'য়া দশক



ব্লগ

কাশ্মীর– ঘুরে দেখা

সংহিতা মুখোপাধ্যায়



প্রাসঙ্গিক সতর্কীকরণঃ

  • এই লেখার সুত্রপাত একটি ফেসবুক মেসেঞ্জার চ্যাট থেকে। যেমন আজকাল হয়।
  • যা ভাবছেন তা নয়; কোনো সময় নষ্ট করা তর্ক এই লেখার মূলে নেই।
  • রাজর্ষিদা লিখেছিলেন, “কাশ্মীর নিয়ে কিছু বক্তব্য থাকলে লেখ না”। আমার জবাব ছিল, “pretty much কিছু নিয়েই আমার কিছু বক্তব্য নেই………তবু লিখতে বলছ যখন……লোভ সামলাতে পারছিনা”
  • এই লেখাটা নেহাৎ লেখার লোভে লেখা।
  • বক্তব্য খুব একটা কিছু নেই। জমা করা তথ্য সম্পর্কে সংগৃহীত ব্যক্তিগত উপলব্ধি।
  • এরপরেও এই লেখাটা পড়ে সময় নষ্ট হলে আমাকে গাল পাড়াটা বাড়াবাড়ি ধরনের ন্যাকামি হয়ে যাবে।

তথ্যঃ

          ভারতীয় স্বাধীনতা আইন(১৯৪৭) ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গৃহীত হওয়ার পর থেকে ভারত, কাশ্মীর, আজাদ কাশ্মীর ও পাকিস্তান মিলে যে রাজনৈতিক রসগোল্লাটি জনসাধারণকে বিনোদন জুগিয়ে আসছে, সেই সংক্রান্ত ঘটনাপঞ্জী সারণীবদ্ধ করা হল।

সাল/তারিখ

ঘটনা

প্রতিক্রিয়া

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭

  • ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলি স্বাধীন হলো
  • ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ভারতীয় স্বাধীনতা আইন (১৯৪৭) মোতাবেক দেশীয় রাজ্যগুলিকেভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পাকিস্তানে যোগদিতে হবে
  • জম্মু ও কাশ্মীর একটি দেশীয় রাজ্য ছিল যা ভারত কিংবা পাকিস্তানে যোগ দেয় নি

কাশ্মীরের কোনো ব্যাপারেই ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের এবং পাকিস্তানের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না

২৬ অক্টোবর ১৯৪৭

  • পাকিস্তানের সাহায্যে আজাদ কাশ্মীর সেনা জম্মু ও কাশ্মীর আক্রমণ করল
  • জম্মু ও কাশ্মীরের তৎকালীন শাসক মহারাজা হরি সিং ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য চাইলেন আজাদ কাশ্মীর বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য
  • আইনত ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র জম্মু ও কাশ্মীরের, যা একটি স্বাধীন দেশীয় রাজ্য, তার প্রতিরক্ষা ও সীমা সংক্রান্ত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে না
  • পাকিস্তানের আগ্রাসন থেকে জম্মু ও কাশ্মীরকে রক্ষা করার জন্য জম্মু ও কাশ্মীরেরপ্রতিরক্ষা ও সীমা সংক্রান্ত ব্যাপারে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আইনানুগ করতে মহারাজা হরি সিং ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগদান করেন
  • এই যোগদান প্রক্রিয়া অন্যান্য দেশীয় রাজ্যের ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগদানের প্রক্রিয়া মোতাবেক হয়েছিল, একই ফর্ম অফ অ্যাক্সেসনে স্বাক্ষর করে

কোচবিহারের মহারাজা কিংবা হায়দরাবাদের নিজাম যে ফর্ম অফ অ্যাক্সেসনে সই করে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তাঁদের শাসনাধীন এলাকা, মহারাজা হরি সিং সেই একই ফর্ম অফ অ্যাক্সেসনে সই করার ফলে তাঁর শাসনাধীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তহলো

১৯৪৯

  • জম্মু ও কাশ্মীর ছাড়া আর কোনো দেশীয় রাজ্যই পররাষ্ট্রের আক্রমণের থেকে বাঁচতে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেয় নি; জম্মু ও কাশ্মীরের ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগদানের পরিস্থিতিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে, জম্মু ও কাশ্মীরকে অন্যান্য দেশীয় রাজ্যে লাগু ভারতীয় আইনের থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়; কেবলমাত্র প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং সংযোগ বিষয়ে ভারতীয় আইন জম্মু ও কাশ্মীরে বর্তায়
  • স্থির হয় যে জম্মু ও কাশ্মীরের বাসিন্দারা তাঁদের সংবিধান সভার দ্বারা নির্ধারণ করবেন রাজ্যের সংবিধানএবং রাজ্যের উপর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের শাসনের সীমা

