আগুনের মত ক্ষিদে বাড়ে; আগুনেরও বাড়ে। খেতে থাকে জল,নদী, ডিঙা, পাহাড়; এমনকি পাহাড়ের ওপর তামাকের গাছটাকেও । তসালি হঠাৎ একদিন সকালে উঠে দেখে পবিত্র তামাক গাছটা নেই। নেই তো নেইই। তামাকের অভাবে ক্রমাগত সরু হতে থাকল দিন, উত্তেজনা ক্ষীণ হতে হতে আস্তে আস্তে ভুট্টার ফেলে রাখা জামার মত শুকিয়ে এলো , ম্লান হয়ে এলো ছেলে বুড়ো মেয়ে গরু শুয়োর এমনকি খঞ্জনা পাখিগুলো। তামাকের গাছ খুঁজে পেয়েছিল তসালি ঠিকই; এ পাহাড় ও পাহাড় ঘুরে। শ্বাস নিয়েছিলো পৃথিবী। বেঁচে গেছিল সেবারের মতো। তবুও একদিন তসালির মতো মানুষদের চলে যেতে হল সেই তামাকের গাছ ছেড়ে। আসলে তাদের নিয়ে যাওয়া হল। নদী পাহার পেরিয়ে অন্য জায়গায় যেখানে যেতে একদিন ছিল তাদের ভয়। নিষেধ করেছিল তাদের প্রাচীন বুড় দিদানাসগি। বন ঔষধি কুড়োতে যার সাথে দেখা হতো রোজ বেঁটে মানুষদের। জ্ঞানের কথা হতো তাঁদের মধ্যে। তাঁরাই বারণ করেছিল হয়তোবা।

বেরিং স্ট্রেইট, যা আমেরিকা মহাদেশকে এখনকার রাশিয়ার সাথে আটকে রেখেছিল, সেই রাস্তা দিয়ে উত্তর পূর্ব এশিয়া থেকে একদল মানুষ এসেছিল পনেরো থেকে কুড়ি হাজার বছর আগে। লম্বা বরফ পথ পেড়িয়ে তারা খুঁজে পেয়েছিল হলুদ ঘাসের দেশ। সে দেশে সন্ধ্যার লাল আকাশের বুকে দাড়িওয়ালা ক্ষয়টে নীল বাইসন চরে বেড়ায়। নিরুদ্বিগ্ন বাইসন যারা বড় পাথরের মত প্রাজ্ঞ। তাদের উষ্ণ নীল মাংস আর মোটা চামড়া সুদীর্ঘ বরফপথ পেরিয়ে আসা মানুষগুলোর মনে ধরল। ওম পেল তারা। সেই ওম গায়ে মেখে তারা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লো উত্তর দক্ষিণ আমেরিকায়।  জল পথেও অনেক এসেছিল এমাটি সেমাটি ঘুরে।

কিছু হাজার বছর আগেও আমেরিকা মহাদেশে একশোরও বেশি ভাষায় কথা বলা হতো।  ভাষার শিকড় ধরে এগোলে দেখা যাবে নির্দিষ্ট কোন এক জনগোষ্ঠী নয়, একাধিক জনগোষ্ঠী এসেছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে। ঈগল পাখী আর বাইসনের মতো তারাও পাল্টে যেতে লাগলো মাটি জল আর পাথরের বুকে।  যেমন নরওয়ের খারাপ দেবতা লোকি গ্রিনল্যান্ড ঘুরে ইরকুইয়ান উপকথায় গ্লুস্কাপ হয়ে গেলো একদিন।
ইরকুইয়ান একটা প্রধান লিঙ্গুইস্ট ফ্যামিলি যাদের উত্তরপুরুষরা এখন নিউইয়র্ক ও তার আশেপাশে রয়ে গেছে। সেই ইরকুইয়ান ফ্যামিলির একটা প্রধান শাখা চেরওকি যাদের রাজপুত্র তসালি। তাদের সাথে সাথে ছিল চোকটাও, চিকাসাও, সেমিনল ও ক্রীকরা। নিজেদের মধ্যে মারামারি করে নিজেদের ক্ষেতের ভুট্টা খেয়ে, সে ভুট্টার খোসা শুয়োর কে খাইয়ে, সেই শুয়োরের মাংস পুড়িয়ে, ভুট্টার দানা পচিয়ে মদ বানিয়ে, সেই মাংস গলা দিয়ে ধুয়ে খেয়ে দিব্যি ঘুমতে যেত সন্ধ্যা নাচের পরে। রাতের কালো চুলের ঢল নামার আগে আগে। নীরবতা গভীর হলে তাদের চামড়ার তাঁবুর গায়ে মৃত নেকড়ের ছায়া দেখা যেতো। ছোটো শিশুদের পাহারা দিতো সেইসব ছায়া। একদিন তাদের সেই নিরপরাধ ঘুমে বাদ সাধল তাদেরই ধারালো তীর ও অব্যর্থ নিশানা। সমুদ্র বয়ে আসা সাদা মানুষের পছন্দ হলনা সেই তীর ধনুক। তাই তাদের বলা হল তোমরা নিরীহ যীশুর মতো শান্ত হও। প্রার্থনা করো আমাদের মতো। মানুষ হও।

