অতঃপরের পরেও দুলাইনের ফাঁকে যে প্রখর থাকে প্রায়শই বারুদসম্ভবি তাকে চেনে কপিলচাঁদ ।  কপিলচাঁদকে পাঠক আপনি চিনবেন না ।  কারণ চেনা জগতের বাইরের মানুষ সে ।  কপিলাবস্তু নগর থেকে দূরে, পাহাড় উপত্যকার গাছপাতার আড়ালের ছোট এক ছাউনির মাঝে বসে দিনরাত সে মুখোশে রং লাগায়, ছবি আঁকে নানাবিধ জন্তু ও মানুষের হারানো প্রজাতির ।  সেই গুহা মানুষের কালের মতো লণ্ডভণ্ড চেহারার অপরিচিত মুখ ।  সে সব ছবি সে স্বপ্নে পায় ।  কপিলচাঁদ দিনরাত স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন বানায়, স্বপ্ন আঁকে ।  স্বপ্নের মতো মুখোশগুলো নিজে হাতেই বানিয়ে তোলে সে ।  উপকরন গাছের জীর্ণ বাকল, ঝরা পাতা, কুড়োনো কাগজ একসাথে পচিয়ে তার কাজের মণ্ড তৈরি করে নেয় ।  মাসে বা কখনও দুসপ্তাহে একবার নোংড়া কাপড়ে চোখমুখ ঢেকে পাহাড়ের চড়াই-উৎরাই ভেঙে, দীর্ঘ পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে কপিলাবস্তু নগরীর অলিগলি, পথ, বাজার, মন্দির, গণিকাপল্লীর আশপাশ ঢুঁরে বিরাট বস্তায় করে সে পথপাশের বর্জ্য কাগজ, কাগজের ছেঁড়া ঠোঙা, প্যাকেট, বাক্স যেখানে যা পায় কুড়িয়ে নিয়ে তার ছাউনিতে ফেরে ।  কখনও দিনের দিন ফিরতেও পারে না, বস্তার গায়ে গা এলিয়ে বসেই স্বপ্ন দেখতে দেখতে, স্বপ্ন বানাতে বানাতে রাত কাটিয়ে ভোর ভোর রওনা দেয় তার ছাউনির দিকে ।  গাছ-পাতা, ফল-মূল,  ছাল-বাকল, শিকড়-বাকড় তার শরীর ও মনের দুটো খিদেই মিটিয়ে দেয় ।  প্রয়োজনে সেগুলোই তার আহার আবার সেগুলোই তার রং বানানোর উপকরণ ।  কখনও ছোটখাটো বন্যজন্তু চোখে পড়লে পাথর ছুঁড়ে মেরে আগুনে ঝলসে তার খাবারের বৈচিত্র আনে ।  শহরের গণিকাপল্লীর অনেকেই তার মুখ ভালো করে চিনতে না পারলেও, তারা ওকে শরীর দেওয়ার বিনিময়ে সারা গায়ে নানারকম ছবি আঁকিয়ে নেয় ।  কখনও ক্ষুধার্ত জানোয়ার আবার কখনও তার স্বপ্নে পাওয়া বীভৎস মানুষের মুখ সে রং ছড়িয়ে এঁকে দেয় নগ্ন সেই গণিকা শরীরে ।  বাজারের রং-তুলিও তারাই এগিয়ে দেয় যত্ন কোরে ।  গণিকা সহবাসে আদিম কপিলচাঁদ মুখোশহীন পাহাড়ের কোনও দাঁতালো জন্তুর থেকেও ভয়ঙ্কর ।  ছবি আঁকানোর মতই কপিলচাঁদের চাহিদা তাই গণিকাদের কাছে প্রত্যাশায় তীব্র ।  

    বেশ কিছু মুখোশ তৈরি হয়ে গেলে তার নিজের হাতে বানানো একটা ঝুড়ির মতো বড়ো একটা ধামায় নিয়ে মাথায় করে সে একদিন ভোর ভোর বেরিয়ে যায় শহরের উদ্দেশ্যে ।  শহরে পৌঁছে অপেক্ষাকৃত নির্জন এক রাস্তার কোণায় সেই ধামা নামিয়ে সে আবার তার স্বপ্ন বুনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।  তারপর যখন দেখে তার মুখোশ পথচলতি মানুষের অনেকেই নিয়ে গেছে, ধামার একপ্রান্তে পড়ে আছে বেশ কটা টাকা ।  