মূল : হুলিও কোর্তাসার

অনুবাদ : আফসানা বেগম

আমরা অমর। আমি জানি কথাটা কৌতুকের মতো শোনাচ্ছে। জানি কারণ আমি নিয়মের ব্যতিক্রমটা দেখেছি, আমি মৃত্যুও দেখেছি। কমভঁনের বার-এ বসে বেদনাবিধুর কণ্ঠস্বরে ভদ্রলোক আমাকে তার কাহিনি শুনিয়েছিলেন। তার আগে তিনি ভালোই পান করেছিলেন তাই সত্যি বলতে একটুও বাধেনি। এমনকি পরিবেশনকারী (লোকটা ওই জায়গার মালিকও) আর কাউন্টারের চারপাশে নিয়মিত ওখানে আসা চেনামুখের মানুষগুলো তার কথা শুনে এমনভাবে হাসছিল যেন ওয়াইন তাদের চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। তিনি নিশ্চয় আমার চোখে-মুখে তার কাহিনির প্রতি ছলকে ওঠা আগ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন। তাই ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলেন, আর তারপর আমরা দুজনে এগোতে এগোতে বারের শেষ প্রান্তে একটা শূন্য টেবিলের দিকে গিয়েছিলাম যেখানে বসে আরাম করে পানের সঙ্গে নির্বিঘ্নে আলাপ করতে পারি। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত শহুরে চাকুরিজীবি। তার স্ত্রী গরমের ছুটি উপলক্ষে বাবা-মায়ের বাড়িতে গেছেন। তবে বিষয়টা তিনি এমনভাবে বললেন, শুনলে যে কেউ বুঝতে পারবে, বউ আসলে তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। লোকটা তত বুড়ো নয়, আবার দেখতেও বোকাসোকা নয়, কেবল মুখের চামড়াটা মাত্রাতিরিক্ত শুকনো আর চোখগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে বুজে আসা। সত্যি কথা বলতে কী, তিনি যে কথা বলবেন বলে আমাকে বসিয়েছেন, তা ভুলতেই যে পান করছেন, পঞ্চমবারের মতো লাল গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে সেটা বুঝতে পারি। তার শরীর থেকে প্যারিসের কোনো গন্ধ আসছিল না। প্যারিসের বিশেষ একটা গন্ধ আছে যা আমরা, বিদেশিরাই কেবল বলে দিতে পারি। ভদ্রলোকের নখগুলো সুন্দর কারে কাটা, উপরে কোনো দাগ-টাগও নেই।
৯৫ নম্বর বাসে হঠাৎ করে এক বালককে দেখার স্মৃতির কথা তিনি বলে চলছিলেন। বালকের বয়স হতে পারে তেরো। তার দিকে তাকাতেই এক মুহূর্তের জন্য ভদ্রলোকের চোখ আটকে গেল। কারণ তিনি বুঝতে পারলেন যে ছেলেটি দেখতে অবিকল তার মতো। নিদেন পক্ষে ওই বয়সে তার মুখটা যেমন ছিল ছেলেটির মুখও হুবহু তাই। ধীরে ধীরে ছেলেটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে তিনি আরো বেশি অবাক হলেন যে সে আসলেই দেখতে  পুরোপুরি তার মতো। তার মুখ, তার হাত, কপালের উপরে এক গোছা চুলের এলোমেলো পড়ে থাকা, বড়ো বড়ো চোখজোড়া, আর খুব ভালো করে তাকালে মুখের উপরে তারই মতো লাজুক ভাব ধরে রাখা, একবার ছোটোগল্পের একটা পত্রিকায় লিখতে পেরে তার মুখটা ঠিক যেমন হয়েছিল, মাথার সামান্য নড়াচড়ায় বালকটির চুলগুলো উড়ে উড়ে পিছনের দিকে যাচ্ছে, বাতাসের তোড়ে চুলের ওড়াউড়িটা সে কিছুতেই ঠেকাতে পারছে না। বালকের সঙ্গে তার মুখের সাদৃশ্য এতটাই স্পষ্ট যে তিনি প্রায় শব্দ করে হেসে উঠতে গিয়েছিলেন। আর তারপর ছেলেটি যখন হ্রেনের কাছে এসে বাস থেকে নেমে গেল, তিনিও তার দেখাদেখি বাস থেকে নেমে গেলেন, ভুলেই গেলেন যে মুঁপারনাসে তার জন্য তার এক বন্ধু অপেক্ষা করছে। ছেলেটার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খোঁজার ছলে তিনি তাকে একটা রাস্তার দিকনিশানা জিজ্ঞেস করলেন। বিস্ময়ের ছিঁটেফোঁটাবিহীন উত্তর শুনতে পেলেন এমন এক কণ্ঠস্বরে যা বহুদিন আগে ছিল তার নিজের। ছেলেটা ওই রাস্তার দিকেই যাচ্ছিল, আর তাই তারা দুজনে একসঙ্গে ধীর পায়ে সেদিকে একের পর এক বøক পেরোতে থাকলেন। তখন ছেলেটির সঙ্গে ভদ্রলোকের কথা বলতে ইচ্ছে করল। খুব লম্বা করে কিছু বলতে ইচ্ছে করল, তা নয়, তবে নিজেকে সামান্য মেলে ধরা, সামান্য কিছু ব্যাখ্যা যেন তখন জরুরি। তার চোখ ঘোলা হয়ে এল, হয়ত তাকে কিছুটা হাবার মতো দেখাল, কোনো একটা ঘটনা বর্ণনা করার আগমুহূর্তের উত্তজনায়, যেমনটা আমার সামনে বসে তাকে দেখায়।
