আমেরিকার প্রায় তিনভাগের একভাগ মেক্সিকোর থেকে নেওয়া। শিশুরা যেমন নিয়ে থাকে মায়ের শরীর থেকে। টেক্সাস আরিজনা নিউ মেক্সিকোর মতো রাজ্যগুলো মেক্সিকো বিক্রি করতে বাধ্য হয় ১৮৪৮ সালে treaty of Guadulpe Hidalgo  মারফত। যারা মনে করে মেক্সিকানরা অযাচিত ভাবে আমেরিকায় ঢুকে পড়ছে, ইতিহাস আর ভূগোলের অনেকটাই তাদের ছোঁয়ার বাইরে। যদি গোলাপি রঙের টেবিলক্লথে নীল সাদা লাল বেলুন লাগিয়ে জন্মদিনের নরম কেক কাটার মতো একটা চকচকে ইস্পাত ছুরি দিয়ে কোনো জমিকে দ্বিখণ্ডিত করা যায় , যদি কোনোদিন সেই জমির বুকে অনেকদিনের ভালোবাসা ফলানো মানুষগুলোকে ওরকম মাঝখান থেকে ভেঙে ফেলা যায়, যদি কোনোদিন সেই ভাঙা মানুষগুলোকে বলা হয় যে তোমার জন্মের জমিতে তোমার ছায়া পড়বেনা; তাহলে সেইসব মানুষেরা জন্মদিনের ফুরোনো বেলুনের মতো বা অল্প আগে উপহার জাপ্টে ধরা রংবেরঙের ছেঁড়া মোড়কের মতো পরিচয়হীন হয়ে পড়ে। পুরাণের ঝাপসা টানেলের পেটের ভিতর থেকে এইরকম পরিচয় বিহীন বাবা-মা-ভাই-বোন উর্দ্ধশ্বাসে বেরিয়ে এসে খাওয়ার খুঁজে চলেছে, জলে খুঁজে চলেছে। সে খোঁজায় দেশ কালের ক্ষণস্থায়ী দাগ টেনেছে যে মতিচ্ছন্ন, লক্ষণ রেখা টেনেছে যেসব মৃত্যুপথযাত্রী; তাদেরকে কিছুদিনের জয়ল্লাস দিয়ে মানুষ আবার তার সনাতন অন্বেষণে ফিরে গেছে। এই উদ্ভ্রান্তের মতো গন্তব্যহীন লক্ষ্যের দিকে ছুটে চলার ভিতর দিয়ে মানুষের ইতিহাস সবলীলতা পেয়েছে। হয়ে ওঠে নিরবধির রোজনামচা। পুরান, ইতিহাস, বাস্তব, বর্তমান এই টানেলের এক একটা জানালার মতো। আলো আসে, যে আলো অন্ধকারকে আরো গাঢ় করে তোলে। যা কোনোদিন ঘটেনি অথবা ঘটেছে অথবা ঘটবে কিংবা ঘটবে না অথবা ঘটেছে বলে বোধ হয় না সেসবই আসলে ধাঁধার মতো। আসলে সবই মায়াচ্ছন্ন ইন্দ্রিয়ের বিভাব।

ঘুম ভাঙা চোখে ডিরেক্ট ফ্লাইটে cancun। সবুজ থেকে ক্রমশঃ খয়েরি ও আরো পরে গাঢ় সবুজ হয়ে যাওয়া পাহাড়, ক্ষুধার্ত মানুষকে আটকাতে লোভী মানুষের তৈরী দেওয়াল, জল শুকিয়ে ফেলা খাঁ খাঁ বুকের 'রিও দে গ্রান্দে' আর নীলচে সবুজ রঙের জলদস্যুদের চুপকথা নিয়ে শুয়ে থাকা ক্যারেবিয়ান সাগর টপকে ক্যানকুন। মজার কথা মেক্সিকান উরোজাহাজে সাধারণ যাত্রীদেরও টেকিলা আর জল কিনতে হয়না। আমেরিকায় যা একরকমের অবিশ্বাস্য। সাড়ে তিন ঘন্টা তাই দেড়ঘন্টার মায়া বলে মনে হয়। কালো চুল কালো চোখের তামাটে রঙের বিমান সেবিকা কে মনে হয় রূপসী ইক্স-চেল। রুপোর চাঁদের মতো গড়ন। চুল যেনো অনন্ত সুতোগাছা, চাঁদনী রাতে নেমে আসে উঁচু গাছের ডাল বেয়ে। বিপন্ন বিস্ময়ে ক্লান্ত, জীবনের ধাঁধায় নিরুদ্দেশ, কবির গলায় ফাঁস লাগাবে বলে। তন্দ্রায় মায়াচ্ছন্ন লাশকাটা ঘরের ভিতর উঁকি মারার আগেই প্লেন ধাক্কা দিয়ে ল্যান্ড করে।