সে উঠে পরে । এই শহরের সেই জায়গাটা সে চেনে যেখানে বেশ কয়েকজন হাত-পা-বাঁকা মানুষ সামনে চট ছড়িয়ে বসে লোকজনদের কাছে টাকা পয়সা চায় ।  লোকেরা কেউ কেউ দু-এক পয়সা ঠকাস ঠকাস তাদের চটচুটোয় বিরক্তি নিয়েই ছুঁড়ে দেয় ।  সে তার ধামার যে দিকটায় টাকাগুলো আছে, সেই দিকটা লোকগুলোর সামনে মেলে দিয়ে বলে, তোমরা সবাই এগুলো ভাগ করে নাও ।  সবাই নেয়, কেউ বেশি কেউ কম পায় ।  নিজেদের মধ্যে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে তারা ।  সে সব মাথায় না নিয়ে কপিলচাঁদ তার নিজের পথে হাঁটে ।

    এভাবেই চলছিলো সব নিয়ম করেই ।  সেদিনও গভীর রাত্রি ।  আকাশের গায়ে সেই ঝলমলে আলোর থালাটা নেই ।  কপিলচাঁদ একমনে শুকনো কাঠজ্বলা আগুনের পাশে বসে এঁকে যাচ্ছে গতরাতের স্বপ্নে পাওয়া ছবি ।  অনেকটা সিংহের মতো কিন্তু সিংহ নয় ।  আরও যেন বন্য তার মুখ ।  যতবারই তার গোঁফের কাছের কেশর আঁকতে যাচ্ছে, ততবারই ঘাড়ের কাছ থেকে যেন কেউ ডেকে উঠছে গ-র-র-র-র ।  ক্রুদ্ধ সেই আওয়াজ ।  সে আঁকা থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ।  ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে কে যেন এসে তার অসমাপ্ত মুখোশটায় রং লাগিয়ে যাচ্ছে ।  ঘুমের মধ্যেই তার খুব আনন্দ হয় ।  আনন্দের উচ্ছ্বলতায় স্বপ্নের মধ্যেই লাফিয়ে লাফিয়ে নাচতে থাকে ।  আর টের পায় তার শরীরের দুপাশ দিয়ে দুটো ডানা গজিয়ে গেছে । ঘন পালকাবৃত ডানা ।  সে যেন জঙ্গল পাহাড়ের মাথা ছাড়িয়ে উড়তে উড়তে উঠে যাচ্ছে অনেক উঁচুতে ।  বুনো শূওরের ঘোঁৎ ঘোঁৎ আওয়াজে আকস্মিক তার ঘুম ভেঙে যায় ।  ছাউনির ওপিঠেই শুওরগুলো ঘুরছে ।  ঘুম চোখ খুলে রাতের স্বপ্নটা সে একবার ভেবে নেয় ।  তাড়াতাড়ি উঠে মুখোশটা তুলে একবার দেখে নেয় কোনও পরিবর্তন হয়েছে কিনা ওটার !  না, হয়নি ।  এবং সে এটাও জানে তার স্বপ্নদর্শন প্রক্রিয়ায় যা কিছু দেখা, শোনা, সবই তাকে নিজের হাতে রূপ দিতে হয় ।   তাড়াতাড়ি সে রং সাজিয়ে তখুনই এঁকে ফেলে বাকি কেশর অংশটুকু ।  তার কয়েকদিন পর আবার সে ধামায় মুখোশগুলো তুলে শহরের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেয় ।  যেতে যেতে একটু জিরিয়ে নেবার জন্য ধামাটা মাথা থেকে নামিয়ে পথের পাশে বসে ।  সে সময় এক কিশোর, বাবার হাত ধরে সে পথ দিয়ে যেতে গিয়ে মুখোশগুলি দেখে বাবাকে বায়না করে একটা মুখোশ কিনে দিতে ।  ছেলের বেয়ারাপনায় নাজেহাল বাবা অবশেষে কপিলচাঁদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে মুখোশের দাম করতে ব্যস্ত হয় ।  কপিলচাঁদ ছেলেটাকে বলে, কোনটা নেবে বলো !  ছেলেটা খুঁজেপেতে সেই সিংহের মুখোশটা নেয় ।  