এই যে গন্তব্য-হীন বেঁচে থাকা এর মধ্যে একটা লম্বা শিক্ষা টান টান হয়ে শুয়ে থাকে দুপুরের বারান্দায় গা ঢেলে দেওয়া রোদের মত। দাগ কাটা কাঠের মেঝের খাঁজ প্রথমে গভীর ও তারপর ঢাউস হতে হতে ঢেউ হয়ে যায়, ঘর আর ঘরে থাকেনা - মনে হয় অথৈ সমুদ্র। নিজেকে মনে হয় নীলচে সবুজ জলে পাক খাওয়া কলম্বাসের অনুসন্ধিৎসু জাহাজ। এ ঘর থেকে বেরিয়ে ও ঘরে যাই; নির্জনতা হাতড়াই; সোফার পায়ে পা লেগে হোঁচট খাই। নতুন কিছু খুঁজে পাই। টেবিল ক্লথে লেগে থাকা কবেকার স্বাদ-ভুলে-যাওয়া মাংসের ঝোলের আচমকা দাগের মতো। নিজের সাথে নিজের এই খুঁজতে থাকার অবিরাম খেলাটা সরল; অথচ পরম শিক্ষার। ছোটরা যেমন টলমল করে তারপর হটাত আবিষ্কার করে দু পায়ে দাঁড়ান যায় আমিও সেরকম হটাত লক্ষ্য করি আয়নার আমি’র কপালে নতুন প্রশ্নচিহ্ন। চোখের ভুরু কেমন যেন বদমেজাজি একা। কলম্বাস এরকম একদিন হটাত ভাসতে ভাসতে ক্যারিবিয়ান কোন এক নাম না জানা দ্বিপে ধাক্কা খেয়ে আবিষ্কার করলেন উনি ভারতে এসে পড়েছেন। এখানে নদীর জলে সোনা ভাসে। সোনা ভাসে আকাশে সূর্য ডোবার অল্প আগে।

এমনিতে রোজকার রোজগারের ফাঁকে নিজেকে পাওয়া দায়, নিজের ঘরকেও। যেমন দেখা হয়ে ওঠেনা অফিস আসা যাওয়ার পথে আস্ফাল্টএর ব্রিজের ওপারে দিগন্ত টানা হলদেটে ঘাসের নিরেট বুনন, সবুজ অন্ধকার টাঙ্গানো ঘিঞ্জি গাছ পরিবার, কিম্বা পথ হারিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকা মজা নদী। চোখ মেললে হয়ত ঠাওর হবে অগণন বৌদ্ধ ভিক্ষুক সার বেঁধে চলে যাচ্ছেন; একাগ্র হলে শোনা যাবে মুছে যেতে যেতে হাওয়ার কানে কানে বলছেন “শরনম গচ্ছামি”। প্রতিটা দিন মুছে যেতে যেতে কিছু বলে যায় ঠিক। আমরা কি শুনেছি কোনোদিন?