জম্মু ও কাশ্মীরকে অন্যান্য দেশীয় রাজ্যে লাগু ভারতীয় আইনের থেকে অব্যহতি দেওয়া সম্পূর্ণ আইনবিরুদ্ধ যেহেতু জম্মু ও কাশ্মীর আর সব দেশীয় রাজ্য যে শর্তে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দিয়েছিল, সেই একই শর্তে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দিয়েছিল; পাকিস্তান সমর্থিত আজাদ কাশ্মীরের আক্রমণের পরিস্থিতিটা সেই সব শর্তকে অস্বীকার করতে পারে না; স্পষ্টত জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ শাসন থেকে অব্যহতি দেওয়াটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত

২৬ জানুয়ারি ১৯৫০

  • ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লাগু হলো
  • জম্মু ও কাশ্মীরকে ১৯৪৯ -এ দেওয়া সমস্ত আইনবিরুদ্ধ প্রতিশ্রুতি আইনসিদ্ধ করার চেষ্টায়ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ হিসেবে গ্রন্থিত করা হলো
  • ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ -এর মধ্যেই এই ধারা খারিজের সূত্র ছিল; যত তাড়াতাড়ি জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধান সভা রাজ্যের সংবিধানটি সংকলন করবে এবং রাজ্যের উপর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের শাসনের সীমা নির্ধারণ করবে তত তাড়াতাড়ি সংবিধান সভা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করতে পারবে ধারা ৩৭০ খারিজ করার জন্য

জম্মু ও কাশ্মীর, অন্যান্য দেশীয় রাজ্যের মতো ভারতীয় সংবিধানের ধারা ১ মোতাবেক প্রথম তপশীলের পার্ট বি-তে অন্যান্য দেশীয় রাজ্যগুলির সাথে ঠাঁই পেল, আইনত এবং অপরিবর্তনীয় অবস্থায়; অথচ ধারা ৩৭০ জম্মু ও কাশ্মীরকে সুযোগ করে দিল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সমান্তরাল রাষ্ট্রব্যবস্থা চালানোর এবং থেকে থেকেই বিশেষ ব্যবস্থার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাকে নিংড়ে নিয়ে নিজেদের ইচ্ছে পূরণের, যদিও ধারা ৩৭০ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন ও জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সংবিধান প্রণয়নের মধ্যবর্তী একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা ছিল

১৯৫২

  • ভারত সরকার এবং জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের মধ্যে চুক্তি হলো যে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য সরকার রাজ্যের উপর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের শাসনের সীমা নির্ধারণ করবে যতদিন না সংবিধান সভা তার কাজ শেষ করছে

জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য সরকারের হাতে নিয়ন্ত্রণ রইল যে তাঁরা ভারত সরকারকেজম্মু ও কাশ্মীরেরশাসনতন্ত্রেরকোন কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবেন; অর্থাৎ জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি রয়ে গেল রাজ্যে

১৯৫৪

  • জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধান সভায় সর্বসম্মতিতে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে যোগদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো; এই সিদ্ধান্তানুসারে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র জম্মু ও কাশ্মীরের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ছাড়া ভারতীয় সংবিধানে গ্রন্থিত কেন্দ্রীয় তালিকার সমস্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার পেল

অর্থাৎ ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সাথে জম্মু ও কাশ্মীরেও  ভারতীয় সংবিধানে গ্রন্থিত কেন্দ্রীয় তালিকার সমান ও একই অনুশাসন জারি হলো

১৯৫৫

  • শেখ আবদুল্লা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা করে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন আইনে ধরা পড়লেন;

ভারতীয়সংবিধানে গ্রন্থিত মৌলিক অধিকার হারালেন

১৯৫৬

  • অঙ্গরাজ্য পুনর্বিন্যাস আইন (১৯৫৬) গৃহীত হলো
  • সংবিধান (সপ্তম সংস্কার) আইন গৃহীত হলো
  • ভারতীয় সংবিধানের ধারা ১ অনুসারে বর্ণিত প্রথম তপশীলের রাজ্যগুলির মধ্যে অঙ্গরাজ্য ও দেশীয় রাজ্যের ব্যবধান ঘুচে গেল

সমস্ত রাজ্য ভাষার ভিত্তিতে পুনর্বিন্যস্ত হলো,ভারতীয় সংবিধানের প্রথম তপশীলেরপার্ট বি লোপ পেল, জম্মু ও কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মতো প্রথম তপশীলভুক্ত আরেকটি রাজ্যে পরিণত হলো