ক্যানকুন কথার আক্ষরিক অর্থ সাপের বাসা। নাগলোক। এক হলদেটে সিলোফেন জড়ানো ঝাঁজালো রোদের দুপুরে তিনঘন্টা ফ্লাইটের পর ক্যানকুনে নামা যায়। মনে হয় কী সহজ অনায়াসে আমার দেশে পৌঁছে গেলাম। প্লেন থেকে নেমে যে গরমটা তার নিবিড় গাম্ভীর্যে আমায় জড়িয়ে ধরে তার সাথে আমার বহুদিনের বন্ধুত্ব। আমেরিকার অনেক গরমের জায়গায় গেলেও এই আত্মিক টানটা বোধ হয়না। মনের বিকার হতেই পারে। কিন্তু কিছু গরমের একটা নিজস্ব লঙ্কাবাটা নুনের স্বাদ আছে। যে গরমে তেঁতুল গাছের নিচে রাদুর মা এসে বসে, বসে ঝিমোয় সারা দুপুর। যে গরমে পাকা তাল পেলে দুদিনের না খেতে পাওয়া মেয়েকে খাওয়ানোর উৎসাহে মদের নেশায় রোজ রাতে বেদম মার খাওয়া রাদুর বৌ তাল গাছের নিচে ঘোরাঘুরি করে। যে গরমে বিকেলে তরমুজ কাটলে রক্তাক্ত শরীরের ভিতর থেকে এক দমকা ভাপ বেরিয়ে এসে নাকে লাগে- রসালো তরমুজ কে আরো সুস্বাদু করে তোলে। যে গরমে সন্ধ্যাবেলায় গা ধুয়ে ফুলের গন্ধ পাউডার লাগানোর মধ্যে, নাক, ও নাক ছাপিয়ে মনে, হালকা ভালোলাগার স্রোত নেমে আসে।
যেসব শীতে আমার দেশের মাটি ছোঁয়া হয়না, যেসব শীতে বরফ দেখে আমার চোখ অসার হয়ে আসে, আমার আমাকে এস্কিমোদের দেশের মানুষ বলে ভ্রম হতে থাকে; সেসব শীতে আমি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাই। আমি মেক্সিকো যাই বা মেক্সিকো পেরিয়ে আরো নিচের দেশে। আমেরিকা ছেড়ে নিচে নামি, উত্তর ছেড়ে দক্ষিণ, মর্ত থেকে পাতাল। গরম বা গরমের আকাশে ঘোলাটে সূর্যই শুধু না, মেক্সিকো বা কোস্টারিকার শহরেরা এবং শহরদের সহ্যতা, তাদের ইট কাঠ পাথর, তাদের মন খারাপ, তাদের অহেতুক অথচ আত্মঘাতী ব্যস্ততা, শুনসান রাতে তাদের কালো পাথরের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে আসা ছায়াদেহরা আমাকে গড়িয়াহাটা বা কন্নট প্লেসে নিয়ে যায়। শহরের গায়ে আঁকা রাস্তা ঘাট বাড়ি ঘর পেরিয়ে, রাস্তায় দাঁড়ানো এলোচুলের মার্টিনা গোমেজ বা ছোটো চুলের সারা মেন্ডেজের পাশ কাটিয়ে মেক্সিকো সিটির জোকোলো বা মেইন স্কোয়ার ছাড়িয়ে আমি কলকাতার এস্প্লানেডে অথবা বোম্বের চার্চ গেটের খুপরি ঘরে চলে যাই। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার, তার চেঁচামেচির আলাদা কোনো ভাষা হয়না। বাংলা হিন্দি মারাঠি স্প্যানিশ সবই এক অদ্ভুত cacophony তে পাল্টে যায়। যা যেকোনো পুরোনো শহরের একান্ত নিজের ভাষা। ঠিক যেমন গ্রীষ্মের নরম বিকেলে রাস্তার ধারের চায়ের বা কফির দোকানের ভাঁড়ের বা গ্লাসের কোনো আলাদা অবয়ব হয়না। বিকেলগুলোরও কোন আলাদা পরিচয় থাকেনা। অথচ সেসব বিকেলগুলো টানেলের ভিতর দিয়ে নিজেকে নিজের শিকড়ের খুব কাছে পিঠে নিয়ে যায়। প্লায়া মেরিদার আকাশ আর স্বর্গদ্বারের আকাশ একই রকমের ম্লান মনে হয়। আসলে এই সবকটা শহর ইউরোপিও কায়দায় তৈরী যদিও এদিকটা স্প্যানিশ আর আমাদেরটা ইংরেজ। তবে আমার ধারণা দুজনের স্টাইলে খুব তফাৎ ছিলোনা অথবা তফাৎ থাকলেও মিল হয়তো আরো বেশি। অন্ততঃ শহরের গঠন এর দিক থেকে এক।শহর বাড়ি গরম ছেড়ে দিলেও আরো কিছু থাকে আর তা হলো মানুষ। চওড়া হাসির মানুষ। রোদে পোড়া ঘামে ভেজা মানুষ। উৎসবে ছেলে মেয়েকে নতুন কাপড়ে দেখতে চাওয়া মানুষ, রোজকার লড়াইয়ে নকল হাসি হাসতে ভুলে যাওয়া মানুষ। বিকেলের বারান্দায় রাস্তার ধারের ক্যাফেতে বসে মাঝবয়সী চামড়ায় দাগ পড়া অর্ণল্ডো রোদ্রিগেজের সাথে আমাদের পুরোনো বইপাড়ার কফির দোকানের দোতালার ভারিক্কি মনিরুল আলমের সেরকম পার্থক্য থাকেনা। দুজনের দৃষ্টিতে একইরকম ঘরে ফেরার হাতছানি টান।

