মূল : নাদিন গোর্ডিমার
অনুবাদ : আফসানা বেগম

যখন তার ছাড়া পাওয়ার খবরটা এলো, সবাইকে জানানোর জন্য সারা খামারে আমি দৌড়াতে লাগলাম। পাঁচিল গলে পাশের খামারেও ছুটে গেলাম। পরে দেখি, কাটাতারের বেড়ায় আমার জামা ছিঁড়ে গেছে আর ঘাড়ের উপরে চিরে রক্ত বেরিয়ে এসেছে।
নয় বছর আগে সে এই জায়গা ছেড়েছিল। ওই যে শহরে যারা আকাশচুম্বি কাচের বাড়ি বানায়, যাদের বলে বাড়ি বানানোর কোম্পানি, সেখানে কাজ করার জন্য চলে গিয়েছিল। প্রথম দু’বছর মাসে একটা করে সাপ্তাহিক ছুটিতে আর বড়োদিনে সপ্তাহ দুয়েকের জন্য বাড়িতে আসত; সে সময় বাবার কাছে আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে আসে। আর তখন থেকেই টাকা জমাত। আমরা দুজনে ভেবেছিলাম, এভাবে জমালে তিনবছরের মধ্যে সংসার শুরু করার মতো যথেষ্ট টাকা জমে যাবে। কিন্তু তারপরেই সে ওই টি-শার্টটি পরা শুরু করল, হরতালের কথা বলতে আরম্ভ করল। আমাদের বলল যে সে ইউনিয়নে যোগ দিয়েছে। হরতালের পরে শ্রমিকদের ছাটাই করা হলে তাদের কাজে বহাল রাখার ব্যাপারে যারা বসদের সাথে কথা বলতে যায়, বলল কেমন করে যেন সে ওই দলে ঢুকে গিয়েছে। সে সবসময় সুন্দর করে কথা বলতে পারত। এমনকি ইংরেজিতেও। খামারের স্কুলে থাকার সময় সে-ই ছিল সেখানকার সবচেয়ে ভালো ছাত্র। ইন্ডিয়ান দোকান থেকে সাবান বা চিনি কিনলে তারা যে খবরের কাগজ দিয়ে জিনিসগুলো মুড়িয়ে দিত, সে বসে বসে সেই খবরের কাগজগুলো পড়ত।  
হোস্টেলেও সমস্যা শুরু হলো যেখানে অন্তত তার একটা থাকার জায়গা ছিল। আর শহরের যেদিকে কালো মানুষরা থাকত সেখানে অতিরিক্ত বাড়িভাড়াও ছিল ভয়াবহ সমস্যা। সে নিজের বাড়িতে কাউকে না বললেও আমাকে বলেছিল যে আমাদের যেভাবে অবহেলা করা হয় তার বিরুদ্ধে সবখানে মানুষ লড়ছে। তারা লড়ছিল আমাদের সবার জন্য, কি খামারে, কি শহরে। ইউনিয়ন তাদের সাথে ছিল। সে তাদের সাথে ঘুরে ঘুরে বক্তৃতা দিত, মিছিল করত। বছর তিনেক পরে আমরা শুনলাম, সে জেলে। বিয়ে করা তো দূরের কথা, বিচার শুরুর আগে জানতেই পারিনি তাকে কোথায় রাখা হয়েছিল। তারপর অনেক দূরের একটা শহরে তার বিচারকাজ শুরু হল। আমি যখনতখন কোর্টে যেতে পারতাম না, কারণ ততদিনে অষ্টম শ্রেণি পাশ করে ফার্মের স্কুলে কাজ করা শুরু করেছি। তাছাড়া বাবা-মায়ের কাছে তেমন পয়সা থাকত না। আমার যে দুই ভাই শহরে কাজ করবে বলে চলে গিয়েছিল তারাও বাড়িতে কোনো টাকা পাঠাত না; আমার মনে হয়, শহরে তারা তাদের বান্ধবীদের সাথে থাকত আর তাদের পেছনে খরচ করত। বাবা আর আমার আরেক ভাই কাজ করত নেদারল্যান্ডস থেকে সাউথ আফ্রিকায় আসা এক সাদা পরিবারের কাছে। কিন্তু বেতন খুব কম ছিল। আমাদের দুটো ছাগল আর কয়েকটা গরু ছিল যেগুলোকে সেখানে ঘাস খাওয়ানোর অনুমতি পেয়েছিলাম। এক চিলতে জমি ছিল যেখানে মা সবজী চাষ করতে পারত কিন্তু বিক্রি করা নিষেধ ছিল।
