গুছিয়ে রেখে গেলাম তোমায় না- দেখেই
অগ্রন্থিত পৃষ্ঠা পাশে একটা সংসার থাকুক

" একেবারে চলে যাবি? বন্ধুত্ব রাখবি না? "
" তুমি চাও ? "
" কেন,তুই চাস না?"
" আমি? হাসালে আলেখ্য দা … তোমার অসুখ হওয়ার পর প্রথম চুমুটা কিন্তু তুমি-ই পাঠিয়েছিলে।আমি কী চাই জানতে চেয়েছ? একবারও? "
"সেটাই আমার ভুল হয়েছে বল? "
"ভুল না ঠিক তা তুমি জানো। আগে তোমার সঙ্গে ডিস্টেন্স রেখেই কথা বলতাম। হঠাৎ তোমার অসুস্থ শরীর দেখে আমি কেমন মায়ায় জড়িয়ে গেছি। "
" জানি। এটাও জানি যে, তুই একটা সিরিয়াস সম্পর্ক চাইবি। আমি সেটা দিতে পারব না। তাছাড়া তোর এত অনুরাগী, নিজের অতীত থেকেই বেরোতে পারলি না তুই!"
"তো? তোমায় কম আদর করেছি?"
" জানি জানি। তুই এখন এইসব হিসেব শোনাবি। আচ্ছা স্নেহ, দিব্যি দিয়ে বল তো, অসুখ না-হলে আমায় আদর করতে আসতি কখনো?”
" আমি আর কী শোনাব বল? কেন-ই-বা শোনাব ? সবই তো উপড়ে দিলে তুমি। এক নিমেষে! বন্ধুত্বে ফেরত চলে যেতে ব’লে। আমার পার্শ্ববর্তী গ্রাম উপড়ে দিলে, টিলাখন্ড, প্রাণী, পশু --- সব উপড়ে দিলে! "
" আর তুই? প্রতি দিন তোর ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাক্তনকে আমাদের মধ্যে নিয়ে আসতি না? সব বুঝতাম।আমার চোখ অন্ধ? "
" বালাই ষাট ! প্রাক্তন হবে কেন? পূরব কী আমার স্বামী? ও তো প্রেমিক। প্রেমিক কখনো প্রাক্তন হয় না।এক একজন প্রেমিক আমাদের মস্তিষ্কে ছোট ছোট কামরায় বাস করে। আই ডোন্ট মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ।"

হ্যারিকান আসুক । বাতি নিভে যাক। চালাঘর খায় পাক।
লাল টিপ আয়নার কোণে লেগে থাকে
কোণ বলছি । বেশি স্থান নেব না।

" যাই বল আলেখ্য দা, তুমি বড্ড ভিতু ! "
" কেন? ভিতু কেন? "
" বাহ! ভিতু নও? তুমি ভাবো আমি তোমার গৃহ দাহ করব। এদিকে আবার আমায় বেঁধে রাখতে পারো না। আঁকড়ে রাখতে তো কোনো কালেই শিখলে না!"
" শোন পাগলি, তোর বয়েসে আমিও এইভাবে ভাবতাম। এত দম, ভাবনায় এত বিদ্যুতের ঝলক, এত আবেগ --- এইসব আমারও ছিল এক কালে। তখন আমি তরুণ কবি! আজ যেমন তুই! ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল আমি তোর চোখে দেখতে পাই।তুই এখনো পূরব - কে একি রকম ভালবাসিস !”
" সেটা ভুল আলেখ্য দা? মাইলের পর মাইল, দশ লক্ষ একর জমি পুড়ছে শহরটার।লালচে আকাশ। মনে হচ্ছে যেন মঙ্গল গ্রহে বসে আছে মানুষ!"
"দেখেছিস? নিউ জার্সিতে বসেও কী স্পষ্ট দেখতে পাস তুই ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশ! অথচ আমি যে এই মারণ রোগে দিন রাত শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছি? এই অসহায় চোখ একবারও টানে তোকে ? রোজ ভোরে তোর চোখ দুটো দেখার প্রতীক্ষা করি।এইসব কিছু নয় বল?”
' না-টানলে আসি কেন অনলাইন? এক শহরে থাকলে ছুট্টে  চলেও যেতাম। আছড়ে পড়তাম তোমার বুকে। সংক্রমণ হলে হত! তারপর আইসলেট করে ফেলতাম নিজেকে। "

