আস্তে আস্তে জট খুলছে সুতোর। আস্তে আস্তে গিঁট ভাঙছে সম্পর্কের। মানুষ একা থেকে আরও একা হয়ে উঠছে। একান্নবর্তী পরিবার ক্রমশ আবাসনভিত্তিক পরিবার হয়ে উঠছে। এসব নিয়ে চায়ের দোকানের বেঞ্চ, সরকারি অফিসের ক্যান্টিন বা রকের আড্ডা ও কাগুজে আলাপ অনেকদিন ধরে জমজমাট। এর মধ্যে একটা ঝড় হঠাৎ আছড়ে পড়লো বিশ্বের উন্নততম দেশগুলোকে ছুঁয়ে আমাদের ভারতেও। এ ঝড় ভাইরাস ঝড়। আতঙ্কের ঝড়। মানুষের থেকে মানুষের দূরত্ব এবং অন্তহীন একার দ্বীপকে প্রকট করে দিলো এই ঝড়। ভাইরাস না প্রতিশোধ! দেশের প্রতি দেশের, রাষ্ট্রের প্রতি রাষ্ট্রের, রাজ্যের প্রতি রাজ্যের সমস্ত রাজনীতি বাদ দিয়েও এ প্রতিশোধ মানুষের প্রতি প্রকৃতিরও বটে। যে জবরদখলে মানুষ যুগযুগ ধরে নিজের ভিত জোরদার করেছে বিনিময়ে বিক্ষত করেছে অপরপক্ষকে, আজ সেই সর্বংসহা প্রতিশোধের খেলাটি নিজের হাতে উপুড় করেছে। আর নিজেকে আরও সাজিয়ে-গুছিয়ে, সৌন্দর্যে ঢেলে ঋতুতে ঋতুতে রূপের পরমান্ন উপস্থিত করছে।

নিয়ম মেনে এ বছরও সে এনে দিলো শরতের কাশচামর, দুর্গাগন্ধের পুজোকাল। বাঙালীর মন আনচান কিন্তু কোথায় প্রতিবছরের মতো সেই ভিড় করে কেনাকাটার ধুম? কোথায় প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে লাইন দিয়ে গা ঘষাঘষি ঘামের আন্তরিকতা! এ বছর কী সম্ভব এসব? শুঢু এ বছর নয়, আগামী কয়েকবছর কী এমন করা উচিত! নাহ, সম্ভব নয় যেমন, উচিতও নয়। এখন নিরাপদ দুরত্ব, স্যানিটাইজারের কৌটো, ডিজাইনার মাস্কে পুজোর নতুন পৃষ্ঠা, নতুন অধ্যায়, নতুন গল্প।

 পশ্চিমবঙ্গ তথা বাংলা থেকে অনেকটা দূরের এক রাজ্যে প্রায় দশ বছর হয়ে গেলো আমার বসবাস। দক্ষিণের এই শহরে উৎসব মানে উগারি, ওনাম, গণেশ চতুর্থী, গৌরীপুজো, নবরাত্রি। এ নবরাত্রিই আমাদের বাঙালীদের দুর্গাপুজোর নামান্তর। প্রবাসী বাঙালীরা জড়ো হয়ে কয়েকটি বেঙ্গলি এসোসিয়েশন থেকে দুর্গাপুজো করেন। দক্ষিণের শহর হলে কী হবে, শরৎ এখানেও তার বৈচিত্রের সাজটি পরিপূর্ণ করেছে। এ সময় প্রকৃতি উদ্ভিন্নযৌবনা। আকাশের মেঘ দেখে মনে হচ্ছে থ্রি ডি মুভির স্ক্রিন। গাছেরা আলোসবুজ, ফুলেরা নিবিড়রঙ। পাখি এবং মধুলোভী প্রজাতির হুল্লোড় এবার অনেক বেশি। অবশ্য পৃথিবীর ভাইরাস অসুখ তথা অসুরের মোকাবিলা করতে এ শহরের বাঙালীরা এ বছর পুজো করবে নামমাত্র। প্রতিমা নয়, ঘট স্থাপন করে তাতেই পুজো করা হবে। সেখানেও কেবল দু’-তিনজন অত্যাবশ্যক ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষেধ। অন্যরা পুজো দেখতে চাইলে নেটের লিঙ্ক পাঠানো হবে। ভার্চুয়ালি পুজো অ দর্শন সেরে নাও সবাই। কেন জানিনা আমার কিন্তু ভালো লেগেছে এই নতুন পদ্ধতি। ব্যক্তিগতভাবে জাঁকজমক তেমন পছন্দ করি না আমি।

