আমার শৈশব যেখানে কেটেছে সেই জায়গাটার নাম বিধানপল্লী। পূর্বঙ্গের থেকে আসা উদ্বাস্তুদের বেঁচে থাকার লড়াই ছিল সেই মাটির কণায় কণায়।এখনকার মেট্রোর গীতাঞ্জলী স্টেশন দেখে তাকে চেনা যাবেনা। সেখানে জোয়ার ভাঁটা খেলতো। থাকতো জেলেদের ভীড়।আমরা বলতাম আদিগঙ্গা।রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকতো নিমগাছ। সেখানে পাক খেতো দড়িতে বাঁধা ছাগল। মেয়েরা পুকুর থেকে স্নান করে সেই পথে মাটির কলসী নিয়ে ঘরে ফিরতো। আমার মামাবাড়ীর বারান্দায় মনসামঙ্গল পাঠ করতেন আমার দিদিমা। তাকে ঘিরে বসতো আশেপাশের মেয়েবউরা। বরিশাল থেকে চলে আসা মানুষের শিকড়ের টান তখনও তাজা। রয়ানির অভ্যস্ত পাঠ তাঁরা বুকে আঁকড়ে ছিল। দিদিমা কিছূটা পড়ছেন আর সবাই ধুয়ো তুলছেন ‘মনসা গো মা’। একদিন দিদিমাকে সকাল থেকে দেখলাম ব্যাস্ত। জিজ্ঞাসা করলাম, আজ কী হবে গো? দিদিমা বললেন ,আইজ লখিন্দররে মারুম। এইভাবেই  মাটির দাওয়ায় বসে আমার শৈশব দেখেছে ধর্মাচরণ। ঘন্টা কাঁসর শাঁখের ধ্বনি নিয়েছিল উৎসবের আনন্দ হিসেবে। আদিগঙ্গা পূজা মন্ডপের দূর্গা পূজোর জন্য মূর্তি তৈরী হত এমনই আর একটি মাটির বারান্দায়। খড়ের কাঠামো থেকে প্রতিমা হয়ে ওঠার প্রতিটি পল উপভোগ করেছি তখন। এইসব ধারাবাহিক ছবি। আমার মনে যে ধর্মভাবনার বীজ পুঁতেছিল, সেখানে ছিল পরম আনন্দ। কোথাও কোনও বিদ্বেষের আঁচ পর্যন্ত পাইনি।কবিতা নিয়ে লেখালিখির শুরুতেও কখনও ভাবিনি এইসব নিয়ে লিখতে হবে একদিন। আমার চারিপাশটা যত বাড়তে থাকলো তত নজরে এলো কোথাও কোথাও যেন আমাদের মধ্যে এই ধর্ম আচরণেই বিভেদ রয়েছে। কিছু শক্তি কীভাবে বিচ্ছিন্নতা আনতে চায় একে অবলম্বন করে স্পষ্ট হয়ে উঠলো ধীরে ধীরে। কবিতাজীবনের রহস্যময় জগতে বারবার অনুপ্রবেশ ঘটেছে এই সংশয়ের।লেখার মধ্যেও মাঝেমাঝেই সেইসব ছুঁয়ে গেছে।


সনাতনী

ঝোলানোর উত্তম ব্যবস্থা নিয়ে আমি ভাবি কমন্ডলু এক আধুনিক বিষয়
সরুগলা দিয়ে জল যথার্থ পড়ে ভালভাবে
ধর্মটুকু বাদ দিলে ধাতুমূল্যে তার বহুকিছু খাদ্যদ্রব্য হবে

উপবীত নিয়ে আমি ভাবিনি কখনও
যদিও দড়িদড়া হামেশাই ব্যবহার করে আমি
কিছুদিন সুতোর দিকে গেছি

সুতো এক সূক্ষ্ম বিষয় যার প্রতি মনোযোগ
তাঁতীদের সবচেয়ে বেশী

ধর্মশিক্ষার এসব পর্যায় পার হতে এতদিন গেল

(লক্ষ করার বিষয়ঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ১৯৯০)


সূর্যপ্রণাম

জল তারই অপেক্ষায়   তখনও
অন্য কাউকে গ্রহন করেনি

আলো তারই অপেক্ষায়   তখনও
কিছুটা গোপন

তিনি এলেন
ডুব দেওয়ার পর ভেসে আসা  পাতায়
জল দিয়ে আঁকলে ওঁ

(তরুনতম কবিকেঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ১৯৯৯)