মেক্সিকোর মানুষের গঠনকে দুভাগে ভাগ করা যায় - মায়ান আর আজতেক। মায়ানরা লম্বাটে। মুখগুলো লম্বা, নাক গুলো ধারালো, চওড়া কপাল... আজতেকরা তুলনায় খর্ব পুরুষ্ট চেহারা। তবে এই দুই গড়ন বৈশিষ্ট এখন অনেকটাই মুছে দিয়ে গেছে তিনশো বছরের স্প্যানিশ আগ্রাসন। কলোম্বাসের দেশীয় ভাইরা ঠিক শেক্সপীয়ার পড়া ইংরেজদের মতো নয়; তারা আরো রক্ত লোভী আরো নিষ্ঠুর। এ ব্যাপারে আমার চোখ খুলে দেয় পুয়েরতোরিকো। একটা জনজাতিকে কিভাবে ধর্ষণ করা যেতে পারে দিনের পর দিন। ধর্ষিত হতে হতে মহিলারা শেষে কাপড় পড়া ছেড়ে প্রকাশ্য রাস্তায় নেমে এসে দলে দলে ঝাঁপ দেয় সাগরের নীল জলে উলঙ্গ সন্ধ্যার সঙ্গমকালে। সে গল্প তোলা থাক আরেকদিনের জন্যে। যেসব দেশে স্প্যানিয়ার্ডরা গেছে সেসব দেশের অধিকাংশ পুরুষদের দল বেঁধে মেরে তারা নারীদের গর্ভে নিজেদের ইউরপিয়ান বীজ গেঁথে দিয়েছে। তাই আজকের মানুষের আদলে তাদের অবয়ব প্রকট। মেক্সিকো অবশ্যই সেই দেশগুলোর অন্যতম। মেক্সিকো সিটিতে গেলে বোঝা যায় মানুষের সভ্যতা আসলে রক্তউল্লাস মাত্র। শহরের মাঝামাঝি আদিম শহর তেনোক্ষতিৎলানের টেম্পলো মেয়র (টেম্পেল মেজর) এর ওপর থেকে নিচে নামলে পেড়িয়ে যাওয়া সময়ের মাটি কেটে কেটে বেরিয়ে আসে একেক শতাব্দীর হিংসার আলাদা হলেও একইরকমের ইতিহাস। তবে আলাদা হলেও যোগসূত্র এক - আদি আর অকৃত্রিম হিংসা। সাম্রাজ্যর মাথার ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা সাম্রাজ্য। এক জাতির ওপর আরেক জাতি। এক করোটির ওপর আরেক করোটি। পৃথিবীর এই দিকটায় যুদ্ধ জয়ের স্মারক চিহ্ন হিসাবে ব্যবহার হতো মৃত শত্রুর খুলি। যে যতগুলো সংগ্রহ করতে পারবে সে ততো বাহবা পাবে। পাল্লা দিয়ে বাড়বে পদমর্যাদা। থরে থরে সাজানো সেসব খুলি বছরের আগে বছরের কথা বলে। যেসব পরাজিত পুরুষদের খুলি নিচের তলায় তাদের সেইসব নারীরা বিজয়ীদের বীজ ধারণ করেছিলো। সেই হিংসা বিদ্বেষ না ভালোবাসার জন্ম দিয়েছিল কে জানে কিন্তু ধারণ ও লালনের ফসল পরের প্রজন্ম। তাদের খুলি ঠিক ওপরের তলায়। তাদের ভালোবাসার নারীরাও তিলে তিলে নিজেদের সাজিয়েছে ওপরের তলার নরখরপরের জন্ম দিতে। প্রথমে তলৎক (১০০ -৮০০ খ্রিস্টাব্দ ) তারপর আক্ষলা, চোচিমিকা, টেপেন্ৎকা, তারপর আজতেক, তারও পর হের্নন করতেজ এর হাত ধরে স্প্যানিশ নাবিক থেকে পর্যটক থেকে ব্যবসায়ী থেকে হত্যাকারী। একের পর এক হত্যা, বছরের পর বছরের বর্বরতা। মহচ্ছন্ন পৃথিবীর প্রগতির মায়া। তবে আজ স্প্যানিশদের গল্প থাক, আজতেকদেরও না , আজ বরং গল্প হোক ময় দানবর ও তার উত্তরপুরুষের তৈরী মায়াপনের।
