যারা আজ মুখে মাস্ক বেঁধে এক মুহূর্ত কলম থামিয়ে ভাবতে বসেছি। প্রাত্যহিক এতখানি অনিশ্চয়তা কল্পনাতীত। তবে এর থেকে একটা নতুন অ্যাবশট্রাকশান, একটা নতুন চিত্রকল্প তৈরি হচ্ছে। একটা নতুন চেতনা। ‘ভাঙছেআশ্রয়নামকশব্দগুলো, পিপাসানামকশব্দগুলোছিটকেউঠছে।’– এটা তোআমিশরীরীকবিতায়লিখেছিলাম। এইলাইন। চল্লিশবছরআগে।
আজকের এই উদ্বায়ী সময়ে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যেটুকু কাজকর্ম নজরে পড়েছে, সাহিত্য, প্রবন্ধ, কবিতা, সঙ্গীত, সিনেমা, চিত্রকলা—কেউ কেউ পাঠিয়েছেন আমায়—কিন্তু তার প্রায় কিছুই আমাকে স্পর্শ করেনি। এর সবটাই পুরোনো ঘরদুয়ার, পুরোনো তাঁতকল, পুরোনো ভাটিয়ালি, পুরোনো শুঁড়িখানা। অনেক শর্টফিল্ম আর লাইভকাস্ট হয়েছে, কিন্তু তার সামান্যই দেখার যোগ্য।সেই একই ললিপপ, একই পপকর্ন। নতুন কোনও উন্মোচন নেই, মৌলিক বিশ্লেষণ নেই।সময় থেকে উৎপন্ননতুন কোনও বোধ এবং তার শিল্পীত প্রকাশ, সহজসাধ্য নয়। এত তাড়াতাড়ি অন্যরকম হওয়া সম্ভবও ছিলো না। তবে আজকের করোনার দিনগুলো আগামী কয়েক বছরে অনেক কিছু পালটে দিতে চলেছে। অনেক কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। যেন এক নতুন প্লেট টেকটনিক, নতুন ভূচাল, নদীর যেন নতুন গতিপথ, কফি হাউসের নতুন নিয়ম কানুন, নতুন কবিতার খাতা, নতুন ড্যান্স ফর্ম, টেলিলেন্সে নতুন ন্যারেটিভ। হয়তো আগামী একদশকে। কেউ কেউ পারবে। সবাই নয়।
আমি নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি, এই ল্যান্ডস্কেপকে একটু ওপর থেকে দেখতে চেয়ে। আমফানের চেয়ে আমার বেশী নজর রয়েছে স্পেস ওয়েদারের খবরে, কি হয়েছে আর হতে চলেছে এই মহাবিশ্বজুড়ে। যাঁরা এই সময়টা ত্রাণের কাজে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোয় ব্যস্ত থেকেছেন অথবা, করোনায় মৃতের শবদাহের ব্যবস্থা করেছেন, প্রাণ হাতে করে, বিনা পারিশ্রমিকে, তাঁরা আমার প্রণম্য। কারণ তাঁরা এই মুহূর্তের একমাত্র সৈনিক। বয়সের কারণে আমি এখন রিজার্ভ ফোর্সে। আমার বেশি চিন্তা আগামী প্রজন্ম আর আগামী পৃথিবীর শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে। কারণ আমি বুঝতে পারছি যে একটা নতুন প্যারাডাইম এসে গেছে, কিন্তুঅনেকেই এখনও খেয়াল করছি না। সম্যক চিনিনা তার স্বরূপ, কিভাবে খেলার নিয়ম বদলে যেতে চলেছে অজান্তেই। আজ লার্নিংয়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন আনলার্নিং। সমস্ত পুরোনো জ্ঞানকে ফেলে দিয়ে নতুনভাবে শিখতে হবে সব কিছু। স্পেস-ওয়েদার পালটে যাচ্ছে দ্রুত। প্রশ্ন করা দরকার। প্রতিবেশীকে নয়, নিজের মনকে, অর্জিত জ্ঞানকে, নিজেদের চিন্তাপদ্ধতিকে। যাদের এতকাল গুরু বলে মেনে এসেছি, তাদেরও।   
