[ ২০১৮ সালে শুরু হয়েছে ব্যতিক্রমী প্রকাশনা-সংস্থা 'পার্চমেন্ট'-এর যাত্রা। দু'বছরেই বাংলা ভাষাভাষী মননশীল পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্জন করে নিয়েছে 'পার্চমেন্ট'। কিছু প্রশ্ন নিয়ে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় মুখোমুখি হয়েছিল প্রকাশক ফাল্গুনি ঘোষের।]

প্র. প্রকাশনা কেন? বিশেষত পার্চমেন্টের মতো একটা দীক্ষিত ও শিক্ষিত প্রকাশনা?
উ. প্রথম অংশের উত্তরে বলব, প্রকাশনা ভালোবাসি, আর ভালোবাসাটাকেই পেশার সঙ্গে এক জায়গায় আনতে চাই বলে প্রকাশনা করি।
আর দ্বিতীয় অংশের উত্তরে বলব, আসলে এই দীক্ষিত, শিক্ষিত ব্যাপারগুলো খুব কনফিউজিং। কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট আকার থাকে না। বিভিন্ন জেলায় মেলা করতে গিয়ে আমাদের এবিষয়ে অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা হয়েছে। এমন অনেক পাঠক আমাদের বই সংগ্রহ করেছেন, যাঁদের সঙ্গে আপাত ভাবে প্রথাসিদ্ধ বিদ্যাচর্চার কোনো ধারাবাহিক সংযোগ নেই। তাঁরা পরে ফিরে এসে যখন সেই বইগুলি বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, বইগুলি বিষয়ে তাঁদের অনুভূতি জানিয়েছেন, আমরা বিস্মিত হয়েছি এটা দেখে যে, কী আশ্চর্য গভীর ভাবে তাঁরা গ্রহণ করেছেন বইগুলিকে। আসলে কে কোন অবস্থান থেকে কীভাবে একটি বিষয়ের হাত ধরে ফেলবেন, এর কোনো বাঁধা গত নেই।
পাশাপাশি এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে, যেখানে এমন কোনো ব্যক্তি, যিনি নিজেকে খুব এগিয়ে থাকা মানুষ বলে মনে করছেন, প্রচুর বই পড়া একজন মানুষ বলে মনে করছেন, তিনি আমাদের প্রচুর বই কিনছেন। কিন্তু যখনই সেই বইগুলি নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছেন, তখনই বুঝতে পারছি, তিনি বইগুলো ঠিক করে পড়েননি। এতে আমাদের ব্যবসায়িক লাভ হচ্ছে ঠিকই, আর সেটাকে অবহেলাও করা যায় না, কিন্তু মানসিক তৃপ্তি হচ্ছে না।
ফলেই আমরা আমাদের একটা পথ ঠিক করে কাজ করি। আর সেই পথেই নানা ধরনের পাঠকের সঙ্গে দেখা হতে থাকে।

প্র. পথটা কী?

উ. 'পার্চমেন্ট' মূলত ইতিহাসভাবনাকে মাথায় রেখে কাজ করে। পুনর্মুদ্রণ, প্রবন্ধ, আখ্যান, কবিতা, গল্প এমন নানা দিক থেকে ইতিহাসবোধকে অ্যাপ্রোচ করার চেষ্টা করা হয়। ইতিহাস যে একটা দূর গ্রহের পরীক্ষাকেন্দ্রিক মুখস্থ করার বিষয় নয়, ইতিহাস আমাদের নিত্যদিনের প্রতি মুহূর্তের পরিচিত, এটা বলার চেষ্টা করে 'পার্চমেন্ট' নানা ভাবে। মানে, বলতে চাইছি যে, আমার চশমা, জামা, জুতো, রহস্যবোধ, দুঃখ, ঘুম- এদের প্রত্যেকেরই ইতিহাস আছে, ইতিহাসের উত্তরাধিকার আছে। ইতিহাস এতটাই ঘরোয়া একটা বিষয়। এই ভাবনাটা নিয়েই 'পার্চমেন্ট' প্রধানত কাজ করার চেষ্টা করে।