একদিন কোর্টে গিয়ে দেখি, নীল স্যুট, ডুরে শার্ট আর বাদামি টাই পরে তাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। অন্য যারা অভিযুক্ত, তার ভাষায় কমরেড, তারাও সবাই সুন্দর কাপড় পরে আছে। ইউনিয়ন তাদের পরার জন্য ভালো জামাকাপড় এনেছিল যাতে করে বিচারক আর উকিলরা অন্তত এটুকু বোঝে যে তারা একদল বোকা, সব কথায় ’আহা, বেশ বেশ বেশ ’ বলা, নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে অসচেতন কালো মানুষদের নিয়ে নাড়াচাড়া করছে না।  আমি যখন জেলে তার সাথে দেখা করার অনুমতি পেলাম, কোর্ট আর বিচারের ব্যাপারে এইসব কথা সে আমাকে বিস্তারিত বলেছিল। বিচার চলতে চলতেই আমাদের মেয়ের জন্ম হলো। আমি যখন প্রথম তাকে বাচ্চা দেখাতে নিয়ে গেলাম, তার কমরেডরা সবাই বাচ্চাটিকে জড়িয়ে ধরল আর লোহার শিকের ভিতর দিয়ে আমাকেও জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানাল। সবাই মিলে চাঁদা তুলে বাচ্চার জন্য উপহারস্বরূপ কিছু টাকা আমাকে দিল। মেয়ের নাম সে রাখল ইনকুলুলেকো।
বিচার শেষে তার ছয় বছরের জেল হয়ে গেল। তাকে দ্বীপে পাঠিয়ে দেয়া হল। আমরা সবাই দ্বীপান্তরের কথা জানতাম। আমাদের নেতারা সেখানে অনেক অনেক দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু স্কুলে সমূদ্রের ছবিতে নীল রঙ করা ছাড়া আমি বাস্তবে কখনও সমূদ্র দেখিনি, তাই কল্পনাও করতে পারিনা কী করে একটুকরো জমি পানি দিয়ে ঘেরা থাকে। শুধু অনুমান করতে পারতাম যে বৃষ্টির জমে থাকা পানি যখন আকাশকে আয়নার মতো ধারণ করে নীল হয়, তার ওপর দিয়ে একপাল গরু হেঁটে যাওয়ার সময়ে গরু যেমন বৃত্তাকার গোবর ফেলে যায়, সব মিলিয়ে দ্বীপ হয়ত এমনই। এটা ভাবার জন্য আমার নিজের কাছেই খুব লজ্জা লাগত। তার কথা মনে পড়ত। সে আমাকে বলত, উপরে কাজ থাকলে ক্রেন যখন তাকে প্ল্যাটফর্মে উঠিয়ে আকাশের উঁচু থেকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেত, তখন কাচের দেয়ালে নিচের গাছপালা, রাস্তার অন্য বাড়িগুলো, গাড়ি আর মেঘের রঙ দেখা যেত।
মাসে তাকে শুধু একটিই চিঠি পাঠান যেত। সেটা অবশ্য আমারই চিঠি হতো কারণ তার বাবা-মা লিখতে পড়তে জানত না। চিঠি লেখার আগে যেখানে তারা কাজ করে সেই খামারে যেতাম ।  জানতে চাইতাম তারা তাদের ছেলেকে কিছু জানাতে চায় কি না। তার মা সবসময় আমাকে দেখলেই কপাল চাপড়ে কাঁদত, কিছুই বলত না। আর বুড়ো বাবা, যে প্রতি রবিবার মাঠে বসে আমাদের ধর্মীয় উপদেশ দিত, বলত, আমার ছেলেকে জানিও যে আমরা তার জন্য প্রার্থনা করছি। বিধাতা নিশ্চয়ই তার সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন। খামারের মানুষরা মনে করত তাদের ভালো-মন্দ সবকিছুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বিধাতাই তো আছেন।  ছোটকাল থেকে তারা এমনই জেনে এসেছে। তাই তারা ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নিজের থেকে কিছু করার কোনো উৎসাহ পেত না।
দুই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরে কেপটাউনে তাকে দেখতে যাওয়ার মতো যথেষ্ট টাকা জমাতে পেরেছিলাম।  তার বাবা-মা এবং আমি মিলে ঠিক করলাম যে তাকে দেখতে যাব। আমরা ট্রেনে রওনা দিলাম, স্টেশনের মেঝেতে ঘুমিয়ে থাকলাম। পরদিন আবার ফেরির খোঁজে বের হলাম। রাস্তা জিজ্ঞাসা করতে করতে যাচ্ছিলাম। মানুষজন খুব দয়া দেখাচ্ছিল; তারা বুঝেছিল আমরা যখন ফেরির ব্যাপারে জানতে চাচ্ছি, মানে আমাদের কোনো আপনজন নিশ্চয়ই ওই দ¦ীপে আছে।
