কবিতা সম্পর্কে তখন ধারণাটুকু ছিল স্কুল পাঠ্য কবিতা। ক্লাসে স্যার মুখস্ত ধরতেন। সেই ভাবে অনেক কবিতাই মুখস্ত হয়ে গিয়ে ছিল। এর সঙ্গে ছিল পাড়ার বিভিন্ন প্যান্ডেলে কবিতা আবৃত্তি।সেই ভাবেও অনেক কবিতা মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল।অন্যরকম কবিতার স্বাদ যিনি আমায় ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি আমাদের ইংরেজী শিক্ষক কেদার ভাদুরী।

ক্লাস নাইনে শুনলাম আমাদের স্কুলে(নাকতলা হাই স্কুল) নতুন একজন শিক্ষক এসেছেন। তাঁর জীবন নাকি বৈচিত্র্যময়।ম্যাট্রিকে স্কলারশিপ পেয়ে রাজশাহীরসরকারি কলেজে বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।পড়া ছেড়ে দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন নেভিতে। ধর্মঘট করে সেখান থেকে বিতাড়িত হন।তারপর অ্যামেরিকান এয়ার ফোর্স।সেখানে ভালো কাজের জন্য গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন।এপরে ব্রিটিশ এয়ার ফোর্স,সেখানে উচ্চপদস্থ সার্জেন্টকে চড় মারায় কোর্ট মার্শাল। এ কথা পরে ওনার মুখেই শোনা।পরে স্পেশাল অনার্স করে নাকতলা হাই স্কুলে আসেন সেখানে কাটিয়ে যান তিরিশ বছর।

এ হেন শিক্ষক কেদার ভাদুড়ী ছিলেন ছাত্রপ্রিয়। তাঁকে কোনওদিনও স্যার বলিনি। চিরকালই কেদারদা বলেছি। স্কুল ছুটি হয়ে যাবার পর টীচার্স রুমে কেদারদা কবিতা পড়তেন আমি শুনতাম।ওই সময়ে কেদারদা আমায় দুটি বই উপহার দিয়েছিলেন।  জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ আর কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘ হুতোম প্যাঁচার নক্সা”।

কেদারদা থাকতেন এক কামরার একটি ফ্ল্যাটে, গাঙ্গুলীবাগানে একাই। কত আড্ডা দিয়েছি আমরা ওখানে। কাছেই ছিল শিল্পী সমীর আইচের বাড়ী । সে ও ছিল নাকতলা হাইস্কুলের ছাত্র। ওর আঁকা একটি কেদারদার ছবি দেওয়ালে ঝুলত। একই সঙ্গে তাঁর ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ জীবন ও আবেগ দুই ই বিমূর্ত আকারে ছিল ওই ছবিটিতে। পরবর্তীকালে সমীর আমার একটি বই “লক্ষ করার বিষয় ‘ এর প্রচ্ছদ এঁকেছিল।ছোট্ট ঘরের ভিতর উঁচু তাকের ওপর থাকে থাকে বাঁধানো খাতা।সব কবিতা লেখা। হাজার হাজার কবিতা ,না ছাপা কবিতাই সেখানে বেশী।
সেই গভর্নমেন্ট কোয়ার্টারগুলি এখন আর আর নেই। মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।গড়ে উঠেছে নতুন আবাসন। আমার কবিতার শৈশবে কতবার হেঁটেছি এই পথে তার হিসেব রাখিনি।

কেদারদার সাথে আড্ডায় মাঝে মাঝেই এমনকথা বলতেন,যা তাঁর বোধ এবং পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে আসতো। যেমন কবিতার সংজ্ঞা তার কাছে ছিল এই রকম – To me the poetry is a super emotion artistically recollected in divine tranquility. ওয়ার্ডস ওয়ার্থের বিখ্যাত সংজ্ঞার সাথে তিনি যোগ করেছিলেন   Super, artistically, divine এই নতুন তিনটি শব্দ।এই কথা তিনি সুবোধ বসু রায় সম্পাদিত “ছত্রাক’ পত্রিকায় ১৯৮০তে তার ‘আত্মকথন’এ লিখেছিলেন।

 ।১।

সমালোচকেরা কবিতার আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়শই দশক দিয়ে চিহ্নিত করেন। এ নিয়ে আমাকেও অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে।কেউ বলেন সত্তর কেউ আশীর দশক। যদিও আমি নিজেকে সত্তরেরই বলি। আমার প্রথম বই ‘ম্যাজিক লন্ঠন’প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮০র জানুয়ারীতে। সেখানে ’৭৮ ও ‘৭৯তে লেখা কবিতা ছিল। এছাড়া কয়েকটি সঙ্কলন যেগুলির সম্পাদক ছিলেন  উত্তম দাশ , গৌর শংকর বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্বনাথ ঘোষ। এ ছাড়া আশীর কবিতা নিয়ে লিখতে গিয়ে তৎকালীন ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত লিখেছিলেন “----- প্রবীর রায় মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাও চোখে পড়েছে।জানিনা এরা আশীর কিনা। সম্ভবত এরা সত্তরের”। শুনেছি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং দেবীপ্রসাদ বন্দ্যপাধ্যায় এর সম্পাদনায় একটি কবিতার দশক সম্পর্কিত বইএ  আমাকে আশীর কবি বলে উল্লেখ করেছেন।