 

বিসর্জন

ফুলগুলি ঢেউয়ে ভেসে যায়
জলের আড়ালে থাকে প্রতিমার মুখ

ডুব দিয়ে প্রতিমাবাহক দ্যাখে
দৃষ্টি বরাভয়
জলেভেজা তৃতীয় নয়ন

(তরুনতম কবিকেঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ১৯৯৯)

ছাত্রজীবন মানে যে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গন্ডী নয় এই বোধ কবিতাজীবনের শুরুতেই হয়েছিল। রামায়ন মহাভারত থেকে শুরু করে সমস্ত পড়াটুকুর সাথে দ্যাখাটুকুকে মিলিয়ে নিতাম।আমার চারিপাশে যে মা বোনদের লক্ষ্মীপুজো ধান দূর্বার সাথে দেখেছি তাদের খুব স্বাভাবিক ধর্ম আচরণের মানুষ বলে মনে হয়েছিল। আজো মনে হয়।কবিতায় পথ চলা লিখতে গিয়ে এতসব কিছু আসছে কেননা আসাটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে।কবিতাজগৎ চারিপাশের পৃথিবীকে বাদ দিয়ে নয়।তা সে চেতনা অবচেতনা বা অতিচেতনা যা ই হোক।প্রতি মুহূর্তে মনে হয় যা দেখছি যা শুনছি তা সত্যি নয়।সে সত্যের সন্ধানেই তো কবিতার রহস্যময় পথে হাঁটা।মানুষ প্রকৃতি মিশে যে আড়ালটুকু রেখেছে তার খোঁজ একমাত্র কবিতার পথেই পাওয়া যায়।

       
কুরুক্ষেত্র

মহাভারতের মত মহাকথা সবাই পড়েছে এ অতি আনন্দবিষয়
বিশেষ উঁচু হয়ে ওঠা শব্দগুলির প্রতি সবার আগ্রহ
শব্দ খুঁড়ে যা পাওয়া গেল তা নিয়ে গোপনতা কেন
তীর ও ধনুকগুলো জঙ্গলমহলে আছে    সকলেই জানে
    
(বাকি অংশটুকুঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ২০১২)

 

ভরাট

দু চোখ বুজিয়ে দিয়ে গড়ে উঠছে প্রার্থনা
কান্নার জল ধরে রাখার গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে
ফুল ধূপ ঘন্টাধ্বনি  দুহাত বুকের কাছে নিয়ে আঁকছে

(বাকি অংশটুকুঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ২০১২)

 

ভাসান

অন্তিমে সরে যাচ্ছে এক একটা হাওয়ার ঢেউ
নিবেদনের পূজাগুলি অনায়াসে সরে যাচ্ছে
জলভেজা পুরনো কাঠামো নিয়ে আমরা ফিরছি

(উদ্দেশ্য বিধেয়ঃএখন বাংলা কবিতার কাগজঃ২০১৬)

যখন ধর্মচিহ্ন মনুষের মধ্যে ভেদরেখা টেনে দিতে চাইছে,তখন একজন কবিতার পথে হাঁটা মানুষও বা কীভাবে নিজের দৃষ্টিকে এসবের থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে।অথচ জীবনযাপনের জন্য সকলেই একই পথের পথিক। সেখানে মন্দির মসজিদ গির্জা কোনও তফাৎ আনতে পারেনা।একজন কবিতা লেখক কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য না হলেও সে অরাজনৈতিক নয়।তাই আমিও পীড়িত হই যখন দেবতার নামে রাজনৈতিক শ্লোগান ওঠে।ভিন্নধর্মী মানুষকে একটি ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হত্যা করা যায়।কবিতার সেই পথে চলাটা তখন খুব কন্টকাকীর্ন হয়ে আসে।নিজের মানসজগৎকে পরিচ্ছন্ন করে নিতে হয়।


ধোঁয়া

ছুটে আসছে পূজারীর সাইকেল
মেশাড়া গ্রামের সবুজ থেকে জাতীয় সড়কে
এইভাবে তার বাবা কোনদিন শহরের দিকে
ছেলের জন্য রাখা ছিল সাইকেল
দড়ি বাঁধা সিট আর কাঠের প্যাডেল