বাবাকে কপিলচাঁদ বলে--  আপনি যা দেবেন সেটাই দাম ।  বাবা পকেট হাতড়ে কিছু পয়সা বার কোরে ধামায় রেখে দেয় ।  মুখোশটা মুখে লাগিয়েই সেই রাতের মতো গ-র-র-র আওয়াজ তুলে ছেলেটা যেন বাবার হাত ছাড়িয়ে টগবগ কোরে সামনে হাঁটতে থাকে ।  কিছুটা গিয়েই তারা রাস্তার পাশের এক সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে বনের আড়ালে চলে যায় ।  এর পরের ঘটনা পরম্পরায় আর কপিলচাঁদ নেই ।  আছে মুখোশ, নব্য কৈশোরপ্রাপ্ত সেই ছেলেটি এবং কয়েকটি দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনা ।

    প্রথম ঘটনাটি ঘটে দিন দুয়েক পর ।  সিংহ মুখোশ মুখে এঁটে ছেলেটি সকালবেলাতেই গ্রামসংলগ্ন বনের মাঝে গর গর শব্দ তুলে ঘুরে বেড়ায় ।  সেদিনও এমন ঘুরতে ঘুরতেই চোখে পড়ে কয়েকজন লোক একটি মেয়েকে ধরে অত্যাচার করছে ।  সে গর গর করতে করতেই আশেপাশে পড়ে থাকা পাথরের বড় বড় টুকরো তুলে জোরে জোরে এলোপাথারি ছুঁড়তে থাকে তাদের দিকে ।  একজনার মুখ থেঁৎলে যায়, একজনার মাথা ফেটে রক্তে ভেসে যায়, একজনের পিঠে ঢিল লেগে দম আটকে ছিটকে পড়ে মাটিতে ।  মেয়েটা তাড়াতাড়ি উঠে জামাকাপড় ঠিক করে নিয়েই রাস্তার দিকে দৌড়ে চলে যায় ।  ছেলেটিও দৌড়ে তার গ্রামে ঢুকে পড়ে ।  দ্বিতীয় ঘটনা তারও দিন দুয়েক পর ।  হাঁটতে হাঁটতে সে বড় রাস্তার কাছে আসতেই দেখে, কয়েকজন লোক লাঠিসোটা নিয়ে গাড়ি থেকে একটা লোককে নামিয়ে, তাকে আর তার ছেলেকে বেধড়ক মারছে আর বলছে--  গাড়িতে করে মাংস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তোদের খাওয়াচ্ছি !  এ কথা বলে নিজেরা মুখে কিসের একটা জয় জয় ধবনি তুলছে আর ভীষণ মারছে ।  ছেলেটির মুখোশঢাকা মুখ থেকে আবারও সেই গ-র-র-র আওয়াজ উঠতে থাকে, ছেলেটি একই কায়দায় বড় বড় পাথরের টুকরো তুলে লোকগুলোর দিকে আগের দিনের মতো একইভাবে ছুঁড়তে থাকে ।  লোকগুলো পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে একইভাবে ছিটকে পড়তে থাকে রাস্তায় ।  আর সেই গাড়ীর যাত্রীরা উঠে খোঁড়াতে খোঁড়াতে গাড়ীতে কোনক্রমে উঠে দ্রুত বেড়িয়ে যায় সে এলাকা ছেড়ে ।  সে নিজেও দ্রুত গ্রামে ঢুকে মুখোশ লুকিয়ে রেখে ঘরের মধ্যে পালিয়ে যায় ।  এর কদিন পর সে শোনে গ্রামের বড়রা আলোচনা করছে দেশের রাজা তার লোকজন দিয়ে চারদিকে লুঠতরাজ শুরু করেছে ।  রাজার লোকেরা দেশের মানুষের জমিজমা ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়ে তাদের পথে বসিয়ে দিচ্ছে ।  বনের আশপাশের মানুষদের তাড়িয়ে দিয়ে বন দখল কোরে বড় বড় গাছ সব কেটে বেচে দিচ্ছে দুহাতে ।  বনের মানুষগুলোকে এলাকা ছাড়া কোরে দিচ্ছে রাজার ভাড়া করা গুণ্ডারা ।  সেদিন রাতেই সে মাকে বলে--  মা, আমাকে একবার রাজবাড়ি নিয়ে যাবে কাল !  