প্র. প্রকাশনা করতে এলে কীভাবে? মানে এই বইয়ের জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে কীভাবে? পার্চমেন্টের আগেও তুমি 'সুচেতনা'র সঙ্গে কাজ করেছ। সেই পথটার কথা যদি আমাদের বলো।

উ. পথটার কথা বলতে গেলে আসলে অনেকটা আগে থেকে বলতে হয়। আমি জন্মেছিই একরাশ বইয়ের ভিতরে। বাবা-মা দু'জনেরই নিরন্তর পাঠের অভ্যাস ছিল। ফলে বই বিষয়টা আমার কাছে খুবই ঘরোয়া একটা বিষয় ছোটো থেকেই। তারপর একসময়ে, মানে আমার ক্লাস সিক্স/সেভেন, এরকম সময়ে বাবার হাত ধরে কলেজস্ট্রিটে আসি। মনে আছে, প্রথমবার কলেজস্ট্রিটে এসে খুব অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। বাড়িতে বইয়ের টাইটেল পেজে যে প্রকাশনাদের নাম দেখি, তাদের অনেকের সাইনবোর্ড দেখতে পাচ্ছিলাম বইপাড়ায়। মনে হচ্ছিল, আরে এইসব বইগুলো এখান থেকে বেরোয়!
আমার বড়ো হওয়ার মূল পর্বটা কেটেছে চন্দননগরে। সেখানে পরপর নানা রকম অভিজ্ঞতা ঘটতে থাকে। তারপর একটু বড়ো হয়ে কলেজস্ট্রিটের একটি কলেজে পড়তে আসি। সেখানেও কিছু অভিজ্ঞতার সূত্রপাত হয়, যেগুলি 'প্রকাশক হব' এই ভাবনার অনেক আগেই মুদ্রণ, প্রকাশনা এই বিষয়গুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটাতে থাকে। এই পর্বটা নিয়ে কিছুদিন আগে একটা লেখা লিখেছিলাম। এখানে সেই লেখাটাকেই একবার উল্লেখ করা যাক।
"পার্চমেন্ট তখনও স্বপ্নের ধারে কাছেও আসেনি। এমনকি বইপাড়াও নয়। অথচ আজ বুঝি, একদিন যে বই তৈরি করব, তার একেবারে গোড়ার হাতেখড়ি হচ্ছিল সেই চোদ্দো বছর বয়সে। বাবার উদ্যোগে 'স্বীকৃতি' নামে একটি পত্রিকা বেরোত চন্দননগর থেকে। খবরের কাগজের মাপের বড়োসড়ো আকারের একটা পত্রিকা। লেটার প্রেসে ছাপা। সে পত্রিকার প্রুফ দেখা থেকে আরম্ভ করে প্রেসের কাজকর্মের অনেকটা দায়িত্বই বাবা দিয়েছিলেন আমার উপর। লেটার প্রেসে কীভাবে কম্পোজ হয়, কীভাবে ট্রে বাঁধা হয়, রোলারে কালি লাগানো, প্রুফ নেওয়া, ছাপা- এইসব নানান পর্যায় বিচিত্র নেশার মতো ঘিরে ধরেছিল আমাকে। সেই কালির গন্ধ, প্রুফের নিউজপ্রিন্টের রং, মাঝে মাঝে একটু ধেবড়ে যাওয়া প্রুফের শব্দগুলো অজান্তে ঢুকে পড়ছিল মাথার ভিতর। কীভাবে প্রুফ দেখতে হয়, বাবা কিছুটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আর অনেকটাই শিখিয়েছিলেন আমার মাস্টারমশাই শুভ্রজিৎ ভট্টাচার্য্য। লেখা সংগ্রহ করা, কম্পোজ, প্রুফ, ছাপা, লেখকদের কপি পৌঁছে দেওয়া- এই পর্বগুলো প্রতি সংখ্যায় এগোনোর সঙ্গে সঙ্গেই মনে হত, আমিও কেমন বড়ো হয়ে যাচ্ছি। হ্যাঁ, জিঙ্ক ব্লকের সঙ্গেও আমার পরিচয় সেই পর্বেই।