আর ঠিক পরপরই, সেই বিস্তৃত সমূদ্র! সবুজ আর নীল, উঠছে আর নামছে, সাদা হয়ে ভেঙ্গে পড়ছে, ওপারে আকাশ পর্যন্ত ধাবমান। ভয়ঙ্কর বাতাসের ঝাপটা যেন তাকে এদিক থেকে ওদিকে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে; উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে সেই দ্বীপটি কোথায় যেন লুকিয়ে আছে! আমাদের সাথে ফেরির জন্য অপেক্ষমান অন্যান্য অনেকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখাচ্ছিল দ্বীপটি কোনদিকে হতে পারে। সত্যি ভাবিনি এরকম বিশাল সমূদ্রের মাঝখানে এত দূরে একটা দ্বীপ থাকতে পারে।
সেখানে আরও অনেক নৌকা ছিল, বড় বড় বাড়ির মতো উঁচু জাহাজ ছিল যেসব সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দিকে যায়। কিন্তু ফেরিটাই যাবে শুধু ওই দ্বীপে; আর কোথাও নয়, কেবলমাত্র ওই দ্বীপে। সুতরাং এখানে যারা অপেক্ষা করছে তারা সবাই ফেরি ধরে দ্বীপটিতে যাবে। আমরা যে সঠিক জায়গায়ই ছিলাম এতে কোনো ভুল ছিল না। কিছু মিষ্টি, বিস্কিট, কয়েকটা প্যান্ট আর একটা গরম কোট তার জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম। (আমাদের সাথে দাঁড়ানো এক মহিলা জানাল কাপড়গুলো নাকি তাকে দিতে দেবে না।) আমি খামারের মেয়েদের সবসময় পরে থাকা ইলাস্টিক লাগানো ক্যাপ পরে যাইনি। খামারে যে লোকটি সাইকেলের ওপরে বাক্সে করে জিনিস বিক্রি করতে আসে, তার কাছে থেকে চুলে লাগানোর একটা ক্রিম কিনেছিলাম। ফুলওলা স্কার্ফ দিয়ে সুন্দর করে আঁচড়ে চুলের গোছাটা বেঁধেছি কিন্তু তবু কানের পাশে ঝুলে থাকা সোনালি কোঁকড়ানো রিংগুলো ঢাকা পড়েনি। ওর মা জামার উপর দিয়ে নিজের কম্বলটা কোমরে জড়িয়ে রেখেছিল। দেখতে লাগছিল, ঠিক যেন খামারের শ্রমিকের মতো। কিন্তু সেখানে থাকা অন্য যে কোনো মেয়ের সাথে আমার কোনো পার্থক্য ছিল না। ফেরী আমাদের ওঠাবার জন্য যখন এলো, সবাই একসাথে গাদাগাদি করে দাঁড়ালাম, ঠিক যেমন একপাল গরু একটা গেটের ভিতর দিয়ে যাওয়ার জন্য ধাক্কাধাক্কি করে অপেক্ষা করতে থাকে। একজন লোক থুতনি উঠিয়ে নামিয়ে বারবার সবাইকে দেখছিল, মনে হচ্ছিল মানুষ গুনছে। হয়তো ভয় পাচ্ছিল যে লোকের সংখ্যা অতিরিক্ত হয়ে যাওয়াতে সে আবার বাদ না পড়ে যায়! সবাই ধীরে ধীরে দায়িত্বে থাকা পুলিশটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আর আমাদের সামনের লোকজন ফেরীতে ওঠা আরম্ভ করে দিয়েছিল। কিন্তু যখন আমাদের ওঠার সময় এলো সে হাত বাড়িয়ে আমার কাছে কী যেন চাইল; কী চাচ্ছে আমি তখন বুঝিনি।
আমাদের কাছে দ্বীপে যাওয়ার অনুমতিপত্র ছিল না।  আমরা জানতামই না যে ফেরীতে চড়ে দ্বীপে কোনো আসামীকে দেখতে গেলে কেপটাউনে আসার আগেই একটা অনুমতি পত্র নিতে হয়। আমি তাকে করুণভাবে অনুরোধ করতে লাগলাম। সাগরের প্রবল বাতাসে আমার মুখনিসৃত কথাগুলো  ভেঙে ভেঙে কোথায় যেন ভেসে গেল!