আমার শহরের বিকেলে সোনা লেগে থাকে বাগানে বাগানে। গোড়াপত্তনে জার্মান হলেও সিনসিনাটি আদতে ল্যাটিন নাম। রোমের মতোই সাতটা ছোট টিলার ওপর বর্ষীয়সী রূপসীর মতো অলস শুয়ে থাকে। দূরের আকাশ দেখে। ভেঙ্গে পরা শরীরের এখানে ওখানে ফুল গাছ গজিয়ে ওঠে বসন্তের শুরুতে। আমেরিকায় করোনা যেদিন এলো সিনসিনাটির চোখে সেদিনও শীত ঘুমের রেষ। অন্য বছর এ সময়ে মোটা বরফের চাদর থাকে। এ বছরটা যেন অদ্ভুত রকম ভাবে আলাদা। শীতে তুষারপাত না হওয়াটাই ছিল অশনি সংকেত। আমি কলকাতা থেকে ফিরি জানুয়ারির ১৭ তারিখ প্যারিস হয়ে।  কোথাও কিছু অস্বাভাবিক চোখে পড়েনি বরং ব্যাঙ্গালুরু এয়ারপোর্টে দেখেছিলাম ইয়েলো ফিভার নিয়ে সতর্ক বাণী। আমেরিকা দ্রুত আসন্ন ইলেকশনের কথা ভেবে রং মাখছিল, লাল নীল। বার্নি স্যান্ডার্স যেন সেই পুরনো জাদুকর ইন্দ্রজাল জানা; সমাজবাদের ছায়া লম্বা করে ফেলছিলেন ডিনার টেবিলে। তার নাগাল পেরতে ছুটছিল স্টক মার্কেট। ছুটতে ছুটতে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছিল। হুলোর তাবেদাররা কোমর বেঁধেছিল অর্থনীতির দোহাই পাড়বে বলে। আর ভারতে বসে সোনালী রোমের হুলো স্বামীজীর নামের বিকৃত উচ্চারণ করে সোশাল মিডিয়াকে খোরাক যোগাচ্ছিল। ঠিক এরকম একদিন কাল কফির সকালে অফিসের মেইল নিয়ে এলো সাবধান বাণী। আমি কাজ করি আমেরিকার সরকারের ‘সেন্টার্স ফর ডিসিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ এ। যারা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে পৃথিবীর আর আমেরিকার দিক নির্দেশ করে। প্রতিবছর ফ্লু সিজনে লোক মরে বিস্তর আর প্রতিবছর ডিসেম্বর নাগাদ আমাদের সচেতনতা বাড়ে হতে পারে প্যান্ডেমিকের কথা ভেবে। এই বুঝি কোমর বাঁধার সময় হল। পৃথিবীর অনেক কিছুর মতোই এই ধরনের ভাইরাস গুলো নিয়ম মাফিক ফিরে আসে। অথচ আশ্চর্য রকম ভাবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরণের সাবধানতায় হ্রাস টানা হয়েছিল। করোনাও আক্ষরিক অর্থে রানীর মতো সুযোগ পেয়ে গেল রাজত্ব বাড়াবার।

পৃথিবীর বড় বড় দেশগুলো ছোটো হতে হতে আরও ছোটো হয়ে যাচ্ছিল ইদানীং। একদিন গুটিয়ে নিলো নিজেদেরকে নিজেদের ভিতর। মানুষও পাল্লা দিয়ে ছোটো হচ্ছিল। ক্ষুদ্র হতে হতে নিজেকে মুঠো ফোনের মধ্যে ঢুকিয়ে নিলো যেদিন ঠিক সেদিন একটা অদৃশ্য জীবাণু দেশগুলোকে আর তার ভিতরের মানুষগুলোকে আয়নার সামনে দাঁড় করাল।

আমি ফিরে আসার পর ইউরোপে বাড় বাড়ন্ত শুরু হল।  ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ারডনেসের জন্যে বলা হল আমাদের অনেককেই যেতে হবে রোগ নির্ণয় ও মোকাবিলায়। ইতালি যাওয়ার আশায় মন নড়ে বসল। চোখ জুড়ে সবুজ ঢেউ এর মতো আঙুরের ক্ষেত আর ক্ষেতের মাথায় লাল টালির বাড়ি, গায়ে অলিভের চামড়ার মত মসৃণ রোদের নকশা। অদ্ভুত মায়াবী আলোয় দাঁড়িয়ে পাথরের মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিড। দেবতারাও এত সুন্দর মানুষ বানাতে পারবেনা কোনোদিন। সাদা পাথরে কি করে রাখা যায় সূর্যের সাত রঙ। মানুষের মনের রঙের মিশেল। মানুষ যে মানুষের ভাগ্য গড়ে দেবে কোনও দেবদূত নয় তার সাক্ষর বহন করে শরীরের অনুপাতে বড় হাতের পাঞ্জা। মাইকেল এঞ্জেলো নিষ্পাপ পাথরে দেখেছিলেন রেনেসাঁসের অন্তরাত্মা। যে রাতে ডেভিডের হাতের স্বপ্ন দেখলাম সে রাতে বুঝিনি বিপদ দোর গোরায়। দরজা টপকে শমন খাটের নিচে।

