‘‘মূলত আমি একটা ভাষার মধ্যে বাস করি। আমার চিন্তার সবকিছুই ভাষা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। তাই ভাষা তার সব দৈবচয়ন নিয়ে কীভাবে হাজির হতে পারে একটি টেক্সটে এবং তৈরি করতে পারে ইউনিক টেক্সচার- মূলত এ সবই আমাকে ঠেলে দেয় নতুন কিছু খোঁজার দিকে। আমার সমস্ত দ্বৈরথ তাই ভাষার সাথেই; আইডিয়ার সাথে নয়। আর ব্যক্তিগতভাবে আমি ভার্সেটাইল প্রকরণে বিশ্বাস করি। কোনো একক স্কুলের প্রতি আমার দাসত্ব নাই। যেহেতু টেক্সটই পড়তে চাই আমি তাই সেইটা কোন স্কুলকে বিলং করে সেটা আমাকে বদার করে না। তাই, নানান প্রকরণে টেক্সটকে সাজাতে চেষ্টা করেছি।’’- হাসান রোবায়েত

বিশ্বকর্মা পূজায় অনেক বছর পরে আমি কোচবিহারে,ছোট্টবেলায় এনবিএসটিসির বিশ্বকর্মা পূজা মানে আমার কাছে দূর্গাপূজার চেয়েও বিশাল কিছু কেননা তখনো কলকাতার দূর্গাপূজা দেখা হয়নি।পঞ্চাননের সাথে সারাটা শহর ঘুরলাম কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়া লাগলো প্রিয় শহর ও পূজা! বেশি বড় হয়ে গেছি বোধ করি। কিংবা…

মিমির হাতের যত্ন দিয়ে বানানো কফি খেয়ে ফিরে এসেছি আশ্রমে। আশ্রম ও বদলেছে,বদলায়নি শুধু সাড়ে নয়টায় রাতের খাবার ও দশটার পরের নীরবতা। বাইরে অবশ্য অনেক আওয়াজ সেটা আগে ছিলো না। কলকাতা থেকে তরুণ কবি হাসান রোবায়েতের প্রথম বই নিয়ে এসেছি,বছর দুই আগে বেরিয়েছে বাংলাদেশের একুশে বইমেলায় চৈতন্য থেকে। আগ্রহ জন্মাতো না দুই বাংলার কবিদের মুখে বেশ নাম শুনছিলাম সঙ্গে দুইটা সমালোচনা তার একটা হল দুর্বোধ্যতা আরেকটা হল ইসলামধর্মী-গন্ধী কবিতা। দার্শনিক দিক দিয়ে যেন একটু পেছনে ফিরছেন কবি এমন অভিযোগ।

আশ্রমের নির্জন রাতে সেই পরিচয় হলো-

“একদিন, অশ্বেরা ঘরে ফিরে গেলে জ্বলে ওঠে তোমার পেতল

কোথাও কোন গল্পে হয়তো পেকে আছে

লুব্ধ দৃষ্টির প্রতিবেশী।

গমের জাহাজ এক ডুবে গেছে রেডিওর নবে।” (স্বাভাবিক চ্যানেল)

“কী অসংখ্য চোখ

উড়ছে

নামছে

এলিজির বাইরে আর বৃষ্টি হলো না কোথাও!” (ইয়র্কার)

 

ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে বইয়ের প্রথম লাইনটিই পাঠককে ভড়কে দেবে। লাইনটি এরকম, “এতটা বৈমাত্রেয় কেন এই ভাষা!” বইটা শেষ করে মনে হয়েছিলো ক্লান্তিহীনভাবে রোবায়েত কবিতা লিখে যাচ্ছেন— নিজের নির্মিত ভাষা, পরিমিতিবোধ আর নিজস্ব বলার ভঙ্গিতে; অর্থাৎ নির্দিষ্ট ধারায়। কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক ছাড়া আনাড়ি পাঠক রোবায়েতের কবিতাকে সহজে নিতে পারবেন না। রোবায়েতের কবিতার এটা একটা ব্যাপার। শক্তিশালী পাঠক না হলে একই ধাঁচের, একই ভাষায় লেখা রোবায়েতের কবিতায় পরিপূর্ণ ডুব দেয়া কঠিন।

 

২.

