আয় রে ছুটে আয়, পুজোর গন্ধ এসেছে...

আসলে গান, গানের সুর স্মৃতির ট্যাবলেট। এখন বুঝি, দূর থেকে ভেসে আসা হলেও, গানের সুরের চেয়ে শক্তিশালী ভাষা আর কিছু নেই। এই নিঃসঙ্গ লকডাউন সে উপলব্ধি আরও মজ্জায় মজ্জায় পুরে দিল। ছোটবেলায় মহালয়ার পর স্কুল ছুটি পড়ে যাওয়ার নিয়মের বিভ্রম তো এখনও কাটেনি, তাই এখনও মহালয়া এবং পুজোর মাঝের দুপুরগুলোতে আয় রে ছুটে আয়...সুরেলা আহ্বান কানে মাথায় ঝনঝন করে বেজে ওঠে। টান পড়ে স্মৃতিতে।

আসলে ডিপার্চারের চেয়ে ধ্রুব সত্য কিছু নেই। আগমনীর আনন্দ আদতে অলীক, আসলে টিকে যায় যা, তা ফুরিয়ে যাওয়ার বিষাদ। আর এই বছরটা সেই বিষাদের সত্যকে চিরস্থায়ী করল যেন।

আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি-র ভিতরে আদতে ঋতুপর্ণ ঘোষের 'হীরের আংটি'-র সেই বাচ্চা ছেলেটা লুকিয়ে থাকে। কুমোরের ছেলে, তার কাছে বাবুদের পুজোর আমোদফুর্তির কিছুই স্পষ্ট নয়, কিন্তু যখন দুগ্গাঠাকুরের শোলার মুকুটের রূপালি জরির টুকরো প্রায় আকাশ থেকে এসে পরে তার হাতে, তখন যেন চারদিনের আমোদকে ছাপিয়ে যায় এক ইটারনাল প্রাপ্তি। তার মধ্যে ভক্তি নেই, আচার নেই, উৎসবের আভাসও নেই। আছে শুধু পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার হঠাৎ উল্লাস! এবং নীরব উল্লাস!

এই প্রাপ্তিটুকু আছে বলেই আদতে উৎসব আছে। তাই গানের সুর স্মৃতিতে যেমন ফেরায়, তেমন সেই গানের সুরই আবার আছড়ে এনে ফেলে মাটিতে। 'ছোটবড় মিলে' অ্যালবামের সেই গান, 'যে ছেলেটা কাজ করে খায়/রাস্তার চায়ের দোকানে/তার ছুটি পালাল কোথায়/তার ছুটি আছে কোনখানে'। এই ছেলেটা আদতে কোন গ্রামের বাড়ি থেকে আসছে, সে কি ফিরতে পেরেছে তার বাড়ি? কাজ কি ফিরে পেয়েছে সে?

আসলে খানিক দুঃখবিলাসিতার চর্চা করে নিলে, এবং 'এই উৎসবের জন্য অন্তত ওদের একটু ভাত জোটে' ভেবে নিলে নিশ্চিন্ত হয়ে আমরা ঘাই মারতে পারি নিজস্ব বীভৎস মজায়। কিন্তু গল্প যে আদতে অন্যরকম, তা এবারটায় বেশ বোঝা গেছে। লকডাউন-শেষে মাস্ক পরে গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে বন্ধুকে বলছিলাম, লকডাউনে কী কী সুরাহা হল আমার। তখন একজন বুড়ির চুল বিক্রেতা এগিয়ে এলেন, হাতের সিগারেট চেয়ে নিলেন, এবং তারপর শুরু করলেন এক আশ্চর্য পারফরম্যান্স। নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির মতো তাঁর মুখ। বলে চললেন, লকডাউন আদতে আপনার জন্যই ভাল ছিল, আমার জন্য নয়। ক্লিশে কথা, রোজ খবরের কাগজের উত্তর সম্পাদকীয়তে লেখা হচ্ছে, পার্থক্য হল- এই কথা শুনছি সেই শ্রেণির এক রক্তমাংসের প্রতিনিধির থেকে, যে শ্রেণি আমাদের আলোচনা, শিল্পচর্চার উপজীব্য হয়ে থেকেছে এই ক'মাস। ভদ্রলোক তারপর সিগারেট হাতে নিয়ে প্রচু্র কথা বলতে থাকলেন দেশোয়ালি ভাষায়। একবার শুনলাম, 'পত্নী সে দূর, বেটাবেটি সে দূর'। কেঁদে ফেললেন বলতে বলতে। মিট্টি শব্দটা বারবার বলছেন। এই মিট্টিই ভাত জোগায়। সেই মিট্টি, সেই মাটির জন্য কেউ একত্র হতে পারলাম না আমরা, আক্ষেপে কেঁদে ফেলছেন আবারও। বলছেন, 'হাম তো বলবান হ্যায়। আগর এক থাপ্পড় মারেগা আপকো, তো কেয়া করেগা?' বলছেন, ব্যক্তিগতভাবে শক্তিশালী হয়ে ব্যক্তিগতভাবেই কেবল আক্রমণ করা যায়। সম্মিলিত না হলে কার সঙ্গে লড়ব? পুলিশ? রাষ্ট্র? ব্যবস্থা? বলেই চলেছেন ভদ্রলোক। টানা।

