আমাদের সময়ে মানে সত্তর আশির দশকে আমরা আড্ডা বলতে বুঝতাম কলেজ ক্যান্টিন আর পাড়ায় রক কিংবা খোলা মাঠের বিকেল। আর কবিতা নিয়ে কথাবার্তাগুলোকে আমরা আড্ডা বলিনি কখনোই। মাঝে মাঝে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যেতাম, যার শুদ্ধ নাম ছিল ‘কবি সম্মেলন’। সভাপতির পরিচালনায় সেই সভাকে ‘আড্ডা’ বলার কথা মনেও হয়নি। আড্ডার পরিবেশ ছিল যখন আমরা কয়েকজন কোথাও জড়ো হয়ে নিজেদের লেখালিখির কথা বলতাম। আমার স্কুলের সহপাঠী শংকর ব্রহ্ম ব্দীপাঞ্জন দত্ত ,সঙ্গে উদয়ন ভট্টাচার্য বিমল দেব সুভাষ দেবনাথ দেবানন্দ দে শৌভিক চক্রবর্তী সহ অনেকেই দীপাঞ্জনের ছোট্ট ঘরে বসতাম।গল্পকার দীপঙ্কর দাস আমাদের অগ্রজ হলেও নিজস্ব ব্যাক্তিত্ব নিয়ে আমাদের মধ্যে থাকতেন।দীপাঞ্জনের পত্রিকার নাম ছিল ‘আবর্ত’, দীপংকরদার পত্রিকা ‘সহজিয়া। এই দীপাঞ্জনই আমার প্রথম বই “ম্যাজিক লন্ঠন’এর প্রকাশক (১৯৮০)।দীপাঞ্জন অনেক অল্প বয়েসে হঠাৎ আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
নাকতলায় আমাদের বাড়ীর কাছাকাছি থাকতেন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত হরিজীবন বন্দ্যোপাধ্যায় কেদার ভাদুড়ী দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় সজল বন্দ্যোপাধ্যায়। এর মধ্যে কিরণদার সাথে যেভাবে কথা বলতাম তাকে আড্ডা বলা যাবেনা।তাঁর ছেলে সুমিত্র শঙ্কর আমার বন্ধু এবং  সাহিত্য পাঠক ছিল ।ওর বাবাকে দাদা বলায় ওর কিঞ্চিৎ অপছন্দ ছিল।মনে আছে, একবার একটি গল্প প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন কিরণদা। উদ্যোক্তারা নাম ঢেকে দিয়ে লেখাগুলি তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন। পরে বিজয়ী নাম ঘোষণা হলে উচ্ছ্বসিত আমি তাঁর কাছে চলে গেলাম।বললাম,”ওই গল্পটি আমার লেখা।“ শুনে উনি ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন।বললেন, “সে কী? তুমি প্রতিযোগিতায় লেখা দিয়েছো? তোমার কাছে এটা আশা করিনি।নিজের লেখাকে সম্মান করো।তুমি কি পুরস্কার পাওয়ার জন্য লেখো? “তার পর থেকে ভাবনা শুরু হল,সত্যিই তো আমি কেন লিখি।
আড্ডা দিয়েছি চূড়ান্তভাবে আমার স্কুল শিক্ষক কেদার ভাদুড়ীর সাথে। গাঙ্গুলীবাগানের গভর্মেন্ট কলোনীর একটিমাত্র ঘর তখন প্রকৃত আড্ডাঘর হয়ে উঠেছিল। প্রবীনদের থেকে নবীনদের ভীড়ই ছিল বেশি। কেদারদা কিছুদিন সৈনিকের ডাইরী, সময়ানুগ ইত্যাদি পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন।পরে ‘ব্যাতিরেক নামের একটী পত্রিকাও সম্পাদনা করেছিলেন। নিখুঁত আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি।অমিতাভ দাশগুপ্ত ঈশ্বর ত্রিপাঠী উত্তম দাশ সজল বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অনেকেই সেখানে আড্ডা মেরেছেন। শিল্পী সমীর আইচও তাঁর প্রিয়জনদের একজন ছিল। এমন আড্ডাঘর আমি কখনও দেখিনি। নিজে রান্না করে খাইয়ে রাতেরবেলা এক বন্ধুর বাড়ীতে শুতে চলে গেলেন। এমন ঘটনা আমি আর আমার স্ত্রীর ক্ষেত্রেই ঘটেছিল।কবিতা নিয়ে বলার তাঁর শেষ ছিলনা।তাঁর ঘরে ঢুকলেই বোঝা যেতো ,অজস্র লেখা কবিতার মধ্যে অনেকটাই অপ্রকাশিত রয়ে গেলো।