মায়ান সভ্যতার গোড়া দুহাজার খ্রিস্টপূর্ব অব্দি টেনে নিয়ে যায় নৃতত্বে। ঠিক যে সময়ে পৃথিবীর মাঝ বরাবর একটা সোজা রেখা টানলে তার অন্যদিকে বসে বৈশম্পায়ন তাঁর গুরুর রচনা 'জয়' এর ওপর গল্পের মোড়ক লাগিয়ে মহাভারত তৈরী করছেন। যে মহাভারত বলছে সূর্য সিদ্ধান্তের রচয়িতা ময়দানব কৃষ্ণের ভয়ে নাগলোকে নেমে যাচ্ছে, অথবা পাতালে। পালাতে পালাতে সোজা রেখা বরাবর নেমেই চলেছে। মেদিনী ভেদ করে, গোলাকার পৃথিবীর ব্যাসরেখা ধরে উল্টোদিকে নেমে আসছে কুইৎজল-কোয়াৎল হয়ে। মাথাটা বিশাল পাখির মত যা আজকের কবির কল্পনায় ময়ূর হতে পারে বা পুরান কালের কবির কল্পনায় গরুড়ও। আর পেছনটা অজগর সাপ যেনো, ঠান্ডা সরীসৃপের মতো। খুব পুরোনো মায়ান শহর কোবার ধ্বংসবশেষে অনেকগুলো এবড়োখেবড়ো সিঁড়ি ভেঙে আমাদের গোপুরমের মতো অনেক উঁচুতে, মন্দিরের মাথায় এই পাথরে খোদাই করা কুইৎজল-কোয়াৎলের রূপ দেখলে ছোটবেলায় খাদু ঘোষের মিষ্টির দোকানে ঝুলতে থাকা কৃষ্ণলীলার কালীয় নাগের অনেকগুলো মাথার কথা মনে পড়ে যায়। যে মাথার ওপর কৃষ্ণ নাচ করছে। বেচারি কালিয়নাগ এর দুপাশে নতমস্তকে, তখনকার কিশোর মনে দাগ কাটা, দুই সুন্দরী মহিলার বেশে দাঁড়িয়ে থাকা কালীয়র বৌয়ের জন্যে আমার দুঃখ হতো খুব। সেদিন থেকেই মনে হয়েছে একপ্রকার অন্ধ না হলে নিষ্ঠুর কৃষ্ণের প্রতি ভক্তিভাব আনাটা কঠিন।
ময় বা ময়দানব কিন্তু শুধু মহাভারতেই ছিলেননা। কুরু পাঞ্চাল সভ্যতার অনেক পূর্বে, হাজারেরো ওপর বছর আগে অযোধ্যায় যখন দশরথ তখন দেখা যায় রাবনের বৌ মন্দন্দরীর জনক ময়। রাবনকে শুধু মেয়ে দিচ্ছেন না সোনার লঙ্কাও বানিয়ে দিচ্ছেন। বাস্তু শাস্ত্র এরই রচনা। ইতিহাস হোক বা কল্পনা হোক, পুরাকথা হোক বা গল্পগাঁথা হোক, ময় বা রাবন ছিলেন সশরীরে বা অশরীরে। তাহলে ময়ের বা রাবনের উচ্চতর শিক্ষা ধ্যান ধারণাও ছিলো। নগর নির্মাতা ময়ের উল্লেখিত স্থাপত্য কৌশলও ছিলো। ত্রিপুরা, লঙ্কা, ইন্দ্রপ্রস্থ, যার মধ্যে ত্রিপুরা ও লঙ্কা গোপুরম এর মতো। একজনের পক্ষে এতদিন বাঁচা কল্পনারও অযোগ্য। কিন্তু মানুষ মরে গেলেও জ্ঞান বেঁচে থাকে। যেমন রবীন্দ্রনাথ বাঁচেন, গান্ধী বাঁচেন, এমনকি ইংরেজ রাজ দণ্ডও। পুরুষানুক্রমে ময় তার জ্ঞান নিয়ে বেঁচে ছিলেন। এরমধ্যে তিনটে জ্ঞান প্রধান। স্থাপত্য বিদ্যা অথবা বাস্তু শাস্ত্র, সূর্যের গতি প্রগতি বা সূর্যগ্রহণের কারণ, ও ভাষা বা অক্ষর জ্ঞান ও তার প্রয়োগ যা সংস্কৃত নয়। আর চতুর্থ জ্ঞান আদবেই ময়ের ছিলো কিনা বলা কঠিন তা হলো মায়াজাল। ভেবে দেখলে, - যে বলে দিতে পারে সূর্য কখন গায়েব হয়ে যাবে আকাশের বুক থেকে তাকে কম শিক্ষিতদের কাছে ম্যাজিসিয়ান বা জাদুগর মনে হতেই পারে। সে তখন নিজেকে শক্তিমান প্রমান করতে সূর্যকে অদৃশ্য করে দেওয়ার মায়াজাল খেলবে। বস্তুত এরকমই অনেক গল্প মেক্সিকোর মায়ানদের মধ্যে প্রচলিত।