আমরা আদতে উৎসবের আনন্দে কাউকে মাড়িয়ে ফেলছি না পায়ে পিষে, এই নিশ্চিন্তি নিয়ে কাটাচ্ছিলাম। এ বছর বুঝিয়ে দিয়েছে গল্প অন্যরকম।

করোনার ভয় এড়িয়ে মানুষ দেদার নেমে পড়েছে রাস্তায়। বাজার চলছে পুরোদমে। হকাররা হয়তো স্বস্তি পাচ্ছেন। কিন্তু অন্নপূর্ণার কাছে ঈশ্বরী পাটনির চিরায়ত প্রার্থনা আদতে হাহাকার হয়ে উঠছে। উৎসবের আড়ালে আদতে তো সেই লোকায়ত প্রার্থনাই জেগে থাকে। যে দুর্যোগ কেড়ে নিয়েছে এক  ঢাকির চাষের জমি, তার ভিটেমাটি, যে রাষ্ট্র তাকে ঔদাসীন্য দেখিয়েছে, তাদের ভুলে গিয়ে কীকরে উৎসবকে সামনে রেখে শস্যভরা মাঠের স্বপ্ন আবার দেখবে সে?

এই প্রথম, বিশ্বায়িত একুশ শতকে এই প্রথম গ্লোবাল ভিলেজ নামক সন্দর্ভটি তার খাপ খুলেছে। এ বছর দেখিয়ে দিয়েছে অবাস্তবের কোনও সীমারেখা নেই। ডলফিন ভেসে আসা আবার নতুন করে, কালিকটে ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্লাউডেড লেপার্ড, রোবট লিখছে গার্ডিয়ানের উত্তর সম্পাদকীয়, একটি মাছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেটের সব মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নানারকমের কণ্ঠস্বর শুনছেন বা পাঞ্জাবে চাষিরা দখল করে নিচ্ছেন রিলায়েন্সের মল- এসবই আদতে এক বিশাল বিচ্যুতির ইঙ্গিত। এই বিচ্যুতি একদিনে আসেনি। অনেকদিন ধরে এসেছে। তাই এই বছর আদতে পৃথিবীকে গলিয়ে দেবে দালির ঘড়ির মতো। সেই গলে যাওয়া অংশ আবার জমে কঠিন হবে যখন, তখন তার আকৃতি হবে আলাদা।

এবারের আগমনী যেমন বিপর্যস্ত, তেমন আগামীর আগমনী কোন পৃথিবীর বুকে বেজে উঠবে, কেউ জানে না। এই প্রথম, সংকটের সূত্রেই, বিশ্বায়নের গল্পটা হজম হয়েছে অনেকের। সেই বিশ্বায়িত হওয়ার বোধ আদতে বিপন্নতার। এই বিপন্নতাই কি আগমনীর সুরে বিচ্যুতি তৈরি করবে এরপর?