কবিতা নিয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে দেখেছি,কবির ঘরে সেটা সম্ভব হয়,যদি তাঁর পরিবারের  আন্তরিক সমর্থন থাকে। সজল বন্দ্যোপাধ্যায় আর দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যাএর বাড়ীতে সেটা ছিল।তবে সেখানে দল বেঁধে আড্ডা দিইনি কখনও। একাই যেতাম যখন ইচ্ছে তখন, যতক্ষণ ইচ্ছে ততক্ষণ।দেবাশিসদা ছিলেন কম কথার মানুষ।সাহিত্য শিল্প খেলা সব বিষয়েই ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। বোউদি মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কবিতা লিখতেন।তাঁদের ছেলে বাপ্পাদিত্য আর রাজাদিত্য দুজনেই তখন সেভেন এইটের ছাত্র। পরে দুজনেই ছবি তৈরির জগতে আলোচিত হয়ে ওঠে।আজ দেবাশিসদা বাপ্পা নেই। কিন্তু সেই সময়ের আড্ডার অজস্র ছবি লিখতে গেলে সে ও এক দীর্ঘ কবিতা হয়ে যাবে।
কবিতায় পথ হাঁটতে আড্ডার কথা লিখতে গেলে কফি হাউসের কথা বাদ দিয়ে হয়না। আমার প্রথম কবিতার বই হাতে করে কফি হাউসে ঢুকলাম ১৯৮০তে।সজলদা সকালে সেন্টজেভিয়ারস স্কুল ,ফাদার মিঙিওর সাথে বাইবেল অনুবাদের কাজ, টিউশানি ইত্যাদি সেরে বাড়ী ফিরতে রাত হয়ে যেতো।এরই মধ্যে ফাঁকা রাখতেন বুধবার আর শনিবার সন্ধ্যেটা। কফি হাউসে পৌঁছে যেতাম তখন। আমাদের টেবিলে তখন সজলদা ছাড়া প্রাবন্ধিক অরুণকুমার ঘোষ সমীর দে রায় অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় দীপক রায় সহ অনেকেই আসতো। সমীর ছিল পিলসুজ পত্রিকার সম্পাদক।ডাক্তারি পড়ছে এমন কিছু ছাত্রও আসতো তখন আড্ডায় দিব্য মুখোপাধ্যাএর সাথে। পরে ‘কার্তুজ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে।আমাদের কবিতা নিয়ে কার্তুজের একটি সংকলনও বেরোয়।সেখানে দিব্য আমি ছাড়াও অলোক বিশ্বাস রঞ্জন ঘোষাল সঙ্গীতা ঘোষাল সহ অনেকেরই কবিতা ছিল। ডাক্তারের কথা বলতে মনে পড়ে দেবাশিস সান্যালের কথা।তিনিও মাঝে মাঝে আসতেন আমাদের আড্ডায়। তাঁর পত্রিকার নাম ছিল ‘কৌস্তভ। তখনকার সুনির্বাচিত কিছু অন্যধারার লেখক কবিকে তিনি প্রতি বছর ‘কৌস্তভ পুরস্কার’ দিতেন।কিন্তু এই আড্ডাটিকে কফিহাউস থেকে দূরে টেনে নিতে তাঁরই উদ্যোগে দিনরাতের আড্ডার বন্দোবস্ত হল বকখালিতে। সেই আড্ডায় ছিলেন সজল বন্দ্যোপাধ্যায় অশোক চট্টোপাধ্যায় শেখর বসু পরেশ মন্ডল আশিস মুখোপাধ্যায় পার্থ গুহ বক্সী তাপস চৌধুরী সুতপন চট্টোপাধ্যায় শ্যামল মজুমদার চিরঞ্জয় চক্রবর্তী সহ আরও কয়েকজন।সেটা ছিল বিচিত্র আড্ডা কেননা কবিতা গল্প গান ছাড়াও আরো কিছু উপকরণ ঢুকে পড়েছিল।সজলদার খোলা গলার গান ছাড়াও অশোকদার মাটিতে পা ফেলে ফেলে গান--- ‘ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি...।নিছক সাহিত্যের আড্ডা নয় অন্য কিছু ছিল সেই আড্ডায়।