রাজর্ষি :
এই মুহূর্তে, আমার চোখে, তুমি সবচেয়ে বর্ণময় অস্তিত্ব। তার কারণ হচ্ছে, তোমার কাজ এবং তোমার কাজের ধারা, এবং তোমার কাজের বৈচিত্র্য। সেটা শুধুমাত্র কবিতা নয়। কবিতা, এবং কবিতাকেন্দ্রিক, এবং কবিতা থেকে উৎসারিত। এইযে তোমার কত বিচিত্র ভাবনাসমূহ, একটা খুব পরিণত বয়সে এসে—আমার যেটুকু পাঠ তোমাকে—মনে হচ্ছে যে কোথাও সে তার সমস্ত অধঃক্ষেপণ শেষ করে খুব পরিশীলিত হচ্ছে। এই পরিশীলনের জায়গাটুকু যদি তুমি একটু আমাদের বলো।
শংকর :
দেখো, আমি সেই খাগের কলমের যুগে জন্ম নিয়ে ক্রমে আজ এই ওয়েবজিন আর নেটিজেন অধ্যুষিত পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছি। কর্মজীবনে অনেক ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে। দেশি বিদেশি অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সাথে কাজ করতে হয়েছে, অনেক কিছু শিখেছি। সবচেয়ে বেশী শিখেছি আমার অনুজদের কাছ থেকে। আশির দশকের শেষে,আইআইটি খড়গপুরে সেমিনারে গিয়ে দেখেছি রোবোটিক্স নিয়ে কাজ করছে তরুণরা। আর প্রফেসররা বলছেন--এগুলো ছাত্ররাই ভালো বলতে পারবে, আমাদের কাছে এসব নতুন বিষয়, আগে কখনও পড়িনি। --এই পরিবর্তনটা আমি ঘটতে দেখেছি। তোমরা যদি আজ আমার কাজে বৈচিত্র্য দেখে থাকো, তার একটা কারণ আমার মুক্তমন এবং অনুসন্ধিৎসা। বহু বিষয়কে, ভাবনাকে আমি প্রকাশ্যে এনেছি নিজের লেখার মাধ্যমে—গদ্যে, প্রবন্ধে এবং কবিতাতেও। এই বিশ্বজগত ও তার সৃষ্টিরহস্য আমাকে ভাবিয়েছে। আমি বালকের মতো উৎসাহে টেলিস্কোপ নিয়ে শীতের রাতে কতদিন চোখ রেখেছি। আর টাটাস্টীলে আমার কর্মজীবনের পরিবেশও আমাকে অনেকটা সাহায্য করেছে। একটা প্রোগ্রাম প্রায়ই হোত—উইন্ডো অন দা ওয়ার্ল্ড-- তাতে দেশবিদেশের অনেক বিশিষ্টরা বক্তৃতা দিতে আসতেন, যেমন মহাকাশ নিয়ে বলতে এসেছিলেন ইসরোর ডাইরেক্টর ডঃ কস্তুরিরঙ্গন, জাপান থেকে এসেছিলেন উৎকর্ষতার বিশেষজ্ঞ ডঃ জেনিচি তাগুচি, মাল্টা থেকে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও মনোবিজ্ঞানী ডঃ ডি-বোনো, যিনি রক লজিক, ওয়াটার লজিক, আর ল্যাটারাল থিংকিং ইত্যাদির প্রবক্তা। কলকাতার আইএসআই থেকে এসেছিলেন ডঃ ডেভিস, তিনি সেই সত্তরের দশকের শেষদিকে দারুণ রঙিন স্লাইডশো দিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় বুঝিয়েছিলেন, কিভাবে প্রকৃতিতে সর্বত্র ক্রিয়া করছে অঙ্ক, রাশিবিজ্ঞান, ফিবোনাচ্চি সিরিজ। আমি খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম সেইকালেই। আমি তো কফিহাউসে টেবিল গরম করে