আমাদের ফিরিয়ে দেয়া হলো। আমাদের পায়ের নিচের সমতলটা কাঁপিয়ে ফেরি সরে যেতে লাগল। সমস্ত পানি ঝরিয়ে পাটাতনটা উঠিয়ে নেয়া হলো। আমাদের চোখের সামনে ফেরীটা ছোট থেকে আরও ছোট হতে লাগল। তাকিয়ে থাকলাম যতক্ষণ পর্যন্ত আর কিছুই চোখে পড়ছে না। ছোট, কালোমতো পাখীগুলোর বাতাসে উড়ে উড়ে ওঠানামার দিকে একভাবে তাকিয়ে ছিলাম তারপরও।
ভালোর মধ্যে যা হলো, একজন মানুষ মিষ্টি আর বিস্কিটগুলো বয়ে নিয়ে গেল। পরে সেগুলো পাওয়ার খবর সে লিখে জানিয়েছিল। কিন্তু সেটা সুন্দর কোনো চিঠি ছিল না। অবশ্যই ছিল না। বুঝতে পেরেছিলাম যে সে আমার উপর রেগে আছে। সব নিয়মকানুন আগেই ভালোমতো খোঁজখবর করে জেনে নেয়া আমার উচিৎ ছিল। তার রাগটা তো অহেতুক ছিল না! আমি ট্রেনের টিকেট কেটেছি, ফেরী ধরতে হলে কোথায় যেতে হবে আমিই খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সুতরাং আমারই তো জানা উচিৎ ছিল যে অনুমতিপত্র লাগবে। আমি তো অষ্টম শে্িরী পাশ করেছি। অনুমতিপত্রের বিষয়টা জানব না কেন? সে লিখেছিল, শহরে চার্চের আওতায় একটা অফিস আছে। অনুমতিপত্রের জন্য সেখানে আমাদের যেতে হতো। কিন্তু খামার শহর থেকে এত দূরে যে খামারে বসে শহরের এসব ব্যাপার-স্যাপার বোঝা সম্ভব নয়। তার মতে এই মূর্খতাগুলোই আমাদের নিচের দিকে দাবিয়ে রাখে। এই মূর্খতা দূর করতেই হবে।
আমরা ফেরার ট্রেন ধরলাম। আর কখনই আমাদের সেই দ্বীপে যাওয়া হয়নি। তারপর এই গত তিন বছর, যতদিন সে ওখানে ছিল, আর কখনই তার সাথে দেখা হয়নি। একবারও দেখা হয়নি। ট্রেনের টিকেটের জন্য পরে আর পয়সা যোগাড় করতে পারিনি। ওর বাবা মারা যাওয়াতে, আমাকেই মায়ের খরচপাতি করতে হচ্ছিল। তাকে লিখেছিলাম, আমাদের মতো মানুষদের জন্য একমাত্র টাকার চিন্তাটাই বড়। শেষপর্যন্ত কখনও কি আমাদের হাতে টাকা আসবে? এরপর সে পাঠিয়েছিল অসম্ভব সুন্দর একটা চিঠিÑ এজন্যই তো আজ আমি এই দ্বীপে বন্দি হয়ে আছি! তোমার থেকে দূরে। আমি এখানে আছি যেন একদিন আমার মতো মানুষেরা তাদের দরকারী সব জিনিস, খাবার থেকে শুরু করে বাড়ি পর্যন্ত কেনার সামর্থ অর্জন করে। আমাদের সকল অজ্ঞানতা দূর হয়। তারপর আরও কিছু যেন লেখা ছিল সে চিঠিতে, শুধু ’ক্ষমতা’ শব্দটা পড়া যাচ্ছিল। জেল থেকেই হয়তো বাক্যটির উপরে কালি লেপে দেয়া হয়েছিল। তার সব চিঠি যে একমাত্র আমিই পড়তাম তা তো নয়! জেলের দায়িত্বে থাকা অফিসার আমার পড়ার আগেই সেসব খুঁটিয়ে দেখত।
পাঁচ বছর পরে সে বাড়িতে ফিরছিল!
অথচ যখন তার ছাড়া পাওয়ার খবরটা শুনলাম, আমার মনে হলো মাঝখানে পাঁচ বছর বলে কোনো সময় নেই। একেবারে উধাও। এমনকি আরেকটা পুরো বছরও তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না!  আমি আমার, নাহ্ একা আমার না, আমাদের দুজনের ছোট্ট মেয়েটিকে তার ছবি দেখালাম। দেখ, এই হচ্ছে তোমার বাবা, সে বাড়ি ফিরছে, তুমি তাকে দেখতে পাবে। স্কুলে গিয়ে সে অন্য বাচ্চাদের বলল যে তারও একটা বাবা আছে। তাকে দেখাচ্ছিল তার পোষা ছোট্ট ছাগলের বাচ্চাটির মতোই আদুরে।
আমরা চাচ্ছিলাম যে সে এখুনই আসুক, আবার একই সাথে ভাবছিলাম তাকে বরণের আয়োজন করতে কিছু সময়ও যেন হাতে পাই। তার মা তার এক মামার সাথে থাকত; এখন যেহেতু তার বাবা নেই তাই কোনো বাড়িও নেই যে বিয়ে করে আমাকে সেখানে তুলবে। যদি সময় থাকত, আমার বাবা খুঁটি তৈরী করে দিত, মা আর আমি মিলে ইট পোড়াতাম, কঞ্চি কেটে বেড়া বানাতাম, তারপর একটা বাসা বানাতাম তার, আমার আর আমাদের বাচ্চার জন্য।                       