আরেকটু বড়ো হয়ে চন্দননগর থেকেই বন্ধুরা মিলে বার করেছিলাম 'নতুন সাঁকো' পত্রিকা। খবরের কাগজের আকারে নয়, বইয়ের আকারে। শেষের দিকে দু'একটি সংখ্যা অফসেটে ছাপা হলেও অধিকাংশ সংখ্যাই ছাপা হয়েছিল লেটার প্রেসেই। তখন স্কুলজীবনের শেষ দিক। ফলে 'স্বীকৃতি' পর্বের চাইতে একটু বড়ো। লেখালিখির চেষ্টার সুবাদে বিচিত্র পত্রপত্রিকার সঙ্গে পরিচয় ঘটছে। তাই মাথায় পত্রিকাসজ্জার বেশ কিছু পরিকল্পনা। আরও বেশি করে ঢুকে পড়ছি লেখাসংগ্রহ, কম্পোজ, প্রুফ, ছাপা, বণ্টনের আশ্চর্য জগতের মধ্যে। বিশ্বাস করুন, প্রকাশক হব, এ-চিন্তা তখন কোথাও ছিল না। কিন্তু আজ বুঝি, আমার ভবিষ্যৎলিপি তখনই ওই কালির গন্ধের মধ্যে, প্রুফের কাটাকুটির মধ্যে একটু একটু করে লেখা হয়ে চলেছিল।
এরপর কলকাতার বইপাড়ার একটি কলেজে পড়তে আসা। আর কলেজ-ঘেঁষা হোস্টেলেই একদিন বই তৈরি করার হঠাৎ সুযোগ। আমাদের সিনিয়ার সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায় কামুর নোটবুক অনুবাদ করছেন। প্রথম তিনটি অংশ অনুবাদ হয়েছে। ঠিক হল, বন্ধুরা চাঁদা করে সেটি বই করা হবে। শুরু হল বইয়ের কাজ। সৌম্যদা, অমিতাভদা, বিপ্লবদার সঙ্গে জুড়ে গেলাম আমিও। 'শ্বাসমঞ্চ' নামে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে বইটি প্রকাশিত হল। প্রকাশক হিসেবে নাম ছিল আমার আরেক বন্ধু রাজর্ষি সেনগুপ্তের। স্ক্রিনে প্রচ্ছদ হয়েছিল। প্রচ্ছদ ছেপে দিয়েছিলেন তখনকার 'পিকাসো' প্রেসের অর্পিতা ঘোষ। সেই অফসেটের ছাপার সঙ্গে পরিচয় ঘটল। প্রুফ, ছাপা- বিভিন্ন পর্ব পেরিয়ে, না পত্রিকা নয়, একটা আস্ত বই তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। প্রকাশিত হল সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায় অনূদিত 'আত্মপ্রতিকৃতির খসড়া'।
এরপরেই আস্তে আস্তে অফবিটের শ্যামলদার সঙ্গে কাজে জুড়ে যাওয়া।
আজ যখন পার্চমেন্টেরও বেশ কতগুলি বই বেরিয়ে গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তের পাঠকদের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছি পার্চমেন্ট নিয়ে, প্রশ্রয় পেয়ে চলেছি পাঠকদের, তখন স্মৃতির আকাশ ছেয়ে আছে 'স্বীকৃতি', 'নতুন সাঁকো' আর 'আত্মপ্রতিকৃতির খসড়া'।
আমার অজান্তেই আমার প্রকাশকজীবনের ভিত গড়ে দেওয়া তিন মায়াময় পর্ব।"
বইপাড়ায় ঘুরতে ঘুরতেই শ্যামলদার সঙ্গে পরিচয় আমার। 'অফবিট' প্রকাশনার প্রকাশক শ্যামল ধর। শ্যামলদার সঙ্গে পরিচয়টা আমার প্রকাশনা সংক্রান্ত জীবনের এক বড়ো মাইলস্টোন। কারণ শ্যামলদাই প্রথম আমাকে পড়া এবং লেখার সঙ্গে সঙ্গে কাউন্টারের অন্য পাশ অর্থাৎ প্রকাশনার দিকটার সঙ্গে পরিচিত করেন। এখানে বলে নেওয়া দরকার, কলেজ ম্যাগাজিন করার সূত্রে 'শিলালিপি' মুদ্রণ সংস্থার কর্ণধার বাসব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও এইসময়েই আমার পরিচয়। আর বাসবদা 'সুচেতনা' প্রকাশনারও প্রাণপুরুষ। কিন্তু এইসময়ে বাসবদার সঙ্গে পরিচয়টা মূলত আড্ডারই, প্রকাশনা