পাদ্রীর আলখাল্লায় তীর আটকান গেলো ঠিকই কিন্তু গির্জার মোমেরর আলোয় রাত জাগে যে লোভ তাকে কে আর পেরেছে আটকাতে? যে জমিতে ভুট্টা হয় তাতে কার কি লাভ? তার চেয়ে সাদা নিরীহ তুলো অনেক শান্তিপ্রিয়। মানুষের পেটের ক্ষিদে মেটানর মধ্যে একরকম হিংসার বীজ লুকিয়ে থাকে, মনের ক্ষিদের মধ্যে সে সব নেই। সাদা কাপাসের বীজ ফেটে গেলে তা হাল্কা হয়; ওড়ে হাওয়ায় হাওয়ায়।  পবিত্র ভগবানের মত জীবনের ভার তাকে বহন করতে হয় না। বরঞ্চ লাল মানুষের শুকনো চোখ ফেটে যে জল বেরোয় তা শুকিয়ে যায় তুলোয় তুলোয়।
সাদা তুলোর জন্যে জমি চাই, সে জমি কোথায় পাই।  অতএব দলবল নিয়ে বছরের পর বছর ধরে মাটি ভালবাসা মানুষগুলোকে সরিয়ে দাও অন্য কোথাও, - পাহারের পেছনে যেখানে সভ্যতার একমাত্র আলো গির্জার কাঁচের জানালা দিয়ে আসবে। রোদে পোরা বেগুনি বা হলুদ ভুট্টার থেকে না।
৫০০০ মাইলের বেশি রাস্তা পায়ে হেঁটে পেরল লাল মানুষেরা। কেউ কেউ আসলে তারও বেশি। শুকনো পথ ধুয়ে গেল ঘাম রক্ত আর চোখের জলে। রাস্তা মুছে গেল, কালের গহ্বরে রয়ে গেল অশ্রু নদী। কিছু গেল ওক্লাহামা কিছু ইলিনয়, কিছুবা  আরকান্সা, আরও কিছু গেল মৃত্যু নদীর ওপাড়ে। জমানো করি তাদের আগেও ছিলনা, যাওবা ছিল তা কেড়ে নেওয়া হল রাস্তার মাঝে। যেসব সাদা জমির অপর দিয়ে তারা গেল সেসব জমির মালিকেরা বন্দুকের নল দেখিয়ে জমির কর আদায় করল। যেসব লাল কাকর আর শুকনো ধুলোপথ দিয়ে গেলো তারা সেসব রাস্তায় জল না পেয়ে রয়ে গেল তারা, তৃষ্ণার্ত প্রানে। অনাহার খেলো কিছু। টাইফাস কলেরা খেল আরও কিছু। যে জমিতে নিয়ে যাওয়া হল সে জমিও এখন ছোট হতে হতে মুঠোয় ধরা মাটি। ছহাজার শব গোনা গেছিলো শেষসমেষ। গোনা যায়নি তার চেয়েও বেশি।
কোনও এক চেরওকি রমনি করুন বাঁশির সুরে সন্ধ্যায় শিকার সেরে ফেরার পথে একা একা গান গায় আজও, হেরে যাওয়ার গান। প্রাচীন ভারতে এক রমনি একদিন এরকমই মহিষ শিকার করে ফিরেছিল। তার সেই জয়গাঁথা আমাদের উৎসব আজ। মহিষাসুরের উত্তরপুরুষেরা লাল মানুষদের মতো মাটির ভিতর আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিলো। মাটি কে বলেছিলো তাদের গভীর দুঃখের কথা। আজও দুর্গোৎসবে চোখের জলে ভাসে হুদুর দুর্গা সাওতালিরা। তারাও কি অশ্রু সড়কে বসে গান গায়.....

কোথাও আজও অশ্রু নদী বয়ে যায়
আমার স্বদেশ ধুয়ে আমার বছর ধুয়ে
লাল লাল মানুষকে ভাসালরে হায়।

কোথাও হৃদয় ভাঙে করুণ ঢাকের ডাকে
কোথাও দেশ ভাঙে অথবা নতুন জন্মায়।
কোথাও স্মৃতি দোলে অনেক উঁচুতে
ঈগলের ধাঁরালো ঠোঁটে হাওয়ায় হাওয়ায়।

অবাধ ছিলাম আমি আকাশি হাওয়ায়
লুকনো বেদনা গভীর, -
পাগলের মতো হায় কেবলই ঘোরায়।

শখের জীবন খুঁজি বিষণ্ণ ডেরায়
বিপন্ন প্রজাতি, - হারায়, সকলই হারায়।

নিঃস্ব কুঁড়েঘর ধুলোয় গড়ায়।
ভুলে যাওয়া পৃথিবী,
ঠেলে ফেলা দূরের খাঁদে
একদিন জেগে উঠবোনা কী ?
আমাদের স্তবে
মহান অস্তিত্ব যদি ঠিক পূর্ণতা পায়।

trail of tears

 

(চেরওকি কবিতা trail of tears থেকে অনুবাদ; আনুবাদক তাপস রায়)