এখনো শোন নি কিছু, তবু

তোমাকেই বলি কানে কানে

আমার সারস ছিল ফাঁকা

উড়ছে হাওয়ার সন্ধানে—

সারা পৃথিবী জুড়ে লকডাউন। মৃত্যুর খবরে মুখ হারিয়ে যাচ্ছে, করোনার গ্রাসে থমকে গেছে সব। অখন্ড অবসরে হারিয়ে যাওয়া শহর, স্মৃতি ও কর্ম ব্যস্ত বন্ধু ও সম্পর্কগুলো ফিরে এসেছে, স্মৃতির দিন ঘিরে ধরেছে এই সময়ের আমিকে। সেই ঘোর মাখা সময়ে দাঁড়িয়ে বুক সেলফ থেকে উঁকি দিলো ‘মাধুডাঙাতীরে’।হাসান রোবায়েতের ২০২০ সালে প্রকাশিত এই বইটি পড়তে শুরু করি,মনে হলো কবি নিজেকে ভাঙছেন জীবনানন্দ, জসীমউদ্দিন আর আল মাহমুদের পরে তিনি তাঁর কবিতায় নতুনভাবে বাঙলার ভূগোল আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন। সেই আবিষ্কার একান্তই তাঁর নিজস্ব। নতুনত্ব আর নান্দনিকতায় তিনি চিন্তা ও রাজনীতির সাথে কার্যকর আঁতাতও করেছেন। হাসান রোবায়েতের 'মাধুডাঙা' এমন গ্রাম, যা মূলত এখন স্মৃতি;তিনি যেন স্মৃতির ছবি দিয়ে সেই গ্রামকে আবার বানানোর চেষ্টা করেছেন; সেই স্মৃতি উদ্ধারের খেলা প্রকৃতি, প্রাণ আর তার সম্পর্কের নানা দার্শনিক (প্রেম) ও রাজনৈতিক (সমাজ)দৃশ্যপট নিয়ে।৭-সংখ্যক কবিতায় যে অতীতের দেখা পাই, তাতে জন্মের স্মৃতি আছে। কিন্তু যে অতীতে আমার জন্ম, জন্মের বিষন্ন স্মৃতিতে মা আর মাতৃসম মাটি-নদীর যে আখড়ায় আমার স্থিতি, আমার বর্তমানে তার বাস্তবতা কেমন? জীবদেহের মা কিংবা নদী-ভূমির সজল-কোমল বস্তুকতায় তাকে অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে কিভাবে পাওয়া যাবে? ধারণা করি, কবি হাসান রোবায়েত এ মর্মে এক টুকরা তাৎপর্যপূর্ণ নিরীক্ষা করেছেন। স্মৃতির যে অংশটা যে রূপে বর্তমান অস্তিত্বের কার্নিশে আলগোছে ঝুলতে থাকে, অথচ তাকে বাড়তি ভেবে কিছুতেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না, ‘মাধুডাঙাতীরে’র কবি সে স্মৃতির রূপের তল্লাসে খানিক অরূপে গেছেন। লিখতে চেয়েছেন এমন ভাষা, ধরা-পড়া এবং একই সাথে ধরা পড়তে না-চাওয়া যে স্মৃতিগুলো বেশ নিরীহ অথচ তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে জায়মান থাকে, সেগুলোকে যে ভাষায় বেশ কতকটা পাকড়াও করা যাবে। কারণ, এই 'মাধুডাঙাতীরে' আর ফেরার উপায় নেই কোন (মানুষ কি পেতে পারে আজো/ আনোখা নদীর সেই দেশ);কথাটা আরো খানিকটা খুলে বলা যাক।

ঢাকার কবিতা ভাষায় নব্বইয়ের দশকে এবং তৎপরবর্তীকালে বেশ চর্চিত হয়েছিল বিমূর্ততা। কবিতার ভাষার ইতিহাসের দিক থেকে এ চর্চার গুরুত্ব স্বীকার করতেই হয়। কলকাতার কবিতা ভাষায় বিমূর্ততা যদিও শুরু হয়ে গেছে আরো আগেই সেই সত্তরে। বিশেষত ব্যক্তির অনুভূতি-উপলব্ধিকে ওই অনুভূতি-উপলব্ধির মতোই বিমূর্ত ভঙ্গিতে ভাষায় সমর্পিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের চর্চার কার্যকরতা যেমন আছে এ ভাষার অর্থহীনতায় পর্যবসিত হওয়ার ঝুঁকিও তেমনি, যার বিস্তর নজির ঢাকার ওই সময়ের কবিতায় দেখা যায়। আর তার ফলেই হয়ত সাম্প্রতিক দশকে ঢাকার কবিতা এ ধরনের বিমূর্ততা থেকে বেশ কতকটা সরে এসেছে। হাসান রোবায়েতের কবিতা ভাষা সেই কথাই বলে। তবে কবি বিমূর্ততাকে তাঁর দরকার মতো ব্যবহার করার যে মুনশিয়ানা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন তা তার সহজাত কবিত্বের অংশ,সেই নজির ‘মাধুডাঙাতীরে’ যথেষ্ট আছে।

মাত্রা বিন্যাসে চোখ রেখে বেশ চমকে গেলাম,বিশ মাত্রার চলন—যার দশ মাত্রা আবার বিন্যস্ত হয়েছে চার-ছয়, ছয়-চার, অথবা আট-দুয়ের চালে, বেশ নতুন ব্যাপার।এমন পুনরাবৃত্ত উচ্চারণের মধ্যে একটা একসুরো তান থাকে। তা কখনো কখনো হয়তো আক্ষেপও জাগায়, মনে হয় কোনো কথাই কি অন্য সুরে-স্বরে-ছন্দে বলা যেতো না বা বলা উচিত ছিলো না কি? কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমিতি বজায় রেখে এক তালে কবিতাগুলো পড়তে বাধ্য করা, আর বৈচিত্র্যকে এক জরুরি ঐক্যে সমর্পিত করার সাফল্য হয়তো গভীরতর আবেশ তৈরি করবে একনিষ্ঠ পাঠকের মননে। ‘মাধুডাঙাতীরে’ অচেনা এক শৈশবের পরিপূর্ণতার মুগ্ধতায় জেগে থাকে—এ-ও নিশ্চয়ই কম কিছু নয়।

 

মাধুডাঙাতীরে

হাসান রোবায়েত

প্রকাশক - ঐতিহ্য

প্রচ্ছদ রাজীব দত্ত

মূল্যঃ ১৩০

 

রাত,ছাদ

০৫ আগষ্ট,২০২০

 

Madhudangatire by Hassan Robayet