          আচমকা বরফ পরা সকালে ঘুম ভেঙ্গে টের পেলাম ফুসফুসে অক্সিজেন ঢুকতে হিমসিম খাচ্ছে। ডিপ্লয়মেন্ট এর তালিকা থেকে বেরিয়ে ঢোকান হল গৃহবন্দীর তালিকায়। বলা হল নিজের বাড়িতে আটকে থাকো। সংক্রমণ হল কি হলনা মাপার যন্ত্র নেই, হলেও বা কি - ওষুধ তো নেই। পনেরো দিনে সমস্ত পৃথিবীটাই বদলে গেল। গোটা আমেরিকা তখন ঘরের ভিতর আটকে। আকাশ গভীর নীল আর উঠোন পেরলেই ঘাসের মোটা সবুজ চাদর। বসন্ত এসে গেছে। অথচ ফুল বালিকারা এলো কই? রাস্তায় ডাকগাড়ি আসেনা। দোকান খুলতে দোকানি আসেনা। ট্রাম্পের রাশভারী অর্থনীতির দ্রুতগামী ট্রেন প্রচণ্ড শব্দ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কোনও এক সস্তার হরর মুভির ঘোস্ট টাউনের সেটে। ছোটবেলার রেলে হাত নিশপিশ করত চেন দেখে, ভয়ে টানা হয়নি কোনোদিন, বড়বেলায় এসে দেখলাম ভাইরাস চেন টেনে দিল এক নিমেষে।

মুশকিল হল আপদে গরিবের গায়ে আগুন লাগে বেশি। রাজা নিজের জমিদারীতে বসে কিছুদিন কাটিয়ে দিতে পারে এ ঘর ওঘর করে। দীনহীন মজুরকে যেতেই হবে কাজে।  জীবিকা ছাড়া জীবন সে রাখে কি করে। জীবিকা আগে না জীবন আগে? ডিম আগে না মুরগি? এ ক্ষেত্রে মরণ দুদিকেই। এখন পর্যন্ত যতজন হারিয়ে গেছেন আদমশুমার থেকে তাদের মধ্যে আমেরিকার দরিদ্র নীল আর লাল রঙের মানুষ সবচেয়ে বেশি। শাদা হলুদ বা বাদামি মানুষের তুলনায় এরা দুঃস্থ অনেক বেশি। স্বাস্থ্য আর অর্থ দুদিক দিয়েই। কিছু শাদা লোক একদিন কিছু নীল রঙের মানুষকে কে ধরে বেধে নিয়ে এসেছিল তাদের জমি তে বেগার খাটতে। এই জমি তারা পেয়েছিল সেই সব লাল মানুষদের মেরে যারা এই মাটিকে পেয়েছে তাদের বাপ দাদাদের থেকে। যারা এ মাটির আদিম গল্প জানে। এইখানে ছিল আন্ধার জগত নইওদিলহিল।[*] কাল মেঘের ভিতর যে জীবন ঘুমিয়ে ছিল একদিন সাদা মেঘের ধাক্কায় তা প্রাণ পেল। জন্মাল প্রথম মানুষ ‘আতসে হাস্তিন’ আর সাদা ভুট্টা দহন্তিনি। আতসে হাস্তিন না হয়ে নাম হতেই পারে তাওয়া, বা আদিম সূর্য। একদিন অন্যরকম রোদে এরকমই নীল লাল মেঘের হলুদ ধাক্কায় জন্মাল প্রথম নারী ককিয়ানহুতি। জন্মে ককিয়ানহুতি দেখল তার হাতে হলুদ ভুট্টা প্রেমিকের ঝকঝকে হাসির মত। কেউ বলে ককিয়ানহুতি মাটির ঢেলা দিয়ে ছোট ছোট মানুষ বানাল কেউ বা বলে ককিয়ানহুতি সমুদ্র-নীল পাথর ঘষে ডাক পাঠাল আতসে হাস্তিন কে। আতসে হাস্তিন তার হাতের চকমকি ঠুকে একইরকম ডাক পাঠাল তার সাধের নারীকে। তাদের সঙ্গম থেকে জন্মাল “দীনে”। পবিত্র মানুষ। বহু বছর পেরিয়ে একদিন সাদা দীনে এসে তাদের ঠেলে দিলো নিম্নভূমির জলের গন্ধে যেখানে তাদের সাধের ভুট্টা দাঁড়ায় না। কম খেতে খেতে তারা বেঁচে থেকেও মৃত। অশ্রু পথের শেষে। তাদের শুকনো শরীর চিনি মেশা রক্তে জল জমা ফুসফুসে ভাইরাস দানা বাঁধবে এ আর নতুন কি। আমেরিকার লাল নীল রঙের পতাকায় সাদা ছোপগুলো আসলেই পৃথিবীর বুকে অমানবিকতার ছোপ। মানুষের ক্রমপরিনতির বুকে ভাইরাস দানা বেঁধে বসে আছে অনেক আগেই।