ফিরে দেখা যাক মহাভারতের কৃষ্ণ-র (শ্রীমদ্ভগবতের নয়) সমাজবাদের বিপ্লবের উল্টো দিকে দাঁড়ানো ময়কে। যে ময় আর সব পুঁজিবাদীদের মতো নিজের সূর্যজ্ঞান স্থাপত্যজ্ঞান আঁকড়ে ধরে রেখেছে, কাউকে দিতে নারাজ। ত্রিপুরা বা লঙ্কা তৈরির ময়বংশের উত্তরাধিকার। যখন টের পেলো ভারতবর্ষে আবর্তন চলছে, যমুনার তীরে যৌবনবতী শ্রীরাধিকার আঁচল টেনে ধরা বাঁশুরিয়া কৃষ্ণ আর সে প্রেমিক যুবক লম্পটটা নেই। উল্টে তার পালিত অর্জুন ও ব্যাস কে নিয়ে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক খোলনলচে পাল্টে দিচ্ছে। শিক্ষা ও ধন কুক্ষিগত করা ক্ষত্রিয় ও কিছু ব্রাহ্মণ রাজণ্যবর্গকে ধ্বংস করার নিদারুন পণ করেছে। বৃদ্ধ ময় নিজের মূলধন হারাবার ভয়ে কিছুদিন খান্ডব বনে হারিয়ে গেলেন। লাভের চেয়ে লোকসান হলো বেশি। উল্টে আগুনের তাড়া খেয়ে তাকে বাধ্য করা হলো পান্ডবদের জন্যেই মায়ামহল তৈরিতে। তাতেও শেষ রক্ষা হলোনা এই বয়সে। যুদ্ধ করা কোনোদিনই তার পেশা ছিলোনা। অগত্যা সে কৃষ্ণর তাড়া খেয়ে পাতালে নামতে লাগলো। যে পাতালের খোঁজ ভারতবর্ষ রাখেনা, শুধু কমবেশি শুনেছে। যে পাতালে সকালে ঘুম ভাঙা কানে কৃষ্ণের পঞ্চজন্য পৌঁছয় না। একদিন গেলো, দুদিন গেলো, মানুষ যব বা গমের মন্ড করে খেলো, রাতের তারাদের নীচে বিচালি ঘাসের বালিশে মাথা রেখে ঘুমোলো, আবার জেগে উঠলো শিকারের খোঁজে, আবার ঘুমোলো। বুড়ো ময় কিছুদিন সাগরের নোনা জল খেলো কিছুদিন ঠান্ডা বরফ খেলো  বা কিছুদিন পায়ের নিচের মাটি। রাত দিনের হিসাব ভুলে শেষে সে পাতালে এসে পৌঁছলো। শেষে সে এসে পৌঁছলো মেসোআমেরিকা, এখনকার মেক্সিকোর পেটের নিচের দিকটা। ঠিক যেখানে সে বানাবে তার নতুন নাগলোক। যেখানে তখন ওলমেকরা পশু পাখি শিকার করে বেড়াচ্ছে আর স্থাপত্য বলতে শুধু পাথরের গায়ে পাথর ঘষে ঢাউস ঢাউস নিজেদের মুখের আদলে মুখ বানিয়ে তাতে ঈশ্বর হাতড়ে বেড়াচ্ছে।
এইখান থেকে আমাদের গল্পের এবাউট টার্ন। মেসোআমেরিকানদের দুহাত ছড়ানো ভাগ্যাকাশেও তাই। ময়ের আগে তারা ব্যাকরণ ধরে ভাষার ব্যবহার করেনি, ছবি এঁকে অক্ষর তৈরী করেনি, ইট পাথরের বাড়ি ঘর বানায়নি, বাড়ি ঘর এক করে শহর বানায়নি। মৌমাছি কে দিয়ে মধু তৈরী করেনি। সে মধুকে তার ভেষজ গুনে ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করেনি। এমনকি মধু তে জড়িবুটি পচিয়ে মদ বা অমৃত বানায়নি। ঠিক সেরকমই মেসোআমেরিকানরা বাস্তুশাস্ত্র জানতোনা। যদিও মায়ান সভ্যতার অনেক আগে এখনকার মেক্সিকো সিটির অদূরে তেওঁতিকানে অবিশ্বাস্য রকম ভাবে গড়ে উঠেছিল সূর্যের আর চাঁদের দুটো দানবীয় পিরামিড যা অনেকেরই ধারণা বাইরের গ্রহের মানুষের দান। মায়ানদের আগে মেসোআমেরিকানরা সূর্যের গতি প্রকৃতিও জানতোনা। সেই গতি প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা হয় জানতোনা। সেই বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে ফসল উৎপাদন তাও তাদের অজানা ছিলো।