সংক্রান্ত নয়। সে প্রসঙ্গ আসবে আরও অনেকটা পরে। আরও একটা বিষয় পরিষ্কার করে রাখা যাক- বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতায় কালীঘাটে যেখানে 'পার্চমেন্ট'-এর দপ্তর, তার নামও 'শিলালিপি'। সেটি গ্রাফিত্তি সম্পাদক শুভঙ্কর দাশের মালিকানাধীন। বাসবদার মুদ্রণ সংস্থা 'শিলালিপি' এবং কালীঘাটে শুভঙ্করদার মালিকানাধীন 'শিলালিপি' দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। যাই হোক, শ্যামলদার প্রসঙ্গে ফিরি। শ্যামলদার সঙ্গে পরিচয়ের পরেই আমি ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ি 'অফবিট'-এর সঙ্গে। দোকান খোলা, বই বিক্রি, প্রুফ দেখা, প্রেসের সঙ্গে কাজকর্ম চলতে থাকে। শ্যামলদা হাতে ধরে প্রকাশনার নানা দিক আমাকে শিখিয়েছেন। এই সময়েই আমার মেলাজীবনেরও আরম্ভ। 'অফবিট'-এর সঙ্গেই নানা জেলায়, এমনকি নানা গ্রামাঞ্চলেও মেলা করতে গিয়েছি। কীভাবে পাঠকের রুচি চিনে নিতে হয়, বই নিয়ে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে স্টল সাজাতে হয়- এসবই তখন থেকেই শেখার শুরু। এইসময়েই বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে প্রুফ রিডিং, কপি এডিটিঙের কাজও করছি।  ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে নানা দেশীয়, বিদেশীয় সংস্থার চাকরিতে জড়িয়ে গিয়েছি। কিন্তু কোনো সময়েই  বইপাড়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। তারপর জীবনের বাঁকবদলে আবারও পূর্ণ সময়ের জন্য ফিরেছি বইপাড়ায়। এই পর্বেই ধীরে ধীরে 'সুচেতনা'র সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। আমার জীবনের নানা সংকটমুহূর্তে বাসবদা যেমন আমার পাশে থেকেছেন, তেমনই প্রকাশনারও, বিশেষত মুদ্রণ সংক্রান্ত নানা খুঁটিনাটি অবিরল শিখেছি তাঁর কাছে। শ্যামলদার কাছে যে গোড়াপত্তন হয়েছিল, তা অনেকটাই শানিয়ে উঠেছে বাসবদার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। আমি এই মুহূর্তেও বিশ্বাস করি, পশ্চিমবঙ্গে পারদর্শিতার দিক থেকে যদি পাঁচজন মুদ্রণকারকে বেছে নিতে হয়, বাসব চট্টোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যেও অন্যতম অগ্রগণ্য।
এরও পরে আসবে 'পার্চমেন্ট'-এর পর্ব। ২০১৮ সালের জুন মাসের চোদ্দো তারিখে দেবরাজ ভট্টাচার্য সম্পাদিত 'Karl Marx: Nineteenth Century Memories and Reflections' বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় 'পার্চমেন্ট'-এর যাত্রা। দেখতে দেখতে দুটো বছরও তো পেরিয়ে গেল। আর এর মধ্যেই 'পার্চমেন্ট' যেভাবে পাঠকদের ভালোবাসা পেয়েছে, ভরসা অর্জন করতে পেরেছে, তার জন্য আমি পার্চমেন্টের বিভিন্ন বইয়ের লেখক, পার্চমেন্টের নানা পর্বের সহায়ক বন্ধু, পাঠক এবং সমস্ত স্তরের গ্রন্থকর্মীর কাছে কৃতজ্ঞ।