দীর্ঘ কাহিনির মূল ব্যাপার হলো কথায় কথায় ছেলেটা কোথায় থাকে তা তিনি বের করে ফেলেন। এমন ভাব দেখান যেন সেখানে তিনি কোনো খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এসেছেন। তারপর সেই ভাবের জোরেই তিনি ফ্র্যান্সের একের পর এক দূর্গের মতো বাড়ি পেরিয়ে ছেলেটার ছোট্ট বাড়িতে ঢুকে পড়েন। সেখানকার বাতাসে সহজাত বিষণ্ণতা গুমরে গুমরে ঘুরছে। ছেলেটার মা, দেখতে তার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বয়সি। মা ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত এক চাচা আর দুটো বিড়াল নিয়ে তাদের পরিবার। তবে তার পর থেকে বিষয়টা আর ততটা কঠিন হয়নি। ভদ্রলোকের ভাইয়ের মতো একজনের মাধ্যমে ছেলেটার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কটা সহজ হয়ে গিয়েছিল। ভাইয়ের ছিল চৌদ্দ বছর বয়সি এক ছেলে যার সঙ্গে ওই ছেলেটির বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তাই তখন তিনি লুকের বাড়িতে প্রতি সপ্তাহে যেতে থাকেন। লুকের মা তাকে গরম কফি দিয়ে আপ্যায়ন করেন, তারা যুদ্ধের গল্প করেন, নানারকম কাজের ব্যাপারে কথা বলেন, লুকের ব্যাপারেও। নামমাত্র পরিচয় দিয়ে যে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল তা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। এমনভাবে বাড়ে যে সাধারণ মানুষের ভাষায় তাকে কেবল ভাগ্যই বলা চলে। আর তা ছাড়া, দিনের পর দিন তার কাছে এটাই প্রতীয়মান হয় যে লুক হলো পৃথিবীতে তারই আরেকবার ফিরে আসা। তাই তিনি বিশ্বাস করেন যে মৃত্যু অবধারিত পরিণতি নয়, আমরা প্রত্যেকেই অমর।
“সবাই অমর, বুঝলে হে, তবে কেউ সেটা প্রমাণ করতে পারবে না। আমার সে সুযোগ এসেছিল, ৯৫ নম্বর বাসে  সেদিন আমি তার প্রমাণ পেয়েছি। গঠনে চোখে ধরা না পড়ার মতো সামান্য কিছু পার্থক্য ছিল বটে, তবে মুখটা ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাকে একেবারে বহু আগের কোনো এক সময়ে টেনে নিয়ে গেল। মানে, আমি বলতে চাচ্ছি, পুনরাবৃত্তির কথা, যেন মূর্তিমান চিরচেনা শরীর। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, একের মৃত্যুর পরে আরেক নয়, বরং একই সময়ে দুজনই বিরাজমান। আমার মৃত্যুর আগে লুকের জন্মানো উচিত হয়নি, আবার আরেকদিক থেকে ভাবলে, তার জন্মানোর পরে আমার বেঁচে থাকাটা. . .যা হোক, শহরের বাসে লুকের সঙ্গে ওরকম অদ্ভুতভাবে মোলাকাত হয়ে যাবার ঘটনাটা আসলে চমৎকার। আমি মনে হয় তোমাকে এতক্ষণে বোঝাতে পেরেছি, যে অবস্থায় আমি লুকের মুখোমুখী হয়েছি তাতে কোনো কথাবার্তার প্রয়োজন ছিল না, চোখের সামনে সবকিছু ছিল দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ওটা ছিল শুরু আর পরে কী হলো, তাও বলেছি। কিন্তু পরে আমার একরকম সন্দেহ হতে শুরু করল, কারণ এরকম একটা ঘটনার ক্ষেত্রে মানুষের যা হয়, মানসিকভাবে সে খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে, হয়তবা এক পর্যায়ে নিজেকে