(১)

সর্বাঙ্গ ঢেকে দেবো ন্যূনতম নিস্পৃহ সজ্জায় – নিজের বলতে আর কিছুই রইলো না। এই যে হ্রস্বমান হৃদয়, তার হ্রস্বতর আকাঙ্খা নিয়ে... তাও। আমি হেঁটে গেলে সেভাবে ছায়াও পড়বে না, এটুকু স্বচ্ছ্বতা আমি অন্তত আশা করি নিজের কাছ থেকে। ক্রমে সেই অপরাহ্ন...... স্নিগ্ধতার শব্দরূপ নামে হেমন্তের রোমকূপে, গাঢ় নীল বুটি ফোটে একে একে... বিম্বিত অরণ্যের গায়ে। ঘামের গন্ধের পাশে জমে ওঠে ছাতিমের মিস্ট। চাঁদের রঙ কখনো রক্তিম হয়ে ফসলের শরীরে মিশেছে...... কতো অচেনা মৃতদেহ দীর্ঘগ্রীব ধানের শীষের মতো – দু-ফসলী জমি, ক্যানালের গায়ে... এইসব নির্জন হাজার বছর। একটু দূরেই থামে অরণ্য ঘোর। কিছুই রাখিনি কাছে..........কিছু কি রাখিনি এই রক্তকণায়!

(২)

যে অপরাহ্নের নাম হেমন্ত, গা ঘেঁষে বনভূমি, পতনোন্মুখ পাতার রঙে তুলি ডুবিয়ে যে আঁকলো সামান্য বিষাদ – নির্মাণ তাকে স্বততই নিঃশব্দ-প্রবণ করে। পাকে পাকে জড়ায় অন্তর্বর্তী রেখা ও তল। দুমড়ে নেমে আসে হিংসা নিরন্তর... প্যাঁচার একান্ত আলগোছ। স্তরীভূত আমি ক্রমে বাদামি ব্যাসাল্ট। সময় পেরোয় আমারই বিপ্রতীপ আয়ু মন্থর চারণে। নদীর দ্বিধায় ক্ষয়ে ক্ষয়ে পাললিক আর বরফ যুগের অবচেতন হিমাঙ্ক প্রমাণ জমে গুহার আলতামিরা তিমিরে। আমাকে ফিরিয়ে দেয় স্বপ্নফাটলের ঘুম মুঠিভর। আমি আবহমান হতে হতে, হতে...... একটা নদীর বাঁক, বিবিক্ত জলাভূমি, সৈকত নির্বাক...

(৩)

একটি যন্ত্রণা ভেঙে আরেকটি যন্ত্রণা... প্রতিটি বিনির্মাণ আসলে অক্ষরের বীজ। খাঁজকাটা সিন্ট্যাক্স বেড়া তোলে। তারপর নীল ডুমো মাছিদের আপাশে, চিনুক – দীর্ঘ স্ট্রাফিঙ্ এর পর লন্ডভন্ড গমক্ষেত আ-স্মৃতি   বিস্তৃত এবং কালো দাঁড়কাকেদের যূথ ক্রমশ রুটির টুকরোয় দুঃস্বপ্ন হয়ে। সিল্ক-রুট বেয়ে আসা উপকথাগুলো  রেশমী সুতোর ফোঁড়ে নকশা বদলে বদলে... মানুষের ঘাম ও রুটির মত মজ্জাগত বিশ্বাস টোটেম।  নৈঃশব্দ একাই ন্যারেটিভ। রাতের অধিত্যকা, সংরাগ ...... প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন আমি সযত্নে জমাই... তারপর হঠাৎ লাইনগুলো চিৎকার করে ওঠে। আমার শব্দ-বধিরতাকে চ্যালেঞ্জ করে মাথাচারা দেয় কাঁটাতার। ভেঙ্গে দিই। একটা ভাঙনের মধ্যে আরেকটা ভাঙ্গন, নৈ:শব্দের মধ্যে আরো বেশী নৈ:শব্দ, যন্ত্রণার গভীরে গাঢ়তর যন্ত্রণা... ক্রমশ দানা বাঁধে। চুপ করে দেখি...  আমার বাইরে...