মা প্রথমে গররাজি হলেও পরে রাজি হয়ে যায় ।  পরদিন সকালে উঠেই মায়ের হাত ধরে তারা রাজবাড়ির দিকে যাত্রা করে ।  সেখানে পৌঁছে তারা শোনে রাজা আজ দরবারে বসেছেন ।  জমিহারা, কর্মহারা, বাস্তুহারা মানুষেরা দলে দলে রাজার কাছে অভিযোগ জানাতে চলেছে সর্বসান্ত করবার এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ।  তারাও পায়ে পায়ে ঢুকে এক কোণায় গিয়ে সবায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে ।  ছেলেটি এরই ফাঁকে মুখোশটা মুখে এঁটে নিয়েছে ।  রাজা সকলের অভিযোগ শোনার পর, মন্ত্রিকে ডেকে আদেশ দিলেন সবাইকে অন্ধকার কারায় সারাজীবনের জন্য নির্বাসন দিতে ।  এ কথা শুনেই ছেলেটির মুখোশের আড়াল থেকে গ-র-র-র  গ-র-র-র ধ্বনি উঠতে থাকে ।  এবার সে পোষাকের আড়ালে লুকিয়ে আনা বড় পাথরের টুকরোটি ছোট হাতে শক্ত কোরে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে এসে রাজার মাথা টিপ কোরে সব শক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারে ।  ব্যাস, আগের মতোই রাজার মুখ থেৎলে রাজাও ছিটকে পড়ে চেয়ার থেকে ।  ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে মন্ত্রী রাজাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়, সেনাপতি পেয়াদাদের নিয়ে ছুটে আস্তে থাকে সেই মুখোশাবৃত কিশোরের দিকে, আর ছেলেটির মা সমূহ বিপদ বুঝে ছুটে গিয়ে মন্ত্রীর কোমর থেকে ঘ্যাচাং কোরে তলোয়ার বার কোরে মন্ত্রীরই গলার কাছে ধরে চিৎকার করে ওঠে--  খবরদার, ছেলেটার গায়ে কেউ স্পর্শ করবে না ।  কথাটা শুনে ম্যাজিকের মতো সবাই থেমে যায় ।  মা আবার আদেশের সুরে চিৎকার কোরে বলে--  সবাই অস্ত্র মাটিতে নামিয়ে রেখে দূরে গিয়ে পেছন ঘুরে হাঁটু গুঁজে মাটিতে বসো ।  সবাই সম্মোহনের মতো তাই করে ।  মা এবার কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জনতার উদ্দ্যেশ্যে বলে, তোমরা সবাই অস্ত্রগুলো তুলে নিয়ে আমার পেছন পেছন এসো ।  জনতাও মুক্তির স্বাদ পেয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে প্রবল উৎসাহে মায়ের পিছু পিছু চলে ।  আগে আগে মা চলেছে মন্ত্রীর গলায় তলোয়ার ঠেকানো, পাশে চলেছে সিংহের মুখোশ পরা কিশোর, আর পেছনে অস্ত্র হাতে চলেছে জনতার মিছিল ।  হাঁটতে হাঁটতে যে গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্য দেখে গ্রামের লোক সব কাজ ফেলে দিয়ে ঢাক ঢোল লাঠিসোটা নিয়ে সবাই এসে মিশছে সেই মিছিলে...  আর দূরে সেই পাহাড়ী উপত্যকায় বনের আড়ালে ছোট্ট ছাউনির নীচে কপিলচাঁদ তখনও এঁকে চলেছে রাতের স্বপ্নে পাওয়া রাগী এক মায়ের মুখ, যার মুখের আদলে ছড়িয়ে আছে সন্তানের জন্য অসীম মমতা...