সামলানোর জন্য ঘুমের ওষুধ জাতীয় কিছু খেতে শুরু করে। যেমন সন্দেহের বশে মানুষ অনেক সময় খুন করে, একের পর এক, উন্মাদনার ঘোরে মানুষ এমনটা করতেই পারে। আর কাউন্টারের ওই লোকগুলো ওরকম পাগলের মতো হাসছিল যে কারণে, একবার ওদেরকে আমি এই গল্পটা বলেছিলেম যা এখন তোমাকেও বলব। লুক তো কেবল পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার আসা আমার প্রতিকৃতিই নয়, সে ধীরে ধীরে আমি হয়ে উঠছিল, একেবারে পুরোপুরি আমি, যে বিশ্রী কুত্তার বাচ্চাটা এখন তোমার সামনে বসে কথা বলছে।  কিন্তু  আমার আর কী করার ছিল, আমি বসে বসে লুককে খেলতে দেখি, শুধু তাকিয়েই থাকি। সে প্রায়ই পড়ে যায় আর ব্যথা পায়। পায়ে পা জড়িয়ে পড়ে যায়, কোথাও ধাক্কা লেগে উলটে পড়ে, কখনো এমন করে যেন চাকভাঙা মৌমাছির দলের সামনে পড়েছে। লজ্জায় ভয়ানকভাবে চোখ-মুখ লাল না করে কিছু চাইতে পারে না। অন্যদিকে তার মা লুকের কোনো না কোনো বিষয়ে কথা বলেই চলেন। প্রত্যেকটি কথায় লুক বিব্রত হয়ে শরীর কাঁপায় কিন্তু সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। লুকের সবচেয়ে গোপন কথা, তার নিজস্ব অনুভূতির কথা, তার করা অসম্ভব কোনো কাজের কথা. . . যেমন ধরো, তার প্রথম দাঁত ওঠার গল্প, আট বছর বয়সে তার আঁকা ছবির কথা, লুকের অসুস্থতার কথা. . .লুকের মা আসলে গল্প করতে পছন্দ করেন। সরল মনের ভদ্রমহিলা আমাকে মোটেও সন্দেহ করেন না। আমি নিশ্চিত আমি সেখানে কেন যাই তা নিয়ে তার মনে বিন্দুমাত্র প্রশ্ন নেই। লুকের চাচার সঙ্গে আমি দাবা খেলি। যেতে যেতে আমি তাদের পরিবারের একজনই হয়ে যাই। এই যেমন মাসের শেষের টানাটানির সময়টায় হয়ত কিছু টাকা দিয়ে সাহায্যও করলাম। না, মানে, ধীরে ধীরে আমি তাদের ততটাই আপন হয়ে গিয়েছিলাম। লুকের ইতিহাস জানতে চাইলে তার বাড়ির বড়োদেরকে তাদের পছন্দসই বিষয় ধরে প্রশ্ন করে এগোলেই হয়, যেমন লুকের চাচার ক্ষেত্রে তার বাতের ব্যথা, রাজনীতির উত্থান-পতন কিংবা প্রহরীদের ঘুস খাওয়ার বাতিক, বিষয়টা নিশ্চয় বুঝতে পারছ। এভাবে প্রশাসন আর বিশপের মাঝখানে রাজনৈতিক দর কষাকষি আর মাংসের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝখানে আমি লুকের শৈশবের ব্যাপারে দু’চার কথা জেনে নিই। তারপর সেই টুকরো টুকরো তথ্যগুলো মনের মধ্যে ধাপে ধাপে সাজিয়ে রাখি, সেসব হলো আমার চোখে লুকের আমি হবার অকাট্য প্রমাণ। কিন্তু এখন আমি চাই তুমি আমার কথা খুব ভালোমতো খেয়াল করো, চলো বরং আরেক গ্লাস করে আনতে বলি। লুক আমিই, মানে আমি কৈশোরে যে আমি ছিলাম, লুক সেটাই। কিন্তু এমনটা ভেবো না যে লুক একেবারে পুরোপুরি সেই আমি। লুক ছিল আমার মতো, বুঝতে পেরেছ? আমি বলতে চাচ্ছি, যেমন, আমার বয়স যখন সাত, তখন একবার আমার হাতের কবজির হাড় নড়ে গেল, যেখানে কিনা লুকের ক্ষেত্রে নড়েছিল গলার হাড়। আবার ধরো, নয় বছর বয়সে আমার হাম হয়েছিল আর লুকের হয়েছিল কালাজ্বর। হামে আমি ভুগেছিলাম প্রায় দুই সপ্তাহ, যেখানে কিনা লুক মাত্র পাঁচ দিনেই ভালো হয়ে গিয়েছিল। যা হোক, আমার আর লুকের বেড়ে ওঠার সময়ের মাঝখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির কথা তুমি নিশ্চয় জানো। তবে ওটুকু বাদ দিলে একের পর এক ঘটনাগুলো একরকমের পুনরাবৃত্তি বলেই ধরতে পার। তোমাকে আরেকটা উদাহরণ দিই যাতে তুমি বিষয়টা ভালোমতো অনুধাবন করতে পার, ওই যে কোণে দেখছ পাউরুটি বানানোর লোকটা বসে আছে, সে আসলে নেপোলিয়নের পুনর্জন্ম। সামান্য