যাই হোক ,কেদার ভাদুড়ীর কথায় আসি।তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন,তাঁর জন্মসাল সম্ভবত ১৯২৫ সাল। চল্লিশ দশকের কবিরা তাঁর সমবয়সী। যদিও তাঁর লেখালিখি দেরীতে শুরু হলেও কবিতায় তিনি এগিয়েছিলেন। তাই তাঁর একাত্মতা ছিল ষাঠ ও তার পরবর্তী কবিদের সাথে।উত্তম দাশ তো তাঁকে ষাঠের কবিই বলতেন এবং সঙ্কলনে সেভাবেই রেখেছেন। কেদার ভাদুড়ীর দু একটি কবিতার মধ্য দিয়ে তাঁর স্বাতন্ত্র্য বোঝানো যাবে।

ফুটনোট /

চেয়ারে বসতে না বসতেই,মেয়ে,কতই বা বয়েস হবে, বারো
বারো বছরের ছাত্রী জিজ্ঞাসা করলো, জিয়ারৌ গ্রেজিং
মানে কি? আমি বললাম বানান বলো।বললো
জেড  ই  আর অউ,গ্রেজিং ও বলে দিতে হবে?
বললো,পারলে না তো…

চেয়ারে বসতে না বসতেই উঠে দাঁড়ালাম,বললাম,লুক
এই বয়েসে সেক্সুয়াল প্রমিসক্যুইটি না বুঝলেও চলবে,
বলেই বেরিয়ে যাচ্ছি,অপমানের মাথায় বাড়ি, রাগে
শরীর জ্বলছে, কোনদিন হয়তো বলে বসবে,বংক
জার্নালিজমের খবর রাখেন ?   এক আশ্চর্য ফুটনোট সভ্যতার                                                                     

 

আমরা আলোচনায় আবৃত্তি বিরোধিতার কথা বলি। আবৃত্তি কবির দুর্বল কবিতাগুলিই বেছে নেয়। কবিতা পাঠ যদি সঠিক ভাবে করা যায় তবে তা কবিতায় প্রাণ সঞ্চার করতে পারে,এই ভাবনা আমার চিরদিনের। আমি অরুণ মিত্রের নিজের কবিতা পাঠ শুনেছি অমন নিস্পৃহ উচ্চারণে এতো সজীবতা! যারা শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিংবা অমিতাভ দাশগুপ্তের গলায় পাঠ শুনেছেন,তাদের পক্ষে ভোলা কঠিন। এমন ভাবেই কবিতা পড়তেন কেদারদা। তাঁর কবিতা তাঁর মতো করে কেউ পড়তে পেরেছে বলে জানিনা।যে কোনো সভায় বা বইমেলার খোলা মাঠে লোক দাঁড়িয়ে যেত।

 ।২।।


কেদার ভাদুড়ীর মত আবেগময় কবিতার বিচিত্র ভাষা আর দেহভোগ অন্য কারো কবিতায় থাকা এক প্রকার অসম্ভব বলেই মনে হত তখনও। কেননা মানুষটাই ছিল অন্যরকম যার জীবনকে ভালবাসা পলকা ভাবনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আমার নিজের কবিতায় আমি আবেগের রাশ টেনে ধরতে চেষ্টা করি।কিন্তু কেদারদার এই ভিন্ন ধারার কবিতাকে ভালোবেসে ছিলাম মানুষটির সঙ্গেই। শেষে তাঁর একটি কবিতা দিয়েই আমার বলাটুকু শেষ করতে চাই।

ময়ূর //

বেশ মনে আছে,বাবা একবার এক ময়ূর পুষেছিলো।
কারণ? বাড়িতে গোখরো সাপের খুব আনাগোনা তাই।
বাবা ওকে কিছুই খেতে দিতো না,তবুও
বর্ষাকাল এলে ফুলে ঢোল, পেখমে পেখমে ছয়লাপ।

তবে সবসময় নয়,মা কাছে এলে তবেই
এমন পেখম মেলে দিতো,দাঁড়াতো,নাচতো,দেখবার… ।
প্রথমে বুঝিনি আমি ও বাবা, মা লজ্জায়
বুকের আঁচল টেনে আড়ালে যেতেই, যার নাম রেখেছিল কাত্তিক ঠাকুর।

জীবনে এর চেয়ে বড় দেহভোগ, সৌন্দর্যশিকারী(ভিখারি)
কখনো দেখিনি।আমি মার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে…

মনে করতো বুঝি স্নেহ হ’য়ে গেছি আমি
কিন্তু বাবা একদিন রাগে দোনালা বন্দুক নিয়ে গুলি করতেই মা,
যে কোনোদিন বাবার নাম মুখে আনেনি
বলে উঠলোঃ রাঘব,রাঘব !

আর আমি এই কাল্কুট্টায় পালিয়ে এসে হবনব ক’রে
নাম নিয়েছি সৌরভ। বোঝো।

 

আমার কবিতায় পথ হাঁটার কৈশোর কাল থেকে পরিনত বয়েস অবধি  কেদার ভাদুড়ীর সাথে কবিতা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছি,কবিতা শুনতে চেয়েছি। ২০০২ ছিল তাঁর প্রয়াণকাল। তবু তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধের মত আমিও রয়ে গেছি ভালোবাসায়।

 ।৩।