কফি হাউসে একটি টেবিলে বসতেন গল্পকারেরা। অতীন্দ্রিয় পাঠক রমানাথ রায় সুব্রত সেনগুপ্ত আশিস ঘোষ সহ অনেকেই থাকতেন সেখানে।অনেক তরুণ গল্পকারের সাথে মাঝেমাঝে আমিও থাকতাম সেখানে। অতীন্দ্রিয় পাঠকের পত্রিকা ‘অব্যয়’ এ একটি গল্প লিখেছিলাম সে সময়ে। অব্যয়ের গল্প সংকলনেও সেটি জায়গা পেয়েছিল।
আর একটি আড্ডার কথা না বললেই নয়। বারীন ঘোষাল মাঝে মাঝে চলে আসতেন কফি হাউসে। সেই টেবিলেও জমে উঠতো আড্ডা স্বপন রায় রঞ্জন মৈত্র ধীমান চক্রবর্তী প্রণব পাল অলোক বিশ্বাস রতন দাস চিত্তরঞ্জন হীরা সহ অনেক নতুন মুখ।কবিতা নিয়ে অন্যরকম ভাবনাচিন্তার কথা হোত তখন এই টেবিলে।আমি বরাবরই উপভোগ করেছি এমন সব সঙ্গ।
শিবনারায়ণ রায় একজন বিদগ্ধ মানুষ। ওই সময়টা অস্ট্রেলিয়ায় মেলবোর্ণ ইউনিভারসিটিতে খুব সম্ভবত ভারততত্ব পড়াতেন। সেখান থেকেই সম্পাদনা করতেন তাঁর পত্রিকা ‘জিজ্ঞাসা’।দূর থেকেই তিনি লক্ষ্য রাখতেন এখানকার লেখালিখি। উনি সেখান থেকে চেয়ে পাঠালেন একগুচ্ছ কবিতা। পাঠানোর কিছুদিন পরে জিজ্ঞাসার একটি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল।এরও বেশ কিছুদিন বাদে কফিহাউসের দোতলার পিছনে একটি ঘরে একটি সভা ডেকেছিলেন তিনি।সেখানেই প্রথম পরিচয়।আর তিনি যেখানে আছেন সেখানে স্বভাবিক ভাবে তিনিই মধ্যমনি।কফি হাউসের ওই ঘরটিতে এরপরে নানান আড্ডাতেও গিয়েছি।
কফিহাউসের ইতিহাস সুদীর্ঘ। অ্যালবার্ট হল থেকে বর্তমান কফিহাউস সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতির জগতের মানুষের এক মস্তিষ্ক চর্চা ও হৃদয়ের বাঁধন খুলে দেওয়ার আড্ডাখানা বলেই মনে হয়।তখনও মোবাইল টেলিফোন ইন্টারনেট এর ব্যবহার এমনটা ছিলনা।কফিহাউসের অবস্থানগত সুবিধার জন্য সেটা হয়ে উঠেছিল লেখা ,পত্রিকা আদানপ্রদান এবং যোগাযোগের জায়গা।
কবি সম্মেলন,সাহিত্যসভা ,এমন নানান শীর্ষকেই চারিদিকে সবাই মিলিত হোত। এখন অনায়াসে এগুলিকে আড্ডা বিশেষণ দেওয়া হয়।আড্ডা বলতে আমরা বুঝি তথাকথিত নিয়মের বেড়াজালে না আটকে থেকে সকলেরই সেখানে সমান গুরুত্ব থাকে।এটা হওয়াই কাম্য।মন খুলে নিজের  কবিতা সংক্রান্ত ভাবনার কথা বলা যায় অন্যেরটা শোনা যায়। অনেকেই বলবেন ,এর সাথে কবিতা চর্চার কী সম্পর্ক?কবিতা লেখালিখি কবির নিজস্ব ব্যাপার।তার সাথে আড্ডার কোনও সম্পর্ক নেই।কিন্তু কবিতা জগতের বৈচিত্র সেখানে তার ভাবনাকে প্রসারিত করে।  
‘কবিতায় পথ হাঁটা প্রসঙ্গে আমার জীবনে আড্ডার একটি বিশেষ ভুমিকা আছে। সবার মত আমিও মানি,কবিতা কবির নিভৃত মননের ফসল। তবু কবিতা চর্চায় এর ভূমিকাকে কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা।কখনও কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে,কখনো কোনো পত্রিকাকে ঘিরে এইসব আড্ডা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। মাঝে মাঝে মনে হয় ,এইসব আড্ডাই আমাকে আজীবন লেখায় রেখেছে।