বাসন ধোয়ার কাজ করতে করতে মুঁপারনাসে এত বড়ো একটা বেকারির মালিক হয়ে যাওয়ার কথা ভেবে দেখ, একেবারে নেপোলিয়নের কোরসিকা থেকে এসে ফ্রান্স দখলের সমান সফলতা। সত্যি কথা বলতে কী, তার আর নেপোলিয়নের জীবনের প্রতিটি ছোটো ঘটনা নিয়ে তুলনামূলকভাবে ভাবতে গেলে তুমি বিস্মিত হয়ে যাবে। হয়ত তার এমন কোনো ঘটনা পেয়ে যাবে যেটা নেপোলিয়নের মিশরীয় যুদ্ধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কোনোটা পাবে তার সিংহাসনে আরোহনের সমত‚ল্য, কোনোটা অস্টার্লিজের দখল নেয়ার মতো। আবার হয়ত খোঁজ নিয়ে দেখবে তার বেকারিতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে যার ফলে তাকে শেষ জীবনে চলে যেতে হলো সেন্ট হেলেনায়। এই ধরো, ছয় তলার উপরে আগে থেকেই আসবাবে সাজানো কোনো একটা ঘরে হলো তার শেষ আশ্রয়, বিরাট পরাজয় না? কী মনে হয় তোমার? ধরো তার ঘরের চারদিকে পানি থই থই করছে আর একাকীত্ব তাকে আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরছে। তখন সেখানে ছয় তলায় বসে পানির দিকে তাকিয়ে সে তার এই বেকারিটার জন্য আফসোস করছে, গর্ববোধও করছে, কী মনে হয়, নেপোলিয়নের সেই ঈগলের যাত্রার মতো ব্যাপার না?”                                                    
যা হোক, ভদ্রলোকের কথা আমি ঠিকমতোই বুঝলাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম ছোটোকালে আমাদের সবার প্রায় একই ধরণের অসুখবিসুখ কাছাকাছি বয়সেই হয়ে থাকে। ঠিক যেমনটা আমরা প্রায় প্রত্যেকেই ছেলেবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে কিছু না কিছু ভেঙে ফেলি।
“আমি জানি, প্রায় প্রত্যেকের জীবনে ঘটে, আমি আসলে এরকম সাধারণ কিছু ব্যাপার ছাড়া অন্য তেমন কোনো মিলের কথা উল্লেখ করিনি। এসব এমনিতেও দেখা যায়। যেমন ধরো, লুক যে আমার মতো দেখতে সে ব্যপারটাকেও যদি তুমি তেমন পাত্তা না দাও, কিংবা মনে করো বাসে তার সঙ্গে আমার দেখাও হয়নি। যা আসলে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, একের পর এক ঘটনার ধারাবাহিকতা। একের পর এক ঘটনার মালা গেঁথে আমরা নিজেদের চরিত্রের একটা ছবি দাঁড় করাই, আমাদের শৈশব-কৈশোরের টুকরো ঘটনাই বেড়ে ওঠার গল্প হয়ে ওঠে। ধরো, তখনকার কথা, মানে, আমি যখন ঠিক লুকের বয়সি, আমার এক ভয়ানক দীর্ঘ অসুস্থতা আরম্ভ হলো। আর তারপর বহুদিন পরে যখন খানিকটা ভালো হয়ে উঠছি তখন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে হাত ভেঙে ফেললাম। তারপর হাত ভালো হতে না হতেই আমি স্কুলের এক বন্ধুর বোনের প্রেমে পড়ে গেলাম। ওহ্ ঈশ্বর! সেটা ছিল সত্যিই ভীষণ ঝামেলার। মানে, আমি মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকাতেও পারছি না অথচ ওদিকে সে ঠিকই আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমাকেই নিয়ে হাসাহাসি করছে। লুকও তার কদিন আগে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আর যখন খানিকটা ভালো, বাড়ির লোকেরা ওকে সার্কাস দেখতে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর উঁচু সাদা একটা চেয়ার থেকে পড়ে সে তার পায়ের গোড়ালি নাড়িয়ে ফেলেছিল। তার অল্প কয়েকদিন পরে লুকের মা হাঁটতে গিয়ে ফট করে লুকের সঙ্গে ধাক্কা খান। দ্রুত উঠে লুকের দিকে তাকিয়ে তার হাতে একটা অদ্ভুত রুমাল পেঁচিয়ে বাঁধা দেখে তিনি চমকে ওঠেন, চিৎকার করতে থাকেন যে ওই রুমালটা তো তিনি আগে কখনোই দেখেননি!”
