এই অনিচ্ছাকৃত বন্দীদশা শুরুর আগে কলকাতা শহরে থাকার জায়গা খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। আমার মতো অলস প্রকৃতির মানুষের কাছে এ যে বিষম জ্বালা তা আশা করি বলে বোঝাতে হবে না। পূর্বে মনের মতো জায়গা খোঁজায় ব্যর্থ হয়ে হস্টেলেই ফিরেছিলাম; এবার বদ্ধপরিকর হয়ে রণভূমি (?) -তে নামবো বলে সবে কোমর বেঁধে তৈরি হচ্ছি, শমন এলো। তারপর পৃথিবীর ওপর দু'টি ঋতু কেটে গেলো, আর বাইরে যাওয়া হলো না।

এই ঘর খোঁজাটা বড্ডো চাপের। আক্ষরিক অর্থেই। এটা মেলে তো সেটা মেলে না। কলঘর ভালো তো ব্যালকনি বাজে, ব্যালকনি যদি বা চলনসই, রান্নাঘরটা ঘুপচি। পকেটের দিকে তাকাতে গেলে সব ঠিক ঠিক মিলবে না। অতঃপর যেমন-তেমন মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েই চলুক। আর ইনস্টা বা ফেবুর পাতা চোখের সামনে এলে বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস। অনলাইন শপিং সাইটে নজরকাড়া কার্পেট বা দেওয়ালজোড়া ছবির ফ্রেম দেখেও বুক হু হু! তা এই নশ্বর জীবনে কতোটুকুই বা জোটে?
তবে এছাড়াও ঘর জোটানো মুশকিল। একবার যে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছে, পুরোপুরি ঘরে ফিরতে তার গোটা জীবনটাই পার হয়ে গেলো হয়তো। এরকম কি হচ্ছেনা? হামেশাই হচ্ছে! তা বলে ঘরছাড়াদের জন্য ক'টিই ভাতগন্ধী আঁচল, হলুদগন্ধী হাত সন্ধ্যেবেলা ধুনো দিতে দিতে শ্বাস ফেলে তার খবর আমাদের জানার প্রয়োজন কী?
সেই কোনকালে ভার্জিনিয়া উলফ সাহিত্যে নারীর স্থান সঙ্কুচিত কেন বোঝাতে একটি নিজস্ব ঘরের কথা বলেছিলেন। তারপর কতো ঘর উড়ে গেলো, পুড়ে গেলো, দু'হাজার কুড়িতে দাঁড়ানো বঙ্গললনা লকডাউনে আবিষ্কার করলেন একলা ঘরে চা-পাতা ফুরোলে ঘরের মাহাত্ম্যে কিচ্ছু যায় আসে না! এমনটাও হবে কেউ ভাবতে পেরেছিলো?
তবে একলা ছেলেদের চাইতে একলা মেয়েরা বেশিই গোছালো। মেয়েদের ঘরের চাদরগুলো বেশ রঙিন, ধোয়া-কাচা হওয়ার ছাপওলা। জুতো-মোজা ঠিকঠাক, জামাকাপড় তারের ওপর পাট করেই ঝোলানো। ছুটির দিনে ঝাঁট-পাট পড়ে। বইখাতা, অ্যাশট্রে, ল্যাপটপ কেমন ছিমছাম ভাবে পড়ে আছে। চাই কি ধূপকাঠির গন্ধও পাওয়া যায় ঘরে। ছেলেদের অতো পোষায় না সত্যিই। কালেভদ্রে ঝাঁট পড়ে, বিছানায় রাজ্যের বাজে জিনিস যার সঙ্গে বিছানার কোনোও সম্পর্কই নেই। ওরা ক'খানা টিকটিকি বা আরশোলাও কি আর পোষে না?!!
বাংলাদেশি বন্ধুরা বাড়ি বলেন না, বলেন বাসা। ভারী মিষ্টি শোনায়। বাড়িটা কেমন যেন ইট-কাঠ সিমেন্টের মতো কঠিন কঠিন একটা বিষয়। বাসাটা অনেকটা নরম বিকেলে চা খেতে খেতে হালকা আড্ডার মতো। আমন্ত্রণেই একটা "এসো এসো" ভাব। বাড়িতে এসো-র সঙ্গে একটু তফাৎ আছেই।
এক বান্ধবী অনেকদিন ঘুরে টুরে ম্যাচিং পর্দা, কুশন‌কভার, মায় তোয়ালে, পাপোষ অবধি কিনে একটি ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সংসার পেতেছিলো। বছর না ঘুরতেই ভালোবাসার মানুষটির অন্য একটি ভালোবাসার মানুষ জুটে গেলো। অতঃপর ক'টি বোবা পর্দা, কভার, তোয়ালের মাঝে বসে উদাসনয়না বলেছিলো, "ঘর ভেঙে গেলো!" এ ঘর বুকের ভেতরের ঘর বলাই বাহুল্য। কোনোও ইঞ্জিনীয়র, আর্কিটেক্ট যার মসৃণ নকশা করেননি, যার জন্যে বাঁধাধরা বাজেট কোনোওদিন পেশ হয়নি। আর যার ভাঙার তিলপরিমাণ আঁচও বাইরে থেকে বোঝা যায় না। বড়োই গোলমেলে বিষয় এই ঘর…
লকডাউনে পাকেচক্রে মা'র কর্মক্ষেত্রে ভাড়াবাড়িতে আছি। পুরোনো বাড়ি। অধিকাংশ দরজায় তালা। পায়রারা, বেজীরা, কাঠবেড়ালীরা বিনা ভাড়াতেই দিব্যি থাকে! সে থাকুক সমস্যা নেই। পুরোনো বাড়ির একটা আলাদা গাম্ভীর্য থাকে। যেন সবাই ছেড়ে গেছে বটে, তবুও কিছু কিছু যেন ফেলে গেছে এমন একটা ভাব। সর্বাঙ্গে বয়সের ছাপ নিয়ে জবুথুবু বৃদ্ধের মতোই থাকা।
এখানে বিকেলের রোদ যখন পুরোনো দালানে পড়ে, মনে হয় কার বোবা কান্না ছড়িয়ে পড়লো। এখানে এককালে যারা ছিলো তারা কে কোথায় কোন নদীর ধারে কার বিছানায় শেষ ঘুম ঘুমিয়েছে।
আর এক নিঃসম্পর্ক আমি পাতাবাহারের টব নিয়ে দালানে বসিয়ে দেবো কিনা ভেবে চলেছি। জীবন এমন বেমানান বটে!