(৪)

কালো বেড়াল একটা সবুজ কাঁচের মাঝখানে ঘুম বোনে... তার পদক্ষেপ জুড়ে চাঁদের গ্রহণ। সেই অন্ধকার একটা মেঘ বা সংখ্যাতীত সমীকরণ, আমি তাকে অনুমান করে নিই, এই ধরো, ভিজে যাওয়া। বেড়ালের ওই স্বপ্নের স্পেসে ঢুকে পড়ছে কাটাকুটি খেলা ও খাকি ইঁদুরের দল আর আমাদের প্রস্তাবিত বাকফসলের খুদকুঁড়ো তুলে রাখছে পরবর্তী প্রজন্মের আশায়। সে প্রজন্ম তো বড় হতে থাকবে কালো বেড়ালের দুঃস্বপ্ন বুকে নিয়ে। অবচেতনের চিৎকার তাদের বারবার বাধ্য করবে সেইসব আপাত  নিরাপদ গ্রীডে আশ্রয় নিতে, নিয়মানুবর্তী হতে... আর নিয়মগুলো ভাঙার আশায় ছুঁকছুঁক করতে। আমি দেখছি, দেখছি কিভাবে কালো থেকে লাল, তারপর সবুজ ও ক্রমে কমলা হয়ে উঠছে বেড়ালটার  গা। গিরগিটির চেয়েও পটু! আর সেই অনায়াস প্রতিবর্ত ক্রিয়া তাকে হা হা করে হেসে ওঠার প্রত্যয় যোগায়। দেওয়ালের পাশে অচেনা ছায়ার নড়াচড়া......... আমি ঘুমোতে পারছি না।  

(৫)

খুলে দিলে জঙ্গল, ওপাশে হৃদয়... ক্রসিং পেরিয়ে জায়মান আঁধারে পাতাদের মনোক্রোম... ভোর ফোটাচ্ছে কুয়াশার গাছ। দিনের শুরুটা এখুনি হারিয়ে গেলো, পাখপাখালির সঙ্গে। নীলিমা আর স্তব্ধতার পায়ে নুপুর হয়ে উঠেছে নদী অন্তর্লীন। কালো পাতাদের গায়ে গুটি বাঁধা রোদের রেশম। আজ কাশ দেখে থমকে যাই। দূর এসে পাশে বসে, একটা রূপকথা যেমন। যেমন ছিলো তোমার হাতের পাতায় কাঁচপোকা। তোমার চুলের ঢালে গড়ানো আলো ঘন জারুলের বন। শিউলি কোড়ানো ভিজে হাতে ছুঁয়ে দিলে যতটুকু নিঃস্বতা, মেঘ রঙ আর লবণ অধর। যারা একদিন দূরে চলে গিয়েছিল, তারা বুঝি হারিয়েই যায়!

 

 