২৬ জানুয়ারি ১৯৫৭

  • জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধান লাগু হলো যা জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গরাজ্য বলে স্বীকৃতি দিল
  • জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধান সভা খারিজ হয়ে গেল

ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সুপারিশে, ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ খারিজ করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অর্জন করলেন

১৯৬৯

  • ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ মোতাবেক আদেশ জারি করলেন যে জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো প্রস্তাব আনতে পারবে না এবংজম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিধানসভা খারিজের প্রস্তাব আনতে পারবে না
  • জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভা নিজেদের প্রিভেনটিভ ডিটেনশন আইন লাগু করল এবং সিদ্ধান্ত নিল যে ভারতীয় আইনসভায় সিদ্ধ এই সংক্রান্ত কোনো আইন জম্মু ও কাশ্মীরে বর্তাবে না

রাষ্ট্রপতির আদেশে জম্মু ও কাশ্মীরের ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ারবা বিধানসভা খারিজ করে রাজ্যের অস্তিত্ব লোপ পাওয়ানোর রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করা বেআইনি হয়ে  গেল; তাই জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভা নিজেদের প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন আইন এনে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রিভেন্টিভ ডিটেনশনের অনুশাসন লঙ্ঘন করল;প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন সাধারণতরাষ্ট্রবিরোধী কাজ করা দেশদ্রোহীদের ওপর লাগানো হয়; নিজেদের প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন আইন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকেভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী কাজ (যেমন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিধানসভা খারিজ করা) বা রাষ্ট্রের ঐক্যে ভাঙার কাজ (যেমন ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া) করার রাস্তা পাকা করল; এই নতুন আইন জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধানের নিরিখেও বেআইনি যেহেতু জম্মু ও কাশ্মীরের সরকারও সংবিধান সভা আগেই যথাক্রমে ১৯৫৪ ও ১৯৫৭সালে জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য বলে ঘোষণা করেছেএবং ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় অনুশাসন মেনে চলবে বলে আইন পাস করেছে

২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫

  • ইন্দিরা গান্ধী সরকার ও শেখ আবদুল্লার মধ্যে সন্ধি হয় যে জম্মু ও কাশ্মীরের পাকিস্তানপন্থীরা আর কাশ্মীরিরা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় কিনা নির্ধারণের জন্য প্লেবিসাইট চাইবে না এবং ভারত সরকারও ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ খারিজ করবেন না
  • বিশদে এই চুক্তি জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভার জন্য কতকগুলি চিরস্থায়ী প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়; এইসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম হলো যে কয়েকটি কেন্দ্রীয় তালিকার বিষয়ের উপর অতিরিক্ত আইন প্রণয়ন ক্ষমতা;এই ক্ষমতা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় আইনসভাতেই ন্যস্ত থাকে

এই চুক্তি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিল যে পাকিস্তানপন্থীদের জন্য কাশ্মীরিরা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় কিনা নির্ধারণের জন্য প্লেবিসাইট করার বিকল্প হলো ধারা ৩৭০ বহাল থাকা যা ১৯৫৭ সালে ২৬ জানুয়ারি জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধান লাগু হওয়া মাত্র গৌণ হয়ে গেছে; অর্থাৎ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া আর ধারা ৩৭০ -এর আওতায় থাকা একই ব্যাপার; অর্থাৎ ধারা ৩৭০ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে; এই চুক্তি ভারতীয় সংবিধান এবং জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধান দুটিকেই অবমাননা করে; জম্মু ও কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক বিধানসভার সিদ্ধান্তকেও অস্বীকার করে শুধুমাত্র পাকিস্তানপন্থী বিচ্ছিন্নতাকামীদের অবস্থাণকেই প্রাধান্য দেয়

১৯৮৬

  • ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির আদেশে (ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ অনুসারে) ভারতীয় সংবিধানের ধারা ২৪৯ এর অনুশাসন জম্মু ও কাশ্মীরে কায়েম করা হয় চীন ও পাকিস্তানের সাথে রাজ্যের সীমা সুরক্ষিত করার জন্য
  • জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য সরকার আইন করেন যে রাজ্যের সীমার ব্যাপারে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি রাজ্যের বিধানসভার সম্মতি না নিয়ে করা যাবে না
  • রাজ্যে ভারতীয় সংবিধান নির্ধারিত কোনো রকমের জরুরি অবস্থা জারি করা যাবে না

ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের সংলগ্ন আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা করল; সেই চেষ্টাকে আটকানোর জন্য জম্মু ও কাশ্মীর সরকার আইন করল যে চীন বা পাকিস্তানের সাথে ভারতের সীমা নির্ধারণ করবে জম্মু ও কাশ্মীর; জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অনুশাসন শিথিল করা যায় এমন আরও অনেক আইন প্রণীত হতে শুরু করে

         

          ১৯৭৫ সালের ইন্দিরা গান্ধী- শেখ আবদুল্লা চুক্তির পর থেকেই লাগাতার জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অনুশাসন ঢিলে হতে থাকে। যে কোনো অনুশাসন কায়েমের প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ হয়ে যায় ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ অনুসারে করা রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মধ্যে। ১৯৭৫-এর চুক্তি স্পষ্টতই ভারত সরকার এবং জম্মু ও কাশ্মীরের সরকারের পূর্বতন সমস্ত চুক্তি অস্বীকার করে। এই চুক্তি ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ এর অস্থায়ীত্ব অস্বীকার করে। এই অস্বীকার শুধুমাত্র জম্মু ও কাশ্মীরের জনপ্রতিনিধিরাই করেন নি, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিরাও করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধান সভা খারিজ হয়ে যাওয়ার মূহুর্ত থেকে।

সূত্রঃ

          Introduction to the Constitution of India, 18th Edition, reprint 2000, by Acharya Dr, Durga Das Basu

চাট্টি বাজে কথাঃ

          এই যে আইনি-বেআইনি নিয়ে এতো ক্যাচর ক্যাচর তার থেকে এঁড়ে তক্ক হতে পারে, “ভারতের আইনসভায় আইন হলেই আইনি আর জম্মু-কাশ্মীরের আইনসভায় হলেই বে-আইনি?”

উত্তরে বলা যেতে পারে, “না এফেন্দি। কথাটা হলো যে যে আইনে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের রাজ্য হয়েছিল, সেই আইনে কাশ্মীরকে সুয়োরানীর মতো মর্জির মিনারে চাপানো যায় না। হয় সেই আইনকে আইন মোতাবেক বদলাতে হতো। নয়তো ১৯৫৭ সালের ২৬ জানুয়ারির পর ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩৭০ খারিজ করতে হতো।”

    সে তো হয়েইছে। বাষট্টি বছর পরে হলেও হয়েছে তো। তার মধ্যে না হয় আফগানিস্তানে রুশ সৈন্য খেদানো হয়ে গেলে বেকার হয়ে যাওয়া মুজাহিদিনগুলো কাশ্মীর বেড়িয়ে, ধারা ৩৭০ -এর কোলে দোল খেয়ে গেছে। না হয় কটা মানুষ মরেছে। না হয়, পণ্ডিতগুলো পালিয়ে বেঁচেছে, মানুষের ইতিহাসে অমন কতো হয়েছে। কতো হবে। তাই নিয়ে .........

          কাশ্মীর যদি আজাদ হয় তাতে আপত্তি কিসের? আপাতত কাশ্মীরের যে অংশটা আজাদ কাশ্মীর বলে চিহ্নিত, সেখানে জন্মানো লোকেরা ইউনাইটেড কিংডমের নানান শহরের মেয়র। তাঁদের অভিবাসনের নথিতে লেখা আছে যে তাঁরা পাকিস্তানি নাগরিক। এখন প্রশ্ন হল যে জন্মভূমি আজাদ কাশ্মীর হলে নাগরিকত্ব যদি পাকিস্তানের হয়, তাহলে কাশ্মীর আজাদ হলো কী করে?

          যদি কাশ্মীর পাকিস্তানে চলেই যায়, তাতে কী? তাতে অনেক কিছু হতে পারে। মানে ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭৫-এও যদি এমন ঘটনা ঘটত তাহলে খালসার রাষ্ট্র খালিস্তান বানানোর বাইটা পঞ্জাবের ও ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যেমনভাবে ঘটেছে তেমন ভাবে ঘটত না। কাশ্মীর পাকিস্তানে গেলে, তারপর পঞ্জাবও যেত, তখন খালিস্তানি আন্দোলন পাকিস্তানে হতো কিংবা হতো না। অথবা ভারতেই হতো, পাকিস্তানের মদতে। কিংবা উল্টোটা? মনে হয় না। যে ভাবে ধারা ৩৭০ পুষে রাখা হয়েছিল...।

