এক একটা বইয়ের বয়নে এবং বয়ানে শুধু ব্যক্তিগত আলো-অন্ধকার বা সমষ্টির সম্মেলক-ই জেগে থাকে না কেবল। বরং ব্যক্তি ও সমষ্টির মূলমধ্যরেখা বরাবর যে মেঘ ও রৌদ্র, বৃষ্টি ও বজ্রপাত, কলি ও কুয়াশা জেগে থাকে -- রচনার ইথারতরঙ্গে তারই আভ্যন্তরীণ স্পন্দন রণিত হতে থাকে আমাদের ব্যক্তিগত ক্লাসরুমে!

কবি কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্যের 'দ্বিতীয় ব্রাজিল' তেমনই এক কবিতার সংকলন। এমনিতে,  উত্তরবঙ্গের জনজাতি গবেষণায় কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য এক সুপরিচিত ও প্রসিদ্ধ নাম --- নিষ্ঠ গবেষকের ভূমিকায় যিনি তাঁর সিদ্ধি-কে প্রশস্ত করে গেছেন ক্রমাগত।  কবিতাসৃজনেও  তাঁর এই সত্তাটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।জনজীবনের শিকড়-বাকড়ে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠার উৎসেচক-ই কৃষ্ণপ্রিয়কে কবিতার অন্যতর দিগন্তসন্ধানে ব্যাপৃত করে তুলতে চেয়েছে। তারই বিভিন্ন অভিজ্ঞান আমরা জেগে উঠতে দেখেছি তাঁর পূর্ববর্তী কবিতার বই -- 'লুফুন কাম্বাং চাই' ( ২০১০), 'ডায়নাকাফে' (২০১৭), এবং 'ভোরের মইষাল' (২০১৯)-এর নানা রচনায়। লাতিন আমেরিকার একটি দেশ ও তার জনজীবন যেমন তার আরণ্যক নিসর্গ ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত আবেগদীপ্ত এক জীবনধারা নিয়ে জেগে থাকে, সেই ব্রাজিলেরই একটি সমধর্মী সংস্করণ হয়তো তাঁর স্মৃতি ও সত্তায়, সংবেদনে এবং অবচেতনে নির্মিত হয়ে উঠতে চেয়েছে উত্তরের তরাই ও ডুয়ার্সের আলো-অন্ধকার মাখা কবিতার আখ্যান নির্মাণে। ভৌগোলিকতার চেনা ছাঁদ পেরিয়ে হয়তো এই 'দ্বিতীয় ব্রাজিল' কবির অন্তর্লোকেরই এক বিজন বারান্দা --- যেখানে স্থানিক এক ছদ্মবেশের ভেতর চুপ করে বসে থাকে যে কোনও প্রান্তিক জনপদ, তার মানুষজন, তাঁদের অন্তর্ভেদী আর্তনাদ আর আনন্দেরই নানা রূপভেদ।

এই বইয়ের ভেতর এক আশ্চর্য সংহিতা-ই যেন-বা গড়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি, যেখানে ইতিহাস আর লোকপুরাণ, লৌকিক দেবতা আর অলৌকিক প্রান্তজনের অতীত এবং বর্তমানের অনুভববেদ্য এক ইতিবৃত্ত নির্মিত হয়ে উঠেছে কবিতার ছদ্মবেশে। গা ছমছমে এক আবহের ভেতর কথা বলে উঠতে চেয়েছে চরিত্রসমবায়,যাকে গদ্যের পরিসরে জোর করে নিয়ে আসতে চাইলে তার আলো প্রতিসৃত হয়ে গিয়ে পড়তো কোনও ভুল জানালায়! ভবানী পাঠক থেকে মদন গিদাল, ভাদু সিং থেকে খার্সাঙ রাভা--- আর তাঁদের শিকড় থেকে ঘনিয়ে ওঠা বাস্তবিক এক জীবনের কুম্ভীপাক আমাদের নাগরিক বোধের স্বাচ্ছন্দ্যের অন্দরমহলে অস্বস্তিকর এক আক্রমণ শানায়। খুব উচ্চকিত নয় তাঁর স্বর, কিন্তু খরশান এক তীর্যকতায় আমাদের সাজানো গোছানো ড্রয়িংরুমের বায়োস্ফিয়ারে একটি অমোঘ অস্বস্তির জন্ম দিতে থাকে। লৌকিক জীবন ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষজনের জীবনযুদ্ধ ও দীর্ঘশ্বাসের বিপরীতে তিনি মিলিয়ে দেখতে চান আজকের ভোগবাদী মল-কালচারের আগ্রাসী দূষণকে! শিকড় থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ার রক্তপাতে স্পৃষ্ট হয়ে তাঁর এই বইটির নানা কবিতায় দলা দলা কান্নার অনুবাদকেই উচ্চারিত হয়ে উঠতে দেখি আমরা, বিভিন্ন আদলে! সেই কান্নাই ভাষান্তরিত হয়ে কখনও কখনও বদলে যেতে থাকে ক্রোধে, আগ্রাসী ভোগসর্বস্ব সভ্যতার প্রতি এক সতর্কীকরণের ইশারা নিয়ে যুগপৎ জেগে উঠতে থাকে সেই লোহিতবর্ণ ক্রোধ এবং মনস্তাপ :