বছরের পর বছর পেড়িয়ে গেলো। নাগ দেবতা বা সাপ হয়ে উঠলো মূল দেবতা। ভগবান কুকুলকান যার মাথাটা বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের মতো আর ধর টা বিষ্ণু যে শেষনাগের ওপর শুয়ে থাকে সেই সাপের মতো। তারপর একে একে দেবতারা দেখা দিলো। ওলমেক দের ভীমাকার পাথুরে মুখ নয়, রক্তমাংসের মানুষের মতো তাদের গড়ন।একে একে এলো ঈৎযমন বা কিনিচ-আও বা সূর্য, আমাদের যমের মতো সেও জন্ম মৃত্যুর দেবতা। এলো সূর্যের বোন বা বৌ, যমের বোন বা বৌ যমুনার মতো চন্দ্র বা ইক্স-চেল। এই ইক্স-চেল রূপবতী কন্যা, গুণবতীও বটে। বসে বসে রাত দিন সূর্যের দিকে প্রেমের দাবি নিয়ে চেয়ে থাকে, চরকা কাটে; রুপোলি সুতো তৈরী করে, যা দিয়ে তৈরী হয় ভুট্টার খোসা, থেকে মানুষের পরনের কাপড়। রুপোলি চাদর বিছানো জ্যোৎস্না রাত। সে রাতে অনেক নিচে সবুজ গাছের তলায় গাঢ় রুপোলি অন্ধকার। সে অন্ধকারে পথ দেখাবার জন্যে মেঠো রাস্তায় জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা হয়েছে নীল সমুদ্র থেকে আনা ঝিনুক। চাঁদের আলো সেই ঝিনুকে পড়ে  ঝিনুকের গায়ের থেকে ঠিকরে চকমোকির কাজ করে। সেই তরল আলো তরুণ মায়ান প্রেমিক প্রেমিকাকে পথ দেখায় তাদের রাতের অভিসারে। একই পথে যায় ডাকহরকরা, এ শহরের সৈন্য বা খোয়ারের খবর নিয়ে অন্য শহরে। খুব সাধারণ কারণ বশতই ইক্স-চেল হয়ে ওঠে প্রেমের দেবতা, মিলনেরও, ফারটিলিটির বা উর্বরতারও। মায়াবী ইক্স-চেল ডাক পাঠায় লালক কে। লালক বা চাক-মূল হলো বৃষ্টির দেবতা। নতুন চাষ করতে শেখা মায়ানদের সবচেয়ে প্রিয় দেবতা। একই সাথে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নিষ্ঠুরও বটে। চাক মূলের প্রিয় পানীয় হলো গরম শিশু রক্ত। অনাবৃষ্টির সময়ে তার রাগ থামাতে মায়ান পুরোহিত তাই দলে দলে শিশুর বলী দেয় মায়েদের কোল ছিঁড়ে। মায়েদের কান্না তখন বাষ্প হয়ে মিশে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়। নেমে আসে যুথবদ্ধ বৃষ্টি হয়ে। ভিজতে থাকে বৃক্ষনাথ - যাক্সে। মায়ান সভ্যতায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ গাছ, স্প্যানিশ ভাষায় সিবা গাছ। এর শিকড়ের নিচে থাকে কুচকুচে কালো জাগুয়ার, নরকের দূত। মৃত্যুর পর যাদের আত্মা নরকে যায় তাদের  হৃৎপিণ্ডর ওপর এই মিশকালো জাগুয়ারের অধিকার। আর ওপরে থাকে ঈগল পাখি স্বর্গের দূত। মৃত আত্মাকে স্বর্গে নিতে হলে এরাই এসে নিয়ে যায় হৃৎপিণ্ড। মাঝখানের প্রকান্ড কাণ্ড হলো পৃথিবীর নাভি আর ওপরের চারকোনায় ছড়ানো ডাল হলো মরণের পরের দিকনির্দেশ। যাক্সে র ওপর নাম জীবন বৃক্ষ। ধূর্ত স্প্যানিশরা বুঝেছিল; তাই ফন্দি করে নিজেদের সাগরপারের ক্রুশকে ব্যবহার করেছিল যাক্সের প্রতিরূপ হিসাবে। মায়ানরা তাই ভেবে নিয়েছিল এরা ভগবানের দূত। ভগবান লালক বা চাক যুদ্ধের দেবতাও বটে, অনেকটা আমাদের ইন্দ্রের মতো। মজার কথা হলো দেবতারা এক কিন্তু শহর হিসাবে নাম ভিন্ন। বলিভিয়ার তিকাল এ যার নাম লালক মেক্সিকোর প্যালেঙ্কতে তার নাম চাক-মূল।
