আশ্বিনের মাঝামাঝি,
উঠিল বাজনা বাজি,
কাশফুলের শুভ্র বসনে, মন উঠেছে আজ সাজি...

নীল আকাশের ক্যানভাসে ছেঁড়া মেঘ যখন ইতিউতি উঁকি দিতে শুরু করে, মনের ঘরে ঢাকের বোল এমনিই আগমনীর আবাহনের প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। শরৎ কালের সময়, কভু বৃষ্টিভেজা কভু সূর্যস্নাত প্রহর বাঙালীর কাছে একটাই অর্থ বহন করে- দুর্গাপূজা। শারদীয়ার বোধন অধুনা অনুকরণপ্রিয়, অনুসরণপ্রিয় নি:স্ব ও নি:শেষিত একটা জাতির সেই ‘শিবরাত্রির সলতে’, সেই সবেধন অমূল্য মণি, যার ঔজ্জ্বল্যে আজও আলোকিত হয় ধানসিঁড়িটির দেশ, যার আতিশয্যে আজও ঢাকা পড়ছে মূল্যবোধের হীনতা ও দীনতা।

কিন্তু ২০২০ এর প্রাক্-আশ্বিনের লগ্নে সবই যেন ওলট-পালট এবার! বিশ্বব্যাপী মহামারী... এক আনুবীক্ষণিক প্রাণ শত শত কোটির মানবসভ্যতাকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও সংকটের সম্মুখীন করেছে, এক অভূতপূর্ব সমস্যার শৃঙ্খলে বন্দী করেছে। ধর্ম নামক অপার্থিব নোঙরের ভরসায় যুগ যুগ যাবৎ সভ্যতার পাড় লাগানো মানবজাতি আজ অচিরেই বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতার মুখাপেক্ষী। সকল উৎসব, পরব ও ধর্মীয় উপাচারের আজ অনিশ্চিত বিরামপর্ব চলছে, কিন্তু তাতে বাঙালী দমছে কই! একদা ব্রিটিশরাজের গুলির সামনে নিশ্চল অকুতোভয় বাঙালী আজ করোনা নামক অদৃশ্য শত্রুর সামনেও নিজের বীরত্ব প্রমাণে মরীয়া। এ সংঘর্ষ বুদ্ধির পরিচয় না সাহসের অপচয়, তা তর্কসাপেক্ষ, কিন্তু ‘সংবিধাণ’ কে কবেই ‘সং’ বানিয়ে ফেলা বাঙালী জাতি যে স্বাস্থ্যবিধি তথা সমাজ রক্ষায় শৃঙ্খলার পরিচয় দেবে না, তা একপ্রকার নিশ্চিত। তাহলে এবার কীসের ব্যতিক্রম? কীসের স্বাতন্ত্র্য?

সেই ছোটবেলা থেকে একটা কথা খুব আনমনা করে দিত, যখন দেখতাম মৃত্যুর দোরগোড়ায় অপেক্ষারত মুমূর্ষু রোগীর আত্মীয় এক এক ক্ষণ কে পরাজিত করার ভরসায় অটল থাকে, অভুক্ত-অশীতিপর এক বৃদ্ধ দারিদ্র্যকেও আগামীর ভরসায় অগ্রাহ্য করতে পারে। কী সেই ভাবনা যা অসম্ভবের বাহুল্যকেও নিমেষে দমিয়ে দিতে পারে? নি:সীম কালো আঁধারকেও ক্ষণিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে? আশা! এর নাম আশা! হারানো সুরে, রূপকথার রাক্ষসপুরে, পথহারানো অপু-দুর্গার স্বপণে, ভেতো অবয়বের মাঝেও স্বামীজি-নেতাজীর গড়নে বাঙালী যা আজও খুঁজে ফেরে, তা হল বাঙালীর দু্র্গাপুজো... আশার পুজো, আস্থার পুজো, আত্মার পুজো।

মা আসেন প্রতিবছর কিন্তু অধুনা যেন মৃন্ময়ী রূপে, তাই আন্তরিকতার যাদুস্পর্শ আজ বিরল, ভক্তির সততা আজ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই পুজোয় তাই মূর্তি নয়, মা কে চাই, চোখ-ধাঁধানো থিম নয়, স্নেহের পরশ চাই! মা আসুন সেই আশা হয়ে, যার আবেশে বাংলার শিল্পের মৃত স্বপ্ন ও সম্ভাবনা গুলো যেন অমৃতসুধার স্বাদ পায়; বিশ্বকর্মার অনুরাগী জাতির শিক্ষিত-মেধাবী যে মনগুলো জীবন-জীবিকার জন্য দৈনন্দিন সংঘর্ষে জীবনীশক্তি ক্ষয় করছে, যেন তারা স্বাচ্ছল্যের বৃষ্টিতে নতুন প্রাণশক্তি পায়!

অপরাজিত-এর শেষভাগে অপুর বনদেবীর কাছে যে গ্রামবাংলার শ্যামল অবোধ প্রাণবন্ততা, স্বপ্নময় সুন্দর শৈশবের অপূর্ণ বাসনা ছিল, এই পুজোর প্রাক্কালে তেমনই স্বপ্ন দেখে মন। আগমনীর আবাহনে, শিউলীর সুবাসে প্রত্যেকের জীবনের প্রতিটা দিন হোক শরতের মুক্ত নান্দনিক আকাশ, কাশের শুভ্রতায় জীবনের চলার পথটা হোক স্বপ্নিল, শান্তিপূর্ণ আর অপরাজিত... বাংলার মর্ম যেন ঢাকের তালে, ধুনুচীর প্রতিটি বোলে, প্রতিটা প্রাণে স্পন্দিত হয় আজীবন, আমরণ।