১. " দু-হাজার তিরিশের লাটাগুড়ি বিদ্রোহে/ আম-জাম-আতা, স্নিগ্ধ ব্যালেরিনারা কেউ নেই / যুদ্ধ হবে স্পেনের আমন ধান আর বার্সিলোনা / যুদ্ধ হবে গদাধরের জাগ্ গান আর তৃষ্ণার / জলপাইগুড়ির মাটি থেকে দলে দলে খসে পড়বে / ভালোবাসা দিয়ে ঘেরা চায়ের বাগান / দু-হাজার তিরিশে অভিধান হয়ে উঠবেন দেবী চৌধুরাণী ঠাকরান। "

                                                       (--- লাটাগুড়ি বিদ্রোহ ২০৩০ )

২. "লিস্ ঘিস্ থেকে ভাবছি সরে যাব / আমোচুতে ছিলাম,আলাইকুমারিতেও ছিলাম, রোদ উঠত বেশ! চল্লিশ বছর হল এখানে রোদ নেই, জল নেই, নতুন পাথরেরা বড়ো উদাসীন, শুধু স্বামী-স্ত্রী / আমাকে চেনে না অনেকেই / এখানে শব্দেরা বড়ো একা / এই বাঘবন এই বনচিহ্ন থেকে আর কোনও / বেদ আসে না, ছায়া আসে না "

                                                                    (--- নিষাদযাত্রা)

৩. " আমার একটি হাত শুধু খালি হতে থাকে / বুক ঢাকি, মোরাঘাটের হাতির রক্ত এনে / অন্য হাতে রাখি --- / শূন্যতা দিক পাল্টায়।"

                               (--- হাতছড়া)

কৌমজীবনের গভীরে গিয়ে বীক্ষণের এক আশ্চর্য আততি হাজারো রেফারেন্সে যেন শিলীভূত হয়ে আছে এ বইয়ের অসংখ্য কবিতায়। আংশিক উদ্ধৃতির ভেতর দিয়ে সেই ভিতর ও বাহিরকে নিষ্কাশিত করে তোলা সম্ভব নয়, কোনওভাবেই! ভাগ্যিস সম্ভব নয়! তাহলে তো মূল গ্রন্থের পাঠের চেয়ে পাঠ-প্রতিক্রিয়া গুরুতর হয়ে উঠতেই পারত। বিহঙ্গদৃষ্টিতে কেবল স্বরায়নের দু'চারটি দিকের প্রতিই আংশিক অবলোকন রাখা সম্ভব! ভাগ্যিস সেটুকু-ই সম্ভব! কৃষ্ণপ্রিয়-র আলোচ্য বইটি ঘিরে ব্যক্তিগত আবর্তনে এ-কথাই আমাদের মনে হতে থাকে বারংবার! এই বইতেও মাছরাঙাপুর থেকে আদি পাঙ্খাবাড়ি,কালজানি থেকে লিচুপাকুড়ির খোলা মাঠ পর্যন্ত আদিগন্ত নীলিমা ও নিসর্গের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জীবনের সেই অন্তর্লীন আলোকেই খুঁজে বেড়াতে থাকেন কৃষ্ণপ্রিয়। আর অনিকেত হয়ে যাওয়ার এক অনিবার্য বোধ তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় :

"আমার নিজের কোনও দেশ নেই, বাড়ি নেই / আমার নিজের কোনও ভাষা নেই / যেভাবে নাচায় আমার হিলকার্ট রোড / সেভাবেই নাচতে থাকি আমি / মাছরাঙাপুর নামে কোনও ডাকঘর নেই / পৃথিবীতে। প্রজাপতি নামে কোনও গ্রহ নেই মহাকাশে। "

(--- মাছরাঙাপুর)

সময় ও সভ্যতার হাতে অবশ্যম্ভাবী ক্রীড়নক হয়ে উঠতে উঠতেও তাই তিনি মূর্তিনদীর মাটি ছুঁয়ে স্পর্শ করতে চান নদীর পূর্বপুরুষের কথা-উপকথার গোপন সম্ভারকে! আঞ্চলিকতার পরতে পরতে জড়িয়ে থেকেও তাঁর স্বর পাড়ি দিতে চায় এক মুক্তাঞ্চলে -- যেখানে প্রত্নজলের মতো সযত্নে শুয়ে থাকে সংবেদনশীল ও নির্জন এক মানুষের অস্তিত্বের প্রবহমানতার এক পরম একক! প্রান্তিক জীবন ও মানুষের অগ্রন্থিত দুঃখ সুখ আর স্মৃতির ভেতরে ডুব দিয়ে খুঁজে তুলতে চায় এক অন্যরকম খনিজকে, যা আসলে ভূগোলের সঙ্কুচিত গণ্ডিকে অতিক্রমণের আত্মবিশ্বাসে বিভাময়! প্রত্নমানবের স্বাভাবিক শ্বাসপতনের স্বরে পুরোনো ও নতুন সময়ের এক সমবায়ী স্বর জেগে ওঠে বারবার, এই গ্রন্থের নানা লেখার বিভিন্ন অনুষঙ্গে, কাঠমাফিয়ার দেশে জেগে ওঠা এক টুকরো অনির্বাণ রোদের মতো, শেষাবধি!

শুভেন্দু সরকারের দ্যুতিময় মলাট নির্মাণ ও চমৎকার মণ্ডনসৌষ্ঠব বইটির অনিবার্য অলংকার হয়ে উঠতে পেরেছে, প্রসঙ্গত সে-কথারও উল্লেখ থাকুক এখানে।

Dwitio Brazil

 


¤ দ্বিতীয় ব্রাজিল। কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য। আজকাল। ১২০ টাকা।