কাউকে না কাউকে যেহেতু উলটো চিন্তা করতেই হবে, তাই আমি বললাম যে, মনে রাখতে হবে, বেড়াল-কুকুর যারা ভালোবাসে তাদের হাতে-পায়ে আঁচড়ের দাগ থাকা খুব স্বাভাবিক, এমনকি হাড় ভাঙা বা ফুসফুসের সমস্যার কথাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হলো যে অ্যারোপ্লেনের ব্যাপারটা একেবারে আলাদা। দুদিকে প্রপেলারওলা রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো একটা অ্যারোপ্লেন লুক তার জন্মদিনে উপহার পেয়েছিল।
“এখন শোনো, লুক যখন উপহারটা পেয়েছিল তখন কী হলো। আমার মনে আছে মা আমাকে চৌদ্দতম জন্মদিনে একটা বাড়িঘর বানানোর সেট দিয়েছিল। সেটা নিয়ে কী হয়েছিল তা-ও আমার পরিষ্কার মনে আছে। একদিন আমি বাইরের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, যদিও জানতাম যে তখন গ্রীস্মকালের ঝড় ধেয়ে আসছে, ততক্ষণে বজ্রপাতের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। বাড়ির সামনে রাস্তার দিকে গেটের কাছে ঝোঁপের নীচে একটা টেবিল ছিল। সেখানে বসে বাড়িঘর বানানোর সেটটা দিয়ে আমি কিছু একটা বানাতে চেষ্টা করছিলাম। বাড়ির ভিতর থেকে কেউ যেন আমাকে তখন ডাকল আর তাই মিনিটখানেকের জন্য আমাকে সেসব ফেলে আসতে হলো। তারপর আমি যখন সেখানে ফিরে গেলাম, দেখলাম আমাদের বাড়ির গেটটা হা করে খোলা আর ঝোঁপের নীচে টেবিলের উপরে আমার বাড়িঘর বানানোর সেটটা নেই। চিৎকার করতে করতে আমি রাস্তার দিকে দৌড়ে গেলাম কিন্তু সেখানে কাউকেই দেখতে পেলাম না। আর ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখলাম বজ্রপাত এসে উলটো দিকের একটা বাড়িকে আঘাত করল। আগুন লেগে গেল সেখানে। সমস্তকিছু এক পলকের মধ্যেই ঘটে গেল। এইসমস্তকিছু আমার মনে পড়ে গেল যখন লুককে দেখলাম উপহার হিসেবে একটা অ্যারেপ্লেন পেয়েছে। সেটার দিকে এমন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে, ঠিক যেমনটা আমি থাকতাম আমার বাড়িঘর বানানোর সেটটার দিকে। লুকের মা তখন আমার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে এল। আমার সঙ্গে বসে দু’একটা আলাপ করতে শুরু করল। আর ঠিক তখনই আমরা একটা চিৎকার শুনতে পেলাম। লুক এমনভাবে জানালার দিক থেকে দৌড়ে আরেকদিকে চলে গেল যেন আমরা তাকে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেব। দেখলাম তার মুখ পুরো সাদা হয়ে গেছে, চোখগুলো থরথর করে কাঁপছে। দূরে দাঁড়িয়ে লুক চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। সামান্য খোলা জানালা দিয়ে কেমন করে যেন তার প্লেনটা উড়তে উড়তে বাইরে বেরিয়ে গেছে। আমি আর কখনো ওটা পাব না, আমি আর কখনো ওটা পাব না, কাঁদতে কাঁদতে লুক একটাই কথা বারবার বলতে লাগল। লুকের গুনগুনানো কান্নার মাঝখানে আমরা নীচের সিঁড়ি থেকে আরেকটা ভয়ানক চিৎকার শুনতে পেলাম। তার পরপরই লুকের চাচা ধুপধাপ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল, জানাল যে রাস্তার উলটোদিকের বাড়িতে আগুন লেগেছে। এবারে বুঝলে তো? চলো আরেক গøাস করে নিই।’
তারপর আমার নীরবতা দেখে ভদ্রলোক নিজেই বলে চলেন। তিনি তখন কেবল লুকের কথাই ভাবতেন। ক্রমাগত ভাবতেন লুকের ভবিষ্যৎ নিয়ে। লুকের মা তখন তাকে একটা ব্যবহারিক স্কুলে পাঠিয়ে দেবার জন্য তৈরি। তিনি মনে করতেন যে ওখানে পাঠালে লুকের ভাগ্যটা খুলে যাবে, সে জীবনে চলার মতো একটা উপায় পেয়ে যাবে। কিন্তু লুকের জীবনের রাস্তা তখন খোলাই ছিল যা কেবলমাত্র ভদ্রলোক জানতেন অথচ সে ব্যাপারে মোটেও মুখ খুলতে পারছিলেন না। সেরকম কিছু বলতে গেলেই তাকে হয়ত ওরা আর লুকের ধারেকাছে ঘেঁষতে দেবেন না। কিন্তু তার ইচ্ছে হতো বলতে যে লুককে যেখানেই পাঠাক আর যত চেষ্টাই করুক, ঘুরে ফিরে