তোমার বুক এবং কপালের মুখোমুখি-হয়ে-পড়া
যেন থেকে যায়। আমি আসব - এই ভেবে।এই ভাবে।

এখন পড়ার টেবিলে বসে আছি।
সেখানে বসেও তোমার বুক দেখতে পাই

" থাক রে এইসব। যত সময় যাবে জটিলতা বাড়বে। অত গভীরে ভাবার প্রয়োজন নেই।"
"একবার আমার চোখে চোখ রেখে বল তো ? আদর করিনি তোমায়? পড়িনি আমরা পরস্পরকে ? এই ক'দিন দিন রাত তোমার খোঁজ নিইনি? তোমার নামে ফুল বেলপাতা রেখেছি। মানত করেছি। বল,এই সব  মিথ্যে?’’
"জানি।আঘাত নে। মানে অপমানে তুই ক্রুদ্ধ হয়ে চলে যা। দূরে চলে যা। আমি তোর ফেসবুকে দেখেছি, তোকে সবাই চায়। আমাদের মধ্যে তুই সেরা প্রেমিকা।তুই এক ধারে সুন্দরী অন্যদিকে … সে সব থাক। তুই চলে যা। "

সহস্র জীবাণু পার হয়ে
উড়ান থেকে নামামাত্র যেন চিনতে পারো আমাকে
আগে কোনোদিন দেখা না-হয়ে থাকলেও

মাঝ গঙ্গায় নৌকায় দাঁড়িয়ে
আমি যেন কিছুতেই তোমায় না-বলে ফিরে আসি
সেই কবে হাতের পাতা পেতে
নিজের উলঙ্গ শরীর কলাপাতা দিয়ে জড়িয়েছিলে।
এখন আর অবশিষ্ট কিছু নেই
কুটো আর একটা শিউলি ভেজা সাজি ছাড়া।

" কলকাতায় এখন বেশ পুজো পুজো গন্ধ এসেছে তাই না? তোমার বুকের চাপটা কমেছে গো ?"
" না কমেনি। আমি আজকাল কোনো গন্ধ পাই না আর। সব গেছে। এমনকী তোর গন্ধও পাই না।”
" পাবে। ঠিক গন্ধ ফিরে পাবে। সেদিন আমার নাভিতে শিউলি ঢেলে দিও তুমি।”
" এই স্নেহ, একদিন রাঙ্গা মাটির দাগ দেব তোর স্তনে। তোর বুকে মুখ রাখব। জড়িয়ে ধরছি তোকে। আয়, তোর ভিতর মিশতে দে আমায়!"
" কিছু হলে ? "
" হোক "
" জানো আলেখ্য দা ঠিক এই জায়গা, এই জায়গা থেকে একটা গোটা উপন্যাস হয়!"
" কিন্তু সে উপন্যাসের চলন কী হবে? সেটা গুরুত্বপূর্ণ।"
" চলন তো লেখিকার কলমে থাকে। "

হাতে হাত বাড়াব ভেবেছি।অমনি বোধ-অবোধের দাঙ্গা।
অর্ধদগ্ধ নারী শরীর।
হাতের ওপিঠে
কি করি? কি করি?
একটা ট্যাক্সি নিলাম সাদার্ন অ্যাভিনিউ থেকে
ভেজা রাস্তা।এঁদো গলি।তোমার ফ্ল্যাটবাড়ি পেরিয়ে
নিজের বাড়ি ফিরলাম।

গা-হাত-পা ধুয়ে

বিছানায় উপুড় হয়ে একুশটা পৃষ্ঠা মেলে ধরি

দেখি তাতে লেখা আছে সংক্রমণের একুশ দিন।
দেখি লক্ষ কাটাছেঁড়া।লক্ষ যতিচিহ্ন।লক্ষ স্পট।