এইতো গেলো দেবতার কথা। গোটা মেসোআমেরিকাতো বটেই ভারত মেসোপোটেমিয়া মিশর ছেড়ে দিলে সূর্যের নড়াচড়া ও ঋতু পরিবর্তনের খবর মায়ানদের মতো আর কেউ জানতোনা। এ যেনো পুরো সভ্যতাটা গড়ে উঠেছে সূর্যজ্ঞান বা সূর্য সিদ্ধান্তের ওপর। স্থাপত্য বিদ্যায় এরা পারদর্শী ঠিকই কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে সময়ে এরা মায়াপন বা চেছেন-ইৎজা বানাচ্ছে সে সময়ে মিশরের গ্রান্ড পিরামিড বা ভারতের অজন্তা ইলোরা হয়ে গেছে।এদের ইতিহাসের অনেকটাই কল্পনা করে নেওয়া হয়েছে এদের পিরামিড বা মন্দিরের দেওয়ালের আঁকা থেকে। পাথরের দেওয়ালে চুন আটকে ঘন্টার পর ঘন্টা ভেষজ রং দিয়ে এরা ছবি এঁকে গেছে। কোনো এক ছবিতে দেখা যায় হলুদ এক মানুষ নৌকো করে এসে পৌঁছেছে। রাজা নেমে আসছে তাকে স্বাগত জানাতে। এরা তখনো নৌকার ব্যবহার করতোনা। অনেকেই ভাবে বুদ্ধ শ্রমিক কোনো এসেছিলো একদিন। বুদ্ধ নিজে এসেছিলেন কিনা মার (ময়ের বৌদ্ধয়িক রূপ অনেকে মনে করেন মায়াজাল এর জন্যে)এর সাথে দেখা করতে নাকী তার কোনো চৈনিক অনুগামী এসেছিলেন তা কেউ জানেনা। শুধু একথা বলা যায় কলোম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার অনেক আগেই এশিও মহাদেশের কোনো মহাপ্রাণ কোনোদিন হেঁটে গেছেন এই বালির ওপর দিয়ে।

কলোম্বাস নয় কিন্তু কলোম্বাসের দেশের মানুষ cortez এসে একদিন মেক্সিকর যুকাতান পেনিন্সুলার মাঝে এই মায়াপন আবিষ্কার করে পনেরোশো শতাব্দীর কোনো এক রোদে পোড়া পিঙ্গল দুপুরে। তার আগে লম্বা অনাবৃষ্টি শুধু ফসল কাড়েনি কেড়েছে বছরের পর বছর শিশুদের। অন্ধ বিশ্বাস খুশি করতে পারলো কই লালককে। লালকের লোভ তার সৃষ্টিকর্তা মানুষের মতই, বেড়েই চললো। নিজেদের শিশু ফুরিয়ে এলো একদিন। পাশের শহরের শিশুর দিকে হাত বাড়ালো পাষন্ড লোভ। বাঁধলো যুদ্ধ বা সংঘর্ষ। নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে কজনই বা আর জিতেছে। তবুও মায়াপন বেঁচে গেলো এল-প্যালেঙ্কতে এসে। আর ছিলো উক্সমাল। লালক মরে গেলো একদিন। রক্তের লোভ তবু যায় কই। একদিন রক্তের গন্ধে গন্ধে এলো দুর্ধর্ষ স্প্যানিশরা। পুরোনো মায়ানরা যারা ছোটো হতে হতে আরো ছোটো হয়ে যাচ্ছিলো তারা আশ্রয় নিয়েছিল মায়াপানে। মরে গেলো তারাও। প্রথমে কিছু মায়ান পুরুষদের দিয়ে গাছ কাটিয়ে মায়ান পিরামিড থেকে পাথর নামিয়ে প্রাসাদ বানালো পবিত্র যীশুর অনুগামীরা। জন্মালো আজকের শহরেরা। মাঝখানে এস্প্লানেডে আর তার চার ধারে প্রাসাদ কোর্ট কাছারি। তারপর কাজ হয়ে গেলে প্রয়োজন ফুরোলে মারা হলো সেই সব মায়ানদের। কিছু মহিলা আশ্রয় নিলো গভীর জঙ্গলে আর কিছু স্প্যানিশদের বিছানায়। লালসার রং গায়ে মেখে। যারা পালিয়ে গিয়ে জঙ্গলের ভিতর জায়গা করে নিলো তারা এখনো আছে। জ্যোৎস্না রাতে জঙ্গলে হাটাহাটি করে। হাত ধরে এ ওর খোঁজ নেয়।পুরুষেরা ছড়িয়ে গেছে কাজের খোঁজে এখানে ওখানে। মহিলারা শুয়োরের খোঁয়ার দেখে। ভুট্টা টোম্যাটো কচু আর লঙ্কার চাষ করে, বুড়িরা বাচ্চা দেখে আর ভুট্টার মন্ড দিয়ে রুটি (ট্যাকো) বেলে। বুড়োরা গল্প করে। অন্ধকার রাতে সে গল্পের ছায়া বাচ্চাদের ঘিরে ধরে। তাদেরকে ইতিহাসের সামনে দাঁড় করায়। যে ইতিহাস কোনো বইয়ে লেখা হবেনা কোনোদিন। ঠিক যেমন বামন রাজার গল্প। যে গল্পে বামন রাজা বড়ো দৈত্য কে মাথায় বারি মেরে মাটির ভিতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমাদের বামন অবতার একদিন যেমন রাজা বলিকে করেছিল। এই বলি আবার আমাদের মায়াজালের বৃদ্ধ ময়ের পূর্বপুরুষ।