          কাশ্মীর আর পঞ্জাব গেলে, টান পড়ত হিমাচলে, লক্ষ্ণৌতে, মুম্বাইতে (বম্বেতে), হায়দারাবাদে এবং মুর্শিদাবাদেও। হয়তো সাতপুরা পাহাড়ের উত্তরে আর নাসিকের পশ্চিমে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বই থাকত না। তাতে অবশ্য দুনিয়াব্যাপী নিঃসীম প্রোলাতারিয়ত শাসনতন্ত্রের ভারতনিবাসী প্রবক্তারা আনন্দ পেতেন। কারণ এই টানাটানিতে পাকিস্তানের সীমা বদলালেও ভারতের তো অন্তত সীমা লোপ পেত।

          মুর্শিদাবাদে টান পড়লে কী হতো সেটা বোঝা একটু কষ্টকর। পশ্চিমবঙ্গের ইস্কুলপাঠ্য ইতিহাস বইতে ১৯৪৬-এর ইতিহাসে কেবলমাত্র একটি ঘটনাই ঘটেছিল; সেটা নৌবিদ্রোহ। নির্মম ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র কোনো উল্লেখ মাধ্যমিক পাঠক্রমের কোনো বইতে ছিল না। যে অতিপাকারা প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কথা জানত তারা বাবা-মায়ের কিরণ চৌধুরির বইতে উঁকি দিয়েছিল। বেশির ভাগেরই নিজের ইস্কুলের বই পড়তে ভালো লাগত না। বাবা-মায়ের ইস্কুলের বই যে তারা পড়ে নি......।

          ১৯৪২ পরবর্তী বছরগুলোতে যাঁরা নিজেদের ভিটেমাটি জন্মস্থল ছেড়ে মান আর প্রাণ বাঁচিয়ে কোনোমতে পশ্চিমবাংলার আত্মীয়ের বাড়িতে, পরিচিতের বাড়িতে এবং নিরাশ্রয় হয়ে রেল স্টেশনে, ফুটপাথে,খালপাড়ে, ফাঁকা মাঠে ঠাঁই নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রবঞ্চনার কাটা ঘায়ের উপর নুনের ছিটে হয়ে যাবে না তো পাকিস্তান মুর্শিদাবাদ নিয়ে নিলে?

          ইচ্ছে মানুষের। আইন মানুষের। ইচ্ছে মতো আইন বদলে ফেলা যায়। ইচ্ছে মতো জমি দখল করা করা যায়। দখল করার আগে জমিটা যার দখলে ছিল তাকে উৎখাত করা যায়। প্রতিশ্রুত জমি অর্জন করার জন্য রক্ত দিতে হয়, নিতে হয় বইকি। আফটার অল, ঈশ্বর আদতে একজন রাজনীতিক। তিনি জরথ্রুষ্টকেও জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মহম্মদকেও দিয়েছিলেন। কাউকে বলেছিলেন, “তুমি পৃথিবীর সেরা বীর। বীরভোগ্যা বসুন্ধরা।” হিটলার, মুসোলিনি আর জেনারেল তোজোর সাথে, দুনিয়ার ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন মোটামুটি।

যখন যার কাছে প্রিয় হয়ে টিকে থাকার ভোট কুড়োতে লেগেছে, তাকেই ঈশ্বর চানার ঝোপে চড়িয়েছেন।তাই এই রাজনৈতিক বিনোদন চলছে, চলবে। কারণ ঈশ্বর সর্ব শক্তিমান ও সর্বকালে বিরাজমান।

শেষ কথাঃ

          ১৯৭১-এ বাংলাদেশের বদলা নিতেই ১৯৭৫ থেকে প্লেবিসাইটের পাঁয়তাড়া এমন প্রমাণও নাকি আছে। সেসব কথা আর বলছি না।

          “কত তাড়াতাড়ি লেখাটা দিতে হবে?” জানতে চেয়েছিলাম রাজর্ষিদার কাছে।

          রাজর্ষিদার উত্তর ছিল, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”

          লিখতে লিখতে মনে হলো এই লেখাটা সারাজীবন ধরে লিখলেও অপ্রাসঙ্গিক হবে না। গত বাহাত্তর বছরে কাশ্মীর/ জম্মু ও কাশ্মীর সব সময়েই কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স। সুতরাং, আমার জীবদ্দশায় জম্মু-কাশ্মীরটা দমন-দিউ-এর মতো ম্যাদামারা পানসে হয়ে যাবে, এমনটা কিছুতেই ভাবতে পারছি না।





সংহিতা মুখোপাধ্যায়

সংহিতা মুখোপাধ্যায়




To post comments Sign Up


Comments


×

CONTACT

RAJARSHI CHATTOPADHYAY (EDITOR)

289, ASHOKEGAR

PURNIMA VILLA

1ST FLOOR

KOLKATA – 700108

Copyright © 2019 www.nayadashak.co.in
A Literary Venture of Naya Dashak (S/SC NO.26851 of 2014-2015)