উঁচিয়ে উঠছে হাঁটুর হাড়
নামাবলী জড়ান শালগ্রামশিলা

রেঞ্চ হাতে ব্রাহ্মণ গিয়েছিল প্রকল্পের কাজে
আমরা দেখেছি তার পেশী শক্ত হল দুদিনেই
আর ধোঁয়ার পোষাক পরে আশ্চর্য
যন্ত্রমানুষের নড়াচড়া

এসবের মধ্যে মেশাড়া অন্ধকারে ভিজে থাকে
চকচকে আঁশে ঢাকা জাতীয় সড়ক থেকে দূরে
মন্ত্র ভেসে আসে ঘণ্টাধ্বনি
মাঝেমধ্যে কয়েকটা সাইকেল

(নীলমাছিদের গানঃমহাদিগন্ত প্রকাশনীঃ১৯৮৬)

কবি কি ধর্মবিহীন মানুষ, তার কোনও ধর্ম পরিচয় নেই? মনে হয় শুধু কবিতা কেন, শিল্পের কোনও ক্ষেত্রেই তা  নেই। তাঁর পরিচয় কোনও ধর্মচিহ্নে নয়।সে কেবল জানে মনুষ্যত্ব।সে মানবিক ধর্মই তাকে সেই অনন্তের  সন্ধান দিতে পারে। যখন প্রবল হয়ে উঠছে ধর্মীয় মৌলবাদী প্রবণতা তখন কবিকে পথ হাঁটতে হয় তাঁর নির্ধারিত পথে। প্রচলিত ধর্মীয় অনুশাসনে নয়।

 

কৃষ্ণরূপ

ব্যালকনির দুচারটি টবে তুলসী দূর্বা ও নয়নতারা ফুটে আছে
সকালে বিকালে তাতে জল ঢেলে যা যা চেয়ে থাকে মনীষা
তা বাগানময় ফুল আর সাদা জ্যোৎস্না

সেখানেই আজ কুঠার আর রক্তপাতের লালসায় শ্মশানচারণা


পরিচয়

কোনও চিহ্ন বহন করিনি বলে
তোমরা ধর্ম ও স্বজাতির কথা বলেছিলে
আমাকেও লুটিয়ে পড়তে হবে একদিন
মাটিতে আঁচড় কেটে
আঙুল কি লিখবে তখন অবিশ্বাসের কথাগুলো?

(জরুরি বৈঠকঃ ঐহিক প্রকাশনীঃ২০২০)

 

প্রবণতা

ঈশ্বরের শুরুতে দীর্ঘ ঈ-কার ব্যবহার
যাবতীয় মনোযোগ নাড়িয়ে দিয়েছিল

কাকে আহ্বান করব

যে সরল বানানে কোনও হাত ধরে ফেলতে পারি
তা লেখায় প্রতি পদে এমন নিষেধ
চুপ করে যেতে বলে
ধ্যানমগ্ন হতে বলে পদ্ধতি মেনে

আকারে যত হ্রস্ব ছিল তা নিয়েই বসে আছি মধ্য চারিপাশে

(জরুরি বৈঠকঃঐহিক প্রকাশনীঃ২০২০)

কবিতায় পথ হাঁটতে গিয়ে অনবরত চারিপাশের মানুষ,তাদের জীবনযাপন বিশ্বাস ধারনার সাথে একজন কবিতা লেখকে মিলিয়ে নিতেই হয়।সেখানেই শুরু হয় সংঘাত। মনোজগৎ ক্রমশঃ একান্তই নিজস্ব লালনের জায়গা হয়ে ওঠে। সেখানে ভাষার সামান্য পুঁজি নিয়ে হেঁটে যেতে হয় প্রকাশের স্বনির্দিষ্ট পথে। কবির ধর্ম কী? সে কি কেবলই সুন্দরের পুজারী,আনন্দ সন্ধানী? নাকি প্রকৃতি সমাজ সম্পর্ক এবং এর অসাম্যগুলিকে নিয়ে মুখরিত হওয়া?

কিন্তু যে ধর্ম মানুষের সৃষ্টি,যাকে মানুষের প্রভুত্বকামী মানসিকতা নানান গন্ডীতে বেঁধেছে, তাকে মেনে নেওয়াও কবিতার পথ হাঁটায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে। তাই সেই কপট ধর্মের খোলস ছেড়ে কবিতা লেখক ধার্মিক হতে চান মানবধর্মে।