আমরা জানতাম না ঠিক কোন দিনটিতে সে এখানে এসে পৌঁছবে। আমরা শুধু রেডিওতে তার এবং সাথে আরও কয়েকজনের নাম শুনেছিলাম যারা ছাড়া পেয়েছিল। তারপর ইন্ডিয়ান দোকানে ’দ্যা নেশন’ নামে কালো মানুষদের লেখা পত্রিকাটি পড়েছিলাম। একেবারে উপরের পাতায় বহু মানুষের আনন্দঘন মুহূর্তের একটা ছবি ছেপেছিল। ছবিতে তারা কেউ নাচছে, কেউ বা হাত নাড়ছে। ছবিটা দেখামাত্রই আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে এটা সেই ফেরিতে তোলা। কিছু মানুষকে আবার অন্যরা ঘাড়ে করে নিয়ে যাচ্ছে। দেখে বোঝা যায়নি সেখানে কোন মানুষটি সে। তাই আমরা শুধুই অপেক্ষা করছিলাম। ফেরী তো তাকে দ্বীপ থেকে শহরে এনেছে কিন্তু আমার মনে আছে কেপটাউন খামার থেকে অনেক দূরে। তারপর সত্যি সে একদিন এসে পড়ল। দিনটা ছিল শণিবার, স্কুল বন্ধের দিন, তাই আমি মায়ের সাথে শাবল দিয়ে মাটি কোপাচ্ছিলাম আর মিষ্টিকুমড়া আর ভুট্টার গাছের চারদিকের আগাছা পরিষ্কার করছিলাম। আমার চুলগুলো পরিপাটি করে রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু তা বাঁধা ছিল একটা জীর্ণ রুমালে। বড় গাড়িটা যখন মাঠে এসে দাঁড়াল, তার কমরেডরা তাকে নিয়ে নেমে এলো। আমি নিজেকে পরিষ্কার করার জন্য দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম কিন্তু সে সেখানে পা সোজা করে দাড়িঁয়ে এ্যাই, এ্যাই, করে ডেকেই যাচ্ছিল! কমরেডরা তাকে ঘিরে চেঁচামেচি করছিল আর আমার মা বাচ্চাদের মতো হই হই করে উঠল। বাবা তার দিকে তাকিয়ে হাততালি দিতে দিতে লাফাচ্ছিল। ইয়াবড় মানুষটা শহরের কাপড়চোপর আর ঝকঝকে জুতা পরে আমাদের দিকে হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিল। আর যতক্ষণ সে আমাকে জড়িয়ে ধরে ছিল, আমি কাদামাখা ময়লা হাত দুটোকে তার ঘাড়ের পিছনে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। ঠোঁটের ভেতর দিয়ে তার দাঁত লেগে আমি বেশ ব্যথা পেয়েছিলাম। এক হাতে সে মা কে আকড়ে ধরল আর মা সাথে সাথে বাচ্চাটিকে তার কোলে তুলে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মনে হচ্ছিল আমরা সবাই মিলে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাব! পরপরই সবাই কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। বাচ্চাটা তাকে দেখে আমার মায়ের পিছনে গিয়ে লুকাল। সে তাকে কোলে তুলে নিল কিন্তু বাচ্চাটা তার ঘাড়ের দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখল। বাবা আদর করে তার সাথে কথা বলা শুরু করল কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই তার সাথে কথা বলছিল না। মেয়েটার প্রায় ছয় বছর বয়স হয়ে গেছে! আমি অবশ্য তাকে এখন আর একেবারে ছোট্ট শিশুদের মতো জেদ করতে মানা করি। বাচ্চাটা পরিষ্কার বলে দিল, এটা বাবা নয়।
শুনে কমরেডরা সবাই হাসছিল। আমরাও হাসতে লাগলাম। দেখে মেয়েটা দৌড়ে পালিয়ে গেল। সে হেসে বলল, মনে হয় বাবা হিসেবে আমার সাথে অভ্যস্ত হতে বেচারার সময় লাগবে।
আশ্চর্য, সে বেশ মোটা হয়ে গেছে। না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সে আগে এত রোগা ছিল যে তার পা দুটো মনে হতো শরীরের তুলনায় অনেক লম্বা। তাকে ছুঁলে শুধু হাড়ের অস্তিত্ব টের পাওয়া যেত। অথচ সেই রাতে, সে যখন আমার উপরে, তাকে এত ভারী লাগছিল! আমার মনে হয় না আগে এমন লাগত। জেলে থেকে এত নাদুসনুদুস হয়ে যাওয়াটা বড় অদ্ভুত লাগছিল; সবসময় ভাবতাম সে নিশ্চয়ই যথেষ্ট খাবার পাচ্ছেনা আর খুব দুর্বল হয়ে পড়ছে। সেদিন সবাই বলছিল, এইবার ওকে দেখ, এখন না সে পুরোপুরি একজন পুরুষ! শুনে নিজের দু’হাত মুঠি করে সে বুকের উপরে দুমদাম করে মারতে লাগল; হেসে বলল সে আর তার কমরেডরা জেলে থাকার সময় অনেক শরীরচর্চা করেছে। বলল প্রতিদিন তিন মাইল করে দৌড়াত আর ছোট্ট যে কামরায় তাকে রাখা হয়েছিল সেখানে এক জায়গায় ক্রমাগত ওঠানামা করত। সেদিনের পর থেকে রাতে যখনই আমরা একসাথে হতাম, অনেকক্ষণ ধরে ফিসফিস করে কথা বলতাম। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারি, সে যেন কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত থাকত যা আমার অজানা। আমার কথা যেন তাকে আর কোনো ঘোরের মধ্যে আটকে রাখতে পারছিল না। তাছাড়া বলার মতো আর কিছু খুঁজেও পাই না। একবার মনে হয়, জানতে চাই না-হয়, কেমন ছিল পাঁচ-পাঁচটা বছর চুপচাপ সেই দূরে সরে থাকা; কখনও মনে হয় এখানকার কথা বলি, স্কুলের কথা, বাচ্চাটার কথা। এখানে বলার মতো কিছু কি হয়েছিল? কিছুই তো চোখে পড়ে না। শুধু অনন্ত অপেক্ষা ছিল। কখনও অবশ্য দিনের বেলায় তাকে বলার চেষ্টা করি, এখানে, এই খামারে লম্বা পাঁচটি বছর কী করে কাটালাম। সে মনোযোগ দিয়ে শোনে, এমনকী আরো শুনতে চায়, ঠিক যেমন সে শুনতে চায় আশেপাশের খামার থেকে তাকে দেখতে আসা অন্যান্য মানুষদের জীবনে এই পাঁচ বছরে ঘটে যাওয়া টুকিটাকি ঘটনার কথা, যে সময় সে ছিল সেই দ্বীপে। তাদের কথা শুনে সে হাসে, মাথা নাড়ে, কখনও বেশ কিছু প্রশ্নও করে তারপর একসময় দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গে। আমি বুঝি, এভাবে ওদের জানায় যে সে এখন আর শুনতে রাজী নয়। তার মাথায় এখন অন্য কিছু ঘুরছে যা হয়তো ওই লোকগুলো আসার আগেও ঘুরছিল। আসলে আমরা খামারে থাকা মানুষগুলো খুবই স্থবির; আমরা কথাবার্তাও খুব ধীরে বলি, একসময় সে-ও আমাদের মতো ছিল।
এখনও সে কোনো কাজে যোগ দেয়নি। কিন্তু এভাবে তো আর শুধু বাড়িতে বসে থাকা যায় না। আমরা ভেবেছিলাম পাঁচ বছর দূরের সবুজ-নীল সমুদ্রের মাঝে কাটিয়ে এখানে আমাদের সাথে অন্তত কয়েকটা দিন হলেও তো বিশ্রাম নেবে। সেই বড় গাড়িটা, নাকি অন্য কোনো গাড়ি যথারীতি একদিন তাকে নিয়ে যেতে এলো। নির্দ্বিধায় সে আমাকে বলল, ভেবনা, আমি যাচ্ছি; তবে কবে, কখন ফিরব জানি না। প্রথমে আমি না বুঝে জানতে চাইলাম, কবে ফিরবে? আগামী সপ্তাহে? সে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল। আন্দোলনে যাওয়া তো আর ইউনিয়নে যোগদান করার মতো ব্যাপার নয়! আন্দোলন শুরু করা মানে সারাদিনের কাজ শেষ করে তারপরেও বিভিন্ন কাজে ব্যাস্ত থাকা। আন্দোলনের পথে কখনই আগে থেকে জানা যায় না যে একটু বাদে কোথায় যেতে হতে পারে অথবা সামনে কী দায়িত্ব আসছে। টাকা উপার্জনের ব্যাপারটিও অনিশ্চিত। আন্দোলন করা তো আর সাধারণ চাকরী করা নয় যে মাসশেষে নিয়মিত বেতন আসবে! আমি এখন বুঝি, আমাকে আর বোঝাবার দরকার নেই। এটা ঠিক যেন তার দূরের দ্বীপে চলে যাওয়ার মতো। আমার বাবা-মায়ের প্রসঙ্গ টেনে সে বলল, আন্দোলন করবে আমাদের মতো মানুষদের জন্য, যাদের নিজস্ব থাকার জায়গা নেই, কোনো সম্পদ নেই। আমি তার, আমার আর আমাদের বাচ্চার জন্য বাড়ি বানানোর যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এই মাটিও আমাদের নয়। সাদা মানুষেরা এই জমির মালিক আর আমাদের এই কাদার মধ্যে দয়া করে শুধু একটু থাকতে দিয়েছে। এই টিনের কুড়েঘরগুলোতে আমরা কেবলমাত্র ততদিন থাকতে পারি যতদিন তাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমার বাবা আর ভাই সাদা মানুষদের জন্য শষ্য ফলায়, তাদের গরু লালনপালণ করে। আমার মা তাদের বাসা পরিষ্কার করে। আমি শিক্ষক হিসেবে সঠিক প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ না পেয়েও স্কুলে পড়াই। তার ভাষায়, এই খামারের মালিক আসলে আমাদের সবার মালিক।
আমি সবসময় এটা ভেবে কষ্ট পেতাম যে আমাদের বাড়ি নেই; কারণ সে দ্বীপ থেকে ফেরার আগে নিজেদের জন্য বাড়ি বানানোর যথেষ্ট সময় পাইনি। কিন্তু আসলেই আমাদের কোনো বাড়ি নেই। এতদিনে বুঝতে পারলাম!