১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর থেকে আজকে আসতে একশো বছরের হাঁটা পথ। হিরু ডাকাতের রনপা বাঁধা পা-য়ে পৃথিবী পেরিয়েছে তারচেয়েও বেশি। হিরোশিমা নাগাসাকি টপকে মানুষ যে কখন মঙ্গলে চলে গেলো চাঁদ ছুঁয়ে, মহাকাশে কাটালো বছরের পর বছর। যেখানে পা পৌঁছায়নি সেখানে নিজেকে পৌঁছে দিয়েছে অন্তর্জলের মাধ্যমে। আর ঠিক তাই আজ ঘরে আটকে পড়েও আমেরিকার ৩৭ শতাংশ লোক রোজকার জীবিকা নির্বাহ করে যেতে পারে। তবুও বিধির বিধান খণ্ডাবে সে কি এমনি শক্তিমান।  মানুষ যত চেষ্টাই করুক কোন না কোন সময়ে এসে সে ঠিক জেনে যাবে আসলে সে প্রকৃতির হাতের পুতুল কারণ তার মস্তিষ্ক প্রকৃতির তৈরি। পৃথিবীর ইতিহাসের তুলনায় মানুষের ইতিহাস বড় ছোটো। ভাইরাস মানুষের আগেও ছিল, পরেও থাকবে। হয়ত বা জীবনের স্পন্দন ওদের থেকেই শুরু। হয়ত জীবন শেষ হবে একদিন ওদের হাত ধরেই।           

খারাপের মধ্যেও ভালো থাকে। কানেকটিকাট ইউনিভার্সিটির পেইন্টিং এর প্রফেসর বিখ্যাত ক্যাথরিন মায়ের্স  বলেছিলেন অন্ধকারের রং চিনতে গেলে তার ভিতরের আলোর রেখাকে সূক্ষ্ম ভাবে আলাদা করতে হয়। আবছায়া ঘরে তেল রঙের গন্ধ চুয়ে পরে ইজেলের গায়ে। নগ্ন মডেলের অন্ধকারাচ্ছন্ন দেহে পিছলে পরা অলিভ আলো দেখতে দেখতে ক্যাথরিন বলেছিলেন মানুষের শরীরের গায়ে যে সব রঙ থাকে তাকে চিনতে গেলে অন্ধ হতে হয়। অন্ধ হয়ে থাকতে থাকতে অন্ধকার ঘরে আলোর দরদী দৃষ্টি ফুটে ওঠে। এঞ্জেলোর ডেভিড আর সাদা শ্বেতপাথরের থাকেনা। তার প্রতিটি পেশি তে সবুজ নীল লালের দৃষ্টি লাগে। রক্ত ছুটে বেরায় তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। ঘর বন্দ মানুষ একই রকম ভাবে নিজেকে ও তার চারপাশের নিজেদের সম্পর্ক গুলোকে চিনে নেওয়ার অবকাশ পাচ্ছে এখন। সেই সব সম্পর্কগুলো যেগুলো বাজারের চাপে মুচড়ে যাচ্ছিল।  নিজেদের জীবন কে পর্যালোচনা করার সুযোগ বেশি আসেনা।  আমেরিকায় মানুষ ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা আমেরিকাকে গ্রেট বলার আগে দুবার ভাববে। কলকাতার মানুষ যারা সেলেব্রিটি পূজা করে অভ্যস্ত হটাত আবিষ্কার করছে  পাশের বাড়ির সাধারণ রানু অমুক গায়িকার থেকে ভালো গায়।  নামী কবিরা যারা ফেইসবুক কবি বলে অনামিদের হেয় করতো তারাও ফেসবুকে কবিতা পাঠাচ্ছে বা পাঠ করছে।  স্টক মার্কেট কারেকশনের মতো পৃথিবী একটা বড় সড় কারেকশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই ত সময় যখন শিল্পীরা বাজার ছেড়ে শিল্পের কাছে ফিরে আসে। প্রাচীন আলোয় বসে বৌদ্ধ ভিক্ষুক নাগারজুনা বলেছিলেন তোমার অস্তিত্ব আমার সাথে বাঁধা – একে অপরের পরিপূরক। এই বাধনটা না থাকলে আসলে সবই অন্তঃসার শূন্য। ভাইরাস ভাইরাসের ধর্মে মানুষ মানুষের ধর্মে ফিরুক। পৃথিবী খুঁজে নিক তার নিজস্ব গতি। ধম্মম শরনম গচ্ছামি।      

          


[*] রেড ইন্ডিয়ান নাভাজ বা হোপই রুপকথা থেকে।

Dhammam-Sharanam-Nayadashak