প্র. তোমার কথায়, বিভিন্ন লেখায় 'আমার বইপাড়া' কথাটা ঘুরে ঘুরে আসে। এই ব্যাপারটা নিয়ে যদি একটু বলো।

উ. বইপাড়ার যে কলেজে আমি পড়তাম, আমার বাবাও সেই কলেজেই পড়েছেন ষাটের দশকের শুরুর দিকে। ফলেই ছোটোবেলা থেকেই বাবার কাছে সেই কলেজ আর তার ধারণক্ষেত্র বইপাড়ার কথা শুনেছি। সেই শোনা থেকে কল্পনার ভিতর বইপাড়ার সঙ্গে একটা আত্মীয়তাবোধ ছিলই। আর সেটাই বাস্তবে পরিণত হল, যখন আমি ওই কলেজেই পড়তে ঢুকলাম নব্বইয়ের দশকে। সঙ্গে জড়িয়ে গেল হোস্টেল। ফলে শুরু হল চব্বিশ ঘন্টার বইপাড়া। ধীরে ধীরে বইপাড়ার অলিগলি, কাজকর্ম, আলোবাতাসের সঙ্গে পরিচয় শুরু হল। এখানে একজনের কথা বলতেই হবে। তিনি 'বিশ্বজ্ঞান' প্রকাশনার প্রবাদপ্রতিম প্রকাশক দেবকুমার বসু। দুরুদুরু বুকে তাঁর সঙ্গে প্রথম আলাপ করতে যাওয়ার মুহূর্তে তাঁকে বলেছিলাম- "আপনার কাছে পুরোনো বইপাড়ার কথা শুনতে চাই।" দরাজ গলায় তিনি জানিয়েছিলেন, "এভাবে কিছু জানা যায় না। বইপাড়ার একটা সমাজ আছে, আর তার একটা ডিসিপ্লিন আছে। সেই ডিসিপ্লিনটায় ঢুকতে হয়। তবে বইপাড়াকে জানা যায়।" দেবুজেঠুর এই কথাটা এক অন্য সন্ধানের মধ্যে এনে ফেলল আমাকে। শুরু হল বইপাড়ার নিজস্ব ডিসিপ্লিনের খোঁজ। এখানে আবার 'অফবিট'-এর শ্যামলদার প্রসঙ্গে ফিরে আসতে হবে। প্রকাশনার কাজের পাশাপাশি শ্যামলদা যে-বিষয়টা খুব গুরুত্ব দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, সেটা হল বইপাড়ার পরম্পরা। বইপাড়ার সমস্ত প্রকাশকই তো টেকনিক্যালি পরস্পরের বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি অদ্ভুত স্নেহ শ্রদ্ধা সহায়তার সম্পর্ক বইপাড়ার বৈশিষ্ট্য। আর আছে বইপাড়ার বাড়িঘর, ধুলোবালিতে মিশে থাকা ইতিহাসকে শরীরে মনে মেখে নেওয়ার চেষ্টা। কত মানুষকে এখানে দেখেছি, যাঁদের বাহ্য ভূমিকা একরকম, কিন্তু শুধুমাত্র বইপাড়ার হাওয়া গায়ে মাখায় এক সুগভীর ইতিহাসের ধারার মধ্যে লোকচক্ষুর আড়ালে ডুব দিয়ে রয়েছেন তাঁরা। 'বইপাড়ার তন্ত্রধারক' নামের একটা সিরিজে তাঁদের কারো কারো কথা লেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু লেখায় আর কতটুকুই বা ধরা যায়!
এমন অনেক অনেক দিন কেটেছে, যখন বইপাড়ার দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে একা একা বইপাড়ার অলিগলিতে ঘুরে বেড়িয়েছি ডিরোজিও থেকে ডিকে-র বইপাড়ার খোঁজে। ভারতীয় অধ্যাত্মচর্চার জগতে যেমন 'জ্ঞানগঞ্জ' নামে এক অদৃশ্য শিক্ষা ও শক্তির কেন্দ্রের কথা বলা হয়, তেমনই বইপাড়ার শিক্ষা ও শক্তির কেন্দ্রটি হল তার আপাত অদৃশ্য এই পরম্পরাটি। এই পরম্পরার সঙ্গে যত দেখা হয়েছে, পরিচয় ঘটেছে আমার গুরুদের হাত ধরে, ততই আমার সঙ্গে বইপাড়ার একক একটা সম্পর্ক প্রগাঢ় হতে থেকেছে। এখানেই 'আমার বইপাড়া'র জন্ম।