ঘটনা সেই একই দাঁড়াবে, সেই আঘাত আর অপমান, সেই একই মরণপণ নিয়মে বাঁধা জীবন, বছরের পর বছর একই নিরুত্তাপ জীবনের ঘানি টানা, ভাগ্যের এমন ভয়ানক বিপর্যয় যা মানুষের শরীরের কাপড় থেকে শুরু করে আত্মা পর্যন্ত কুরে কুরে খুবলে খুবলে খায়, তাকে বিরক্তিকর একাকীত্বে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সে তখন নিদারুণ কষ্টের ভার সহ্য করতে না পেরে আশেপাশের সাধারণ কোনো দোকানে গিয়ে হা করে বসে থাকে। কিন্তু লুকের পরিণতিই এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় নয়; সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হলো লুক তার সময়মতো ঠিকই মারা যাবে, তারপর তার জায়গায় আরেকজন মানুষ একইভাবে জীবন শুরু করবে, যতদিন বেঁচে থাকবে লুকের আর নিজের কিছু জীবনাচরণ অনুসরণ করে চলতে থাকবে, আর তার পরে আরেকজন মানুষ আবার একই চক্রে প্রবেশ করবে। তিনি সেই মানুষগুলোর কথা এত বেশি ভাবছিলেন যে লুক যেন তার কাছে তখন তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। নির্ঘুম রাতের পর রাত তিনি লুকের পরে একই রাস্তায় আবিভর্‚ত হওয়া সেইসমস্ত মানুষের জীবন আর জীবীকা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। তাদের কারো নাম হতে পারে রবার্ট কিংবা ক্লড অথবা মাইকেলও হতে পারে, নামের ব্যাপারে অসীম সম্ভাবনা দেখতে পেলেন তিনি। বুঝতে পারলেন দোষবিহীনভাবে আর নিজের সম্পর্কে অবগত না হয়ে একই পথে কত বেচারা পা বাড়াবে, নিজের জীবনের ব্যাপারে তাদের পছন্দ-অপছন্দ অথবা বেছে নেয়ার কোনো স্বাধীনতা থাকবে না। বলতে বলতে ভদ্রলোক তার বিয়ারের গ্লাসের উপরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। বললেন, ওই গ্লাসে বিয়ার না থেকে ওয়াইনও থাকতে পারত, তাতে কী যেত-আসত। কিছুই না।
“ওই যে কাউন্টারে ওদেরকে দেখছ, তারা আমার কথা শুনে ওইভাবে হাসছিল কারণ আমি তাদের বলেছি যে তার কয়েক মাস পরে লুক মারা গেছে। তারা এতই গাধা যে আমার সহজ কথাটা বুঝল না. . .সত্যি বলছি, এখন তুমি আবার আমার দিকে ওইভাবে তাকিয়ে আছ কেন! লুক সত্যিই তার কয়েক মাস পরে মারা যায়। খারাপ ধরনের ব্রঙ্কাইটিস হয়েছিল ওর, ঠিক যে বয়সে আমার হয়েছিল হেপাটাইটিসের সংক্রমন। আমার ক্ষেত্রে বাড়ির লোকেরা আমাকে হাসপাতালে নিয়েছিল, কিন্তু লুকের মায়ের মত ছিল তাকে বাসায় রাখা। লুককে বাসায় রেখে তিনিই তার দেখাশোনা করছিলেন। আমি তখন বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই গিয়ে উপস্থিত হতাম। কখনো আমি আমার ভাগ্নেকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম যেন লুকের সঙ্গে খেলতে পারে। ওই বাড়ির আনাচেকানাচে এমন বেদনা তখন যে সেখানে আমাদের যাওয়াটাই ছিল একটা সান্ত্বনার মতো। লুকের জন্য সামান্য সঙ্গ আর কিছু শুকনো ফল, সঙ্গে ডামাসকাসের এক প্যাকেট টার্ট। আর যখন তাদের বলেছিলাম যে জানাশোনা একটা ওষুধের দোকান আছে যেখানে আমি বিশেষ ছাড়ে ওষুধ কেনার সুবিধা পাই, তখন ওষুধ কেনার দায়িত্বটা আমার ঘাড়েই এসে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টা গিয়ে এমন দাঁড়াল যে আমিই হয়ে গেলাম লুকের নার্স, আর তুমি চিন্তাও করতে পারবে না যে ওখানকার পরিস্থিতিটা তখন কেমন ছিল, মানে, ডাক্তার নাম কা ওয়াস্তে আসেন-যান, তেমন দরকারি কিছু না বলে শুধু দেখে চলে যান। যে অসুখ বলে প্রথমে চিহ্নিত করা হয়েছে দিনে দিনে লুকের শরীরে তার বাইরে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না, সেই বিষয়েও কারো মাথাব্যথা নেই. . . তা, তুমি এখন আবার আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছ কেন, হুম? আমি কি কিছু ভুল বলেছি নাকি?”