এসব না বোঝার মতো তত বোকা আমি নই। তার সাথে কথা বলার জন্য বড় গাড়িতে করে    কমরেডরা যখন এখানে আসে, চা বা বিয়ার যাই হোক একটা কিছু দিয়ে মায়ের পিছুপিছু গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। (সাপ্তহিক ছুটির দিনগুলোতে মা বিয়ার বানায়) তারা মায়ের বানানো বিয়ার খেতে পছন্দ করে। তারা আমাদের সংষ্কৃতি নিয়ে আলাপ করে। আর তাদের মধ্যে একজন কোনো ছুঁতায় মাকে জড়িয়ে ধরে বলে যে এই মা হলেন তাদের সবার মা; পুরো আফ্রিকার মা। দ্বীপে থাকার সময় তারা একসাথে কেমন করে গান গাইত সেসব গল্প শোনাতে শোনাতে কখনও তারা মাকে অভিভূত করে ফেলে। মা আমার নানির শেখানো, আমাদের সবার জানা অনেক পুরোনো কোনো গান গাইতে শুরু করে। তারপর তারা মায়ের সাথে তাদের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর মেলায়। আমার বাবা মাঠের এদিকওদিক ঘোরাঘুরি করার সময় এই সমবেত গানের শব্দ শুনলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে; যদি কোনোভাবে সাদা মানুষেরা জেনে যায় যে আমার স্বামী একটা দ্বীপান্তর ফেরত, রাজনীতি করা মানুষ আর সে তাদের জায়গায় বসে আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে, অবশ্যই তারা বাবাকে তাড়িয়ে দেবে। সাথে তার পুরো পরিবারকেও নিয়ে যেতে বাধ্য করবে। কিন্তু আমার ভাই বাবাকে শিখিয়ে দেয়, যদি তারা কিছু জানতে চায় তো তাদের বলে দিও, এসব হলো সমবেত ধর্মীয় প্রার্থনা। গান শেষ না হলেও একসময় মা বোঝে যে এখন তাদের সামনে থেকে সরে যাওয়ার সময় হয়েছে।
আমি তবু দাঁড়িয়েই থাকি। তাদের কথা শুনি। একসময় সে ভুলেই যায় যে আমি সেখানে আছি। কমরেডদের সাথে কথা বলে, নানান বিষয় নিয়ে যুক্তিতর্ক চলে। আমি অবাক হয়ে দেখি, সেসব কথা তার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দুজনে একলা থাকার সময়ে যত কথা হতো তার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কমরেড কথা বলার সময়ে ফাঁকে ফাঁকে সে আমার দিকে এক ঝলক তাকায়। ঠিক যেমন স্কুলে পড়ানোর সময় বুঝতে উৎসাহিত করতে প্রিয় কোনো ছাত্রের দিকে আমি যেভাবে তাকাই। কমরেডরা আমাকে আন্দোলনের বিষয়ে কিছু বলেনি আর আমিও জানতে চাইনি। তাদের আলোচনার মধ্যে একটি বিষয় ছিল, আমার বাবা, ভাই অথবা তার বাবা-মায়ের মতো খামার শ্রমিকদের সংগঠিত করা। তাদের আলোচনা থেকে আন্দোলনের বিষয়বস্তু জেনেছি। ন্যূনতম বেতন, কাজের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারন, সঙ্গত কারণে হরতাল ডাকার অধিকার, বাৎসরিক ছুটি, দুর্ঘটনার জন্য সাহায্য, পেনশন, অসুস্থতার জন্য ছুটি থেকে শুরু করে মাতৃত্বকালীন ছুটি পর্যন্ত বিষয়গুলো তাদের আলোচনায় এসেছে। আমি মা হতে যাচ্ছি, আমার ভিতরে আবার আরেকটি বাচ্চা বেড়ে উঠছে, কিন্তু এ সমস্ত মেয়েদের ব্যাপার। যখন তারা বয়ষ্ক, অনেক বড় মানুষদের নিয়ে কথা বলেছে, আমি বুঝেছি তারা আমাদের নেতাদের বিষয়ে বলছে। আমাদের নেতারাও জেল থেকে ফিরে এসেছে। আবার বাচ্চা আসার খবরটা আমি তাকে বলেছিলাম। সে বলেছিল, এই শিশু একটা নতুন দেশে জন্মাবে। যে স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়ছি, সে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনব! আমি জানি এর মধ্যে সে আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা সেরে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তার জন্য আর সময় কোথায়। বলতে গেলে নতুন বাচ্চাটিকে পৃথিবীতে আনার জন্যও সময় প্রায় ছিলই না। সে এমন তড়িঘড়ি করে আমার কাছে এল যে মনে হলো যেন শুধু এক বেলা খেতে অথবা কাপড় বদলে পরিষ্কার কাপড় পরতে এসেছিল। ছোট্ট মেয়েটিকে হাতে তুলে নিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুরতে লাগল। ব্যাস শেষ! বাবার আদর দেয়া হয়ে গেল। কমরেডদের দিকে নিজের মুখটি ঘুরিয়ে সে বড় গাড়িতে চড়ে বসল। এই দুর্বোধ্য মুখটিই শুধু জানত যে তার মাথার ভেতরে কী চলছে। ইতস্তত কেঁপে ওঠা চোখজোড়া দেখলে মনে হয় কোন এক স্বপ্নকে ধাওয়া করছে যা অন্য কেউ দেখতে পায় না!  বেচারা ছোট্ট মেয়েটি বাবার সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগই পেল না। কিন্তু আমি জানি, একদিন সে তার বাবাকে নিয়ে গর্ব করবে!                       