আড্ডা মারার সময় পাইনি কখনো। ভাগ্যিস পাইনি। কিন্তু কর্মসুত্রেযেতে হয়েছে সমুদ্রবন্দরে, নামতে হয়েছে খনি গর্ভে। নতুন রেলপথের জন্য পাহাড়জঙ্গলের ওপর দিয়ে কত বিপজ্জনক হেলিকপ্টার সর্টি। দাঁড়াতে হয়েছে ফার্নেসের তপ্ত গলিত লোহার মুখোমুখি, রোলিং মিলের আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলে, দুঃসহ গরমে, বাস্পে ঘামে সিক্ত হয়ে,ঝিমধরা রেজা ওমজদুরদের পাশাপাশি। শ্রমিক ইউনিয়নের অনেক নেতারাই সেসব জায়গায় যাননি, দেখেননি কোন পরিবেশে কিভাবে শ্রমিকরা কাজ করে। কিভাবে কয়লা, বিদ্যুৎ, ইস্পাত উৎপন্ন হয়, পৃথিবীর কিমাকার ডায়নামো কিভাবে ঘোরে।কত কত সিমুলেশন মডেলিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান, কত বোর্ডরুম মিটিং—রেলওয়ে বোর্ড, হাইওয়ে অথরিটি, বন্দর কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও কত ওভারসিজ অ্যাসাইনমেন্টস, গবেষণাপত্র। একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেছে কর্মজীবনের সাঁইত্রিশটা বছর। তার মধ্যেই কৌরবের সাথে প্রায় পনেরো বছর,  সৃজনশীলসাহিত্যকর্মে জড়িয়ে থাকা। আমাদের প্রিয় কতকবিতার ক্যাম্প। আমি এইসব থেকে একটু একটু করে শিখেছি, তৈরী করে চলেছি নিজের সামান্য লেখাকে। প্রেমে, নির্মোহে। এভাবেই যা কিছু পরিশীলন।
আমার সহকর্মীরা অনেকেই আজ অবসরজীবনে প্যারিস-মাদ্রিদ-মালদীভ ঘুরে বেড়াচ্ছে, দিনান্তে ক্লাবে গিয়ে সুইমিংপুল, খাদ্যপানীয়, আড্ডা। কেউ আছে তাসে, অথবা গল্‌ফে। কেউ সৎসঙ্গে, প্রবচনে।-আমি আছি এই নরেন্দ্রপুরে, একপ্রান্তে, গৃহবন্দী, কবিতার সভাসমিতি ও পুরস্কারমঞ্চগুলো থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে, নিজের খেলাধুলায়। আমার সামনে আছে অসীম বিশ্বব্রহ্মান্ড, আর আমার আছে অসীম আগ্রহ। আর মাত্র কয়েকদিন পরে, এই জুলাই মাসের শেষেই নাসার মহাকাশযান-- যার নাম মার্স ২০২০ পার্সিভিয়ারেন্স--রওনা দেবে মঙ্গলগ্রহের দিকে। সেই যানে আমার লেখা প্রথম গদ্যটির নাম খোদিত আছে লেসার বীম দিয়ে ; নাসা আমায় তার বোর্ডিং পাসও পাঠিয়ে দিয়েছে। শুরু হয়ে গেছেতাদের কাউন্টডাউন। সাত মাস পরে,লাল গ্রহের যেখানে গিয়ে নামবে সেই জায়গাটা ৫০ কিলোমিটার ব্যাসের একটা শুকিয়ে যাওয়া হ্রদ, তার নাম ‘জেযেরো ক্রেটার’। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার একটা ছোট্ট শহরের নামে তার এই নাম দেওয়া হয়েছে। দারুণ নতুন ব্যাপার। আমাকে আকর্ষণ করে।
রাজর্ষি :
আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক—শুধুমাত্র প্রদেশ, দেশ, বা পৃথিবী নয়-- হয়তো মহাজাগতিক একটা পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। এবং সেই পরিবর্তনের নিরীখে মেধাবী মানুষ আরও কোনও সমুচ্চতায় পৌঁছবেন। তাঁরা পৃথিবীকে এই নব্যসঞ্জাত জ্ঞান দিয়ে হয়তো বিচার করার চেষ্টা করবেন। আমরা থাকবো কি থাকবো না গুরুত্বপূর্ণ নয়, ব্যক্তি কখনোই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্যক্তির যে সৃষ্টি, সেই সৃষ্টিই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হবে, কথা বলবে। সেই সৃষ্টির জায়গা থেকে তোমার মনে হয় কি যে, আমাদের এই যে চিরন্তনের প্রতি সন্ধান, সে কিএকটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল করবে ? এবং সে আগামী মহাবিশ্ব, বিশ্ব প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে, জগৎ,জাতি, সমস্ত জীবগুলোর দিকে তাকিয়ে। সেই মেধা সঞ্জীবন কোনদিকে যেতে চাইবে ? হুইচ শুড বি দা ডিরেকশান, অ্যান্ড ম্যাগনিচিউড ? মানে, এই সবটুকুইসৃষ্টির নিরিখে, যে সৃষ্টির কথা বারবার ধরে বলা হয়েছে। ব্রহ্মান্ডের রহস্য ও অপার জগতের কথা বলা হয়েছে। আমি সেই সমস্তটুকু ধরে, তোমার এই সমস্ত অনুসন্ধিৎসু মন, তাকে সামনে রেখে এটাই আমার শেষ প্রশ্ন তোমার কাছে।
শংকর :
হ্যাঁ, মহাজাগতিক পরিবর্তন তো হয়েই চলেছে। মানুষের মেধা ও অনুসন্ধিৎসা তাকে আরও উৎকর্ষের শিখরের কাছে নিয়ে যাবে। কিন্তু এই পৃথিবী কতদিন বাসযোগ্য থাকবে, বলা যায় না। আকস্মিকের জন্যও তো প্রস্তুত থাকতে হবে। তাই এখন থেকেই সন্ধান চলছে ব্রহ্মান্ডের অন্যত্র, উন্নত পরিবেশ ও উন্নত প্রাণজীবনের। এই সব বিষয়ে একটা ধারাবাহিক লেখা শুরু করেছি অপরজন-এ। অনেক কিছু নিয়েই আলোচনা করা যায়। যতটুকু এখন জানা যাচ্ছে, ততটুকুই। কাল হয়তো এর অনেকটাই আবার নতুন করে জানতে হবে। একটা প্যারাডাইম চেঞ্জের কথা অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছে। সেটা নিয়ে আজ কিছু বলতে গেলে দীর্ঘ হয়ে যাবে। পরে কখনো লিখবো ;যেভাবে তুমি প্রশ্ন রেখেছ আগামী মহাবিশ্ব নিয়ে, জানতে চেয়েছ—‘হুইচ শ্যুড বি দা ডিরেকশান?’ একজন কবির দৃষ্টিকোণ থেকেই তো।  
রাজর্ষি :
খুব ভালো থেকো। সতত কাজের মধ্যে থেকো। আমি নিজেকে খুব গর্বিত মনে করি যে আমি হয়তো তোমার কিছুটা সান্নিধ্যে আসতে পেরেছি। এই পর্যন্ত, এটা আমার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। আমি রথী মহারথীদের বাড়ি যাইনি। আমি বুধ রবি-- হো হো হো-- কোনওভাবে--এইসমস্ত দিন, দিনান্তরাল, অনুশীলন সমিতির মতো করে—মানিনি, মান্যতা দিইনি। তবে তোমার সান্নিধ্য আমাকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে। সবসময় তোমার কাছে আমার সেই কৃতজ্ঞতা।