# গদ্য #
কবিতার কলকাঠি, কায়ক্লেশ

কবিতা বড়ো ব্যক্তিগত প্রকাশ, আমার একান্ত অন্তর্লীন সংলাপ। সাধারণত আমার চেতনা ও অবচেতনের ছায়ায় গড়ে ওঠা। তাই এর গঠন বা কারু পদ্ধতি আমার কাছেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। হয়তো একটা টুক্‌রো ছবি, বা কখনো ছবিও নয়, বড়জোর একটা ছায়া বলা যেতে পারে, আমার মাথায় ঘুরঘুর করছে। তার একটা প্রকাশের দাবী নিশ্চয় আছে, নয়তো আর ঘুরঘুর করবে কেন! হুল ফোটাবেই বা কেন! হ্যাঁ, হুল ফোটাচ্ছে তো বটেই, নইলে আমার দায় পড়েছে। ফলে আমি ভাবতে বাধ্য হচ্ছি কোন শব্দটা জুতসই হয়। প্রায়শই আমি ঠিক মতো শব্দটা নাগালে পাইনা। তখন বিরক্ত হয়ে যাই। শব্দটাকে না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই। ওই যে বললাম হুল! কখনো শব্দটা পাই, আবার কখনো ছবিটাই হারিয়ে যায়। ঠিক একটা শব্দ তো আর না। জড়ামড়ি করে থাকা বেশ কয়েকটা শব্দ, শব্দ-বন্ধ বা কপাল ভালো থাকলে গোটাগুটি একটা লাইনই।  ধাঁ করে লিখে ফেলতে হবে, নইলেই আঙ্গুলের ফাঁক গলে বালির মতো ঝুরঝুর। লেখা যদি গেলো তো শান্তি, তবে বেশিক্ষণ নয়। সে লাইন পিছু ছাড়ে কি? একটা ছবি হতে চায়, গোটাগুটি, এদিকে ফ্রেম তো ফাঁকা, এক কোণে পড়ে আছে, আর আমার মাথা জুড়ে ফ্রেমের খালি স্পেসটা। আবার কখনো একটুকরো ছবি যেই হলো, ওমনি সে খুঁজতে গেলো আরেকটাকে। মানে ওই অনুষঙ্গ, এ্যাসোসিয়েশন। যেমন 'নীলিমা আর স্তব্ধতার পায়ে নুপুর হয়ে উঠেছে নদী অন্তর্লীন ' লেখার পর একটা ছবি তৈরী হল, আর সেই নদীর ধারে আমার পাশে এসে বসলে তুমি। তখন লিখলাম 'দূর এসে পাশে বসে, একটা রূপকথা যেমন। যেমন ছিলো তোমার হাতের পাতায় কাঁচপোকা। তোমার চুলের ঢালে গড়ানো আলো ঘন জারুলের বন'।

এখন একটা ছবির গায়ে এসে বসল আরেকটা ছবি।
আবার শব্দের খেই ধরে আরো কটা শব্দ এলো : যেমন 'নীল ডুমো মাছিদের' দেখে মনে হলো যেন যুদ্ধ হেলিকপ্টার। তাই লিখলাম 'আপাচে, চিনুক' যারা এসে বসছে রুটির গুঁড়োর ওপর, যেন স্ট্রাফিং করছে গমের ক্ষেতে আর গমক্ষেতের অনুষঙ্গে এসে গেলো ভ্যান গখের গমক্ষেত আর কালো দাঁড় কাকেদের ছবি।

এমনি করতে করতে একটা দুটো লাইন আর কখনো কপাল খুব ভালো হলে হুড়মুড়িয়ে কয়েকটা লাইনও বা!  ছবি হতে থাকল, কথারা সারি বাঁধলো...... বেশ বেশ, কবিতাটা এবার বোধহয় হয়েই গেলো। কিন্তু সে গুড়ে বালি। লাইন ক’টা পড়তে গিয়ে দেখি কেমন যেন নিজের কানেই বেখাপ্পা ঠেকছে। তখন কাটাকুটি, বা এমন রাগ হলো যে কাগজটাই ছিঁড়ে ফেললাম। বা কটা লাইন লিখে ফেলে রাখলাম হয়তো। ডিমে তা দে গা!

এই করতে করতে কবিতাটা হয়তো হলো। কখনো হয়তো পছন্দও হয়ে গেলো(প্রায়শই হয়না যদিও)। না হলে থাক পড়ে খাতার পাতায়। আর কখনও হয়তো পাঠিয়েই দিলাম। চরে খা। সম্পাদকের ভালো লাগলে ছাপা হবি। নয়তো থাক পড়ে বাজে কাগজের সাথে। ওদের কাছ থেকে শেখ গিয়ে বেঁচে থাকার হ্যাপা কতো!