প্রসঙ্গত বলি, এ শহরে একটি নাটকের দলের সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি বেশ কয়েক বছর হলো। দলের নাম ‘এনাদ ঃ একটি নাটকের দল’। শহরের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টায় আঠারো বছর ধরে বাংলা নাটক নিয়ে কাজ করে চলেছে ‘এনাদ’। আমার এই দল আমার পরিবারও বটে। আমরা সারাবছর নাটকের চর্চা করি। অভিনয় করার থেকে অভিনয় শেখাটাই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। আমাদের প্রশিক্ষণ দেন অমিতাভ বক্সী। এ বছর সাহিত্যভিত্তিক নাটকের কাজ শুরু করেও ভাইরাস সংক্রমণের কারণে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে আমাদের দল। কর্ণাটকের এই শহরে দলে দলে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। অনেক পরিচিত মানুষের খবর পাচ্ছি যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে রেখেছেন নিজেদের। এই ভাইরাসটি থিয়েটারের দলগুলোকে বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলো। কলকাতার দল্গুলো খবর পাচ্ছি। কেবল নাটক/ থিয়েটারের অভিনেতারাই নন, যেকোন পারফরমেন্সের পিছনে থাকে লাইট, সাউন্ড, মেকআপ আর্টিস্ট এবং স্টেজ ম্যানেজমেন্টের প্রচুর শিল্পীমানুষ। থিয়েটার এবং প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকায় এরা সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। কাজ নেই তাই টাকাও নেই তাই ভাত নেই পেটে। যদিও বিভিন্ন থিয়েটার গ্রুপ টাকা তুলে সাধ্যমতো তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করে চলেছেন। ‘এনাদ’ থেকে আমরাও সে চেষ্টা করেছি। কলকাতার সেইসব ‘ব্যাকস্টেজ আর্টিস্ট’- দের হাতে কিছু পরিমাণ অর্থসাহায্য তুলে দিতে পেরেছি। এবারে শুনছি কলকাতায় পুজো হবে। অন্যবছরের মতো না হলেও, হবে। কিন্তু এরা কী পুজোর আনন্দ উপলব্ধি করতে পারবে? এদের বাচ্চাদের গায়ে উঠবে নতুন জামা?

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মদনপুর নামে একটা গ্রামে যেতাম। পুজোর পাঁচটা দিনের যে কোন একটা দিনে। ক্ষেতের পর ক্ষেত। পাশে বয়ে যাচ্ছে গঙ্গার অফহোয়াইট শরীর। ওখানেই কোন ছোট্ট ফাঁকা জায়গায় পুজো হতো। ছোট প্যান্ডেল, ছোট প্রতিমা, মুখের ঘামতেলে আলোর ঝকঝকানি, লাল গামছায় কলাবউ... ভিড় নেই, জাঁক নেই, মাইকের চিৎকার নেই... শুধু ঢাকের আওয়াজ আর সরল-সহজ কিছু মানুষের আনাগোনা, ঘরোয়া আয়োজন। বাবার থেকে প্রতিবছর পুজোয়পাওয়া সেরা উপহার  ছিলো এটাই। ঢাকিদের সঙ্গে থাকতো ওদের কুচি কুচি ছেলেমেয়েরা। ঢাকের বোলে তাল মিলিয়ে ওরা কাঁসি বাজাতো ঠুং ঠুং। বাবা আমার হাত দিয়ে ওদের হাতে তুলে দিতো ছিটের নতুন জামা। ওদের চোখে আলো খেলতো। আমার ওই বন্ধুদের পেছন পেছন কাশবন, বুড়িরমাঠ, বটতলার ছায়া, বাঁশবন আর বুনোগাছের জঙ্গলে ছোটাছুটি, হাঁসের দঙ্গল তাড়ানো আর বাবুইয়ের খসে যাওয়া বাসা কুড়নোর রূপকথা আজো মনের ভিতর গাঁথা রয়েছে। কেমন স্বপ্নের মতো কখনো কখনো ঘোরের সেই দৃশ্যগুলোর যাতায়াত থাকে। পুজো আসলে শুধু ওই ব্রিজটুকুই বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়। এ রাজ্যের এ শহরে পুজো আসার আগেই পুজো টের পাই যখন রুদ্রপলাশের কুঁড়ির ভেলভেট মুখ খুলে তীব্র কমলা হাসি মেলে ধরে। এবারেও তাই আগমনী ওই হাসিতেই গেঁথেছে আমাকে। মাটির প্রতিমা না হোক, প্রকৃতিপ্রতিমা অকৃপণ। সেখানে কোন ভাইরাসের জারিজুরি চলবে না।