" দেখেছিস তুই আবার সিরিয়াস হয়ে পড়ছিস? "
"মানে ? তুমি পুরুষ সেটা বলব না? নাকি তুমি দৈত্য দানব রাক্ষস আর ক্ষয়?"
" আজ তোর ফেলে-যাওয়া-শহরে সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। কী জানিস স্নেহ, তুই না কেমন ঝড়ের মতো এসে পড়লি।আমার আরেকটা প্রেম হয়ে।আমি অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতাম। তোকে যে তখন কোথায় বসাই! এক ঘরে স্ত্রী, এক ঘরে সন্তান, অন্যটাতে সামাজিকতা। ওপারে তোর রূপ যৌবন নিয়ে গভীর স্পর্শে ! কোথায় বসাই! আমার এই জীর্ণ অবস্থায় তোকে কোথায় রাখি বল তো! তুই শহরের  রাস্তায় গেলে লোকে লোকারণ্য! সেখানে কোনো সামাজিক দূরত্ব নেই। হাসপাতালে ভিড়! মেট্রো বন্ধ। কীভাবে তোর দায়িত্ব এড়াব? অথচ তোকে কোথায় বসাই ! আমি যে পঞ্চাশার্দ্ধ সংসারী জীব! লোকে তাই জানে! "

আধচেড়া বর্ণ এভাবে নষ্ট হল
 সে নষ্টের গায়ে নগ্নতার ঋতুরক্ত

লাল টিপের আঠা গেছে। এবার শৃঙ্গার দাও।
পুরুষ শুনেছি সিঁদুর দান করে।

" আমি তো ঘর চাইনি আলেখ্য দা। একদম চাইনি। আমি জানি আমি কোনো পুরুষের লক্ষ নই। সবাই আমার বোধন শেষে আমায় ছেড়ে পালায়।কেউ এই ভয়-কে স্বীকার করে। কেউ তোমার মতো বন্ধু হয়ে থাকতে চায়।"
" বেশ বেশ। যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে! আমায় কাপুরুষ বলা বন্ধ করবি? "
"ওমা! আমি আবার কখন কাপুরুষ বললাম! অযথা উত্তেজিত হয়ে পড়ছ কেন?"
"কারণ তুই, তুই! কেন স্নেহ? কেন তুই এরকম? কেন তুই প্রথম থেকে শেষ অবধি আমার না? কেন তুই আমার না-পারা হয়ে থাকবি আজীবন ? এই অমানবিক মনের লড়াই কেন দিয়ে গেলি আমায়?"
" জানো আলেখ্য দা , মার্কিন দেশে আজ অবধি দু'লক্ষের কাছাকাছি মৃত্যু ঘটেছে।এই সব ক'টা মৃত্যুতে আমি আছি। কারণ এই সব মৃত্যু রাজসেনাপতিকে প্রশ্ন করে।পরিকাঠামোর প্রশ্ন।অর্থনীতির প্রশ্ন।মৃত্যু রাজদণ্ডকেও একটা প্রশ্ন রেখে যায়। তুমি তো জানো, প্রশ্নেই আমি। উত্তরে নয়। "
" এবার সত্যিই চলে যা তুই। যাওয়ার আগে 'আসি?' ব'লে অনুমতি নিয়ে যাবি না ? জানিস, ওটাই আমায় বাঁচিয়ে রাখবে।কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখব মহালয়া শেষ। সমস্ত মাঠ বিষের বৃষ্টিতে ধোয়া। মাঠের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, ভাঙ্গা ঘর, ভাঙা প্রেম, পরাজিত আমি!''
" বন্ধু হয়ে কীভাবে থাকব আলেখ্য দা? আমি যে শরীর দিয়ে দিয়েছিলাম তোমায়! তুমিও তো দিয়েছিলে! হয়তো কিছু ভেবেই! সম্পর্কটা এখানেই অসমাপ্ত রেখে গেলাম।সামলে নেব নিজেকে। শিখে গেছি গো এখন।কত হার্ড ইমিউনিটি শরীরে তৈরি হয়ে গেল এই ক'মাসে বল!”
" আজ থেকে আমি তোর প্রাক্তন হয়ে যাব বল? ও ! তুই তো আবার প্রাক্তন করিস না "
" কী করে প্রাক্তন করব বল! এই যে সম্পর্কটা অসমাপ্ত রেখে গেলাম, তুমি কখনো ফিরতে চাইলে তোমায় ফেরাতে পারব? আছে আমার মনে অত জোর? ছুঁয়ে বল আমায়, যে, জ্বর কমেছে? না- কমলে যাব না।”
"হ্যাঁ। কমেছে। ফের থেকে রোজ তোকে ভুলতে হবে!"
" আমার ছবিগুলো দিয়ে দাও। ওগুলো আর তোমার নয়। দাও বলছি… "
" না… "
"কি না? বায়না করবে না আলেখ্য দা। আর তোমার বায়না সহ্য করব না। তুমি সবে সেড়ে উঠেছ। আমি এই মুহূর্তে অমানবিক হতে চাই না। "
" তোর কোনো ছবি আমার কাছে নেই। মুছে দিয়েছি। ডিলিটেড ।"
" ও । সামনে দাঁড়ানো , চোখে চোখ গাঁথা, বুকে গান লাগা, মাথায় বয়ে-চলা ঢেউ? সব মুছে দিয়েছ ? ডিলিটেড ? তোমার এই ডিলিটেড ভারশানের গায়ে একটা মহীরুহু জন্ম নেবে? লেখা হবে তার গায়ে ন্যায় অন্যায়?