না, না, সত্যিই তিনি কিছু ভুল বলেননি। বিশেষ করে তিনি যখন ওয়াইনের গøাসের সামনে পুরোপুরি দিউয়ানা। আবার আরেকদিকে, কেউ তাকে নিছক কল্পনাশ্রয়ী গল্পবাজ মনে করার মতো ভয়াবহ চিন্তা না করে থাকলেও, ৯৫ নম্বর বাসে যে কাহিনির সূত্রপাত হয়েছিল আজ বেচারা কিশোর লুকের নিস্তব্ধ মৃতুশয্যার পাশে সেই কাহিনির সমাপ্তি টানা জরুরি। তার প্রশ্নের উত্তরে না বললাম, তাকে শান্ত করার জন্যই বললাম। তিনি যেন গল্পটা আরেকবার শুরু করবার জন্য শূন্যে তাকিয়ে কিছু একটা জাদু খুঁজতে লাগলেন।
“যা হোক, তুমি যেমনটাই শুনতে চাও না কেন, সত্য হলো, তখনকার সময়টাতে, মানে, লুকের শেষকৃত্যের পরের কয়েক সপ্তাহে আমি প্রথম উপলব্ধি করলাম যে যা হলো ভালোর জন্যই হলো। তার পরেও আমি মাঝেমধ্যে লুকের মাকে দেখতে যেতাম, যাবার সময়ে হাতে করে এক প্যাকেট বিস্কিটও নিয়ে যেতাম, কিন্তু তার প্রতি আগের সেই কৌতূহলও বোধ করতাম না। তাদের বাড়িটা আমার কাছে আগের মতো আপনও মনে হতো না। কেবল মনে হতো হঠাৎ করে আমি জীবনের এক মহা সত্যের সামনে দÐায়মান হয়েছি, মৃত্যুর মতো অবধারিত পরিণতি দেখে আমি যেন জমে থাকা পানির মতো কোথাও আটকে পড়েছি। মনে হতো, আমার জীবনও যেন দিনের পর দিন শেষ দিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ওয়াইনের পর ওয়াইনে ফুরিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারতাম যে এই জীবনটা এখানেই শেষ হবে বা অন্য কোথাও। জানতাম এখনই শেষ হবে বা অন্য কোনো সময়ে। কোনো একদিন সহ¯্র অচেনা মানুষের জীবনের শেষ পরিণতির মতো একই বিন্দুতে গিয়ে মিলবে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কেউ বলতে পারে না কখন, কোথায়। কিন্তু আমি জেনেছি, আমি জেনেছি যে আমি সত্যিই মারা যাচ্ছি, এখন আমার এই বেঁচে থাকার চক্রে আর কোনো লুক পদার্পণ করছে না, বোকার মতো জীবনের বিশ্রী পুনরাবৃত্তি করে কাটাতে কে-ইবা চাইবে। বুঝেছ তো কী বলতে চাচ্ছি, সুতরাং, জীবনে যত আনন্দ পেয়েছি আর সেসব যতদিন ধরে টিকে ছিল, তার জন্য তো অন্তত আমাকে হিংসা করতে পার।”                    
সত্যিই সুখ স্থায়ী হয়নি। ওই সাদামাটা মদের দোকান আর সস্তা ওয়াইনই তার প্রমাণ। আর তার চোখজোড়ায় যে জ্বর জ্বর উত্তপ্ততা লেগে ছিল তা শারিরীক জ্বর নয়। সেভাবে বলতে গেলে তিনি তার জীবনের কিছু মাস প্রতিমুহূর্তে টানাটানির মধ্যে ছিলেন, তার স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, জীবনের পঞ্চাশটা বছর বৃথাই নষ্ট হয়েছে, পদে পদে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে নিজের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। এক সন্ধ্যায়, লুক্সেমবার্গের বাগানের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে তিনি একটা হলুদ ফুল দেখতে পান।