প্র. 'তোমার বইপাড়া'য় কোনো বদল দেখ, যেগুলো তোমাকে ভাবায়?

উ. বদল তো প্রচুর। আর সেটাই স্বাভাবিক। বদল গতির চিহ্ন। আর স্থবিরতা মৃত্যু ডেকে আনে। কিন্তু দু'একটা বদলে একটু মুষড়ে পড়ি। কখনো কখনো কোথাও কোথাও বাণিজ্যের চেয়ে বেনিয়াবৃত্তি বড়ো হয়ে ওঠে। ফলেই সেখানে প্রকাশকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহায়তার সম্পর্ক আলগা হয়ে আসে। পাশাপাশি বইপাড়ায় কাজ করতে আসা অনেকেই পাড়াটাকে তার প্রাণের জায়গা থেকে চেনেন না বা চিনতে চানও না। নিছক ব্যবসা ক্ষেত্রের বাইরে পাড়াটার বহমান সত্তা তাঁদের কাছে আমল পায় না বলেই উজ্জ্বল উত্তরাধিকারের বোধ আর দায়িত্বটাও ধরা পড়ে না। একটা উদাহরণ দিয়ে কিছুদিন আগে একটু লেখা লিখেছিলাম। সেটা এখানে উল্লেখ করলে বিষয়টা হয়তো খানিক পরিষ্কার হবে।
"আমাদের কলেজজীবনের কথা। এক পর্বে বেশ কিছুদিন আমি ও আমার অনুজ বন্ধু মিথুন নারায়ণ বসু সন্ধে সাড়ে সাতটার সামান্য আগে হাজির হতাম সূর্য সেন স্ট্রিটের এক বাড়ির গেটে। ঠিক সাড়ে সাতটায় দোতলা থেকে নৈশাহার সেরে নেমে আসতেন তিনি। পরনে সাদা হাফহাতা গেঞ্জি আর নীল সাদা চেকড লুঙ্গি। রাস্তা টপকে ঢুকে পড়তেন কলেজস্কোয়ারে। পিছু পিছু আমরাও। সুইমিং পুলের চারপাশ ঘিরে হাঁটতে থাকতেন রাত সাড়ে নটা অব্দি। আর অনর্গল বলে যেতেন কলেজস্ট্রিট, অ্যালবার্ট হল, কলেজ স্কোয়ার, প্রেসিডেন্সি কলেজ ঘিরে তৈরি হওয়া বিচিত্র ইতিহাস। জ্ঞানচর্চা, রাজনীতি, বাবুয়ানি, প্রেম, যৌনতা, খেলাধুলো... কী থাকত না তাঁর বলে চলায়! তাঁর কাছেই প্রথম জানি, কলেজস্কোয়্যারের নাম আদতে ছিল 'মাধব বাবু কা তালাও'। তাঁর লেখা কিছু বইও দিয়েছিলেন আমাদের। তাদের মধ্যে 'আজব সফর' আর 'আমার প্রেমিকারা'র কথা মনে পড়ে।
হোস্টেলে আমাদের এক বন্ধু আসত পুরুলিয়া থেকে। একদিন ইউনিভার্সিটি পোস্ট অফিসে একটি কাজে গিয়ে কাউন্টারে সে নিজের নাম বলে। পিছন থেকে এক বৃদ্ধ বলে ওঠেন- "তুমি দেখছি আমার নেমসেক।" সেই বন্ধুর সূত্রেই এই বৃদ্ধের সঙ্গে আলাপ আমাদের।
সম্প্রতি কলেজস্ট্রিটের, এমনকি সূর্য সেন স্ট্রিটে তাঁর বাড়ির উল্টোফুটের বেশ কিছু বইয়ের দোকানের তরুণ তুর্কিদের জিজ্ঞেস করে দেখেছি, তাঁর নামও জানেন না তাঁরা।
কলেজস্ট্রিটের ধুলো ধোঁয়ায় ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বইপাড়ার ইতিহাসের জীবন্ত অভিধান কৃষ্ণগোপাল মল্লিক বা KGM-এর নাম।"