 একদিন সদুত্তরে

শত নষ্ট মুছে দেব সংসারের অনর্থ দোলায়
তুমিই বল
সে হাতে আর কখনো কী কবিতা লেখা যায়!

লেখার টেবিল থেকে উঠতেই স্নেহর  ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। তিমির কল করেছে।
" তোর পাত্তা নেই কেন? পুজোর সংখ্যার লেখা পাঠা শিগগির।কবে থেকে ফোন করছি। যোগাযোগ বন্ধ করে দিস কেন মাঝে মাঝে? জানিস কলকাতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে রোজ। চিন্তা হয় না তোর তিমির দা'র জন্য?
এপারে স্নেহ স্থির। যেন প্রতি নিঃশ্বাসে স্থির। রক্তচাপ বেড়ে ওঠার আগে যেমন হয়। অস্থির শরীরে।

"কি রে? উত্তর দে? "
 " অভিজ্ঞতা জোগাড় করছিলাম ক'দিন ধরে তিমির দা.. "
" কীসের অভিজ্ঞতা?”
" এই যে তোমার লেখার। তুমি - ই তো বল তোর লেখার হাত ভাল। অভিজ্ঞতা কম। "
"পাগলি! লেখাটা পাঠা তাহলে। ছাপতে সময় লাগবে না?"
" হুম, কিছু তো লেখা নেই গো এই মুহূর্তে। কী দেব তোমায়? কাশফুল? শিশির না মায়ের ওই ডাগর চোখ? সন্ধি পুজো না মায়ের বরণ? অনেক সিঁদুর? লেপটে-যাওয়া সিঁদুর? "
" সব এক সাথে আসুক না"
" বেশ। লেখা তো নেই কিছু। একটা ডিলিটেড ভারশান আছে।প্রুফ করিনি।লিখেছি বিভোর হয়ে। সেখানে লেখা-বাক্য সব সত্য। তাই মুছে দেওয়া। ডিলিটেড। সাজানো, মুখোশ পরা না।"
" মুখোশ নেই তো? ব্যাস পাঠিয়ে দে। তুই আমার সোনা-পোড়া, মুক্ত - পোড়া ছাই।অতিষ্ঠ জীবন নিয়ে বারে বারে তোর লেখার কাছেই যাব।ডিলিট করবি না কিন্তু।এত আদর।"
বলে, তিমির খানিকটা তাড়াহুড়োয় ফোন রেখে দিল।স্নেহ টিপল,
সিলেক্ট … কাট...ডিলিটেড …
ঠিক যেমন প্রতিমা নিরঞ্জন হয়।মুখে এক গাদা সন্দেশ পুড়ে দেওয়া।এত এত সিঁদুর পরে মা কৈলাসে রওনা দিল! শত সহস্র অভাগ্যতাকে নিয়ে মাটিতে মিশে গেল। আবার এই মাটি দিয়েই  মায়ের নির্মাণ।আসছে বছর। অল্টার্নেটলি ভাঙা আবার গড়া, আবার ভাঙা আবার গড়া ...