“ফুলটা ছিল অনেকগুলো গাছের সারির শেষ গাছটায়। একেবারে হলুদরঙা একটা ফুল। আমি সিগারেটে আগুন ধরাবার জন্য দাঁড়িয়েছিলাম কিন্তু বারবার ওটার দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল। ফুলটা খুবই ছোটো কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছিল সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মানে, বলতে চাচ্ছি, একরকমের যোগাযোগ, যেন সেরকম কিছু থেমে থেমে ঘটছিল. . . তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাচ্ছি। প্রত্যেকেই ব্যাপারটা অনুভব করতে পারে, মানুষ যার নাম দেয় সৌন্দর্য। এরকমটা হবার কারণ কেবলমাত্র ওই ফুলটার সৌন্দর্য। ফুলটা আসলেই খুব সুন্দর ছিল। আর সেখানে আমি হলাম গিয়ে কুৎসিত, ধীরে ধীরে একদিন মরেও যাব, চিরকালের তরে হারিয়ে যাব। অন্যদিকে ফুলটা ছিল চমৎকার। ভবিষ্যতের মানুষের জন্যও এমন অপূর্ব ফুল বরাবর ফুটতে থাকবে। আর ঠিক তখনই আমি কিছু না থাকার বিষয়টা বুঝে গেলাম। মানে, কিছু না থাকার শূন্যতা, অস্তিত্বহীনতা। আমি বুঝলাম, এটাই শান্তি, এটাই চক্রের সমাপ্তি। আমি একদিন মরে যাব, লুক তো মরেই গেল। আমাদের মতো মানুষদের জন্য আর কখনো কোনো ফুল ফুটবে না। আমাদের জন্য আর কখনো কিছু থাকবে না, একেবারে কিছুই না; আর এটাই হলো না থাকা, যেমন, একদিন কোনো ফুলও থাকবে না। সিগারেটের লাইটারটা আমার আঙুল পুড়িয়ে দিল, হাত থেকে সেটা ছিটকে পড়ল। রাস্তার পরের মোড়ে আমি লাফিয়ে একটা বাসে চড়ে বসলাম। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, সেটা ভাবা জরুরি মনে হয়নি। আমি সত্যিই জানতাম না কোথায় যাব। তারপর বোকা বোকা চোখে চারপাশে তাকাতে লাগলাম, সমস্তকিছুকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। রাস্তায় যত মানুষকে দেখা যাচ্ছিল, প্রত্যেককে দেখতে লাগলাম, বাসে যত মানুষ বসে ছিল, ভালোমতো তাদের দেখলাম। বাসটা যখন তার শেষ গন্তব্যে চলে গেল তখন নেমে আমি আরেকটা বাসে উঠে বসলাম যেটা আবার উপশহরের দিকে যাবে। সেদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমি কেবল এক বাস থেকে নামলাম আর আরেক বাসে চড়ে বসলাম, লুক আর ওই অপূর্ব হলুদ ফুলটার কথা ভাবতে থাকলাম। বাসের যাত্রীদের চোখমুখের দিকে তাকিয়ে লুকের মতো দেখতে কাউকে খুঁজতে লাগলাম, কাউকে যদি পেয়ে যাই যে দেখতে আমার মতো কিংবা লুকের মতো! যদি কাউকে পেয়ে যাই যে আবার আমি হতে পারে, যার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতে পারি যে এই মানুষটাই আবার আমি হতে যাচ্ছে। যার চোখে চোখ রেখে আমি ভাবব যে এটাই আমি, এই মানুষটার ভিতরেই আমি আছি। আর তারপর তাকে তার নিজস্ব জীবন যাপন করতে পাঠিয়ে দেব। তাকে আগে থেকে কিছুই জানাব না। তাকে বাঁচতে সাহায্য করব যেন সে অনেকদিন এই পৃথিবীর বুকে বিচরণ করে, বহুদিন ধরে তার দরিদ্র আর অর্থহীন জীবন যাপন করে। যেন যতদিন পারে ততদিন তার অক্ষম আর নিষ্ফল জীবন কাটায়, যতক্ষণ না তার জায়গায় তারই মতো আরেকজন তার অক্ষম আর নিষ্ফল জীবন কাটাতে আসে, তারপর যতদিন না আরেকজন আসে তার অক্ষম আর নিষ্ফল জীবন কাটাতে, তারপর যতদিন না আরেকজন. . .”
বারের বিলটা আমি শোধ করে দিলাম।

...........................................................