প্র. আচ্ছা, এই বদল প্রসঙ্গেই একটা প্রশ্ন করি। প্রকাশনা জগতে ইদানিং POD বা Print on demand খুব পরিচিত একটা কথা। এবিষয়ে কী বলবে?
উ. প্রিন্ট অন ডিম্যান্ড তো একটা প্রযুক্তি। এতে কম সংখ্যায় বই ছাপানো সম্ভব। তা নতুন প্রযুক্তি তো আসবেই। লেটার প্রেসের দীর্ঘ ইতিহাস প্রায় অবসিত হয়ে অফসেট এসেছিল। এখন প্রিন্ট অন ডিম্যান্ড এসেছে। এতে আমাদের মতো অত্যল্প পুঁজির প্রকাশকদের সুবিধাই হয়েছে বলে মনে করি। অল্প পুঁজিতে একাধিক টাইটেল ছাপা যাচ্ছে। কপি কমে এলে বিক্রির টাকা থেকেই আবার ছাপিয়ে নেওয়া যাচ্ছে।

প্র. কিন্তু এই প্রযুক্তির ফলে কুড়ি/পঁচিশ কপি বই শেষ হলেই অনেক প্রকাশক 'প্রথম মুদ্রণ শেষ' বলে ঘোষণা করছেন বলে একটা অভিযোগ উঠছে।
উ. আসলে ঠিক কত সংখ্যায় একটি মুদ্রণ হবে, এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম তো নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয় অত্যল্প সংখ্যায় পরবর্তী মুদ্রণ ঘোষণা করলে বইটির প্রসার সম্বন্ধে পাঠকের এতকালের অভ্যস্ত ধারণায় একটা ভুল বার্তা যায়। 'পার্চমেন্ট'-এর নিজের মতো করে এক্ষেত্রে একটা সিদ্ধান্ত আছে। কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রে দুশো কপি আর অন্যান্য বইয়ের ক্ষেত্রে তিনশো কপি শেষ না হলে 'পার্চমেন্ট' পরবর্তী মুদ্রণ ঘোষণা করে না।

প্র. আচ্ছা, এখন তো বেশ কিছু বাংলা ই-বুক প্রকাশিত হচ্ছে। ই-বুক কি মুদ্রিত বইয়ের বাজারে ক্ষতি করছে?
উ. আমার অভিজ্ঞতা এখনও তা বলছে না। ই-বুক একটা নতুন প্রযুক্তি। প্রকাশনার আরেকটা মাধ্যম। আমরাও হয়তো ভবিষ্যতে কিছু ই-বুক প্রকাশ করব। কিন্তু ই-বুকের প্রকাশ এখনও, অন্তত আমাদের অভিজ্ঞতায়, মুদ্রিত বইয়ের গ্রহণযোগ্যতায় কোনো ক্ষতি করেনি।

প্র. এবার একটা অন্য প্রশ্নে আসি। 'পার্চমেন্ট' কবিতার বই করে না কেন?
উ. 'পার্চমেন্ট' কবিতার বই করেছে তো। অমিতাভ মুখোপাধ্যায়ের 'শূন্যস্থানে তাকাও' প্রকাশিত হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হবে জয়দীপ রাউতের 'শীতলার গাধা'।