দক্ষিনে রোদ ঝলমল বিশাল বিশাল টুরিস্ট রিসোর্টে ভর্তি ক্যানকুন শহর আর উত্তরে মেরিদা শহর এর মাঝামাঝি জঙ্গলে এখনকার মায়ানদের বাস। চেহারায় এখনো তারা স্প্যানিশ ধর্ষিত মেক্সিকোর থেকে আলাদা। তাদের চাপা অথচ ধারালো নাক, সরু চোখ, শক্ত নারকোল এর মতো কপাল এখনো তাদেরকে আলাদা করে রেখেছে। আমি তাদেরকে দেখতে ছুটে গেছি একবার দুবার তিনবার। প্রথমে টুলুম, - নীল জল আর সাদা বালির পাশে আশ্চর্য মায়াময় শহর। লোনা জলে মাছ ধরে দরিদ্র জেলেরা মাইলের পর মাইল। সন্ধ্যায় সেই মাছ ভেজে লেবু লঙ্কা আর বিয়ার দিয়ে দল বেঁধে খায়। আগুন জ্বেলে সালসা নাচে হাত ধরাধরি করে। সমুদ্রের হাওয়া বয়ে নিয়ে আসে হালকা গর্জন। সে হাওয়ায় উড়ে যায় মেক্সিকান সুন্দরীর চুল, ঠিক একদিন যেমন উড়ে যেতো ইক্স-চেলের রুপোলি সুতো। আকাশের চাঁদ আর চাঁদের মতো হাসি ওদের। জীবনকে উপভোগ করার চাবিকাঠি সেই হাসিতে। নাচ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে একসময়। তারপর গেছি ভেঙে পড়া অথচ পরিপাটি করে রাখা কোবা। যেখানে অশরীরী মায়ানরা পোক্তাপোক খেলে। যে খেলায় জিতলে পুরস্কার ছিলো ভগবানের উদ্দেশ্যে বলি হওয়া। এইভাবে মরে যাওয়াটা সর্বোচ্চ সম্মাননা ছিলো। মৃত্যুর আগে যতো খুশি খাও মধুজাত মদিরা নাকি অমৃত। যার আরেক অর্থ এখনকার জীবনের থেকে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে উৎসাহ বেশি। আরো পরে যাই চেছেন-ইৎজা। যেখানে বছরে দুবার সূর্যের আলোয় ছায়ার মতো নেমে আসে বিশাল বাসুকি সাপ উঁচু মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে। যেখানে আমাদের কোনারকের মতো মন্দির টানে সূর্যের রথের চাকা। যে মন্দিরের দিকে তাকালে বলে দেওয়া যায় আজ কি ঋতু। বলে দেওয়া যায় কোন বছর এবং কি মাস। অবশ্যই তা মায়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। মন্দিরের পিছনে বৃদ্ধ লালক জিভ বার করে বসে থাকে। যদি কোনো শিশু ভুল করে তার ফাঁদে পা দেয়। তারপর উক্সমাল যেখানে বামন রাজার মা ডাইনি রানি এখনো থাকে লাল গাছে ঘেরা জঙ্গলের ভিতর।

কেনো বারবার ফিরে গেছি আমি? কেনো যাই আবার? ইক্স-চেলের জাদুটোনা হয়তো আমাকে ছুঁয়েছে। হয়তো মায়াপনের কোনো জিন চেপেছে আমার ঘাড়ে। আমি বয়ে বেড়াচ্ছি তাঁকে। সে আমায় মায়ান গল্প বলে রাতে ঘুম না এলে। আমি তাঁকে শোনাই প্রাচীন ভারতের গল্প। দুজনে মিলে ইচ্ছা না থাকলেও থেকে যাই আমেরিকায়। এরকমই যেতে যেতে আমার ধারণা একদিন কোনো এক পিরামিডের কোনো এক স্যাঁতসেঁতে ঘরে হয়তো বৃদ্ধ ময়ের দেখা পাবো। হয়তো বা আমার পরবর্তী গন্তব্য 'তিকাল'এ ।

Mayan Moon