ছয় বছরের একটা ছোট্ট শিশুকে কী করে আমি সেই গর্বের কথা বোঝাই! তাই তাকে আমাদের নেতা, বিরাট আর অভিজ্ঞ মানুষটির কথা বলি। বলি যে তার বাবা ওই মানুষগুলোর সাথে দ্বীপে ছিল। তাকে বোঝাই যে তার বাবাও একজন অসাধারণ মানুষ।
শনিবারে যখন স্কুল বন্ধ থাকে, আমি মায়ের সাথে গাছ লাগাই, আগাছা পরিষ্কার করি। মা গুনগুন করে গান গায় আর কাজ করে। আমি চুপচাপ হাত চালিয়ে যাই। প্রার্থনার জন্য গাছের নিচে একত্রিত হওয়া ছাড়া রবিবারে অন্য কোনো কাজ থাকে না। পরে সবাই মাটিতে অথবা টিনের ছাপড়ায় বসে বিয়ার খায় যেখানে খামারের মালিকেরা দয়া করে আমাদের থাকতে দিয়েছে। আমি আস্তে করে সবার থেকে আলাদা হয়ে একটু দূরে সরে যাই। ছেলেবেলায় যেমন কিছুটা আড়ালে গিয়ে একা একা খেলা সাজিয়ে নিজের সাথে কথা বলতাম যেন কেউ আমার কথা শুনতে না পায় অথবা আমাকে দেখতে না পায়। সন্ধ্যার আগেআগে ওই উঁচুতে সূর্যের তাপে গরম হয়ে যাওয়া একটা পাথরের উপরে উঠে বসে থাকি। আমার পায়ের নিচে পুরো উপত্যকাটি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তার মতো বয়ে চলে। খামারটি সাদা মানুষদের খামার। কিন্তু এটা সত্যি নয়! এই মাটি কারও নয়। ওই যে গরু আর ভেড়াগুলো চরছে, তারা কি জানে তারা কার? এই যে ধুসর পাথরগুলো, তারা জানে? আবার ওই যে একটা গাঢ় ধুসর সাপ নড়েচড়ে চলে যাচ্ছে, সে কার? কিছুই কি বেঁচে থাকবে চিরকাল পৃথিবীর গায়ে? বুড়ো মালবেরি গাছের নীচে আমাদের সারি সারি কুড়েঘর, বাড়িতে মায়ের হাতে লেপা মেটে রঙের মেঝে, দূরে চিমনি ঘিরে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো আর খামার বাড়ির উপরে টিভি দেখার জন্য লাগানো চকচকে অ্যারিয়েল, কিছুই কি থাকবে? কুকুর যেমন আকস্মিক থাবায় মাছি তাড়ায়, সেভাবেই এইসমস্ত এক নিমেষে কোথায় মিলিয়ে যাবে!
আমি মেঘের সাথে ভেসে বেড়াচ্ছি। আমার পেছনে সূর্যটা আকাশের রঙ বদলায়। মেঘেরাও বদলে যায় ধীরে ধীরে। মেঘ যেন গোলাপি আর সাদা বুদ্বুদ হয়ে শুধু বাড়তে থাকে। নীচে এক চিলতে দীর্ঘ ধুসর মেঘ-  অতটুকুতে বৃষ্টি আনতে পারবে না। তাই সে বিস্তৃত আর গাঢ় হতে থাকে। ছুঁচালো সরু নাক, লম্বা শরীর আর একেবারে শেষে একটা লেজ নিয়ে আরও বড় হতে থাকে। আমার চোখের সামনে যেন একটা বিশাল ইঁদুর আকাশের গায়ে চলাচল করছে, আকাশকে গিলে খাচ্ছে।
আমার মেয়ের মাথায় বাবার সেই আগের ছবিটা বসে গেছে; সে বলে, যে লোকটা এসেছিল, সে বাবা নয়। সে দ্বীপান্তরে থাকার সময়ে প্রায়ই আমি এই উঁচু পাথরের উপরে এসে বসতাম। এখানে আসতাম কিছুক্ষণের জন্য সবার থেকে আলাদা হতে, নিজের মনে তার জন্য অপেক্ষা করতে।
আমি অবাক চোখে ইঁদুরটাকে দেখছি, আকাশকে গ্রাস করার মতো সেই ভয়ঙ্কর আকৃতিটি সে হারিয়ে ফেলছে। আর আমি অপেক্ষাই করছি। তার আসার জন্য বসে আছি।
অপেক্ষায় আছি।
আমি আমার নিজের বাড়িতে ফেরার প্রতীক্ষায় আছি।