প্র. হ্যাঁ, আছে। কিন্তু সংখ্যায় এত কম কেন?
উ. আচ্ছা, সবাইকেই সব ধরনের কাজই বেশি পরিমাণে করতে হবে, এমন কোনো কথা আছে! এখানে বলে রাখা ভালো, আমি নিজে কবিতার নিয়মিত পাঠক। আর অনেক প্রকাশনাই কবিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব বই প্রকাশ করছেন তো। 'ভাষালিপি', 'ধ্যানবিন্দু', 'রাবণ' 'আদম', 'ঋত', 'বৈভাষিক' এমন অনেকেই কবিতা নিয়ে নানারকম কাজ করছেন। 'পার্চমেন্ট'ও তার পছন্দ অনুসারে আপাতত এই দুটি কবিতার বইয়ের কথা ভেবেছে। তবে 'পার্চমেন্ট' মুখ্যত গদ্য নিয়ে কাজ করতেই বেশি আগ্রহী।

প্র. এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে এসে আজকের কথাবার্তার শেষের দিকে আসা যাক। এমন একটা সময়ে আমরা কথা বলছি, যখন বিশ্বব্যাপী অতিমারীর প্রকোপ চলছে। প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে চলছে লকডাউনের নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বইবাণিজ্যের অবস্থা নিয়ে তুমি কী বলবে?
উ. অবস্থা যে সাবলীল নয় সে তো বলাই বাহুল্য। গত একশো বছরে এমন পরিস্থিতি আমরা কেউই দেখিনি। এক দিকে সংক্রমণের আতঙ্ক, আরেক দিকে অর্থনৈতিক অবস্থার ভেঙে পড়া, কোনোটাকেই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টা, সেটা হল, অসংখ্য মানুষের কাজ চলে গিয়েছে। তার মধ্যে গ্রন্থজগতের মানুষের সংখ্যাও কিছু কম নয়। বেশ কিছু সংস্থা এবং কিছু গ্রন্থকর্মীও একজোট হয়ে কাজ হারানো মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এও তো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সত্যিই খুব অসহায় ভাবেই বলতে হচ্ছে, কবে আবার এই মানুষগুলির কর্মসংস্থান হবে, বলা মুশকিল। বইয়ের বাজারেও এই অর্থনৈতিক ধ্বসের প্রভাব পড়েছে। কিন্তু কিছুটা আশার কথা এই যে, লকডাউনের কড়াকড়ি  কিছুটা শিথিল হতেই বেশ কিছু পাঠক অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বই সংগ্রহ করছেন। দোকানে এসে বই কেনার চেয়ে অনলাইন বইবিক্রেতাদের মাধ্যমে বইকেনার সংখ্যা বেশি। কিন্তু বইয়ের বিক্রি একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। এখানেই আশার আলোটা দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বইয়ের দুনিয়া আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে ট্রেন চালু হওয়াটা খুবই জরুরি। কারণ বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রন্থকর্মী এবং বিভিন্ন জেলার পাঠকদের সঙ্গে সংযোগের পথ ট্রেনচলাচল ছাড়া স্বাভাবিক হওয়া অসম্ভব।
এখানে আমার 'অফবিট' পর্বের একটা অভিজ্ঞতা বলি। নব্বইয়ের দশকের একদম শেষ দিকে ও দুহাজারের একেবারে শুরুর দিকে বাংলা বইয়ের বাজারে একটা মারাত্মক মন্দা দেখা দিয়েছিল। টানা দু'তিন মাস প্রকাশনার ঘরেএ বসে থেকেও একটাও বই বিক্রি হচ্ছিল না। মনে পড়ে, সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আমি আর শ্যামলদা কখনো কখনো সূর্য সেন স্ট্রিটের বীণা সুইটস থেকে এক টাকার একটা ল্যাংচা বা জিবে গজা কিনে দু'জনে ভাগ করে খেয়েছি। সেটাই ছিল আমাদের সংকটকালের বিরল বিনোদন। সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কোনো প্রকাশককে বা গ্রন্থকর্মীকে দেখিনি বইপাড়া ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে। দাঁত কামড়ে লড়ে সেই অবস্থা পার করেছেন তাঁরা। এই লড়াইয়ের স্পিরিটটা বইপাড়ার পরম্পরায় আছে। এবারের ধ্বস হয়তো সেবারের চাইতেও কঠিন। তাই লড়াইটাও আরও বেশি শক্ত। কিন্তু বইপাড়ার পরম্পরাকে মাথায় রেখে লড়ে তো যাব। মাটি ছাড়ব না।